চলতে চলতে কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কিংবা অন্য কারো কাছে তাঁদের সম্পর্কে জেনে আমরা অবাক হই এজন্য যে, এঁরা অন্য দশজন মানুষের মতো নন, বরং এঁদের বলা যায় এগারোতম। সমাজ প্রায়ই এমন মানুষদের সহ্য করতে পারে না; তবে এঁরা আছেন বলেই পৃথিবী বর্ণিল।

এমন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি এ গল্পের প্রধান চরিত্র; তাঁর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি; দেখা হওয়ার কথাও ছিল না; ঘটনাচক্রে এ রহস্যময় মানুষটি সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জেনেছি। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে আমি কার কাছ থেকে জেনেছি। জেনেছি স্বপনদার কাছে। কে এই আমিনুল ইসলাম চৌধুরী? স্বপনদাই বা কে? কী তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক? এসব বিষয় নিয়ে আপনাদের আপাতত না ভাবলেও চলবে, কেননা আপনারা তো আদতে একটা গল্পই পড়তে চলেছেন।

গল্পের শুরুতে একটু ভূমিকা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

রবিঠাকুরকে দেখেছেন, সঙ্গ পেয়েছেন, শান্তিনিকেতনে এমন ব্যক্তির সন্ধান করতে করতেই স্বপন ভট্টাচার্য মানে স্বপনদার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। প্রায় ১৭ বছর আগে। বন্ধু অমিতাভের মাধ্যমে। আমার অভিপ্রায় জানার পর অমিতাভ বলেছিল, তার পরিচিতদের মধ্যে স্বপনদা ছাড়া আর এমন কেউ নেই, যিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছেন; তবে মোহরদি (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) বেঁচে থাকলে সে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যেত। আমিও জানতাম, মোহরদি বছর তিনেক আগে গত হয়েছেন। অমিতাভের কাছেই প্রথম শুনতে পাই, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং মোহরদির ছোটবেলায় তাঁকে গান শিখিয়েছিলেন।

অমিতাভ তখন বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমরা দুজন একসঙ্গেই ভর্তি হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুজনেরই সাহিত্যে প্রবল আগ্রহ থাকায় আমাদের বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগেনি। তবে রবীন্দ্রসংগীতে পড়ার জন্য ভারত সরকারের বৃত্তি পেয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ ছাড়ে। পাড়ি জমায় শান্তিনিকেতনে। অমিতাভের এমন ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের জন্যই আমি তাকে পছন্দ করতাম। অথচ মিনমিনে স্বভাবের আমি ছোটবেলা থেকে কেবল নিশ্চয়তা খুঁজতাম। এখন কিছুটা সাহস বাড়লেও সে সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতেই ভয় পেতাম, পাছে কোনো ভুল করে ফেলি। যা-ই হোক, তার আমন্ত্রণেই আমি সেবার রবীন্দ্রতীর্থে বেড়াতে গিয়েছিলাম।

ছাতিমতলায় জমে উঠেছিল আমাদের আড্ডা। ৮২ বছর বয়সী একজন মানুষ এমন প্রাণবন্ত হতে পারে তা আমার ধারণার মধ্যে ছিল না; প্রায় হাঁটুর বয়সী এক নবীনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে স্বপনদার কোনো সমস্যাই হয়নি; বরং বিভিন্ন বিষয়ে রসিকতা করে আমার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক স্থাপন করলেন মুহূর্তে; মিলে গেল বয়সের ব্যবধান যেন দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রবিঠাকুরের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম স্বপনদাকে। রবীন্দ্রনাথ মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন, মানুষে-মানুষে কোনো বৈষম্য করতেন কিনা, কোনো কারণে মেজাজ চড়ালে কী করতেন, কী খেতে বেশি পছন্দ করতেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

গুরুদেব প্রসঙ্গে কথা বলতে বেশ পুলকবোধ করছিলেন স্বপনদা। চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল খুশির ঝিলিক। তিনি যেন ভাবের ঘোরে বিভোর হয়ে যাচ্ছিলেন বারবার; জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রারম্ভের কথা স্মরণ করার মধ্যে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলেন। প্রখর স্মৃতিসম্পন্ন ও বাগ্মী পুরুষ স্বপনদাকে আমি বারবার চারিয়ে দিচ্ছিলাম। স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে তিনি বলে যেতে লাগলেন অনর্গল, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জড়িত তাঁর বিভিন্ন সময়ের ঘটনা। ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রমথনাথ বিশী, নন্দলাল বসু, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, ক্ষিতিমোহন সেন—এঁদের কথাও বাদ দেননি। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলাম সেসব অমিয়বচন। বিশেষ করে স্বপনদার কথা বলার ধরন ও উপস্থাপনার ভঙ্গি আমাকে এমনভাবে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল যে আমার মনোযোগে সামান্য সময়ের জন্যও বিচ্যুতি ঘটছিল না, যা আমার স্বভাবের সঙ্গে কিছুতেই যায় না।

হঠাৎ কথা প্রসঙ্গে আমার বাড়ি চট্টগ্রাম শুনে একটু থামলেন। তারপর টানলেন তাঁর বন্ধু আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর প্রসঙ্গ। আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর কিছু লেখা পড়লেও আমি তাঁর সম্পর্কে তেমন বিশেষ কিছু জানতাম না। শুধু জানতাম তিনি শান্তিনিকেতনে থাকেন। তাঁর ‘বাঙালির আত্মহনন’ আর ‘জাতীয়তাবাদের অন্তসারশূন্যতা’ নামের দুটি প্রবন্ধ আমার মনে বেশ দাগ কেটেছিল। সে কথা জানাতেই স্বপনদা বেশ গর্ব করে বললেন, আমরা দুজন একই সময়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে এসেছিলাম।

তার মানে আপনারা সতীর্থ?&dquote;&dquote;

হ্যাঁ। সময় যে কীভাবে বয়ে যায়! কত বছর হয়ে গেল। তবু মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা! সময়টা ১৯৩৫ সাল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সারা ভারতবর্ষ কেঁপে কেঁপে উঠছে। তখন আমাদের বয়স বড়জোর ১৭ হবে। আর গুরুদেবের বয়স প্রায় ৭৪। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সে সময় সমানতালে ছবি এঁকে চলেছেন তিনি। কলমও থেমে নেই। একই সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে-বিদেশে। একজন সত্তরোর্ধ্ব অশীতিপর বৃদ্ধের ভেতর এমন প্রাণ-প্রাচুর্য দেখে আমরা যারপরনাই বিস্ময়বোধ করি তখন; পরিচিতমণ্ডল এমন মানুষ কখনো দেখিনি তো। তাঁকে দেখেই বুঝতে পারি, বার্ধক্য আসলে দেহের ব্যাপার নয়, মনের ব্যাপার। আমরা ঋষিতুল্য এই মহান মানুষটির কর্মকাণ্ড দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত হয়ে পড়ি। ‘ফেলো জীর্ণ চীর/ পরো নব সাজ/ আরম্ভ করো জীবনের কাজ’—রবীন্দ্রনাথের এই কর্মের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সেই যে পথচলা শুরু, সেই পথের শেষ আমরা আর খুঁজে পাইনি।

স্বপনদা আরো বললেন, আমিনুলের মতো এমন মেধাবী আর নিষ্ঠাবান আমাদের সতীর্থদের মধ্যে দ্বিতীয় কেউ ছিল না। তবে সহপাঠী অনির্বাণ গুহঠাকুরতার মধ্যে তাঁর মতো বেশকিছু গুণ ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য যে অনির্বাণ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

কেন চট্টগ্রাম থেকে এত দূরে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ এক মুসলমান বালক পড়তে এসেছিল, কৌতূহলে জানতে চাইলাম।

এ প্রশ্ন করতেই স্বপনদা একটু মুচকি হাসলেন। আমিনুল আমাকে বলেছিল, সে রবীন্দ্রনাথের কাছে চিঠি লিখে জানতে চায়, কেন তিনি প্রথম জীবনে ‘শিবাজী উৎসব’-এর মতো সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন কবিতা লিখেছিলেন। আরো জানিয়েছিল, এজন্য তাকে বন্ধুদের কাছে প্রায় ছোট হতে হয়। এ প্রসঙ্গ তুলে বন্ধুরা রবীন্দ্রবিরোধিতায় মেতে উঠলে তা তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। কেননা রবীন্দ্রনাথের গল্প, কবিতা ও গানের ভক্ত সে। একটি ১৪ বছর বয়সী বালকের লেখা চিঠির প্রত্যুত্তরে খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা নোবেল বিজয়ী কবি সংক্ষেপে সেই কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট জানান। রবীন্দ্রনাথ আরো লেখেন, তোমার জ্ঞানস্পৃহা, সত্যানুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা আর সাহিত্যানুরাগ আমাকে সত্যি মুগ্ধ করেছে। তোমার জন্য আমার আশীর্বাদ সবসময় থাকবে। তুমি বড় হলে শান্তিনিকেতনে এসো।

উত্তর পাওয়ার পর উত্তেজনায় সে কয়েক রাত ঘুমাতে পারেনি। গর্বে বুক ফুলে ওঠে তাঁর। যাকে পায় তাকে দেখায় চিঠিটি। তখনই রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য হয়ে পড়েছিল সে। বন্ধুরা তাঁর নাম দিয়েছিল ‘রবীন্দ্রপাগল’। এমনিতে তাঁর সাহিত্যপ্রীতি ছিল প্রবল; ওই চিঠিটি হয়ে ওঠে সেই আবেগে আগুনে ঘি ঢালার শামিল। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে আর দেরি করে না একরোখা আমিনুল। মায়ের সঙ্গে এক রকম ঝগড়া করে কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে সোজা চলে আসে শান্তিনিকেতনে। তল্পিতল্পাসহ। গুরুদেবের পদতলে সমর্পণ করে নিজেকে। ছয় বছরের রবীন্দ্র সান্নিধ্য আমূল পাল্টে দিয়েছিল আমিনুলের জীবন।

তিনি এখন কোথায় থাকেন?

কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

মানে?

তাঁর ইচ্ছানুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য মরদেহটি দান করে দেয়া হয়েছিল।

কবে মারা গেলেন তিনি?

গত বছর। ১৫ এপ্রিল।

তিনি কি বাকি জীবন শান্তিনিকেতনেই ছিলেন?

হ্যাঁ। এখানেই কেটেছে রবীন্দ্র-অন্তঃপ্রাণ অকৃতদার আমিনুলের গোটা জীবন।

মানবকল্যাণে মরদেহ দান, চিরকুমার থাকা, শান্তিনিকেতনে একটা জীবন পার করা—এ কথাগুলোর মধ্যে আমি যেন গভীর রহস্য টের পাচ্ছিলাম; তা উদ্ঘাটন না করে যে আমার তৃষ্ণা মিটবে না। অনুসন্ধিত্সু আমার মন মুহূর্তে নেচে ওঠে। আমি স্বপনদাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকি; তিনি একটুও বিরক্তি প্রকাশ করেন না; বরং বন্ধুর কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন।

আচ্ছা দাদা, ব্যাপারটা যদিও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, তবু জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, তিনি কেন বিয়ে করেননি? কোনো গোপন বিষয় কি আছে?

সে অনেক কথা। আমিনুল ভালোবাসত কলকাতার মেয়ে অনুরাধা গোস্বামীকে। অনুরাধাও বিশ্বভারতীতেই পড়ত। দুজনের প্রেমকাহিনী ক্যাম্পাসে সবার মুখে মুখে ছিল। অনুরাধার মা-বাবা ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ। তাঁরা কিছুতেই আমিনুলের কাছে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। অনুরাধাও আমিনুল ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না। পরিবারের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্বে অনুরাধা শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। তখন ভীষণ মুষড়ে পড়ে আমিনুল। ওই ঘটনা বিয়ে না করার কারণ হতে পারে। অনুরাধার মৃত্যু ছাড়াও আরো একটি বড় আঘাত সে সারা জীবন বহন করে বেড়িয়েছে।

কী সেটা?

দেশ বিভাগ। চিরাভিমানী আমিনুল আমৃত্যু দেশভাগের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। রাজনৈতিকদের হঠকারী সিদ্ধান্তের বলি হওয়া সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের অবর্ণনীয় দুtখ-কষ্ট, বাস্তুভিটা ত্যাগের মতো ঘটনাগুলো তাঁর বুকে শেলের মতো বিঁধেছিল। দেশের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য দেশ আর মানুষের জন্য ধর্ম, না ধর্মের জন্য মানুষ—এমন সব প্রশ্নে সে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। মানুষের কষ্ট সে একদম সহ্য করতে পারত না। আমার সঙ্গে প্রায়ই এসব বিষয়ে আলাপ করত সে।

তিনি এখানে কী করতেন?

আমিনুল ছিল বিশ্বভারতীর বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক। চীনা-ফরাসিসহ আরো কয়েকটি ভাষাও বেশ ভালো জানত। অধ্যাপনা পেশা হলেও সাহিত্যচর্চায় ছিল সে নিবেদিতপ্রাণ। ধরতে গেলে সাহিত্যই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা। রবীন্দ্রগবেষক হিসেবে তাঁর বেশ নামযশ আছে। তবে সে ছিল মূলত মননশীল প্রাবন্ধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই ‘বাংলাদেশের হূদয় যেদিন দ্বিখণ্ডিত হয়’, ‘রবীন্দ্র-সংস্পর্শে আমার দিনগুলি’, ‘কেন শান্তিনিকেতনে বাসা বেঁধেছি’, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ’, ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’, ‘বিশ্ববাঙালি’, ‘জিন্নাহ, নেহরু, মহাত্মা গান্ধী এবং দেশভাগ’। এমন প্রায় শতাধিক মূল্যবান বইয়ের রচয়িতা সে। তাঁর জীবনের লক্ষ্যই ছিল জ্ঞানান্বেষণ। ভ্রমণকে সে জ্ঞানার্জনের অন্যতম অনুষঙ্গ মনে করত। ভ্রমণের নেশা ছিল প্রবল। সুযোগ পেলেই উড়াল দিত। দূর-দূরান্তরে। আমিও বেশ কয়েকবার তাঁর ভ্রমণসঙ্গী হয়েছি। প্রতিটি দ্রষ্টব্য স্থানের ভূগোল ও ইতিহাস ছিল তাঁর নখদর্পণে।

স্বপনদা থামতে চান না। রেজাল্ট ভালো থাকার কারণে বিশ্বভারতী আমিনুলকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। বরাবরই পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করত সে; রেকর্ডসংখ্যক নম্বর নিয়ে। তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁর প্রতি গুরুদেবের অকৃত্রিম স্নেহের কথা এখানে সবাই জানত। তাই বিরোধিতা থাকলেও তা ধোপে টেকেনি। তাঁর অধ্যাপনায় নিযুক্ত হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় ঘটে দেশভাগের ঘটনা; একই সঙ্গে কোটি কোটি ভারতবাসীর জীবনে আসে বহুল প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিনিময়ে হিন্দু-মুসলমানের রক্তে অর্জিত ওই স্বাধীনতাকে সে মেনে নিতে পারেনি। বাংলা ভাগ তাঁর হূদয়টাকে ভেঙে দুই টুকরো করে দেয়। বাঙালি জাতির বিভক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে প্রখর অনুভূতিপ্রবণ ও সংবেদনশীল আমিনুলের মনোজগত। তবে কারো সঙ্গে দেশভাগ ও স্বাধীনতাসংক্রান্ত বিষয়ে সে আলাপ করত না। গায়ে পড়ে কেউ করতে চাইলেও সে এড়িয়ে চলত।

কেবল মুসলমান বলে অনেকে তখন তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতে বলেছিল। এমন প্রস্তাব সে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট রাষ্ট্রে সে যাবে না। মনে-প্রাণে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানুষটির বিরুদ্ধেও সাম্প্রদায়িকতার অপবাদ দেয়া হয়। আনা হয় দেশদ্রোহিতার অভিযোগও। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় তাঁকে পাকিস্তানি চর আখ্যা দেয় বিরোধী পক্ষ। এখানে তাঁর নিন্দুকও কম ছিল না। অপমানে চাকরিতে রিজাইন দিয়ে কলকাতায় চলে যায় সে। কলকাতায় গিয়েও শান্তি পায় না। ঘুরতে থাকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে। দক্ষিণের সমুদ্রে। উত্তরের হিমালয়ে। সাধু-সন্ন্যাসীদের সঙ্গে কাটায় বেশ কিছুদিন। ভেতর থেকে সাড়া পায় না। মন পড়ে থাকে শান্তিনিকেতনের নিবিড় শালবনে। গুরুদেবের অদৃশ্য পদতলে। প্রান্তিকের ছায়া ঘেরা বাড়িটিতে। আমাকে সে চিঠি লিখে সব জানাত।

তারপর কী হয়েছিল?

বছর দুই পর আবার সে ফিরে আসে নিজ গৃহে। চাকরি করার সময় সে প্রান্তিকের কাছে একটি বাড়ি করেছিল। বেশ সাজানো-গোছানো ও দৃষ্টিনন্দন বাড়ি; মনের মতো করে সে সাজিয়েছিল বিশাল বাড়িটি। এর মধ্যে শুরু হয় মুক্তিপাগল বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। সে সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায়ই সে চলে যেত সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ক্যাম্পের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে সে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করত। ধরতে গেলে যুদ্ধের পুরো নয় মাসই সে সীমান্তের কাছে কাছে কাটায়। আমিনুল সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করত বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। তাঁর অনেক লেখায় সে এটা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে আবহমানকাল ধরে বাঙালি এক অসাম্প্রদায়িক জাতি। বাইরের শক্তিই বাঙালিকে বারবার বিভক্ত করতে চেয়েছে। নিজেদের স্বার্থে।

স্বাধীনতার পর তাঁকে অনেকেই বাংলাদেশে পিতৃভূমিতে ফিরতে বলেছিল। তিনি ফিরে যাননি।

প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করি, তিনি কি ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন? পালন কি করতেন ধর্মীয় আচারাদি?

সেই অর্থে সে প্রচলিত ধর্মকর্মে বিশ্বাস করত না। মানত না ধর্মীয় কোনো অনুশাসন। পালন করত না কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। এসবের পেছনে একটা গূঢ় কারণ ছিল। অবশ্য এ বিষয়টি আমি ছাড়া আর কেউ জানত না। কারো কাছে তা সে কখনো প্রকাশ করেনি। সে আসলে ছিল এক দরিদ্র নমtশূদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁর প্রকৃত মা-বাবার সংসারে ছিল অভাব আর অভাব। বাচ্চাকাচ্চা ছিল অনেকগুলো। তাদের কাছ থেকে এক নিtসন্তান মুসলমান নারী তাকে টাকা দিয়ে কিনেছিল। স্বামী আপত্তি করেননি। কিন্তু বিষয়টা যতদিন গোপন ছিল, ততদিন কোনো সমস্যা হয়নি। আমিনুল যেদিন তাঁর জন্মের ঘটনাটি জানতে পারে, সেদিনই ঘটে বিপত্তি; তাঁর জীবনে শুরু হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার কয়েক দিন আগে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার সময়ই তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়। তখন থেকে তাঁর জীবনের সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। জ্ঞানচর্চাকেই তিনি জীবনের একমাত্র ব্রত করে নেন। আমিনুল প্রায়ই বলত, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য না পেলে সে কোথায় ভেসে যেত! রবীন্দ্রনাথকে সে একবার বলেছিল, ‘গোরা’ উপন্যাসের কাহিনী একটু এদিক-ওদিক করে দিলে তাঁর জীবনেরই কাহিনী; গোরার মা আনন্দময়ীর স্থানে তাঁর মা আমিনা, আর পরেশ বাবুর স্থানে রবীন্দ্রনাথ। গোরাকে নিয়ে আমিনুলের প্রবল আগ্রহ তাঁর প্রতি রবীন্দ্রনাথের অত্যধিক স্নেহের একটি কারণ হতে পারে।

তিনি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন?

খাঁটি লোক ছিল সে; বলা যায় সোনার মানুষ। কোনো ভেজাল ছিল না তাঁর মধ্যে। যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছে তাঁরা জানে, সে কত বড় মাপের মানুষ ছিল। আমিনুল কোনো কিছু না করতে চাইলে বলত, গুরুদেব এটা কখনো করত না। আর করতে চাইলে বলত, এটা গুরুদেবের দেখানো পথ। তাঁর মতো এমন রবীন্দ্রানুরাগী আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি।

তাঁর জীবনের একমাত্র আদর্শই ছিল রবীন্দ্রনাথ। গোরার মধ্যে সে খুঁজত নিজেকে; যার দেশ নেই, কাল নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, যে কেবলই একজন মানুষ। আর গুরুদেবের গান ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। প্রার্থনা করত রবীন্দ্রনাথের গানে গানে। মানবতাবাদী মানুষটি সব মানুষকে দেখত সমান চোখে; সেখানে দেশ-জাত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের কোনো পার্থক্য ছিল না। হিংসা-বিদ্বেষ-লোভ-ঘৃণা কী বস্তু, তা বোধহয় সে জানতই না।

আর কথা না বাড়িয়ে আমি স্বপনদাকে অনুরোধ করি আমাকে প্রান্তিকের ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার প্রস্তাবে স্বপনদা কেমন যেন ইতস্তত করতে থাকেন। অমিতাভকে দিয়ে আবার চাপ দিই। অবশেষে পরদিন সেই বাড়িতে নিয়ে যেতে স্বপনদা সম্মত হন।

যেতে যেতে বললাম, বাড়িটিতে এখন কে থাকে?

কী ভেবে যেন উত্তর দিলেন, আমিনুলের সন্তানরা থাকে।

বিস্ময়ে প্রশ্ন করি, তিনি না চিরকুমার? সন্তান এল কোত্থেকে?

উত্তর না দিয়ে স্বপনদা একটু হাসলেন। গেলেই বুঝতে পারবেন।

কৌতূহল চেপে রাখি। আমি আর কোনো প্রশ্ন করি না।

বাড়িটির চাবিও স্বপনদার কাছেই ছিল।

আমার মনে হয়েছিল, বাড়ি নয়, এ যে মিউজিয়াম কাম লাইব্রেরি। বাড়িজুড়ে কেবল বই আর বই। আর দেয়ালে দেয়ালে বিচিত্র ছবির সমাহার। ফটোগ্রাফির শখ যে ছিল তা স্পষ্ট। দেয়ালজুড়ে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বয়সী ছবি। অনুরাধার বেশকিছু ছবিও ছিল। তবে তাঁর নিজের কোনো ছবি ছিল না। আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়াই; ঘুরে ঘুরে সব দেখি আর অবাক হই।

ঘণ্টাখানেক পর স্বপনদা আমাকে নিয়ে চলেন পাশের প্রাচীরবেষ্টিত এক আবদ্ধ স্থানে। ঢুকতেই গেটে লেখা সাইনবোর্ড—‘মানবতীর্থ’। ভেতরে কী আছে দেখার জন্য উদগ্রীব হতেই স্বপনদার কথা কানে আসে—অবাক হতেই হবে।

হাতের ডানে চোখে পড়ল অনাথাশ্রম—‘স্বর্গভূমি’। কানে ভেসে এল প্রায় ৫০ জন অনাথ শিশুর উল্লাসসংগীত—‘আনন্দালোকে, মঙ্গলালোকে, বিরাজ সত্য সুন্দর’। একটু এগিয়ে যেতেই বাম পাশে প্রতিবন্ধী আশ্রম—‘শান্তিনিবাস’। প্রায় ৪০ জন প্রতিবন্ধী শিশু সমস্বরে গাইছে—‘তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করে, মলিন মর্ম মুছায়ে’। তারপর একে একে চোখে পড়ল বৃদ্ধাশ্রম, দুস্থ মানুষের জন্য সেবাশ্রম।

এতসব সেবাধর্মী কাজ একসঙ্গে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। আবেগে চোখে অশ্রু চলে আসে।

স্বপনদাকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব কর্মকাণ্ড চালানোর খরচ আসে কোত্থেকে?

উত্তর না দিয়ে তাঁকে অনুসরণ করতে বললেন। আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই। একে একে প্রদক্ষিণ করি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলের খামার, মাছ চাষের পুকুর। অনেক মানুষকে একযোগে কাজ করতে দেখি। সবাই গভীর মনোযোগে কর্মে নিয়োজিত; অন্যদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

আমার দিকে তাকিয়ে স্বপনদা শুধু বললেন, এসব আমিনুল সন্তানের মমতা দিয়ে গড়েছে।