বইয়ের নাম সাইক্লিং ইন বেঙ্গল: আ গাইড টু প্র্যাকটিক্যাল ট্যুরস, লেখক ডব্লিউএস বার্ক। বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে। বই খুললেই কিছু কৌতূহলোদ্দীপক বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে, যেমন ম্যাকফি অ্যান্ড ম্যাকডোনাল্ডস বিজ্ঞাপন দিচ্ছে সাইক্লিস্টদের কোট, মোজা, টুপি, সোয়েটার, শার্ট এবং বেনিয়ানের—এগুলো পুরুষদের জন্য। নারী সাইকেল চালকদের জন্যও আছে ভেস্টস, বেল্ট, স্কার্ট, জ্যাকেট, ব্লাউজ, শার্ট। অর্থাৎ সাইকেল চালাতে কাউকে যত পোশাক ও অনুষঙ্গ দরকার হয়, সেসবই পাওয়া যাবে এ দোকানে। আর হেনড্রাই অ্যান্ড কোম্পানির বৈশিষ্ট্য হলো, তারা একই সঙ্গে সাইকেল বিক্রি, মেরামত করে এবং সাইকেল চালানো শেখায়। তাদের কাছ থেকে সাইকেল ভাড়া নেয়ারও সুযোগ আছে। তাদের আকর্ষণ ছিল আমেরিকার ক্লিভল্যান্ড সাইকেল। হেনড্রাই ক্লিভল্যান্ড সাইকেল বাতি, বেল্ট ও অন্যান্য গিয়ারসহ বিক্রি করত; দাম ২৭৫ রুপি। তাদের কাছে আরো ছিল সাশ্রয়ী দামে আমেরিকার জিমি সাইকেল, ডানলপ টায়ার ও ফিল্ড নামের ব্রিটিশ সাইকেল। আর হেনড্রাই অ্যান্ড কোম্পানির দোকান ছিল কলকাতার ধর্মতলায়। এলকিংটন অ্যান্ড কোম্পানি বিক্রি করত বিভিন্ন খেলার বিজয়ীদের দেয়ার জন্য শিল্ড, কাপ, ট্রফি।

‘স্মিথ, স্টানিসট্রিট অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সাইক্লিস্টদের শারীরিক সমস্যা ও সেসবের সমাধানের প্রাথমিক পরামর্শ দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। দীর্ঘক্ষণ সাইকেল চালালে চোখ ও পেশিতে সমস্যা হতে পারে এবং সেসবের জন্য তারা বিজ্ঞাপনে কিছু মলম এবং ওষুধের সুপারিশ করেছে।

বইয়ের ভূমিকায় ডব্লিউএস বার্ক লিখেছেন, তার এ কাজের উদ্দেশ্য বাংলার সাইক্লিস্টদের মধ্যে ট্যুরের আগ্রহ জাগিয়ে তোলা। তার মতে, অবসর কাটানোর দারুণ এ উপায়টির প্রতি বাঙালি খুব কমই মনোযোগ দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলায় সাইকেল ভ্রমণের দারুণ সব সুবিধা আছে—চমত্কার সড়ক, ডাকবাংলো, রেল ও নৌ-যোগাযোগ, বড় বড় মফস্বল স্টেশন এবং অনেক কৌতূহলোদ্দীপক স্থান।’ বাংলার অনেকটা পথ সাইকেলে ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। সে অভিজ্ঞতার আলোকে বইটি লিখেছেন। ‘এ বইয়ের পাতায় যত তথ্য দেয়া হয়েছে, তার সবই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। যেসব পথে ভ্রমণের বর্ণনা আছে, সেগুলোর সবই আমি ভ্রমণ করেছি।’

বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে লেখক সাইকেল ট্যুরের উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। এরপরের অধ্যায়ে বার্ক সাইকেলের যত্ন কীভাবে নিতে হবে, সে বিষয়ে বলেছেন। তারপরের অধ্যায়ে বলেছেন ট্যুরে কী কী সঙ্গে নিতে হবে; পোশাক, নানা ধরনের গিয়ারের পাশাপাশি চা-চিনি নিতে ভুল করতে মানা করেছেন। কারণ বাংলোয় আসবাব, রান্নাঘর থাকলেও চা থাকবে না। এরপরই বার্ক শুরু করেছেন বাংলার পথে-প্রান্তরে তার ভ্রমণের বর্ণনা, যেমন কলকাতা থেকে বর্ধমান, কলকাতা থেকে খুলনা, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, পুরুলিয়া থেকে রাঁচি প্রভৃতি। এসব অধ্যায়ের শুরুতেই তিনি যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য, রাস্তার অবস্থা, কোথায় কোথায় রাত কাটানো যাবে, সেসব অবস্থান, ট্রেন-স্টিমারের যাত্রাপথ, স্টেশন, ভাড়ার তথ্য দিয়েছেন। বার্ক সারা পথ সাইকেলে ভ্রমণ করেছেন, এমন নয়। তিনি বরং বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেনে, স্টিমারে সাইকেল নিয়ে গেছেন, তারপর সেখান থেকে পছন্দমতো কোনো জায়গার উদ্দেশ্যে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। বার্ক যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থানের যে বিবরণী তুলে ধরেছেন, তা বিশদ ও নিখুঁত। খুলনা থেকে তিনি মাগুরা হয়ে যশোর গেছেন। যশোরে ওঠেন জেলার ডাক বাংলোয়। খুলনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘আগের দিনে খুলনা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। জন কোম্পানির লবণ বিভাগের সদর দপ্তর ছিল এখানে। এমনকি এখনো এটা একটা ব্যস্ত স্টেশন।’

সাম সেন্ট্রাল বেঙ্গল রোডস শিরোনামের এক অধ্যায়ে বার্ক বাংলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পথের উল্লেখ করেছেন। এ পথগুলো হলো কিশেনগঞ্জ থেকে কোটচাঁদপুর হয়ে যশোর, যশোর থেকে পাবনা, চুয়াডাঙ্গা থেকে ঝিনাইদহ।

পূর্ব বাংলায় বার্ক যতটুকু ভ্রমণ করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পথটি ছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। তিনি ঢাকা থেকে সড়ক ও জলপথ ব্যবহার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যান। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সাইকেলে চেপে চট্টগ্রাম যাত্রা করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব উল্লেখ করেছেন ৯৬ মাইল। জানিয়েছেন এ পথে রাস্তার অবস্থা ভালো। ডব্লিউএস বার্কের বই থেকে ‘ঢাকা টু চিটাগং’ অধ্যায়টি এখানে ঈষৎ সংক্ষিপ্তরূপে ভাষান্তর করা হলো—

বাংলার সবচেয়ে উপভোগ্য সফরগুলোর একটি ছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। দৃশ্যের ছিল বৈচিত্র্য নদী, অরণ্য, পাহাড়, ভালো রাস্তা, কিছুটা স্টিমারে ভ্রমণ, কিছুটা নৌভ্রমণ, কৌতূহলোদ্দীপক সব স্থান, প্রাচীন স্থাপনা আর শীতকালে বের হলে এসবের সঙ্গে পাওয়া যাবে দারুণ আবহাওয়া। এই সফরে যে পথ পাওয়া যাবে, তা বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে একেবারে ভিন্ন। এখানের মানুষজন ভিন্ন, সবখানে নতুন নতুন জিনিস চোখে পড়বে, সব ধাপে নতুন ও প্রশান্তির অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। বড়দিনের সময় কোনো সাইক্লিস্ট ১০ দিনের ছুটি হাতে নিয়ে এ পথে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন। এটুকু নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনার সফর উপভোগ্য ও লাভজনক হবে। তিনি এ দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন।&dquote;&dquote;

শিয়ালদহ থেকে নাইটমেইল দিনের বেলায় গোয়ালন্দে পৌঁছে। সেখান থেকে আমরা নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রেলওয়ে মেইল স্টিমারে চাপি। সেদিন সন্ধ্যায়ই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে যাই। এখান থেকে ট্রেনে চেপে আমরা ঢাকায় হাজির হই। ঢাকায় আমরা বাংলার সবচেয়ে বড় ডাকবাংলোগুলোর একটি খুঁজে পাই। পরদিন খুব সকালে ঢাকায় এক পাক চক্কর লাগাই— হাতির আস্তাবল, পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ ও রেসকোর্স দেখে বাংলোয় ফিরে প্রাতরাশ করি। এরপর হয়তো চাইলে দুপুরের খাবারের আগ পর্যন্ত এ পুরনো শহরে ঘোরাঘুরিটা অব্যাহত রাখা যেত। এরপর আইজিএসএন কোম্পানির ডেসপ্যাচ স্টিমার ধরতে আমরা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জে যাই। স্টিমারে আমরা পৌঁছি কুমিল্লায়। স্টিমারটি রাতে নোঙর করে ছিল, সকালে লালপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া, একদম নাক বরাবর চললে আট মাইল। কিন্তু আমরা সাইকেলে না চেপে সেগুলো নৌকায় তুললাম এবং আরাম করে যাত্রা করলাম, তবে নৌপথে দুরত্ব ছিল ১৮ মাইল। এ অঞ্চলের স্থানীয় নৌকাগুলোর সুবিধা-অসুবিধা দুই-ই ছিল। সব নৌকারই প্যাটার্ন প্রায় একই রকম—লম্বা, নৌকার মাঝামাঝি বাঁশের তৈরি মাচার মতো থাকে—এখানে বসে যাত্রী সিগারেট টানতে পারে, বই পড়তে পারে, মাঝিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে। অসুবিধাগুলোর মধ্যে সাধারণ হলো নৌকার তলায় ছিদ্র থাকা, আধা ঘণ্টা অন্তর এক বা একাধিক মানুষকে নৌকার পানি সেচতে হয়। কয়েক মাইল পথ আমরা নদী দিয়েই চললাম, তারপর পাঁচ মাইল ব্যাসের একটা ঝিল অতিক্রম করলাম। ঝিল বলতে বোঝায় আট ফুট গভীরতার পানি, যেখানে ধান আবাদ হয়। এপ্রিলে ধান লাগানো হয়, ধান পানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে এবং সবসময় পানির এক ফুট ওপরে থাকে; অনেক জায়গায় এ ধানের কাণ্ড ২০ ফুট লম্বা হয়ে যায়। তবে অবশ্যই ধানের বৃদ্ধি ঘটে ধীরে ধীরে, হঠাৎ করে পানি বেড়ে গেলে ধান গাছ ডুবে যায় এবং ফসল নষ্ট হয়। ঝিল রেখে আমরা গোকর্ণ খালে প্রবেশ করলাম। এ খাল ডান দিকে মোড় নিয়ে তিতাস নদীতে প্রবেশ করেছে। এখানে থেকে দারুণ প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের শুরু। প্রত্যেক বাঁকে আমাদের সামনে গ্রামীণ জীবনের ছবি হাজির হচ্ছিল। উঁচু পাড়ে বেত, কচু ও আন্যান্য গাছের জঙ্গল। কোথাও বড় ছায়াতরুর সারি, কোথাও কোথাও আমাদের নৌকা দুই পাড়ের এসব গাছের ছায়া দিয়ে পুরো ঢেকে যাচ্ছিল। উভচর শিশুরা সারা দিন নদীর পাড়ে খেলাধুলা করে, সাঁতার কাটে, এক অন্যের গায়ে পানি ছেটায়। তাদের চিত্কার-চ্যাঁচামেচিতে গ্রামগুলো সবসময় সরব থাকে। এখানকার মানুষ মনে হয় যতটা সময় ডাঙায় থাকে, তত সময় পানিতে থাকে। তাদের দেখবেন পানিতে নেমে মাছ ধরতে কিংবা হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে আর না হয় দেখবেন পানির কিনারে—হয় পানিতে নামছে নয়তো পানি থেকে উঠছে।&dquote;&dquote;

আমরা বিকাল নাগাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছলাম এবং দাউদকান্দির উদ্দেশে সাইকেল যাত্রা শুরু করলাম। এটা ছিল সাত মাইলের যাত্রা। সেখানে গিয়ে একটা ডাকবাংলো পেলাম এবং রাতে সেখানেই থেকে গেলাম। এখান থেকে আমরা সাইকেলে ৩০ মাইল গেলাম কুমিল্লার দিকে। পথটা ছিল মনোমুগ্ধকর, কয়েকটা নদী পার হতে হয়েছিল, পুরো পথেই টিপরা পাহাড়ের দৃশ্য চোখের সামনে ছিল। পুঠিয়া ছাড়িয়েই কসবা, সেখানে রাস্তার কাছেই একটা বাংলো পাওয়া গেল—লম্বা লম্বা গাছে বাংলোটা প্রায় আড়ালেই ছিল। জায়গাটা ছিল দারুণ, পাহাড়ের গোড়ায়—ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে মাত্র ১২ মাইল দূরে। তবে এখানে আমার যাত্রাবিরতি নেয়ার কোনো দরকার নেই। কারণ কুমিল্লা তখনো ২০ মাইল দূরে। তাড়াতাড়ি রওনা হলে সকাল ১০টার মধ্যে আমরা সেখানে পৌঁছতে পারব। কুমিল্লা জলাশয়, মঠ ও মন্দিরের শহর: এগুলো আগের কালের অভিজাতদের স্মরণে তৈরি। সাধারণত তাদের যেখানে দাহ করা হতো, তার কাছেই এসব মঠ নির্মিত হতো। মঠগুলো গির্জার পেঁচানো গঠনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নিরেট ও উঁচু সমাধিফলক ছাড়া আর কিছু নয়। তবে কিছু কিছু মঠের পেঁচানো অংশ মন্দিরের মাথাকে ছাড়িয়ে যেত। মন্দিরগুলোতে অনেক পরিবার অনুদান দিত, এগুলো শিবের পূজার জন্য নির্মিত এবং প্রত্যেক মন্দিরেই শিবলিঙ্গ আছে। এসব মন্দিরে এক বা একাধিক পুরোহিত থাকেন। কিছু দীঘি আয়তনে অনেক বিস্তৃত, পুরনো দিনের শাসকরা এসব দীঘি খনন করিয়েছিলেন। এ রকম একটা দীঘি আছে কুমিল্লা স্টেশনের কাছে, এর পরিধি তিন মাইল। কুমিল্লার কাছে গিয়ে রাস্তাটি বিখ্যাত গোমতী বাঁধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গোমতী নামটি হয়েছিল নদীটির সর্পিল গতিপথের কারণে। এটি স্বাধীন ত্রিপুরার প্রধান নদী। গোমতীর উদ্ভব ত্রিপুরা পাহাড়ে। এক জায়গায় নদীটি এত পেঁচানো যে সারা দিন নৌকায় ভ্রমণ করে নদীতীরে থাকা একটা মন্দিরই চোখে পড়বে! কুমিল্লা থেকে ৩২ মাইল দূরে গিয়ে গোমতী মেঘনা নদীতে মিশেছে। যদিও বাঁধের দৈর্ঘ্য ৩৬ মাইল এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের পুরো খরচ বহন করেন ত্রিপুরার মহারাজা।&dquote;&dquote;

এরপর আমরা যে গ্রামটি অতিক্রম করলাম তার নাম চন্দনা। এখন থেকে কুমিল্লা দেড় ঘণ্টার পথ। সেখানে গিয়ে আমরা সার্কিট হাউজে উঠতে পারব এবং রাতে ঘুমিয়ে সকালে চট্টগামের উদ্দেশে যাত্রা করব। এর মধ্যে দিনটি কাটবে স্টেশন ও শহরতলিতে সাইকেল চালিয়ে ঘোরাঘুরি করে। বাংলার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর মধ্যে অবশ্যই কুমিল্লা স্টেশন একটি। ঘাটে নেমে কিংবা শহরের মধ্যে একটু ঘোরাঘুরি করেই কুমিল্লার যে বিষয়টি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, সেটা হলো এর গাছাগাছালিতে ভরা পরিবেশ, শহরের চেয়ে গ্রামের মতোই মনে হবে। প্রত্যেক বাড়ি, বাংলো, কাচারি তার বাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বাড়িঘর তো গাছের কারণে দেখাই যায় না। প্রত্যেক রাস্তা চলে গেছে গোল্ডমোহর, পিপুল, সেগুন, তেঁতুল, কাঁঠাল কিংবা অন্যান্য সুন্দর সুন্দর লম্বা গাচের তরুশ্রেণীর মধ্য দিয়ে। কেউ চাইলে সারা দিনই ছায়াঘেরা পথ দিয়ে হাঁটতে পারে। রেসকোর্সের কাছে ট্রাংক রোড। এটা সমান্তরালে চলে গেছে। মাইলখানেক পথ এভাবে তারা পাশাপাশি চলে গেছে। এ পুরোটা পথে অসাধারণ পুরনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। রেসকোর্সটা অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোড়দৌড়ের ট্র্যাকগুলো এখনো আছে। এগুলো প্রায় দেড় মাইল লম্বা। তবে রেসকোর্সটি যে বৃত্তকার বেড়া দিয়ে আবদ্ধ ছিল তা আর নেই। সেখানে এখন ধানক্ষেত; ‘গ্র্যান্ড স্টান্ড’-এর একটি স্তম্ভ বা বাঁশের খুঁটিও নেই।

স্যার অগাস্টাস রিভারস টমসন কুমিল্লায় প্রথম এই আলো দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলার সাবেক লেফটেন্যান্ট গভর্নর। তার বাবা জিপি টমসন ছিলেন বিচারক ও কালেক্টর। তখন এ দুটো পদ একই ছিল। পুরনো ধ্বংসাবশেষ তখনো কিছু রয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে নানা মজার ঘটনা ঘটত। টমসনের ব্রিজ ও ব্রিজ বাংলা তখনো টিকে ছিল। একটি পাথরের ফলকে খোদাই করা আছে ‘জিপিটি’ ও ‘১৮৩৬’।

কুমিল্লা বাজার বাংলার আদর্শ বাজার হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছিল। এতে লম্বা সোজা একটা রাস্তা আছে। এর দুই পাশে দোকান, মাঝের ‘পাকা’ সড়ক ছিল ৮০ ফুট। এরপর এক সারি প্রাচীন বট ও পিপুল গাছ। তারপর একটা চওড়া পাকা ড্রেন। বাইরে দোকানগুলোর অবস্থান। অনেক দোকান পাকা আবার অনেকগুলো কাঁচা। তবে সবারই মাথার ওপর লোহা বা দস্তার ছাদ ছিল। বাজারের রাস্তাটি খুব পরিষ্কার এবং চমত্কারভাবে সাজানো-গোছানো।

কুমিল্লার সব ব্যক্তিগত বাড়িঘরে পুকুর আছে। আরো আছে অনেক পাবলিক জলাশয়, যার মধ্যে রানী দীঘি ও ধর্মসাগর বিখ্যাত। ধর্মসাগরের আয়তন কলকাতার লাল দীঘির চেয়ে দ্বিগুণ। এসব জলাশয় থেকে খাওয়ার পানি পাওয়া যায়। তবে গোমতী নদীর পানি পানের যোগ্য নয়। কুমিল্লা শহরে ৫০০-এর বেশি পুকুর-দীঘি আছে। আনুপাতিক হিসাব করলে কুমিল্লা শহরের ভূমির এক-পঞ্চমাংশজুড়ে আছে এই জলাশয়। এখানে গির্জা আছে। আছে বীর চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর। আছে অনেক আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ, মন্দির, মঠ, পুরনো নীল কারখানা। একটা সমাধিক্ষেত্র আছে, যেখানে অনেক সমাধিফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ আছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওঠার যাত্রায় বৈচিত্র্য আনবে। এখানে পাহাড়ে চড়ার রোমাঞ্চও ছোট পরিসরে পাওয়া যাবে। পাহাড়ে চড়ার সুযোগ বাংলায় বিরল।&dquote;&dquote;

পরদিন সকালে যাত্রা করাটা ভালো। চট্টগ্রাম আরো ৫০ মাইল দূরে। এ রাস্তায় আরো অনেক মজার জিনিস চোখে পড়বে। রাস্তায় অনেক জায়গা খুব খারাপ। তবে সাইকেল চালানো সম্ভব। কুমিল্লা ছেড়ে এগোলে ডান দিকে পড়বে ত্রিপুরা পাহাড়। কিছুক্ষণ পর বাম দিকে দেখা যাবে চট্টগ্রামের পাহাড়।

কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি পড়বে সীতাকুণ্ড। এখানে একটা বাংলো আছে এবং সপ্তাহে একবার বাজার বসে। খুব কমসংখ্যক ইউরোপীয়ই সীতাকুণ্ড সফর করেছেন। এখানে আমরা অবশ্যই বিখ্যাত ধর্মীয় কেন্দ্রটি দেখব (নাম উল্লেখ না করলেও লেখক সম্ভবত চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ওপর অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দিরের কথা বলেছেন)।

বছরে একবার এখানে বিরাট উৎসব হয় (সম্ভবত শিব পূজার মেলা)। এ উৎসবের সময় বিভিন্ন বিষয় দেখভালের জন্য চট্টগ্রাম থেকে একজন সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কোনো কর্মকর্তা আসেন। এ উৎসবে বাংলা, বিহার এমনকি ওড়িশা থেকেও ভক্তরা হাজির হয়।

সীতাকুণ্ড বা সীতার কূপ চন্দ্র শেখর পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১ হাজার ১৫৫ ফুট। এটি সীতাকুণ্ড শ্রেণীর একটি চূড়া। যিনি এ চূড়ায় উঠবে না, তিনি দুর্দান্ত কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি ও অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। পাহাড়ে আধাআধি ওঠার পর আমরা প্রথম মন্দিরের দেখা পেলাম। এটা সীতার মন্দিরের আগে অবস্থিত। এ মন্দির পূর্ব বাংলার হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। এ মন্দির ইট ও প্লাস্টার দিয়ে তৈরি। তবে কোনো বিশেষ স্থাপত্যরীতি নেই। মন্দিরের পাশে আছে কুঁড়েঘর, যেগুলোতে পুরোহিত ও শিষ্যরা বাস করেন। এ মন্দির প্রাঙ্গণে অনেক দেব-দেবীর মূর্তি আছে—কালী, রাধা-কৃষ্ণ, জগন্নাথ—সব মূর্তির গলায় জবা, গাঁদা, বেল ও নিমপাতার মালা ঝুলানো। মন্দিরগুলোতে অনেক ঘণ্টা আছে। শিবলিঙ্গ ও বিভিন্ন পাথরের গায় সিঁদুর লাগানো।&dquote;&dquote;

নিচের মন্দিরটা ছেড়ে আমরা এবার চূড়ার মন্দিরের দিকে যাত্রা করলাম। ৬০০ ধাপ পেরিয়ে হাজির হতে হয় চূড়ার মূল মন্দিরে। এটা ৫০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। চূড়ায় এক ফুট দেয়াল বা প্রচীর ছিল। এক পাশে ছিল একেবারে খাড়া ৮০-১০০ ফুট গভীর খাদ। চূড়ায় উঠে পূর্ব দিকে তাকিয়ে আমার দেখলাম সেই পথ, যেখান দিয়ে আমরা উঠে এসেছি। দূরে দেখা যাচ্ছিল স্টিমার ও দেশীয় নৌকা। সন্দ্বীপকে মনে হবে কয়েক মাইলের পথ। হাতিয়াও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। একটু দূরেই মেঘনা ও বর্দু চ্যানেল। কাছেই আছে শম্ভুনাথের মন্দির ও সীতার মন্দির। মন্দিরের বর্তমান স্থাপনা ৫০ বছর আগে এক ধনী ব্যক্তি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মূল স্থাপনাটি ১৮৪৭ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

বড়কুণ্ড খুবই ধর্মীয় আবেগের জায়গা। চট্টগ্রাম থেকে এর দূরত্ব ১২ মাইল। এটা আরেক তীর্থস্থান। সীতাকুণ্ডের সঙ্গে এর জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা আছে। ধারণা করা হয়, এটি একটি আগ্নেয় কূপ। এর পানিতে আগুন জ্বলে। এর ওপর একটি মন্দির স্থাপিত হয়েছে। এই আগুন নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। সম্ভবত জলাশয়ে থাকা গ্যাস বাতাসের সংস্পর্শে জ্বলে ওঠে। স্থানীয় অশিক্ষিত তীর্থযাত্রীরা নির্জন পাহাড় ও অন্ধকার উপত্যকার মধ্য দিয়ে এখানে পৌঁছে। পথে গাছের জটলা আলোকে প্রায় রুদ্ধ করে দেয়। তার মনে করে, এখানে নানা রকম অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে। কিন্তু একজন ইউরোপীয়র কাছে বড়কুণ্ড হলো স্থানীয়দের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের পুরোহিতদের দেয়া নিখুঁত ও লাভজনক ধোঁকা।&dquote;&dquote;

মন্দিরে ঢুকতে আমাদের জুতা খুলতে হবে। তারা মন্দিরে নিয়ে যেতে যেতে বখশিশের ইঙ্গিত দিলেন। লোহা দিয়ে বাঁধানো একটা দরজা খোলা হলো। আমরা একটা বাইরের ঘরে ঠুকলাম। সেখানে ঘণ্টা, জগন্নাথের কাঠের রথ রাখা। আরো ছিল কিছু পিতলের তৈজসপত্র ও পুরনো আসবাব। আমাদের সামনে পাথরের সিঁড়ি। ভেতরে ঢুকে আমরা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে প্রবেশ করলাম। প্রচণ্ড গরম, মনে হলো আমরা ওভেনের মধ্যে প্রবেশ করেছি। সিঁড়ি বেয়ে আমরা নিচে নামলাম। এবার নিজেদের ১৮ ফুট বর্গাকার একটি চেম্বারে আবিষ্কার করলাম। এখানে মাঝে একটা কূপ। খিলানের মাঝে একটা ছিদ্রমতো। এখান দিয়েই আগুনের শিখা বেরিয়ে আসতে দেখে স্থানীয়রা। সঙ্গে থাকে কামারের হাঁপরের শব্দের মতো শব্দ। কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করেও আমরা আগুনের প্রাকৃতিক কোনো উৎস খুঁজে পেলাম না। জলাশয়ে থাকা গ্যাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো সন্দেহ নেই, ছিদ্রের নিচে কৌশলে কোনো ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। নিচে নিশ্চয়ই কেউ কাজ করছে। নিচ থেকে আগুনের ব্যবস্থা হয় আর ওপরে স্পিরিট দিয়ে আগুনকে উসকে দেয়া হয়।

এরপর আমরা গেলাম বাঁশবাড়িয়া গ্রামে। আরো আট মাইল এগিয়ে একটা বাংলো পাওয়া গেল। এখান থেকে চট্টগ্রাম ১২ মাইল। পথে ফোয়রা ও মেরপুর গ্রাম। এগুলো পার হওয়ার পর আমরা বাম দিকে এক অবিস্মরণীয় ধ্বংসস্তূপ পেলাম। এটা স্যার উইলিয়াম জোনসের বাংলো ছিল। এটা বেলভিউ নামে পরিচিত ছিল। পুরো স্থাপনাটি এখন ধ্বংসস্তূপ। দেয়ালে নানা রকম গাছপালা জন্মে আছে। স্যার উইলিয়াম জোনস &dquote;&dquote;এখানে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছেন এবং তার বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা তিনি এখানে বসেই লিখেছিলেন। তার বাংলো থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত যে রাস্তাটি ছিল, সেটা এখনো টিকে আছে। বাংলোর ধ্বংসস্তূপে মাঝে মাঝে বনভোজন করতে আসা লোকজন ঠাঁই নেয়। এ ধ্বংসস্তূপ থেকে মাইলখানেক এগোনোর পর চট্টগ্রাম শহরের প্রথম নিদর্শন দেখা গেল। বাড়িঘর, দোকানের সংখ্যা বাড়তে লাগল।

চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশের আগে সড়ক সরু হয়ে গেল। দুই পাশে খাড়া পাহাড়, যা ‘টাইগার পাস’ নামে পরিচিত। নামটি এসেছে রাজকীয় পশুর নাম থেকে। অতীতে এই পাহাড়গুলোতে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাস ছিল। চারপাশ পুরোপুরি জঙ্গলে পূর্ণ। আছে লম্বা লম্বা ঘাস। এ ঘাসে যখন ফুল ফোটে, তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় সাদা তুষারে ঢেকে গেছে। এরপর দেখা গেল কয়েকটা চা বাগান। এ রকম এক বাগানের মধ্য দিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে আমার চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছলম। ফেয়ারি হিলে সরকারি দপ্তরগুলোর অবস্থান। এটা চট্টগ্রামের সবচেয়ে উঁচু জায়গা। টেম্পেস্ট পাহাড়ে (এখন বিলুপ্ত) আছে কালেক্টর, কমিশনার ও প্রকৌশলীদের বাংলো। ক্লাবটা বাজারের কাছে। ক্লাবের দক্ষিণের বারান্দা থেকে দুর্দান্ত দৃশ্য দেখা যায়—বাজার, শহর, মসজিদ, মগ মন্দির। কর্ণফুলী ও হালদা নদীও দেখা যায়। দূরে দেখা যায় চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল।

এই সীমিত পরিসরে চট্টগ্রামকে পুরোপুরি বর্ণনা করা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম সুন্দর, মনোমুগ্ধকর। এর নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। স্টেশনের কাছে &dquote;&dquote;বাড়িগুলো প্রত্যেকে নিজের নিজের পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের মাথায় গাছাপালা লাগানো। এগুলো বাড়িগুলোকে ঝড় থেকে রক্ষা করে। লম্বা ঝাউয়ের মধ্য দিয়ে দূর সাগরের ঢেউয়ের গর্জন ভেসে আসে। মিনজারির হলুদ ফুল ল্যাবারনাম ও প্রিয় পুরনো কেন্ট শহরের কথা মনে করিয়ে দেবে। অনেক বাড়ির বানান্দা যেন অর্কিড হাউজ। রাস্তাগুলো চমত্কার। এগুলো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে গেছে। ছোট ছোট সেতু। সবখানে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য। দেখে দেখে কেউ ক্লান্ত হবে না।

চট্টগ্রাম থেকে বিআই স্টিমার কিংবা আসাম-বিহার রেলপথে কলকাতায় যাওয়া যায়।

*

সাইক্লিং ইন বেঙ্গল: আ গাইড টু প্র্যাকটিক্যাল ট্যুরস বইয়ের পরিশিষ্ট অংশটিও দারুণ আকর্ষণীয়। এতে আছে তত্কালীন ভারতবর্ষে বিভিন্ন দূরত্বে সাইকেল চালনায় দ্রুতগতির রেকর্ডের বিবরণ। আছে বেঙ্গল সাইক্লিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বিবরণ। বাংলার বিভিন্ন এলাকার হোটেল এবং ডাক বাংলোর বিবরণ। পূর্ব বাংলার ঢাকা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, যশোর, তানোরের ডাক বাংলোর উল্লেখ আছে। ডাক বাংলোগুলোয় কেমন খরচ হবে, সে সম্পর্কেও লেখক ধারণা দিয়েছেন।