(১) পলাশী যুদ্ধক্ষেত্র
রাতে এ পথেই গিয়েছি, সামনের জানালায় কাচের ভেতর দিয়ে স্টেশনের আলো, লোকজনও দেখছি, কিন্তু কোন স্টেশন, তা যেমন লক্ষ করিনি, তেমনি কাউকে জিজ্ঞাসাও করিনি। ট্রেনের যাত্রীদের সঙ্গে নতুন পরিচয় ও আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকায় জানতেই পারিনি যে পরদিনের গন্তব্য পলাশী পার হচ্ছি।
আজ সকালে আমাদের নামিয়ে দিয়ে লালগোলা-শিয়ালদহ প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে গেলে তখন ভালো করে লক্ষ করলাম। ব্রড গেজের ডাবল লাইন, দীর্ঘ প্লাটফর্ম, রেললাইনের দুপাশেই যাত্রীছাউনি, লাইন পার হওয়ার জন্য ওভারব্রিজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, আমাদের দেশের প্লাটফর্মে যেমন রাজ্যের স্টল থাকে, তেমন একটাও স্টল নেই। শীতের সকালের উজ্জ্বল রোদে প্লাটফর্ম তথা স্টেশন ঝকঝক করছে।
প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তে বড় সাদা সাইনবোর্ডে স্টেশনের নাম লেখা পলাশী। ইংরেজি বানান Plassey। যদিও এখনকার সব বইয়ে দেখেছি পলাশীর বানান Polashi। তখন মনে পড়ল, ইংরেজরা সেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর বানান Plassey-ই লিখত। এখনো তা-ই চলছে।
স্টেশন দেখায় সময় নিয়েছি, খেয়াল হতেই দেখি প্লাটফর্ম ফাঁকা, অর্থাৎ যারা নেমেছিল, তারা নিষ্ক্রান্ত হয়েছে। পরের ট্রেনেরও হয়তো দেরি আছে, তাই কোনো যাত্রী আসেনি। আমরা শিয়ালদহ-লালগোলা লাইনের কলকাতা থেকে ১৫০ কিমি দূরত্বের ২২ নম্বর পলাশী স্টেশন ছেড়ে বাইরে আসি।
গত রাতে মুর্শিদাবাদ স্টেশনের কাছেই হোটেলে ছিলাম। সকালে উঠেই প্রথম ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে এক কাপ চা খেয়ে গাড়িতে উঠেছি। তাই নেমে আগে নাশতা করার জন্য রাস্তার পাশে চা দোকানে কয়লার গনগনে চুলার আগুনে করা পাউরুটি টোস্ট আর ডিম-মামলেট দিয়ে নাশতা সারলাম শীত সকালের রোদ পিঠে নিয়ে।
চা দোকানির পরামর্শে রিকশায় চাপলাম পলাশীর ব্যাটলফিল্ড দেখব বলে। দূরত্ব অনধিক তিন কিলোমিটার। মফস্বলের পিচের রাস্তা, দুই পাশে দোকানপাট, বাড়ি-ঘর। এ রাস্তা গিয়ে উঠেছে ভারতের ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে। গন্তব্যের কাছাকাছি এসে রিকশা ডানে ছোট রাস্তায় মোড় নিল। অল্প কিছু দূর যেতেই বুঝলাম পৌঁছে গেছি। কারণ রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মনুমেন্ট। ইংরেজরা পলাশী যুদ্ধজয়ের প্রথম স্মারক স্থাপন করে ১৮৩৩ সালে। লর্ড কার্জনের সময় দ্বিতীয় স্মারক স্থাপন করা হয় ১৯০৯ সালে, যা এখন আর নেই, ভাগীরথী নদীতে বিলীন হয়েছে। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে সাদাসিধে এ মনুমেন্ট ২৩ ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে। মনুমেন্টের নিচের দিকে এমনটাই লেখা হয়েছে।
মূল মনুমেন্টের বাইরে এক মানুষ সমান পিলারের উপরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে ২৩ জুন ২০০৭ সালে। কিন্তু এ স্মৃতি স্থাপনের নিচে শ্বেতপাথরের যে স্মারকলিপি সাঁটা আছে, তা দেখে আমার মতো এদেশের যে কেউই মনঃক্ষুণ্ন হবেন। ‘বিদেশী বেনিয়া বশ্যতাবিরোধী জেহাদি নায়ক সিরাজদ্দৌলা।’ উদ্বোধক হিসেবে ভারতের এক সংসদ সদস্য এবং একজন বিধায়কের নাম লেখা। তারিখের আগে লেখা বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান পিপলস ফোরাম।
এ রকম কোনো ফোরামের নাম কখনো কোথাও শুনেছি বা পত্রপত্রিকায় দেখেছি বলে মনে করতে পারি না। এ প্রসঙ্গে মানুষ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা কি সিরাজদ্দৌলার একটি ভালো মূর্তি, সঠিক পরিচিতি এবং ছোট একটা জাদুঘর করতে পারি না, যেখানে এলে দর্শকরা প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে এবং দেখতে পারবে পলাশীর যুদ্ধমাঠ এবং সেই দিনের (২৩ জুন, ১৭৫৭) ঘটনাক্রম ও পেছনের ষড়যন্ত্র, যার কারণে সিরাজ পরাজিত হয়েছিলেন এবং ইংরেজরা দীর্ঘ ২০০ বছর ভারতবর্ষ শাসনের সুযোগ পেয়ে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেনে পাচার করেছে ৪৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার সমমানের সম্পদ, যা বর্তমান ব্রিটেনের জিডিপির ১৭ গুণ।
বিপরীতে ইংরেজরা এদেশকে দিয়েছিল দু-দুটো, দুর্ভিক্ষ, ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে মারা যায় এক কোটি মানুষ, যা সেই সময়ের বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এবং ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে মারা যায় ৪০ লাখ মানুষ। এ উভয় দুর্ভিক্ষের কারণ ব্রিটিশদের ভুল শাসননীতি। অথচ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের মতো বলেছিলেন, ‘ইঁদুর-বিড়ালের মতো জন্মদানের কারণে এমন দুর্ভিক্ষ।’
সাধারণ ইংরেজরা গর্ব করে বলত এবং এখনো বলে, তারা এদেশ মানে ভারতবর্ষকে আলোকিত করেছে। কিন্তু বিখ্যাত ভারতীয় অর্থনীতিবিদ উৎস পট্টনায়েক তথ্য-প্রমাণ এবং বিভিন্ন উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন—ভারতবর্ষকে নয়, ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ পাচার করে আলোকিত হয়েছে ব্রিটেন। ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেনে পাচার হওয়া ৪৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার সমমানের সম্পদ তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এর জ্বাজ্জল্যমান প্রমাণ এখনো ব্রিটেনের রানীর মুকুট, যেখানে শোভা পাচ্ছে এদেশ থেকে পাচার করা কোহিনুর মণি।
সামনের দিকে হেঁটে বাঁধের ওপর দাঁড়ালাম। এটা বন্যানিরোধ বাঁধ এবং রাস্তাও, ডানে অদূরে আছে একটি চিনিকল, তাই রাস্তার নাম সুগার মিল রোড। খৈতান গ্রুপের, তারা মিল স্থাপনের সময় স্থানের নাম খৈতান নগর রাখার চেষ্টা নিয়েছিল পলাশীর বদলে। স্থানীয় জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের আপত্তির মুখে নাম বদলাতে পারেনি।
বাঁধের প্রায় চার-পাঁচ ফুট নিচে কৃষিক্ষেত, সামনে-ডানে এবং বামেও কৃষিক্ষেত, অদূরেই ভাগীরথী নদ বহমান। অথচ ফারাক্কা, তিস্তা ও উজানে আরো বাঁধের কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই পানি নেই, নাব্যতা তো বেশ দূরে। সামনে বামে আখক্ষেত, ডানে কৃষক জমি চাষ করছেন। নদীর কাছে কোমর সমান উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা তিনটি স্মৃতিস্তম্ভ। পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের কামানের গোলায় নিহত সেনাপতি মীরমদন, মোহনলালের জামাই বাহাদুর আলী খাঁ এবং নোয়াই সিং হাজারী। আমাদের বামে ও ম্যাপের দক্ষিণে বেশ দূরে পলাশী গ্রাম। এখানে ছিল অজস্র পলাশ গাছ, হয়তো সেই কারণে স্থানটির নাম হয় পলাশী। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সামনে ও ডানে বামের কৃষিক্ষেত, বহমান ভাগীরথীর দিকে বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে মানশ্চক্ষে দেখতে থাকি সেদিনের পলাশী যুদ্ধক্ষেত্র।
পলাশীর গ্রামের সামনে ১ হাজার ২০০ গজ দূরে নাটোরের রানী ভবানীর লাখো বা লক্ষভাগ আমবাগান, যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৮০০ ও ৩০০ গজ। সমব্যবধানে সারি সারি আম গাছ। চারদিক মাটির বাঁধ বা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। লক্ষভাগের উত্তর-পশ্চিমে ১৫০ গজ দূরে ভাগীরথী নদী। চারদিকে মাটির বাঁধের প্রাচীর এবং আমগাছের ঘন ডালপালার কারণে ইংরেজদের যুদ্ধ শিবিরটি আত্মরক্ষার জন্য ভালো কাজ দিয়েছিল সেদিন। এখন আমবাগানে একটাও আমগাছ নেই। শেষ আমগাছের মূল গুঁড়িটি যুদ্ধজয়ের স্মতিচিহ্ন হিসেবে ইংরেজরা লন্ডনে নিয়ে গেছে ১৮৭৯ সালে। সম্ভবত এখনো প্রদর্শিত হচ্ছে ইংল্যান্ডে কোনো জাদুঘরে।
আমবাগানের সামনে ২০০ গজ দূরে ইটের তৈরি এবং সুদৃঢ় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ‘পলাশী হাউজ’ নামে সিরাজের একটি শিকারগৃহ ছিল। ক্লাইভ আমবাগানে অবস্থান নিয়ে এ শিকারগৃহটি অধিকার করে। উঁচু ছাদে উঠে দেখেন, এখান থেকে সামনের যুদ্ধ ক্ষেত্রটি দেখা ও চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার চমত্কার সুযোগ। পেছনে অনেক দূরে গ্রাম, বাম দিকে নদী এবং মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আমবাগানটি লর্ড বরার্ট ক্লাইভের কাছে যুদ্ধশিবিরের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিকারগৃহ থেকে ৪০০ গজ উত্তরে এবং ভাগীরথী নদীর কাছে একটি বড় দীঘি এবং এর ১০০ গজ উত্তরে ছিল ছোট একটি পুষ্করিণী, এ দুই জলাশয়ই ছিল উঁচু মাটির বাঁধ দিয়ে ঘেরা।
এখানে সিরাজপক্ষের ফরাসি সেনাপতি মঁসিয়ে দ্য সিফ্রে নবাবপক্ষের অভিজ্ঞ ও দক্ষ ৪৫ জন ফরাসি গোলন্দাজ সৈন্য এবং চারটি কামান নিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই সতর্ক অবস্থান নেন।
সিফ্রের বাহিনী থেকে ৫০০ গজ উত্তরে এবং নদীতীর থেকে ৪০০ গজ দূরে ছিল ঝোপঝাড় ও জঙ্গলাকীর্ণ একটি উঁচু মাটির ঢিবি, সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে নবাবের বিশ্বস্ত ও অনুগত সৈন্যরা। তারা নবাবের শিবিরের প্রধান প্রবেশপথ রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে। উঁচু ঢিবির সামান্য পশ্চিমে এবং সেনাশিবিরের দক্ষিণের অংশে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রধান প্রবেশপথ রক্ষার জন্য নবাবের একদল সৈন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে।
যুদ্ধ আরম্ভ হলে কোনো পক্ষই যেন কোনো অসুবিধার সম্মুখীন না হয়, তার জন্য দুপক্ষই সতর্কতার সঙ্গে তাদের সৈন্য সমাবেশ করে। ফরাসি সৈন্য দল এবং উল্লিখিত উঁচু ঢিবির মধ্যবর্তী স্থানে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান অধিনায়ক মীরমদনের নেতৃত্বে নবাবের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী অবস্থান নেয়। মোহনলাল কাশ্মীরি এবং অন্য বিশ্বস্ত সেনাপতিরাও মীরমদনের সঙ্গে যোগ করেন। পাঁচ হাজার সুদক্ষ মোগল অশ্বারোহী এবং দুটি কামানসহ সাত হাজার রাজপুত ও পাঠান পদাতিক সৈন্য দ্বারা গঠিত এ সেনাবাহিনী নবাবের সৈন্যদের অগ্রভাগ রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এরাই প্রকৃতপক্ষে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
তিন বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর, রায়দুর্লভ ও ইয়ার লতিফের অধীনে ছিল সিরাজের মোট সৈন্যের তিন-চতুর্থাংশ। তিন সেনাপতির অধীনে বিশাল বাহিনী নিয়ে তারা দাঁড়িয়েছিল নবাবের অগ্রগামী বাহিনীর কোনাকুনি করে ও নবাবের বামদিকে কিন্তু ইংরেজ বাহিনী থেকে বেশ দূরে বৃত্তাকারে। তিন বিশ্বাস ঘাতকের সৈন্যবাহিনীর দৈর্ঘ্য ছিল পলাশী গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় তিন কিলোমিটার। তারা বেষ্টন করেছিল ইংরেজ বাহিনীকে। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে ইংরেজ বাহিনীকে ভাগীরথী নদীতে ডুবিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। ইংরেজদের মাঝে সে ভয়ও ছিল।
সেদিনের যুদ্ধে এ বিশাল বাহিনীর কোনো সৈন্যই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তাদের দখলে থাকা কামানগুলোও তারা ব্যবহার করেনি।
সেদিন নবাব সিরাজদ্দৌলার পক্ষে ছিল মোট প্রায় ৫০ হাজার গোলন্দাজ, অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যর বাহিনী এবং ৩২, ২৪ ও ১৮ পাউন্ডের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৫৩টি কামান। এ কামানগুলো স্থাপন করা হয়েছিল এক মানুষ সমান উঁচু মঞ্চ বা পাটাতনের ওপর, যা বসানো ছিল ৪০ বা ৫০ জোড়া ষাঁড়ের পিঠে পাটাতনের ওপর। এ পাটাতনের ওপর অবস্থান নিয়েছিল গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা, সঙ্গে কামান-বন্দুক, গোলাবারুদ এবং যুদ্ধের অন্য সাজসরঞ্জাম। পাটাতনের পেছনে একটি করে হাতি। চলতে অসুবিধা হলে হাতি তার মাথা দিয়ে পাটাতন বা মঞ্চকে সামনের দিকে জোরে ধাক্কা দিত এবং মঞ্চ চলতে শুরু করত।
২৩ জুন সকালে নবাব ও ইংরেজ দুপক্ষের বাহিনী মুখোমুখি হয়। ইংরেজ বাহিনীর সম্মুখ ভাগ ছিল ২০০ গজ দীর্ঘ, মাঝে ছিল ইংরেজ বাহিনী সাদা ক্রস বেল্টে লাল রঙের পোশাকে। ইংরেজ সেনা চারটি দলে বিভক্ত হয়েছিল। জেমস কিলপেট্রিক, আর্চিবন্ড গ্রান্ট, চার্লস আয়ার কুট ও মিস্টার গপ ছিল তাদের দলের অধিনায়ক।
ইংরেজ সৈন্যদের ডানে ও বামে ছিল বাদামি রঙের তেলিঙ্গা-সিপাহি এবং লাল পল্টন নামে পরিচিত দেশী সেনাদল। ইংরেজদের সঙ্গে ছিল মাত্র ছটি কামান। লাল পল্টন নামে পরিচিত পদাতিক বাহিনীর সৈন্যদের সংগ্রহ করা হয়েছিল ইংরেজদের কলকাতা পুনরুদ্ধারের পর, ওই বছরের জানুয়ারিতে বিহার, অযোধ্যা, দোয়ার অঞ্চল, রোহিলাখণ্ড প্রভৃতি স্থানের পাঠান, রোহিলা, জাঠ, রাজপুত ও ব্রাহ্মণ। তবে সবচেয়ে বেশি ছিল মুসলমান, যারা ইতোপূর্বে বিভিন্ন দেশীয় শাসকের সৈন্যদলে চাকরি করেছে। ইংরেজ বাহিনী বামে ভাগীরথী নদী এবং পেছনে আমবাগান রেখে সারিবদ্ধভাবে নবাব বাহিনীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
(২) যুদ্ধ শুরু হলো
২৩ জুন, বৃহস্পতিবার, ১৭৫৭ সাল। নবাব সিরাজদ্দৌলার বিশাল বাহিনী বহু রঙের ও বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত হয়ে অশ্ব ও হস্তীবেষ্টিত হয়ে পলাশীর মাঠে যুদ্ধের জন্য অবস্থান নেয়।
ইংরেজ বাহিনী আমবাগানকে পেছনে রেখে সামনের সমতল ভূমিতে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে থাকে। দীর্ঘ ২০০ গজ সৈন্য বাহিনীর মাঝখানে মূল ইংরেজ সৈন্য, তাদের ডানে এবং বামে তেলিঙ্গা সিপাহি এবং লালপল্টন নামের দেশী সৈন্য। ইংরেজরাই প্রথম যুদ্ধ শুরু করে। প্রথম রক্তপাতও হয় ইংরেজ সৈন্যের শরীর থেকে।
সকাল ৮টা। ফরাসি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মঁশিয়ে দ্য সিফ্রে আগেই অবস্থান নিয়েছিল ভাগীরথী নদীর কাছের দীঘি ও পুষ্করিণীর উঁচু মাটির ঢিবির ওপর। সেখান থেকে ইংরেজ সৈন্যদের লক্ষ্য করে কামানের গোলা ছুড়তে শুরু করে।
শুরু হয়ে যায় পলাশীর যুদ্ধ। দুপক্ষই যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দুপক্ষের কামান পরস্পরের বিরুদ্ধে দাগতে থাকে। নবাবপক্ষের কামান ক্রমাগত গোলা ছুড়লেও ইংরেজদের তেমন ক্ষতি হয় না। কারণ গোলাগুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল। ইংরেজদের গোলন্দাজ বাহিনী ছিল দক্ষ, তাদের গোলা লক্ষ্যবস্তুর ওপরই আঘাত হানছিল। তবে তাদের কামান সংখ্যা ছিল কম, কামানের পাল্লার দূরত্বও ছিল কম। কাজেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিল না ইংরেজরাও। তবুও নবাবপক্ষের সৈন্যদের প্রচুর ক্ষতি হয়। আধঘণ্টার যুদ্ধে ইংরেজদের ৩০ জন নিহত ও আহত হয়। ক্লাইভ বাধ্য হয়ে তাদের সৈন্যবাহিনীকে আমবাগানের মধ্যে আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেন এবং সিদ্ধান্ত নেন আর দিনের যুদ্ধ নয়। রাতে অতর্কিত নবাব বাহিনীকে আক্রমণ করবেন।
এ যুদ্ধ নিয়ে ক্লাইভকে জবাবদিহিও করতে হয়েছিল। মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গের সিলেক্ট কমিটির কাছে ২ জুলাই ১৭৫৭ সালে লেখা চিঠিতে ক্লাইভ জানান, দ্রুতবেগে অগ্রসর হয়ে ৬টার সময় তারা (নবাবের সৈন্যরা) কয়েকটি শক্তিশালী কামানের সাহায্যে আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে ভীষণভাবে আমাদের ওপর অবিরাম আক্রমণ চলে। কিন্তু আমবাগান ঘেরা মাটির প্রাচীর এবং আম বাগানের নিবিড় ডালপালার আড়ালে থাকায় ইংরেজ বাহিনী আত্মরক্ষার প্রচুর সুযোগ পায়। আমাদের চারদিকে এবং একটু দূরে এমনভাবে নবাবের পক্ষের কামানগুলো স্থাপিত ছিল যে, তাদের কামানের বিরুদ্ধে কৃতকার্যতা লাভ করা আমাদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব ছিল না। সুতরাং রাতের বেলায় নবাবের বিরুদ্ধে সাফলতার সঙ্গে আক্রমণ পরিচালনা করার সম্ভাবনায় আমরা যে যার জায়গায় স্থিরভাবে চুপ করে অপেক্ষা করতে থাকি।
ইংরেজ বাহিনী আমবাগানে আশ্রয় নিলেও তাদের দক্ষ গোলন্দাজ বাহিনী মাটির প্রাচীর এবং আমবাগানের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে যথেষ্ট দক্ষতা ও নির্ভুলভাবে কামানের গোলাবর্ষণ করতে থাকে। নবাব পক্ষের বহু সৈন্য মারা যায় এবং তাদের কামানের গোলা নবাবপক্ষের গোলাবারুদের ওপর পড়ে মুহুর্মুহু প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে।
ইংরেজ সৈন্যরা আত্মরক্ষার জন্য আমবাগানে আশ্রয় নিলেও এরই মধ্যে যুদ্ধের ৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। বেলা ১১টায় শুরু হয় বজ বিদ্যুৎসহ তুমুল বৃষ্টি। ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে পলাশীর ধূলি ও বালুকাময় মাঠ হয়ে ওঠে কর্দমাক্ত এক জলাভূমি।
বৃষ্টি থেমে গেলে মীরমদন তার বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হয়। সে ভেবেছিল তাদের গোলাবারুদ যেমন ভিজে অকেজো হয়েছে, ইংরেজদের গোলাবারুদও তেমনি ভিজে অকেজো হয়েছে। কিন্তু তার ধারণা সঠিক নয়। ইংরেজরা তাদের গোলাবারুদকে বৃষ্টিতে ভেজা থেকে রক্ষা করেছিল ত্রিপল দিয়ে ঢেকে।
মীরমদনের আশা ও অভিযান ব্যর্থ হয়। মাটির প্রাচীরের আড়াল থেকে ছোড়া কামানের গোলায় অশ্বারোহী বাহিনীর প্রচুর ক্ষতি হয়। মারা যায় মীরমদন, মোহনলালের জামাই বাহাদুর আলী খাঁ, নোয়াই সিং হাজারী। যুদ্ধক্ষেত্রে মীরমদনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নবাব সিরাজদ্দৌলার যুদ্ধে জয়লাভের আশা-ভরসা নির্মূল হয়ে যায়।
নবাব মীরজাফরকে ডেকে পাঠান। মীরমদনের মৃত্যু এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর, রায়দুর্লভ এবং ইয়ার লতিফের নীরব দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকা দেখে সিরাজদ্দৌলা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীরজাফর দেখা করতে এলে তার হাতে নবাব তার মাথার উষ্ণীষ তুলে দিয়ে বিনীতভাবে অনুরোধ করেন, ‘পূর্বে যা করেছি, তার জন্য আমি এখন অনুতপ্ত, আপনার সঙ্গে আমার রক্তের যে সম্পর্ক রয়েছে [মীরজাফর সিরাজের নানা আলিবর্দি খানের ভগ্নিপতি, অর্থাৎ সম্পর্কে তার নানা] এবং মাতামহ আপনার কৃতজ্ঞতার ওপর সন্দেহাতীতভাবে যে অধিকার অর্জন করেছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সেই সম্পর্কের কথা স্মরণ করে আপনাকেই আমি সেই শ্রদ্ধাষ্পদ ব্যক্তির একমাত্র প্রতিনিধি বলে মনে করি; সুতরাং আশা করি, অতীত দিনের আমার অবৈধ কার্যকলাপের কথা বিস্মৃত হয়ে এখন থেকে রক্তের সম্পর্কে আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ একজন সৈয়দের ন্যায় এবং আমার পরিবারের কাছ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছেন, তা কৃতজ্ঞতাসহকারে স্মরণ করার উপযুক্ত মনোভাবসম্পন্ন একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির মতো আমার সঙ্গে ব্যবহার করবেন। নিজেকে আমি আপনার কাছে সমর্পণ করছি, যত্নসহকারে আমার, মর্যাদা ও প্রাণ রক্ষা করুন। [সিয়ার উল মূতাক্ষরিণঃ গোলাম হুসেন খান, পৃষ্ঠা- ২৩২]
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]






