এক কথায় বলতে গেলে মরিচে থাকা ‘ক্যাপসেইসিন’ নামক প্রাকৃতিক একটি উপাদানের কারণে তা ঝাল হয়। তবে মরিচের মধ্যে ক্যাপসেইসিনের উপস্থিতি একটি সম্পূর্ণ বিবর্তন প্রক্রিয়া। বিরূপ পরিবেশে প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষার তাগিদে মরিচ নিজের শরীরে এ উপাদান তৈরি করে। মানুষসহ অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষে এ উপাদান জ্বালাপোড়ার অনুভূতি তৈরি করে। মনে হয় যেন শরীরের ভেতর কিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরের প্লাজমা ঝিল্লিতে একগুচ্ছ সরু পথ আছে। এগুলো ‘ট্রানজিয়েন্ট রিসেপ্টর পটেনশিয়াল (টিআরপি) চ্যানেল’ নামে পরিচিত। ক্যাপসেইসিন যখন এ চ্যানেলগুলোর সংস্পর্শে আসে, তখন এসব প্রাণীর শরীরে ব্যাপক প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
এভাবে ধারালো দাঁতবিশিষ্ট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মরিচের চারা খাওয়া থেকে এবং বীজ নষ্ট করা থেকে ক্যাপসেইসিন বাধা প্রদান করে। পাখির শরীরে এ টিআরপি চ্যানেল নেই। তাই মরিচের এ ঝালে তাদের শারীরিক কোনো সমস্যা হয় না। তারা পাকা মরিচ ভরপেট আহার করে। তবে মরিচের বীজ তাদের হজম হয় না। ফলে পাখির ত্যাগকৃত মলের মাধ্যমে এসব অক্ষত বীজ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই মরিচ তার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উত্তরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
২০০১ সালে মরিচ নিয়ে এর আদিভূমি বলিভিয়ায় একটি গবেষণা হয়েছিল। গবেষণায় পাওয়া তথ্যমতে, মরিচের এ ঝালের জন্য তীক্ষদন্তী প্রাণী কিংবা পাখি দায়ী নয়। ‘হেমিপটেরা’ গোত্রের ছোট এক প্রকার পতঙ্গ এর জন্য দায়ী বলে গবেষকরা মনে করেন। এ কীটগুলো বুনো মরিচ খেয়ে জীবনধারণ করে। তাদের পিনের মতো তীক্ষ হুল দিয়ে ফলটির গায়ে ছিদ্র করে ভেতরে থাকা রস টেনে নেয়। স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো এ পতঙ্গগুলোও ক্যাপসেইসিনের প্রতি সংবেদনশীল। তাই তারা ঝাল মরিচগুলোকে এড়িয়ে চলে। দক্ষিণ-পূর্ব বলিভিয়া অঞ্চলের মরিচগুলো পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখতে পান, যেসব মরিচে এ কীটগুলোর দংশনের চিহ্ন বেশি, সেগুলোয় কোনো ঝাল নেই।
মরিচের গায়ে যখন ছিদ্র তৈরি হয়, তখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এদের ভেতর বায়ুবাহিত ছত্রাক প্রবেশ করে তাদের আক্রান্ত করে। বীজের ওপর ছত্রাকের পুরু আবরণ পড়ে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো মারা যায়, যদি না এ ছত্রাকের বিরুদ্ধে তারা কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আর এক্ষেত্রেই ক্যাপসেইসিনের উদ্ভব ঘটে। পরীক্ষাগারে গবেষণা করে পাওয়া ফলাফল অনুসারে, ক্যাপসেইসিনের উপস্থিতিতে ছত্রাক জন্মাতে পারে না। যত বেশি ক্যাপসেইসিন থাকবে, ছত্রাকের টিকে থাকার সম্ভাবনা তত কমে যায়। শুষ্ক অঞ্চলগুলোয় যেখানে সাধারণত আর্দ্রতা কম এবং কীটপতঙ্গ তেমন নেই, সেখানে ঝালবিহীন মরিচ জন্মায়। কেননা সেখানে তাদের ছত্রাকের বিরুদ্ধে তেমন লড়াই করতে হয় না। অন্যদিকে অধিকতর আর্দ্র অঞ্চলগুলোয়, যেখানে কীটপতঙ্গের সংখ্যা অনেক বেশি, সেখানে এসব কীটপতঙ্গ মরিচের অনেক বেশি ক্ষতি করে। ফলে মরিচ গাছে ছত্রাকের আক্রমণ হয় বেশি। তাই সেখানকার মরিচ অনেক বেশি ঝাল হয়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে মরিচের সংযোগ ঘটার বহু আগে মূলত স্থানীয় জলবায়ু, কীটপতঙ্গ ও প্রাকৃতিক ছত্রাকের সম্মিলিত প্রভাবেই মরিচের ঝালের তারতম্য নির্ধারিত হয়ে আসছে। আর এ থেকে প্রাচীন মানুষেরা বুঝতে পারত কোন মরিচগুলো ঝাল হবে। তারা আবিষ্কার করেছিল, যেসব মরিচে ছিদ্রের পরিমাণ কম, সেগুলো বেশি ঝাল। তাই তারা খাদ্য হিসেবে মরিচের ওই প্রজাতিগুলো সংগ্রহ ও চাষাবাদ করা শুরু করে।
তবে মানুষ কেন ঝাল মরিচের প্রতি আগ্রহী হলো? ঝাল মরিচের যে বিষয় এর উৎপত্তিস্থল আমেরিকার আদিবাসীদের আকৃষ্ট করেছিল তা হলো এতে ছত্রাকের কম উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি। অন্য কথায় বলতে গেলে ঝাল মরিচের মধ্যে থাকা সংরক্ষণমূলক উপাদান তাদের প্রভাবিত করেছিল। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ার বহু আগে ঝাল মরিচের জীবাণুবিরোধী এ বৈশিষ্ট্য কেবল তাকে রক্ষা করতেই সাহায্য করেনি, বরং এর সঙ্গে মিশ্রিত অন্যান্য খাবারও সংরক্ষণ করেছে। তাই খাদ্য সংরক্ষণের জন্য মরিচ ব্যবহার হতো। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে আদি যুগে এটি ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার হতো। জীবাণু সংক্রমণের ফলে সংঘটিত খাবারের বিষক্রিয়ার ফলে মারাত্মক অসুস্থতা এমনকি মৃত্যু আদি যুগে খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিল। যেহেতু এ ধরনের সংক্রমণের বিরুদ্ধে ক্যাপসেইসিন একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, তাই মানুষ ঝাল মরিচ খাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের অভ্যস্ত করে নিয়েছিল। এভাবে পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের মাধ্যমে একই সঙ্গে মরিচের মধ্যে ঝাল এবং মানুষের ঝাল মরিচ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে।
রবিউল হোসাইন: লেখক





