সম্পর্কের গান শুনিবার যে বয়সকাল তাহার আগেই যদি সেই সব গান মরমে কালের অনিত্যতাসূচক আবহ তৈয়ার করে; দেখিবেন, বয়সকালেও সেই সব গান ফিরিয়া ফিরিয়া আসে। যাহারা একান্ত মানুষ; লেনার্ড কোহেন বহুকাল ধরিয়াই তাহাদের লগে কথা কহেন, বাতচিত করেন। তাঁহার ইন্তেকালের পর, কাল নিরবধি হইয়াছে। তথাপি বাতচিত থামে নাই। একান্ত মানুষের সাথে কোহেনের এই অন্তর্গত আলাপ চিরায়ত। কারণ সেই সোস্যাল কন্ট্রাক্ট বা সামাজিক চুক্তির আমল হইতে সম্পর্ক একখানা নদী হইয়া ধরা দিয়াছিল আমাদের জীবনে। জীবনের এই সামাজিক ছদ্মবেশ স্বভাবতই গীতল; ছলছল করে। ইহা হইতে উৎসারিত কথামালা সংগীত রচনা করে। লেনার্ড কোহেন ইহারই স্মারক।

কোহেনের সম্পর্কের গানগুলিতে হূদয় আর অভিজ্ঞতা ঢালিলে দেখিবেন, এই সমস্ত গান সাকল্যে এক বিস্তৃত সফরনামা। ‘সুজান’, ‘সো লং’, ‘ম্যারিয়ান’, ‘ফেমাস ব্লু রেইনকোট’, ‘টেক দিজ ওয়াল্টজ’ কিংবা “আ’ম ইয়োর ম্যান”—এই প্রকারের অন্য সমস্ত গানেও দেখিবেন সম্পর্কের ভেতরকার একটা একটানা গল্প কহিতেছেন কোহেন। সম্পর্কের গান গাহিতে গিয়া, কহিতে গিয়া কোহেন বারবার সমর্পণের নিকট ফিরিয়া আসিয়াছেন। সম্পর্ককে তিনি সমর্পণ দিয়া আমল করিয়াছেন। এই সমস্ত গানের মূল সুরটা সমর্পণের।

কোহেনের গান শুনিতে শুনিতে, একান্তে গাহিতে গাহিতে খামখেয়ালে তাঁহার কথামালা মম বঙ্গীয় আবহে সমর্পণ করিতে চাহিয়াছে বহুবার। কোহেন বঙ্গে ধরা দিবেন কিনা জানি না; তথাপি আমার এই বাংলা জীবনের সকাশে কোহেনকে তর্জমা করিবার চেষ্টা করিয়াছি। সেই চেষ্টার নমুনা “আ’ম ইয়োর ম্যান” বা ‘আমি তোমার বান্দা’। কোহেন এই গান ১৯৮৮ সনে “আ’ম ইয়োর ম্যান” অ্যালবামে প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই তর্জমায় কোন সংগীত পাইবেন না। এই তর্জমায় আমি কথামালা আর উপলব্ধির ভাবাশ্রয়ী ছিলাম।

আমাদের চলিত বা কথিত বাংলায় এই গান তর্জমা করা যাইত। কিন্তু সাধু বাংলার যে গমক; তাহার ভেতর “আ’ম ইয়োর ম্যান”কে স্থাপন করিয়া আমি গম্ভীর অথচ গীতল প্রসাদ লাভ করিয়াছি। তাছাড়া লেনার্ড কোহেনের প্রকাশনায় এক মগ্ন গাম্ভীর্য আছে। গাম্ভীর্য কোহেনের অলংকার। সাধু বাংলা দিয়া সেই গাম্ভীর্য ধরিতে চাওয়া হয়তো দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোই। ঘোল দিয়া লেনার্ড কোহেন চালাইতেছি; এই ধৃষ্টতার কসুর লইবেন না আশা করি।

নাসিফ আমিন

 

যদি চাও প্রেমিক রূপে

যাহা বলিবে করিব অকপটে

যদি চাও অন্য কোন প্রেম

দেখিবে মম মুখ মুখোশে ঢাকিলেম

সঙ্গী চাহিলে যদি;

এই নাও, বাড়াইলেম মম হাত

অথবা রাগে টগবগ আঘাতে

করো যদি কুপোকাত,

তোমার বান্দা আমি

হাজির আলবত।

 

মুষ্টিযোদ্ধা রূপে চাহিবা মাত্র হাজির থাকিব ময়দানে

কিংকা ধরো, দরকার যদি ডাক্তার

তদারক করিব ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে তব সত্তার

আর যদি লাগে ড্রাইভার, উঠিয়া বসো

কিংবা ধরো তুমিই যদি আমারে ভ্রমিয়া আন

পারো, তুমি তা পারো তা অবশ্যই

তোমার বান্দা হাজির আমি, মাভৈঃ মাভৈঃ

 

আর চন্দ্রাহত, এমন পূর্ণিমায়

আটকে রাখিবার শিকল অটুট তবু

পশুটারে ঘুম পাড়ানো দায়

এমত কত কত প্রতিজ্ঞায়

জর্জরিত করিয়াছি তোমারে

অথচ কোন প্রতিজ্ঞাই আমি রাখিতে পারি নাই

আর, জানোই তো, নতজানু আকুতিতে

কোন প্রেমিক প্রেমিকারে ফিরাইতে পারে নাই

যদি পারিত, তবে হামা দিয়া ভিড়িতাম তব পায়

কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করিতাম যেন

তোমার মাধুর্য ভজনাই মোর শেষ উপায়

আর খামচাইয়া ছিঁড়িতাম

তব চাদর কিংবা হূিপণ্ড

যেন এই মোর আরজি

আমি তোমার বান্দা, আমারে গ্রহণ করো।

 

আর ধরো নিশিযাত্রায়

নিদ্রাহত চোখ তোমার যদি

দু’দণ্ড ঘুমাইতে চায়

আমি ধরিব সে হাল বাকি পথটায়

অথবা নিশিকুটম্বের জন্য বড় রাস্তায়

যদি হতে চাও দৃশ্যমান

অদৃশ্য হইব আমি; যখনই তোমার মন চায়&dquote;&dquote;

অথবা তোমার সন্তানের পিতা রূপে যদি চাও

কিংবা ধূসর বালুকায়, যদি চাও

পাশাপাশি কিছুক্ষণ হাঁটুক একজন

তোমার বান্দা আমি; হাজির সর্বক্ষণ।

 

 

লেনার্ড কোহেন

জন্ম: ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪

মৃত্যু: ৭ নভেম্বর ২০১৬