দক্ষিণ সমুদ্রের তীরে বাস করত এক টিট্টিভ দম্পতি। একদা টিট্টিভীর ডিম পাড়ার সময় এল। সে স্বামীকে বলল একটি নিরাপদ স্থানের সন্ধান করতে। টিট্টিভ বলল: কেন, এটাই তো আমাদের বাসস্থান। তুমি এখানেই ডিম পাড়ো।
টিট্টিভী আশঙ্কার সঙ্গে বলল: সমুদ্র অতি বিশাল ও ভয়ঙ্কর! অস্থিরও! কখন যে কী করে তার ঠিক নেই। হয়তো আমাদের ডিম ভাসিয়ে নিয়ে গেল! তখন কী হবে? তাছাড়া নিজের ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ক্ষমতা সম্পর্কে যার ধারণা থাকে না, সে বিপদগ্রস্ত হয়।
টিট্টিভ সদম্ভে বলল: আমিই বা কম কিসে? সমুদ্রের এত সাহস আমাদের ডিম ভাসিয়ে নিয়ে যাবে? আমাদের বাসায় আমরা থাকতে পারব না? এখানেও অন্যের লাঞ্ছনা সহ্য করতে হবে? তুমি ভয় পেও না। নিশ্চিন্তে ডিম পাড়।
স্বামীর কথায় সাহস পেয়ে টিট্টিভী সমুদ্রের তীরে ডিম পাড়ল। এদিকে সমুদ্র ক্ষুদ্র টিট্টিভের দাম্ভিকতা দেখে মনে মনে হাসছিল। তাকে শায়েস্তা করার জন্য একদিন এক বিশাল ঢেউ দিয়ে ডিমগুলো ভাসিয়ে নিয়ে গেল। টিট্টিভী কান্নাকাটি শুরু করে দিল। স্বামীকে ভর্ত্সনা করে বলল: আগেই বলেছিলাম সমুদ্র বিশাল। তার সঙ্গে লাগতে যেও না। আমার কথা শুনলে না। এখন কী হবে?
টিট্টিভ ভাবল: ডিম গেছে যাক, কিন্তু স্ত্রীর কাছে আমার মর্যাদা নষ্ট করা যাবে না। আমি এর বদলা নেব।
এরূপ ভেবে টিট্টিভ সব পাখিদের জড় করে বলল: বন্ধুরা, সমুদ্র আমাদের ডিম নিয়ে গেছে। কিন্তু সেজন্য আমার তেমন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ হলো সে আমাদের বাসস্থানে হানা দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য অপমানের। আজ আমার ক্ষতি করেছে, কাল তোমাদেরও ক্ষতি করবে। তাই এর একটা বিহিত করা দরকার।
পাখিরা সকলে টিট্টিভের কথায় সায় দিল। তারা একটি সভায় বসল। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, সকলে মিলে পক্ষীরাজ গরুড়ের কাছে যাবে এবং এর একটা বিহিত করতে তাকে অনুরোধ করবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলে মিলে গরুড়ের কাছে গেল এবং টিট্টিভ বলতে লাগল: প্রভু! সমুদ্র আমাদের ডিম চুরি করেছে। আমাদের বাড়িতে হানা দিয়েছে। এটা আমাদের জন্য খুবই অপমানের। আপনি থাকতে আমাদের এই অপমান সহ্য করা যায় না। আমরা আপনার প্রজা। প্রজার সুখ-দুঃখ দেখার ভার রাজার। তাই আপনি এর একটা বিহিত করুন।
টিট্টিভের কথা শুনে গরুড় ভাবতে লাগল: সত্যিই তো। আমি ওদের রাজা। ওরা আমার প্রজা। প্রজার ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তো রাজারই। তা না হলে ওরা আমাকে রাজা বলে মানবে কেন? প্রজার অপমান মানে রাজারই অপমান। তাই আমাকে এর একটা বিহিত করতেই হবে।
এরূপ ভেবে গরুড় গেল বিষ্ণুর কাছে। তাঁকে বলল: প্রভু! সমুদ্র আমার প্রজার ডিম চুরি করেছে। তাকে অপমান করেছে। তারা সবাই এসে আমার কাছে অভিযোগ করেছে। আমি রাজা হয়ে যদি তাদের রক্ষা করতে না পারি, তাহলে সেটা আমার জন্য অপমানের। অক্ষমতার। আপনি এর একটা বিহিত করুন।
গরুড় বিষ্ণুর বাহন। তাই বিষ্ণু ভাবলেন: গরুড়কে যদি শান্ত করা না যায় তাহলে আমার বিপদ। কে আমাকে বহন করবে? আমার চলাফেরা যে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই যেভাবেই হোক ওকে শান্ত করতে হবে।
এরূপ ভেবে বিষ্ণু গরুড়কে বললেন: তুমি চিন্তা করো না। আমি এখনই এর ব্যবস্থা করছি।
এই বলে বিষ্ণু সমুদ্রকে ডেকে বললেন: এক্ষুনি টিট্টিভের ডিম ফিরিয়ে দাও। নইলে আমি তোমায় শুষে ফেলব।
বিষ্ণু জগতের কর্তা। তাঁর কথা অমান্য করার সাধ্য কার? তাই সমুদ্র তত্ক্ষণাৎ টিট্টিভের ডিম ফিরিয়ে দিল। গরুড় বিষ্ণুকে ধন্যবাদ জানাল এবং পাখিরা গরুড়ের প্রশংসা করতে করতে আপন আলয়ে ফিরে গেল।
টিট্টিভ ও সমুদ্রের কাহিনী বলে দমনক পিঙ্গলককে বলল: মহারাজ, এজন্যই বলছিলাম শত্রু ক্ষুদ্র হলেও তার ক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।
পিঙ্গলক দমনককে বলল: তুমি যা ভালো বোঝ তাই করো। কিন্তু আমি বুঝব কী করে যে, সঞ্জীবক আমার ক্ষতি করতে চায়?
দমনক: মহারাজ! যখন দেখবেন সে শিং বাঁকিয়ে আপনার দিকে ছুটে আসছে, তখন বুঝবেন সে আপনাকে মারতে চায়।
এই বলে দমনক পিঙ্গলকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গোপনে সঞ্জীবকের কাছে গেল। সে বিষণ্ন বদনে সঞ্জীবকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সঞ্জীবক তাকে ওই অবস্থায় দেখে সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল: বন্ধু! কুশল তো? তোমাকে এত বিষণ্ন দেখাচ্ছে কেন?
দমনক নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল: ভৃত্যের আবার কুশল! যারা রাজার আশ্রিত, তারা তো পরাধীন। তাদের দেহ-মনের স্বাধীনতাই বা কোথায়? আর স্থিরতাই বা কোথায়? রাজার কি কেউ প্রিয় হয়? ক্ষণে মিত্র, ক্ষণে শত্রু। এর কোনো কারণে নেই। রাজার ইচ্ছাই সব।
সঞ্জীবক উদ্বেগের সঙ্গে বলল: বন্ধু! খুলে বলো, কী হয়েছে?
দমনক রুদ্ধ কণ্ঠে বলল: সমুদ্রে নিমগ্ন ব্যক্তি সামনে সাপকে অবলম্বন পেলে তাকে ধরবে কি ছাড়বে তা যেমন নির্ধারণ করতে পারে না, তেমনি আমিও এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আছি। একদিকে আমার প্রতি রাজার বিশ্বাস নষ্ট হতে চলছে, অন্যদিকে তোমার মতো বন্ধুর মৃত্যু উপস্থিত। এখন আমি কী করি?
এই বলে দমনক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বসে রইল। সঞ্জীবক উদ্বেগ ও বিস্ময়ের সঙ্গে বলল: আমার মৃত্যু উপস্থিত! কেন? কীভাবে? খুলে বলো, বন্ধু!
দমনক গোপনীয়তার ভান করে বলল: বন্ধু! কথাটা যদিও গোপনীয় তথাপি পরলোকের কথা ভেবে আমি আর না বলে পারছি না। কারণ আমিই তো তোমাকে রাজার কাছে এনেছিলাম। তাই তোমার এত বড় বিপদ দেখে আমি আর চুপ থাকি কী করে? মহারাজ কী কারণে জানি না তোমার ওপর ভীষণ রেগে আছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তোমাকে মেরে তোমার মাংসে নিজের আত্মীয়স্বজনদের তুষ্ট করবেন।
দমনকের কথা শুনে সঞ্জীবক অত্যন্ত বিষণ্ন হলো। তা দেখে দমনক আবার বলল: বন্ধু! দুঃখ কোরো না। রাজাদের মতিগতি বোঝা ভার। তাই এখন যা করণীয় তা করো।
সঞ্জীবক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল: তুমি ঠিকই বলেছ। রাজাদের খুশি করা খুবই কঠিন কাজ। তার কাছে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলতে কিছু নেই। আজ যে শত্রু, কাল সে মিত্র। আবার আজ যে মিত্র, কাল সে শত্রু। রাজনীতির চরিত্রই এই। যেকোনো কারণবশত অসন্তুষ্ট হয়, অসন্তোষের কারণ দূর হলে সে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু বিনা কারণে যে অসন্তুষ্ট হয়, তাকে সন্তুষ্ট করা দেবতাদের পক্ষেও সম্ভব নয়। আমি তো রাজার কোনো অপকার করিনি। তাহলে বিনা করণে তিনি কেন আমার ওপর ক্রুদ্ধ হলেন? আসলে রাজাদের এটাই স্বভাব।
দমনক বলল: বন্ধু! জ্ঞানীরা বলেন, দুর্জনের শত উপকার করলেও তা বিফলে যায়। মূর্খকে শত উপদেশ দিলেও তা কোনো কাজে লাগে না। কথার অবাধ্য লোককে ভালো কথা বললেও তা নিরর্থক হয়। নির্বোধকে শত বুদ্ধি দিলেও তা কার্যকর হয় না। অকূল সমুদ্র পার হওয়ার জন্য জাহাজ, অন্ধকারে প্রদীপ, হাওয়া না থাকলে পাখা এবং মদমত্ত হাতির দর্প নাশের জন্য অঙ্কুশ নির্মিত হয়েছে। এভাবে ভগবান প্রতিটি বিষয়েরই প্রতিকার চিন্তা করেছেন। কিন্তু তিনি দুষ্ট লোকের মনোভাব দূর করার কোনো প্রতিকার চিন্তা করতে পরেননি।
সঞ্জীবক পুনরায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল: আমি শস্যভোজী সাধারণ প্রাণী। রাজা আমায় মারবেন কেন? কারণ উভয়ের মধ্যে সমান বিত্ত ও সমান বল থাকলেই কেবল তাদের মধ্যে বিবাদ হতে পারে। উত্তম ও অধমে তা কখনো হয় না। তবে বিরক্ত রাজাকে সর্বদা ভয় করে চলা উচিত। কারণ বজ্র ও রাজা উভয়ের তেজ সাংঘাতিক। বজ্র এক জায়গায় পড়ে, কিন্তু রাজার তেজ সর্বগামী। সুতরাং যুদ্ধে মৃত্যুবরণই শ্রেয়। এখন তার আদেশ মেনে চলা ভুল হবে। যুদ্ধে মৃত্যু হলে স্বর্গ, আর শত্রুবধে জয়ের আনন্দ। বীরের কাছে এ দুটিই দুর্লভ। তাছাড়া যুদ্ধ না করেও যদি নিশ্চিত মৃত্যু হয়, তাহলে যুদ্ধ করে মরাই ভালো। প্রাজ্ঞরাও এ কথাই বলেন। অতএব যুদ্ধ করাই শ্রেয়।
এ কথা বলে সঞ্জীবক পুনরায় দমনকের উদ্দেশে বলল: বন্ধু! রাজা যে আমাকে মারতে চান, তা আমি বুঝব কী করে?
দমনক: যখন দেখবে সে লেজ উঁচু করে পা তুলে মুখ হাঁ করে তোমার দিকে তাকাচ্ছে, তখনই বুঝবে যে সে তোমাকে মারতে আসছে। তখন তুমি তোমার বিক্রম দেখাবে। তাকে আক্রমণ করবে। কারণ বলবান হলেও সে যদি নিস্তেজ থাকে, তাহলে লোকে তাকে অবজ্ঞা করে। দেখো, আগুনকে সবাই ভয় পায়, কিন্তু ভস্মে অবলীলায় পা ফেলে।
অতঃপর দমনক পিঙ্গলকের কাছে গিয়ে বলল: মহারাজ, সেই পাপিষ্ঠ এসেছে। আপনি প্রস্তুত হোন।
পিঙ্গলক দমনকের কথা অনুযায়ী লেজ উঁচু করে পা তুলে মুখ হাঁ করে থাকল। এমনি সময় সঞ্জীবক সেখানে গিয়ে পিঙ্গলককে ওই অবস্থায় দেখে সেও শিং বাঁকিয়ে এগিয়ে গেল। শুরু হলো দুজনের মধ্যে ভীষণ লড়াই। একপর্যায়ে পিঙ্গলক সঞ্জীবকের শ্বাসনালি কামড়ে ধরল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সঞ্জীবকের মৃত্যু হলো।
সঞ্জীবককে মেরে পিঙ্গলক বিমর্ষ হয়ে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর সে বলল: আমি এ কী পাপ কাজ করলাম! সঞ্জীবক আমার বিশ্বস্ত মন্ত্রী ছিল। তাকে মেরে ফেললাম! বনে সিংহ যেমন হাতিকে মেরে নিজে পাপের ভাগী হয়, কিন্তু হাতির মাংস সব পশুরা খায়; তেমনি আমি রাজা হয়ে মন্ত্রী সঞ্জীবককে মারলাম, আর তার মাংস খাবে অন্য সবাই।
দমনক পিঙ্গলককে সান্ত্বনা দিয়ে বলল: মহারাজ, আপনি সঞ্জীবকের জন্য মিছেমিছি শোক করছেন। শাস্ত্রে আছে না—পিতা, ভ্রাতা, পুত্র কিংবা বন্ধু—এরাও যদি প্রাণনাশে উদ্যত হয়, তাহলে নিজের মঙ্গলকামী রাজা তাদেরও বধ করেন। ধর্ম, অর্থ ও কাম বিষয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি একান্ত দয়ালু হন না। হাতে রাখা অন্নও ক্ষমাশীল ব্যক্তি রক্ষা করতে পারে না। শত্রুকে ক্ষমা করা মুনিদের সাজে, রাজাকে নয়। রাজার পক্ষে সেই ক্ষমাগুণই দোষের হয়। দয়ালু রাজা, সর্বভুক ব্রাহ্মণ, অবাধ্য স্ত্রী, দুশ্চরিত্র সহায়ক, বিরুদ্ধগামী ভৃত্য, অমনোযোগী কর্মচারী ও অকৃতজ্ঞ—এদের ত্যাগ করাই উচিত। তাছাড়া রাজনীতি হচ্ছে বারাঙ্গনার মতো বহুরূপিণী। সে কখনো সত্য কথা বলে, কখনো মিথ্যা কথা বলে। কখনো রুক্ষভাষিণী, কখনো প্রিয়বাদিনী। কখনো নির্দয়, কখনো দয়ালু। কখনো কৃপণ, কখনো দানশীল। কখনো প্রচুর ব্যয় করে, কখনো প্রচুর আয় করে। এভাবে দমনক বোঝালে পিঙ্গলকের মন শান্ত হয় এবং সবাই মিলে সঞ্জীকের মাংস ভক্ষণ করে। দমনক প্রধানমন্ত্রীর পদ পায় এবং তাকে নিয়ে পিঙ্গলক সুখে রাজত্ব করতে থাকে।





