ঠিক শতবর্ষ আগের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে পাঞ্জাবের তখনকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডয়ার ভূমিকার কথা স্মরণ করে প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেন অমৃতসরের এতিম বালক উধম সিং।

বালকের সেই সুযোগ আর আসে না। গভর্নর চাকরি শেষে স্বদেশ ব্রিটেনে ফিরে যান।

উধম সিং কিছু অর্থ জোগাড় করে ইংল্যান্ডে আসেন। সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ১৩ মার্চ ১৯৪০ সে সুযোগ আসে। ২১ বছর পর। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে ক্যাক্সটন স্ট্রিটের ওপর ক্যাক্সটন হলে আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা সভায় বক্তা মাইকেল ও’ডয়ার ও তখনকার ভারত সচিব লর্ড জেটল্যান্ড।

উধম সিং ততক্ষণে নিজের নাম বদলে নিয়েছেন: মোহাম্মদ সিং আজাদ। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নতুন নামটিই বহাল রাখেন। ৩৭ বছর বয়সে উধম ভাবলেন, একসঙ্গে দুজনকে পরপারে ঠেলে দেবেন। কিন্তু মৃত্যু কেবল তার প্রথম টার্গেট লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও’ডয়ারকে টেনে নিয়েছে।

মার্ডার অ্যাট ক্যাক্সটন হল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম একটি সোপান।

১৩ মার্চ ১৯৪০, রাত ১০টা। ঘটনার সাড়ে ৫ ঘণ্টার মধ্যে চার্জশিট দাখিল। স্যার মাইকেল ও’ডয়ারকে গুলি করে হত্যা করেন উধম সিং। তিনি হত্যাকাণ্ডের পর পালাতে চেষ্টা করেন। হত্যাকারী হিসেবে তার পরিণতি কী, হবে এটা নিয়েও তিনি বিচলিত নন।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯ জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ডে শত শত ভারতীয় নারী ও শিশু হত্যার দায় ও’ডয়ারের। আর নিহতদের একমাত্র অপরাধ তারা একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভায় অংশগ্রহণ করেছিল। উধম সিং নিজের মধ্যে একাধিক ধর্মের মিলন ঘটিয়ে গ্রেফতারের সময় তিনি তার নাম বলেছিলেন মোহাম্মদ সিং আজাদ। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনি ১৩ মার্চ ১৯৪০ ওয়েস্টমিনস্টারের ক্যাক্সটন স্ট্রিটে মাইকেল ফ্রান্সিস ও’ডয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুন করেছেন।

লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিভিশনাল ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর জন সোয়াইন তার নথিতে খুনের যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন, তা নিম্নরূপ:

বেলা ৩টা, ১৩ মার্চ ১৯৪০, বুধবার। রয়াল সেন্ট্রাল এশিয়ান সোসাইটিকে সঙ্গে নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন সভা ডেকেছে ওয়েস্টমিনস্টারের ক্যাক্সটন স্ট্রিটের ক্যাক্সটন হলের ট্যুডোর রুমে। লেকচারের বিষয় ‘আফগানিস্তান: দ্য প্রেজেন্ট পজিশন’। এ বিষয়ে বক্তৃতা দিলেন স্যার পিটার স্কাইস। সভাপতিত্ব করছিলেন লর্ড জেটল্যান্ড। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন লর্ড লেমিংটন, স্যার লুইস ডেইন ও স্যার মাইকেল ও’ডয়ার (নিহত)।

সভা শুরু হলো বেলা ৩টায়, আনুমানিক সাড়ে ৪টায় শেষ হলো। শ্রোতাদের টিকিট কিনে আসতে হয়েছে। আনুমানিক ১৫০ জন এতে অংশগ্রহণ করেছে। ১৩০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আগত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় কক্ষে আসা-যাওয়ার পথে তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ডানদিকের পথে দাঁড়িয়ে থাকাদের একজন বর্তমান কয়েদি, তিনি সামনের কাতারের খুব কাছাকাছি ছিলেন।

যখন সভা শেষ হলো এবং অংশগ্রহণকারীরা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সে সময় কয়েদি বক্তাদের লক্ষ্য করে অনেকগুলো গুলি করেন, যার ফলে স্যার মাইকেল ও’ডয়ার গুরুতর জখম হন, এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। লর্ড লেমিংটনের ডান হাতে গুলি লাগে, লর্ড জেটল্যান্ডের শরীরের বাম অংশে এবং স্যার লুইস ডেইনের ডান হাতের সামনে গুলি লাগে। শেষ তিনজনের আঘাত গুরুতর নয়। অতঃপর স্যার লুইস ডেইনকে কয়েকদিন ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতালে রাখা হয় এবং তার হাতে ছোট একটি অপারেশন করা হয়।

গুলি করার ঘটনা বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষ করেছেন, যথাসময়ে তাদের বিবৃতি উপস্থাপন করা হবে।

গুলির পরপরই ভীষণ অসন্তোষ বিরাজ করতে থাকে এবং কয়েদিকে দরজার দিকে ছুটে যেতে দেখা যায়। তাকে বাধা দেন এক মহিলা—বার্থা হেরিং। তিনি তার পথ আগলে রাখেন এবং তার কাঁধ জাপটে ধরেন। সে সময় উইন্ডহাম হ্যারি রেচেস তার কাঁধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মেঝেতে ফেলে দেন, তার হাতের রিভলবার মুঠি থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়। মিস্টার রিচেস ধাক্কা দিয়ে রিভলবারটি দূরে সরিয়ে দিলে তা মেজর রেজিনাল্ড আলফ্রেড স্লি তা স্যার পার্সি স্কাইসের হাতে তুলে দেন, তিনি এটি পুলিশ সার্জেন্ট ম্যাকউই লিয়ামের কাছে হস্তান্তর করেন।

ক্যাক্সটন হল ভবনে স্পেশাল কনস্টেবুলারি অফিস থাকায় মেট্রোপলিটন স্পেশাল কনস্টেবুলারির ইন্সপেক্টর রবার্ট উইলিয়াম স্টিভেনস (একজন ব্যারিস্টার) উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছয়টি গুলির শব্দ শোনেন এবং দ্রুত ট্যুডোর রুমে পৌঁছে ম্যাকউইলিয়াম না পৌঁছা পর্যন্ত কয়েদিকে ধরে রাখতে সহায়তা করেন।

ম্যাকউইলিয়াম পৌঁছে ট্যুডোর রুমের দরজা খোলা পান, অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি পোড়া বারুদের কড়া গন্ধ পান। রুমের ভেতর তিনি নীলচে ধোঁয়ার আভাসও দেখতে পান। সার্জেন্ট তখন কয়েদিকে তল্লাশি করেন, তার ওভারকোটের বাম পকেটে রাইনোলিয়াম ছুরি, জ্যাকটের ডান পকেটে পান রিভলবারের ১৭ রাউন্ড গুলি, ট্রাউজারের ডান পকেটেও অনুরূপ ৮ রাউন্ট গুলি পান।

ইন্সপেক্টর ডিটন কয়েদি ইংরেজি জানে কিনা জানতে চাইলে কয়েদি বলেন, তিনি তাকে বললেন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আটক করে রাখা হবে। তিনি বলেন, এতে কিছু এসে যায় না, সব শেষ হয়ে গেছে। তারপর স্যার মাইকেল ও’ডয়ারের মরদেহের দিকে নির্দেশ করে মাথা নেড়ে বললেন, ওই তো ওখানে।

আজাদকে অন্য রুমে সরিয়ে নেয়া হয় এবং তাকে ডিটেকটিভ সার্জেন্ট সিডনি জোন্সের হেফাজতে দেয়া হয়।

সাড়ে ৫টায় আমি (জন সোয়াইন) ক্যাক্সটন হলে পৌঁছে, সেখানে স্যার মাইকেল ও’ডয়ারের মরদেহ দেখি এবং কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করি। গুলির সময় ট্যুডোর রুমে উপস্থিত সবার জবানবন্দি নেয়া হয়। নির্বাচিতদের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স্যার পার্সি মোলসওয়ার্থ স্কাইস (অবসরপ্রাপ্ত), ঠিকানা ২৬ সেন্ট জর্জেস কোর্ট গ্লাস্টার রোড। তিনি ক্যাক্সটন হলে ‘আফগানিস্তান: বর্তমান পরিস্থিতি’ বিষয়ে ১০ মিনিটের বক্তৃতা করেছেন। তারপর বক্তৃতা করেন যথাক্রমে স্যার মাইকেল ও’ডয়ার, মিসেস অড্রে মালাম এবং সবশেষে স্যার লুইস ডেইন ১০ মিনিট বক্তৃতা দেন।

তারপর লর্ড জেটল্যান্ড লর্ড লেমিংটনকে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করতে বলেন। তিনি ৫ মিনিট বক্তৃতা করে সভা শেষ করেন। তখন বিকাল সাড়ে ৪টা। স্যার পার্সি বললেন, তখন আমাকে গুডবাই বলার জন্য লর্ড জেটল্যান্ড উঠে দাঁড়ালেন, ঠিক সে সময় তিনি আলোর ঝলক দেখতে পান এবং দেখতে পান একজন লোক ক্যাক্সটন হলের দেয়ালে ঠেস দিয়ে গুলি চালাচ্ছে। তিনি দেখলেন স্যার মাইকেল মেঝেতে পড়ে গেলেন। এবং স্যার রিচেস ঘাতককে ধরে ফেলেছেন। স্যার রিচেস ঘাতকের কাছ থেকে রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে তা স্যার পার্সিকে দেন এবং তিনি পুলিশ ইন্সপেক্টর স্টিভেন্সের কাছে হস্তান্তর করেন।

মরদেহ দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনের হর্সফেরি রোডে ওয়েস্টমিনস্টার মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।&dquote;&dquote;

রাত ৮.৫০ মিনিটে আমি ক্যাক্সটন হলের একটি কক্ষে কয়েদিকে বলি: তোমাকে ক্যানন রো পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হবে এবং স্যার মাইকেল ও’ডয়ারকে হত্যা করার জন্য তোমাকে অভিযুক্ত করা হবে।

কয়েদি বলল, আমি এভাবেই প্রতিবাদ করেছি বলে জানাব।

তাকে সতর্কতার সঙ্গে ক্যানন রো পুলিশ স্টেশনে নেয়া হয়, সেখানে তিনি বিবৃতি দেন, তার অনুরোধে আমি বিবৃতি লিপিবদ্ধ করি। তিনি নিজে সেই বিবৃতি পড়ে দেখেন এবং তাতে সই করেন।

সেদিনই রাত ১০টায় কয়েদিকে মাইকেল ফ্রান্সিস ও’ডয়ারকে হত্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয় এবং তাকে অভিযোগ শোনানো হয়।

কয়েদির জবাব, আমি হত্যা করতে চাইনি। আমি কেবল প্রতিবাদ করতে এ কাজটি করেছি, আমি কাউকেই হত্যায় করতে চাইনি।

১৪ মার্চ উধম সিংকে বাউ স্ট্রিট পুলিশ কোর্টে হাজির করা হয় এবং পুলিশ তাকে এক সপ্তাহের রিমান্ডে নেয়।

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর রিচার্ড ডিটন হত্যাকাণ্ডের দিন ৪টা ৫০ মিনিটে ক্যাক্সটন হলের ট্যুডোয় রুমে উধম সিংকে স্বাভাবিক এবং হাসিমুখ অবস্থায় দেখতে পান। সেদিনই তল্লাশির সময় তার কাছ থেকে ১৯৪০ সালের একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়, তাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিখিত ছিল:

১৩ মার্চ: বেলা ৩টা। ক্যাক্সটন হল মিটিং

অন্য জায়গায় লেখা: একজন—দরজা খোলার একমাত্র উপায়

আমার গত মাস—আমি পৃথিবী দেখেছি, আমায় একমাত্র আকাঙ্ক্ষা স্বাধীন ভারত দেখা।

ডায়েরিতে ভারতের সাবেক ভাইসরয় (১৯৩১-৩৪) লর্ড উইলিডন এবং ভারত সচিব লর্ড জেটল্যান্ডের ঠিকানা লেখা আছে। সেদিনই সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে রিজেন্ট পার্কের ৮ নম্বর মরিংটন স্ট্রিটে উধম সিংয়ের কক্ষ তল্লাশি করা হয়। ইন্সপেক্টর ডিটন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ওয়াইটহেডকে সঙ্গে নিয়ে তল্লাশি চালান। ১৯৩৯ সারের ডায়েরিতে স্যার মাইকেল ও’ডয়ারের সাউথ ডেভনের ঠিকানা তাতে লেখা ছিল। তল্লাশির পর সার্জেন্ট জোন্স সেখান থেকে তুলে আনা দ্রব্যাদির ফর্দ তৈরি করেন। এদিকে উধম সিং অনেকগুলো বিবৃতি দেন ও মন্তব্য করেন:

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ডিটন হত্যাকারী ‘আজাদ’কে সতর্ক করেন বরং চুপ থাকতে বলেন। আজাদ বলতে থাকেন, আমি এ কাজ করেছি কারণ আমি তাকে মেনে নিতে পারিনি। এটা তার প্রাপ্য ছিল। আমি কোনো সংঘ-সমিতি বা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে নেই।

সে সময় ইন্সপেক্টর ডিটন চারটি শূন্য কার্তুজ টেবিলের ওপর রেখে আজাদকে দেখান। তিনি বলেন, চারটা নয়, ছ’টার সব কটাই। তিনি হাতের ছয়টি আঙুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন— তিনি ছয়টি গুলি করেছেন। তিনি বলেন, আমি মৃত্যুকে পরোয়া করি না, মরতে হলে আমি কিছুই মনে করব না। মরার জন্য বুড়ো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে লাভ কি? ওতে লাভ নেই। তরুণ অবস্থায় মরতে পারাটা ভালো, আমি তাই করছি।

সার্জেন্ট জোন্স তাকে মনে করিয়ে দিলেন যেসব কথা আজাদ বলছে, সেগুলো কিন্তু আদালতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।

আজাদ বলেন, আমি আমার দেশের জন্য মরতে যাচ্ছি। আমি কি একটা সংবাদপত্র পেতে পারি?

কিছুক্ষণ পর আজাদ আবার বললেন, জেটল্যান্ড কি মরেছেন? তারও মরা উচিত। আমি তার ডানদিকে দুটি গুলি করেছিলাম।

কিছুক্ষণ পর বললেন, আমি রিভলবারটা বর্নমাউথের একজন সৈনিকের কাছ থেকে কিনেছিলাম। আমি তাকে কিছু মদ কিনে দিয়েছিলাম।

একটু বিরতি দিয়ে তিনি বললেন, আমার বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখনই আমার মা-বাবা মারা যান। আমার সম্পত্তি বিক্রি করে ফেলি। আমি যখন ইংল্যান্ডে আসি আমার হাতে ২০০ পাউন্ডের বেশি ছিল।

বেশ কয়েক মিনিট নিশ্চুপ থেকে আজাদ আবার বললেন, মাত্র একজন মরেছেন! ধ্যাৎ! আমি তো ভেবেছি আরো বেশি মারতে পারব। আমি নিশ্চয়ই খুব ধীরে ধীরে কাজটা করেছি। অনেক মহিলা ছিলেন তো, তাই।

সার্জেন্ট জোন্স যখন কয়েদিকে ক্যানন রো পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যান, আমি সঙ্গে ছিলাম।

১৫ মার্চ বেলা সোয়া ১টায় জন সোয়াইন ও চিফ ইন্সপেক্টর রাউলিং কয়েদির প্রকৃত নাম কী, তা জানার জন্য ব্রিক্সটন জেলখানায় যান। পুলিশ সচেষ্ট ছিল যেন ঘাতক তার ভিলেনগিরিকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করতে না পারেন। তারা চায় পুরো বিষয়টিকে একটি সাধারণ অবিবেচনাপ্রসূত খুনের ঘটনা হিসেবে দেখতে।

সিআইডি কর্মকর্তার ভাষ্য, এটা স্পষ্ট খুনের ঘটনা, সাধারণ সাক্ষ্য খুবই শক্তিশালী, এ মুখ থেকে যেসব কথা বের হচ্ছে, তা যদি আদালতে এবং পরে সংবাদপত্রে যায়, তা অত্যন্ত বাজে একটি ব্যাপার হবে। 

উধম সিং তার দিক থেকে এটা স্পষ্ট করে দিলেন ক্যাক্সটন হল মার্ডার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক বিবেচনা—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দখল থেকে ভারতকে স্বাধীন করার একান্ত আগ্রহ থেকেই ঘটিয়েছেন। দ্বিতীয় ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতি একটি আবেগময় সম্পৃক্ততা থেকে তিনি জানিয়েছেন, তার নাম আগে উধম সিং থাকলেও তিনি মোহাম্মদ সিং আজাদ হিসেবেই পরিচিত হতে চান, চার্জশিটে তার নাম তাই লিখতে হবে।

আজাদ বলেন, আপনারা কী লিখবেন, তাতে আমার কিছু এসে যায় না, তবে আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলব মোহাম্মদ সিং (১৬ মার্চ ১৯৪০ দাখিল করা জন সোয়াইনের রিপোর্ট)

১৬ মার্চ ব্রিক্সটন কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে তিনি পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট মিস্টার স্যান্ডসকে লিখেন, আমি আপনাকে যে নাম দিয়েছি মোহাম্মদ সিং আজাদ, এটাই আমার নাম। যারা এটা বদলাতে চাচ্ছে, তাদের গোল্লায় যেতে দিন। এটাই আমার নাম।

কেন ক্যাক্সটন হল অপারেশন—উধম সিং পুলিশের কাছে তার জবানবন্দিতে বলেছেন, আমি মনে করেছি সেই বিকালের সভায় গিয়ে আমার প্রতিবাদ জানাতে হবে। হত্যা করার জন্য আমি সঙ্গে রিভলবার নিইনি, প্রতিবাদ করার জন্য নিয়েছিলাম, কিন্তু সভা শেষ হয়ে গেছে, আমি পকেট থেকে রিভলবার বের করে দেয়ালে গুলি করার মতো গুলি করে প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমি দেখেছি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে ভারতে মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে— আমি আমার প্রতিবাদের জন্য দুঃখিত নই। এটা আমার দায়িত্ব, দায়িত্ব পালন করেছি—আমার দেশের জন্য প্রতিবাদ করায় যে শাস্তি হওয়ার হোক, আমি এসবে কিছু মনে করি না— ১০, ২০ কিংবা ৫০ বছর জেল কিংবা ফাঁসি হয় হোক, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।...

মাইকেল ও’ডয়ারের হত্যাকাণ্ডের একমাত্র আসামি হিসেবে ৪ জুন ১৯৪০ তাকে সেন্ট্রাল ক্রিমিনাল কোর্টের জাস্টিস অ্যাটকিমসনের আদালতে আনা হয়। তিনি দোষ স্বীকার করেননি। দুদিন ধরে বিচারকার্য চলে, বিচারপতি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

১৫ জুন ১৯৪০ আপিল আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে শুনানি হয়। আদালত আপিল খারিজ করে দেন।

৩১ জুলাই ১৯৪০ প্যান্টোভাইল কারাগারে উধম সিং অথবা মোহাম্মদ সিং আজাদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শহীদ ক্যাক্সটন হল মার্ডারের কারুকার উধম সিং ওরফে মোহাম্মদ আজাদ সিং।