আলফ্রেড জোসেফ হিচককের সিনেমা আমার জীবনে একটি স্থায়ী ভালোবাসার নাম। সপ্তাহান্তের রাতে ‘মুভি অব দ্য উইক’ হতো বিটিভিতে, সেকালে এ দেশের মানুষের জন্য একটিমাত্র বাতায়ন বহির্বিশ্বকে দেখার, সে আমলে মনে হতো ক্যারি গ্রান্টের চুল কেন চকচকে নীল? জিমি স্টুয়ার্ট কেন মুখে সুপারি ঠুসে কথা বলে? অল্প বয়েসে এই মুভি অব দ্য উইকেই দেখেছি ‘সাসপিশন’ আর ‘রিয়ার উইন্ডো’, দেখেছি ‘সাইকো’, সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সুনসান বাড়িতে ‘সাইকো’ দেখে দিনের বেলায়ও কেমন গা ছমছম করত, তা মনে আছে আমার। মনে হতো, হিচকক ‘সাইকো’র নাম ভূমিকায় এমন একটি নরমসরম মৃদুভাষী লোককে নিলেন, যে প্যারিসাইড থেকে ম্যাট্রিসাইড সবকিছুতে জড়িত, তাই কি এই সিনেমাটা দেখার অস্বস্তি এত স্থায়ী? সাইকো তথা নরম্যান বেটসকে যেন খানিকটা ভালো লাগে, মায়া লাগে, তাই যখন সে তার আপাতসুন্দর প্রচ্ছদ ছিঁড়েফুঁড়ে বের হয়ে আসে খুনির বেশে তখন ভয়ের পাশাপাশি তীব্র অস্বস্তিতে ছেয়ে যায় মন। দেশ ছাড়ার পর যখন আমি উত্তর লন্ডনে প্রথম এসে ঘর পাতলাম, আবিষ্কার করলাম, ‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ এমন একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে আসা যায়, যেখানে থরে-বিথরে সাদা-কালো আমলের রত্নের সম্ভার ছড়ানো, তখন কাঙাল শাকের ক্ষেতে এসে পড়ল। একদিন হিসাব করতে গিয়ে দেখি, সাইলেন্ট মুভি (আঁঁভা গার্দ ‘দ্য লজার’ বাদে) ছাড়া হিচককের আর সব মুভি দেখে ফেলেছি!

বর্ণাঢ্য বললে তার কাজকে কম বলা হয়, এক জীবনে এতগুলো অসাধারণ কাজ লোকে কী করে সম্পন্ন করে যায়, তা বিস্ময় জাগায়, সমীহ জাগায়। ৫০ বছরের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় হিচককের টেকনিকের কিছু অদলবদল ঘটেছে (নির্বাক থেকে সবাক, সাদা-কালো থেকে রঙিন, অতঃপর থ্রি-ডি ফিল্মিং), ‘সাইকো’তে স্নান দৃশ্যে যা পারেননি ‘ফ্রেঞ্জি’ তৈরির সময় সেই ফ্রন্টাল ন্যুডিটি কাজে লাগিয়েছেন, ‘নটোরিয়াস’-এ কিংবা ‘নর্থ বাই নর্থ ওয়েস্ট’-এ সেন্সর বোর্ডকে চালাকি করে ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ করেছেন চুমুর দৃশ্য, ‘রোপ’-এ একটিমাত্র সেটে টানা একটি দৃশ্যের মতো করেই পুরো সিনেমাটি তৈরি করেছেন, কোনো কোনো সিনেমা (যেমন ‘রেবেকা’ বা ‘আন্ডার ক্যাপ্রিকর্ন’) যতটা না হিচককের সিনেমা মনে হয়, তার চেয়ে বেশি মনে হয় প্রেমের গল্প, হিচককের প্রিয় ব্লন্ড নারী বদলেছে, বদলেছে সিনেমার ভাষা, এ যাত্রায় তিনি নিজেই একটি জনরায় পরিণত হয়েছেন, একটি বিশেষণ (হিচককিয়ান), তাকে আদর করে লোকে ডাকে ‘মাস্টার অব সাসপেন্স’, সিনেমার ইতিহাসে একটি অবশ্য-উচ্চার্য নাম হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে একটি বিষয়ে হিচককের মানসিকতা বদলায়নি বলা যায়। সেটা নিখাদ সিনেমা মিডিয়ামটিকে ব্যবহার করে ভয়ের আবহ নির্মাণ, সেন্সুয়ালিটি তৈরি। উত্কণ্ঠা- অনিশ্চয়তা-প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব-বুদ্ধি-রোমান্সের এক অদ্ভুত ককটেল ওর সিনেমা।

হিচকক বলতেন, ‘মানুষ ভয় পেয়ে চমকে উঠতে ভালোবাসে। ভয়ের গল্পের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণ।’ এই তো, ত্রৈলোক্যনাথের কঙ্কাবতীই হোক কিংবা মিথের অর্ফিয়ুস, তাকে যখনই ভয় দেখানো হয় যে পিছে তাকিও না, তাহলে ভয়ানক কিছু ঘটবে, সে পিছু ফিরে তাকাবেই। একটি সাক্ষাত্কারে হিচকক স্বীকার করেছিলেন, জগতের যা যা বিষয়ে লোকে ভয় পায়, তার সবকিছুতে তার ভয় ছিল, অন্ধকার ঘর থেকে শুরু করে দরজার ওপাশ, চিলেকোঠা থেকে বেজমেন্ট, সব। ভয়কে এবং একান্ত অন্ধকারকে এমন তন্ন তন্ন করে জেনেছিলেন বলেই সিনেমায় এমন উত্কর্ণ মুহূর্ত সৃষ্টি করতে পারতেন তিনি। ভিতু মানুষ মানে আসলে ক্রিয়েটিভ মানুষ, যার মাথা আর মন যত সৃষ্টিশীল, সেই মন তত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে অন্তরালে, তাই সেসব মানুষ ভিতু হয়। ভয়ের একটি আকর হচ্ছে শৈশবের ট্রমা (যেমন করে তিনি দেখিয়েছিলেন ‘স্পেলবাউন্ড’-এ কিংবা ‘দ্য বার্ডস’-এ, এমনকি ‘সাইকো’তেও যেখানে নরম্যান বেটস অত্যন্ত সংবেদনশীল গলায় বলে, ‘আমরা যে যার নিজস্ব খাঁচায় বন্দি, যতই বাতাসে আঁচড় কাটি, কেউ বেরোতে পারি না সেই খাঁচা থেকে, বৃথাই একে অন্যকে ক্ষতবিক্ষত করি’, সেখানে সে ইশারা করেছে তার শৈশবের দিকেই, যে সময়টাতে সে মায়ের প্রেমিকদের প্রতি অসহিষ্ণুতাকে আবিষ্কার করেছে।), হিচককেরও ছিল সেসব, বিনা অপরাধে বাপ তাকে চার-পাঁচ বছর বয়সে ১০ মিনিট হাজতবাস করিয়েছিলেন, সেই থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার ভয় ও বিতৃষ্ণা। এমনিতে যা কিছু করাল, যা কিছু ভয়ানক, যা কিছু উদ্গ্রীব-উত্কণ্ঠার, তা-ই তৈরি করে গেছেন হিচকক, আজীবন; কিন্তু হরর তার গন্তব্য ছিল বললে অবিচার করা হবে গল্প বলার কুশলতার প্রতি, প্রায় প্রতিটি সিনেমায় হঠাৎ ছলকে পড়া অসম্ভব মানবিক মুহূর্তের প্রতি, তার সিনেমায় নির্মিত প্রেমের সৌধাকার সৌন্দর্যের প্রতি।

অল্প বয়েসে তিনি ছিলেন মুখচোরা গোছের, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছিলেন, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে তার বাবার মৃত্যুর পর টেলিগ্রাফ অফিসের অ্যাডভার্টাইজিংয়ের দপ্তরে কাজ শুরু করতে হয় ওকে, তারপর ২১ বছর বয়েসে একটি আমেরিকান মুভি স্টুডিওর লন্ডন শাখায় কাজের জায়গায় পরিচয় হয়েছিল আলমা রেভিলের সঙ্গে, আলমা এরই মধ্যে লেখক ও সম্পাদক হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছেন, হিচকক ও আলমা পরস্পরের প্রতি এবং সিনেমার প্রতি দারুণ আকর্ষণকে আবিষ্কার করলেন, জীবনব্যাপী সম্বন্ধের সেই শুভসূচনা। ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’, ‘দ্য মাউন্টেন ইগল’-এর মতো কিছু ফ্লপ দিয়ে হিচককের যাত্রারম্ভ, এরপর এল ‘দ্য লজার’, কুখ্যাত খুনি ‘জ্যাক দ্য রিপার’-এর ঘটনার ছায়াবলম্বনে আসল খুনগুলোর মাত্র ৩৮ বছর পরে নির্মিত নির্বাক চলচ্চিত্র, পর্দায় সম্ভাব্য খুনি পায়চারি করছে কাঠের মেঝেয়, কাচের মেঝে আর ঝাড়বাতির দোলা দিয়ে হিচকক নিচতলার মানুষদের বোঝাচ্ছেন খুনি ক্ষেপে উঠছে।&dquote;&dquote;

শুরু হলো হিচককের জয়যাত্রা, ছোট ছোট কিছু সাফল্যের পর ১৯২৯-এ এল ‘ব্ল্যাকমেইল’, তারপর ক্রমে ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ’, ‘থার্টিনাইন স্টেপস’ ও ‘দ্য লেডি ভ্যানিশেস’, তিনি লন্ডনের সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্মাতায় পরিণত হলেন। হিচককের সিনেমায় লোকে এমন সব গল্প ও ভিজুয়াল ট্রিটমেন্ট দেখতে পাচ্ছিল, যা তারা আগে কখনো কোনো সিনেমায় দেখেনি। আমেরিকায় এলেন হিচকক, তার সই নিতে হামলে পড়ল লোকে, কিন্তু হলিউড তখনো বিশ্বাস করেনি, এই ভদ্রলোক একটি চলনসই হলিউড মুভি নির্মাণ করতে পারবেন। এগিয়ে এলেন ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’খ্যাত প্রডিউসার ডেভিড ও’সেলঝনিক, সাত বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেন হিচকক, সাফল্য এল ড্যাফনি দ্যুমরিয়রের রচিত গথিক রোমাঞ্চ ‘রেবেকা’র হাত ধরে। ‘রেবেকা’ হারিয়ে দিল ক্যুকরের ‘ফিলাডেলফিয়া স্টোরি’র মতো তারা ঝলমলে চিরকালীন বিনোদনকে ও চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’কে, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের অস্কার নিতে উঠলেন সেলঝনিক, হিচককের কাছে নিশ্চয়ই সেটা খুব একটা উপাদেয় ঠেকেনি। রেবেকার পর কিছু সফল চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন হিচকক, ‘ফরেন করেসপন্ডেন্ট’, ‘শ্যাডো অব আ ডাউট’ ও ‘দ্য প্যারাডাইন কেস’।

‘হিচককিয়ান’ বিশেষণটি নিয়ে একটি আলোচনায় হিচকক দেখিয়েছিলেন, আদুরগায়ে একটি বুড়ো লোক সৈকতে বসে আছে এবং কারো দিকে চেয়ে হাসছে—এ দৃশ্যটিও দুভাবে দেখানো সম্ভব, বুড়ো যদি শিশুর দিকে তাকিয়ে হাসে, তবে সেই দৃশ্যের ব্যঞ্জনা এক রকম, আর যদি স্বল্পবসনা যুবতীর দিকে তাকিয়ে কেলিয়ে হাসে, তবে তা দর্শককে আরেক রকম অনুভব করাবে, ক্যামেরা যদি চোখকে অনুসরণ করে, তাহলে দর্শক দর্শকামীতে পরিণত হতে পারে এক নিমেষে। কিংবা ‘সাসপিশন’-এ যে স্ত্রী সন্দেহ করছে, তার স্বামী তাকে মেরে ফেলবে, সে দেখতে পাচ্ছে, রাতের ঘুমের আগে তার স্বামী যে দুধের গেলাস এগিয়ে দিচ্ছে, সেটি ফসফরাসের মতো জ্বলছে যেন, জোনাকির আগুনের মতো যেন তা তরল নীল, গেলাসটিও যেন প্রকাণ্ড ভাণ্ড, তাতে মরণ ডুব দেয়া সম্ভব। ভিজুয়ালি চিন্তা করছেন হিচকক, একটিমাত্র সামান্য চিন্তার গড়ন দেখাতে গড়িয়ে আনছেন অস্বাভাবিক বিশাল &dquote;&dquote;চীনামাটির পাত্র—কাচের গ্লাস। নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লজার’-এ শুরুতে খবরের কাগজ ছাপা হওয়ার দৃশ্যে ‘মার্ডার’ শব্দটা হাইলাইট করা, রোগাসক্ত সভ্যতা ‘খুন’ ভালোবাসে, মানুষের রক্তের প্রতি মরবিড তৃষ্ণা বারবার ফিরে এসেছে এই নির্বাক ছবিতেও। গল্পের শুরু থেকে যেমন নিশ্চিতভাবে নতুন লজারকে নির্দেশ করে দেয়া হয় সোনালিচুলো মেয়েদের সিরিয়াল কিলার হিসেবে, তাতে নির্বাক যুগের সাদা-কালোয় মেলোড্রামাটিক অভিনয় সত্ত্বেও হিচককপ্রেমীরা মনে মনে নিশ্চিত হয়ে যেতে পারেন, এ লোকটি আসল খুনি হবে না। অবশ্য আসল খুনি হবে না, এমন আভাস দিয়েও শেষ অবধি ‘সাসপিশন’-এ স্বামীটিকে হিচকক মূল অপরাধী হিসেবেই চিত্রিত করেছিলেন, কিন্তু ক্যারি গ্রান্টকে পর্দায় লোকে এমন ভয়ানক লোক হিসেবে নিতে পারবে না বলে শেষে ‘সাসপিশন’-এর শেষটা বদলাতে হয়, দর্শক স্বস্তির সাথে দেখে, ক্যারি গ্রান্ট আসলেই খেয়ালি—একটু দায়িত্বহীন—একটু নিষ্ঠুরভাবে উদাসীন—আনপ্রেডিক্টেবল, কিন্তু নিরপরাধ একজন স্বামী, বৃথাই স্ত্রী জোন ফন্টেইন সারা সিনেমায় তাকে সন্দেহ করে চলেছে। এই হচ্ছে ‘হিচককিয়ান’ সিনেমা, কোন বাঁকে কী ধন দেখাবে, কেউ জানে না।

একটা কথা বলে রাখা ভালো, বিশ্বযুদ্ধকালীন সিনেমায় হিচকক নিজের মতো করে যুদ্ধকে দেখেছিলেন, ‘স্যাবোটেয়ার’, ‘ফরেন করেসপন্ডেন্ট’, ‘লাইফবোট’-এ বারবার উঠে এসেছে যুদ্ধের ব্যক্তিগত প্রতিবেদন, ব্যক্তিক বীক্ষণ। সে সময় লরেন্স অলিভিয়ের ফিরে যাচ্ছেন দেশে, ডেভিড নিভেন যাচ্ছেন, কিন্তু হিচকক তখনো দেশের বাইরে চুক্তিবদ্ধ, তার ফেরা হচ্ছে না। অতএব দেশের বিপর্যয়ে দেশের হয়ে লড়তে না পারার গ্লানি থেকে হিচকক নির্মাণ করেছিলেন মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে তার নিজের জবানি। ব্যক্তি হিচককের হাতের দাবার ঘুঁটি, তাকে দিয়েই হিচকক তৈরি করেন ব্যঞ্জনা, ব্যক্তির পারস্পেক্টিভ থেকেই হিচকক দেখান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি ব্যক্তির বিরাগ ও দ্বন্দ্ব। ‘সাইকো’তে খুব সংবেদনশীল করে এই পারস্পেক্টিভ হিচকক দেখিয়েছেন তা আগেই বলেছি, ‘শ্যাডো অব আ ডাউট’-এ সিরিয়াল কিলারের জবানিতেও তার দৃষ্টিকোণ খুব স্পষ্ট, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারীদের পাহাড়প্রতিম ধনের প্রতি ঘৃণা। ‘রিয়ার উইন্ডো’তে খিড়কির &dquote;&dquote;জানালায় দৃশ্যমান প্রতিটি ব্যক্তির আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে, রয়েছে ব্যক্তিক প্রাপ্তি-ঘৃণা-বেদনা-প্রেম, এমনকি এতে ফ্যাশনসর্বস্ব গ্রেস কেলিরও রয়েছে নিজস্ব ভাষ্য, প্রেফারেন্স। নায়কের ‘ভালনারেবিলিটি’ হিচককের খুব প্রিয়, সুকুমার আইভার নভেলো (‘দ্য লজার’) বা অ্যান্থনি পারকিন্সকে (‘সাইকো’) ব্যবহার করেছেন তিনি, ব্যবহার করেছেন দীর্ঘদেহী জিমি স্টুয়ার্টের মানসিক কোমলতা ও শারীরিক অপারঙ্গমতা (‘রিয়ার উইন্ডো’, ‘ভার্টিগো’)...এসব অসম্পূর্ণতা নায়ক চরিত্রগুলোকে এক রকমের স্পর্শের দূরত্বের মানুষ বানিয়ে তোলে, যেন পাশের গলির লোকটাই, তাতেই ভয়-ঘৃণা-গ্লানি-অস্বস্তি এসব এমন খোলে হিচককের হাতে। সাধারণ মানুষের ভেতরেই থাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলার মতো নিষ্ঠুর খুনি, থাকে শেষ করে দেয়ার উন্মাদনা; সেই অভিজ্ঞান কুঠার হাতে খুন করতে আসা জম্বির চেয়ে অনেক ভয়ানক। তার নির্মিত খুনি চরিত্ররা আমার-আপনার প্রতিদিনকার দেখা মানুষ, যেমন ‘ফ্রেঞ্জি’র সেই কভেন্ট গার্ডেনের ফলওয়ালা, ‘রিয়ার উইন্ডো’র সেই প্রতিবেশী লোকটা, ‘শ্যাডো অব আ ডাউট’-এর সেই আদরের ছোটমামা, ‘স্ট্রেঞ্জারস অন দ্য ট্রেন’-এর সেই সিগ্রেট চেপে একটি শিশুর হাতের বেলুন ফুটিয়ে দেয়া লোকটা, কিংবা মোটেলের সেই ফিনফিনে রুগ্ণ মিষ্টি লোকটা যার নাম নরম্যান বেটস (‘সাইকো’), কিংবা স্বামী (‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’, ‘সাসপিশন’, ‘রেবেকা’, ‘ভার্টিগো’, ‘রিয়ার উইন্ডো’)। মনে রাখতে হবে, হিচকক জন্মেছিলেন ১৮৯৯-এর পূর্ব লন্ডনের লেটনস্টোনে এক সবজি বিক্রেতা বাপের ঘরে, সাধারণ তার পরিপার্শ্ব, দৈনন্দিন জীবন নিস্তরঙ্গ, সম্পর্কগুলো একঘেয়ে, হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি খুন ছাড়া এই সামাজিক জীবনে তেমন বড় কিছু ঘটে না, ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ সেখানে পাবলিক হাউজগুলোকে সরগরম করে রাখে বছরের পর বছর। কে জানে, যারা এসব খুন নিয়ে মাতামাতি করে আনাজপাতি কিনে বাড়ি গিয়ে বিগতযৌবনা স্ত্রীর পাশে শুয়ে পড়ে তাদের জিঘাংসা কিংবা রিরংসার খবর? অতএব ব্যক্তির অন্তরালের একাধিক রূপের দ্বন্দ্বই ছিল তার গন্তব্য। হিচকক ছাড়া আর কে-ই বা ভাবতে পারতেন, ক্যারি গ্রান্টের মতো জোরালো-সারবান-পরম সুপুরুষ নায়কের সৌন্দর্যের সাথে একটা মিশেল আছে প্রবঞ্চকের-বাটপাড়ের-হন্তার-অবিমৃশ্যকারীর?&dquote;&dquote;

অল্প বয়েসে বক্সিং দেখতে যেতেন খুব, আর প্রচুর থিয়েটারে যেতেন হিচকক, মঞ্চনাটক তার ভালো লাগত, মঞ্চের নানা দিক তিনি ব্যবহার করেছেন সিনেমাতেও। সিনেমার প্রায় সমান বয়েসী হিচকক সিনেমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন চ্যাপলিন আর বাস্টার কিটনের মতো অগ্রদূতদের কাজ ভালোবেসে। পরে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট ফিল্মমেকারদের কাজ দিয়েও ভীষণ প্রভাবিত হয়েছেন হিচকক; টাইটেলমেকার থেকে স্ক্রিপ্টরাইটার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর থেকে ডিরেক্টর, এ যাত্রায় ফ্রিত্জ ল্যাংয়ের কাজ তার ওপর খুব প্রভাব বিস্তার করেছিল। হিচককের চলচ্চিত্রের আরেকটি দিক হচ্ছে তার সাহিত্য নিয়ে কাজ করার প্রবণতা, সাইলেন্ট মুভিগুলো থেকেই এ প্রবণতা বহাল ছিল হিচককের, নানান লেখকের উপন্যাস ও ছোট গল্প নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তবে এ সাহিত্যকে তিনি নিজের মতো করে ভিজুয়ালাইজ করে নিতেন, অসম্ভব ডিটেইলে তৈরি করতেন তার স্টোরিবোর্ড।

নিজের শারীরিক আকার ও কুশ্রিতা নিয়ে হিচককের বেদনা ছিল তীব্র। ক্যাথলিক স্কুলে যাওয়ার কারণে এক রকমের প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করত হিচককের ভেতর, এক রকমের চির-অপরাধীর মন-মানস গুঁজে দেয়া হয় তো এসব স্কুলে, তার সাথে যোগ হয় কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও তীব্র অবদমন। ওর সিনেমায় খুন-ধর্ষণ-ধর্ষকাম-যৌনতা-সন্দেহ-রক্তলোলুপতা-কুচক্রের এত আনাগোনার এ-ই হয়তো কারণ। ছয়টি একই রকম গাঢ় নীল স্যুট ছিল তার, ছাঁটের সামান্য হেরফের করা, যেন ওজন বাড়লে ঢাকা পড়ে। ছয়টি একই রকম জুতা, ১০ খানা একই রকম টাই, ১৫টি একই রকম মোজা ও অন্তর্বাস।&dquote;&dquote;

আসুন দেখা যাক ওর চলচ্চিত্রের নারী চরিত্রদের। ফ্রিত্জ ল্যাংয়ের উফা স্টুডিওতে কাজ করার সময় থেকেই হিচককের ব্লন্ডপ্রীতি সর্বজনজ্ঞাত, ওর নায়িকারা যেমন জ্যানেট লি, গ্রেস কেলি, টিপি হেনড্রেন, ইভা মারি সেন্ট ও কিম নোভাক এরা প্রত্যেকে ব্লন্ড। হিচককের তিনটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রের নায়িকা ইনগ্রিড বার্গম্যান ডার্ক ব্লন্ড, ডরিস ডের চুলও কালো নয় (অথচ পৃথিবীখ্যাত ব্লন্ড আইকন মেরিলিন মনরোকে নিয়ে হিচকক কোনো কাজ করেননি, ওর সোনালিচুলো হওয়ায় নাকি কোনো রহস্য নেই, কোনো লুকোছাপা নেই, গল্পের ঘনীভবন নেই।)। জ্যাক দ্য রিপারের চরিত্রাবলম্বনে তৈরি নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লজার’-এ হিচকক পর্দাজুড়ে আলোর নাচনে একটি লেখা জ্বলতে-নিভতে দেখান, ‘টুনাইট—গোল্ডেন কার্লস’, আজ রাতে—সোনালি কোঁকড়াচুলো (কাউকে)। প্রথম দিকে প্রতি মঙ্গলবার সোনালিচুলো মেয়েরা যখন মরছে, তখনো বিনোদনজগতের মেয়েরা দিব্যি সোনালি পরচুলা পরে একে অন্যকে ঠাট্টা করছে, পরের দিকে তারাই টুপি পরে নেয়ার আগে একথোকা কালো চুল পরচুলার মতো করে ক্লিপে এঁটে বের করে রাখছে টুপির বাইরে। ‘ভার্টিগো’য় জিমি স্টুয়ার্ট প্রেমিকার চুলের রঙ বদল করে পারঅক্সাইড ব্লন্ড করে আনছেন। হিচককের এসব ব্লন্ডের চরিত্র প্রায় একই রকম, এরা একটা হিমেল দূরত্ব বজায় রাখে, এদের প্রত্যেকের কাপড়চোপড় খুবই ফ্যাশনেবল (নিভু নিভু রঙের পেন্সিল স্কার্ট, খুর তোলা জুতা, আঁটসাঁট খাটো কোট, চুল ফ্রেঞ্চ নটে নিবদ্ধ, নিপুণ করে আঁকা ভ্রুপল্লব, হাতের দস্তানা-ব্যাগ ইত্যাদি আনুষঙ্গিকও অত্যন্ত ফ্যাশনেবল।) এবং এরা প্রায় প্রত্যেকেই পর্দায় অপমানের বা অভব্য আক্রমণের শিকার। মায়ের প্রেম, মায়ের চরিত্রহীনতা, বিবাহ সম্পর্কবহির্ভূত শিশু এসবের সাথে অশুভ কিছুর যোগ থাকার ইঙ্গিত আছে ‘সাইকো’, ‘মার্নি’ ও ‘দ্য বার্ডস’-এ। মায়ের সাথে বাজে সম্পর্ক বা অস্বাভাবিক গভীর সম্পর্কের চিত্রণ রয়েছে ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’, ‘ফ্রেঞ্জি’, ‘স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেন’, ‘নটোরিয়াস’ ও অবশ্যই ‘সাইকো’তে। ‘আন্ডার ক্যাপ্রিকর্ন’-এ নারী খুনি, ‘সাইকো’তে নারী চোর, ‘মার্নি’তে নারী ক্লেপ্টোম্যানিয়াক, ‘নটোরিয়াস’-এ নারী ভ্রষ্টা, ‘ভার্টিগো’ ও ‘টর্ন কার্টেন’-এ নারী ভয়াবহ খুনের সহায়তাকারী, এমনকি ‘ফ্রেঞ্জি’র সেই ইন্সপেক্টরের স্ত্রীও পার্শ্বচরিত্রে বুদ্ধিহীনতার প্রতিমূর্তি ও হাস্যরসের জোগানদার। ‘সাসপিশন’-এ ভালোবেসে স্ত্রীকে স্বামী ডাকে ‘মাংকিফেস’ বা &dquote;&dquote;বাঁদরমুখো, ‘নটোরিয়াস’-এ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রেমিক প্রায় বেচে দেয় প্রেমিকাকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায়ে এবং তাকে একজন নািসকে বিয়ে করতে বাধ্য করে। এমনকি ‘রিয়ার উইন্ডো’তেও যেখানে প্রেমিকা হুইলচেয়ারে বসা প্রেমিককে সর্বতোভাবে সহায়তা করার জন্য জীবন বিপন্ন করতে প্রস্তুত, সেখানেও প্রেমিকার অন্তঃসারশূন্যতা নিয়ে প্রেমিকের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ ব্যঙ্গস্তুতিময় ও ঘোরহীন। প্রেম-ভালোবাসা ও বিয়ে নিয়ে হিচককে এমন একটিও চিত্রণ নেই, যাতে উত্তল আয়নায় ধরা প্রতিবিম্বের মতো বিকার ধরেনি এবং যেখানে স্ত্রী চরিত্র মহিমময়।

আদি অ্যামিবা প্রথম তার শিকারটিকে ঘিরে ধরে, তারপর নিজের অংশ করে নিয়ে খেয়ে ফেলে, এ পদ্ধতির নাম ফ্যাগোসাইটোসিস, হিচকক খানিকটা তা-ই করতেন তার নায়িকাদের, তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসচেতনতার বেড়াজাল ভেঙে দিতেন এবং জোয়ারের মতো ঢুকে যেতেন আর ক্ষমতা ফলাতেন (যেমন কিম নোভাক স্বীকার করেছিলেন)। ইনগ্রিড বার্গম্যান একবার খুব তর্ক করছিলেন একটি দৃশ্যায়ন নিয়ে, অবশেষে হিচকক যখন কিছুতেই মানবেন না, তখন হাল ছেড়ে দিয়ে বার্গম্যান বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, আমি তোমার মতো করেই করব!’ হিচকক বলেছিলেন, ‘আমার মতো নয়, ওটাই ঠিকমতো!’ (ইটজ নট মাই ওয়ে ইনগ্রিড, ইটজ দ্য রাইট ওয়ে)। হাসতে হাসতে স্মৃতিচারণ করেছিলেন বার্গম্যান, যখন তিনি কিছুতেই কোনো একটি চরিত্রের মুখে হিচককের ইচ্ছা অনুযায়ী মনোভাব ফুটিয়ে তুলতে পারতেন না, তখন হিচকক বলতেন ‘ফেক ইট’, অর্থাৎ মন থেকে করতে হবে না, ভাণ করো। টিপি হেনড্রেন, হিচককের ‘দ্য বার্ডস’ ও ‘মার্নি’র নায়িকা বলতেন হিচকক নিজেই আসলে সাইকো। শোনা যায়, হিচকক ভালোবেসে ফেলেছিলেন ইনগ্রিড বার্গম্যানকে, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যাত হন, ‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’-এ আরেক প্রিয় নারী গ্রেস কেলিকে তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই মারধরের দৃশ্যে জখম হতে দেন, পরবর্তী সময়ে হিচকক টিপি হেনড্রেনকে সিনেমায় পাখির ঠোকর খেতে এমন বাধ্য করেছিলেন যে কুলোকে বলে সেটা হিচককেরই অচরিতার্থ বাসনা আর রিরংসারই স্বরূপ। ‘দ্য বার্ডস’-এর পাখিগুলো প্লাস্টিকের হবে বলে আশ্বস্ত করে হেনড্রেনকে বাধ্য করেছিলেন সত্যিকারের দাঁড়কাকের সাথে অভিনয় করতে, এমনকি পাখিগুলোর কোনো কোনোটি হেনড্রেনের সাথে ইলাস্টিক দিয়ে বাঁধা ছিল দৃশ্যায়নের সময় এবং এদের কোনোটি হেনড্রেনের চোখে ঠোকর দেয়। হেনড্রেনকে একেবারে অপরিচিতির অন্ধকার থেকে তুলে এনেছিলেন হিচকক, ফলে দাবিদাওয়াটাও ছিল বেশ তীব্র, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর মতো বিখ্যাত পরিচালকের সাথে কাজ করতে দেননি হেনড্রেনকে। ‘রেবেকা’ তৈরি করার সময় জোন ফন্টেইনের ক্যারিয়ারের বেশ নাজুক দশা, হিচকক সেটে ফন্টেইনের সে সময়ের আত্মবিশ্বাসহীনতাকে আরো উসকে দিতেন আর বলতেন, সেটের কেউ ফন্টেইনকে সইতে পারে না শুধু রেবেকার চরিত্রের উদ্ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসহীনতাকে পর্দায় নিয়ে আসার জন্যে। যৌন উসকানিমূলক কুিসত চুটকি বলতেন হিচকক, একেবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দৃশ্যের দৃশ্যায়নের শুরুতেই, নায়িকার কানে কানে। মানুষ ও মানবিকতা একসময় বড় মাপের শিল্পীর কাছে গৌণ হয়ে পড়তে পারে, হিচককও তার &dquote;&dquote;ব্যতিক্রম নন (অবশ্য সাধারণ মাপের শিল্পীর কাছেও যে মানুষ আর মানবিকতা গৌণ হয়ে পড়ে, যেমন হিটলার, তাই বা অস্বীকার করি কী করে!)। আলমা, হিচককের লালচুলো স্ত্রী, হিচককের সাধনসঙ্গিনী স্ত্রী, স্বামীর ব্লন্ড নায়িকাবিষয়ক এসব অবসেশন এবং ফেটিশ খুব ভালো করেই জানতেন, কিন্তু আশ্চর্য নৈঃশব্দে তিনি কেবল কাজ করে গেছেন, ফল ভোগ করবেন কিনা তাতে দৃকপাত না করে, নায়িকা চরিত্রের মেয়েটি নির্যাতিত হচ্ছে কিনা সেদিকে দৃকপাত না করে, স্বামী নিজের যৌনতাহীন বিবাহ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে বেড়াচ্ছে, সেদিকেও দৃকপাত না করে।

অভিনেতা-অভিনেত্রীরা হচ্ছে একপাল গবাদি পশু—বলেছিলেন হিচকক। যেমন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভালোবাসতেন তিনি, তেমনি কট্টর ছিলেন তার ‘মাই ওয়ে’র বেলায়। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছিলেন ‘লোকলক্ষ্মী’, আমরা যাদের বলি ‘পাবলিক’, সিনেমার বেলায় যাদের নাম দর্শক বা অডিয়েন্স, তা-ই ছিল হিচককের মূল চিন্তাসূত্র, ঘটনার পরম্পরায় লোকে এ সময় কী দেখতে চাইবে, লোকে এখন কী ভাববে। অথচ একই সাথে হিচকক ফিল্ম বানানোর সময় একেবারেই চিন্তা করতেন না তার ফিল্ম লোকে নেবে কি নেবে না (বা বলা ভালো, খাবে কি খাবে না), নিজের যেমনটি চাই যেভাবে চাই, সেভাবেই তিনি ফিল্ম তৈরি করতেন। ইহজীবনে তিনি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পাননি, অত অসম্ভব দর্শকপ্রীতি পাওয়ার পরও পুরস্কারের প্রসঙ্গ এলেই সাসপেন্সধর্মী সিনেমায় যথেষ্ট গভীর জীবনবোধ থাকে না, এমন একটি বালখিল্য কারণে সেগুলো খারিজ হয়ে যায়। তাতে অবশ্য সিনেমার রাজ্যে হিচককের নামের ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটে না, লোকলক্ষ্মীর কৃপাও জোটে তাঁর কপালে, একই সঙ্গে জোটে ভীষণভাবে ব্যক্তিগত ছাপ তৈরি করার বিরল ভাগ্য।&dquote;&dquote;

হিচককের সিনেমার আরেকটি বৈশিষ্ট্য তাতে হিচককের নিজের ক্যামিয়ো অ্যাপিয়ারেন্স। তার ৫২টি ছবির ভেতরে ৩৯টিতে তিনি সামান্য সময়ের জন্য অবতীর্ণ হতেন, অবশ্যই নির্বাক একচিলতে পার্শ্বচরিত্রে, সেটা হতে পারে বাসে ওঠার সময় বা পাতালরেলের দৃশ্যে, ফোনবুথের সামনে, ভিড়ের জনসমাগমে, উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, এমনকি একবার খবরের কাগজের ছবিতে (‘লাইফবোট’-এ) কিংবা নারীর চরিত্রে (‘স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেন’)। খুব কম পরিচালক এমন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যিনি নিজেই তাঁর সিনেমার সমান জনপ্রিয় ও রহস্যময় এবং তুমুল জনপ্রিয়। এ যেন দর্শকের সাথে এক রকমের সাপলুডু খেলা, দর্শক অপেক্ষায় থাকত কখন ধাঁধার সমাধানের সামান্য সুতোর মতো হিচকক ধরা দেবেন পর্দায়, কিংবা এ যেন শুধুই বিপুল ক্ষমতাধর এক শিল্পীর আপন ক্যানভাসের অন্তিমে একটুখানি করে তুলিতে আঁকা স্বাক্ষর।

হিচককের সিনেমায় নারীর চরিত্রায়ণ নিয়ে গবেষণা চলছে এবং চলবে, ওর সিনেমায় কালোদের চরিত্র নিয়েও আলাদা লেখা হতে পারে, লেখা হতে পারে হিচককের বেড়ে ওঠার অজস্র উপাদান ও তার রসায়ন—যৌগ নির্মাণকে নিয়ে, হিচককের সিনেমায় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে, ট্রেনের ভূমিকা নিয়ে, সর্বজাতি সমন্বয় ও তার অন্তর্গত খেলা নিয়ে, সিনেমায় ল্যান্ডমার্কের (যেমন মাউন্ট রাশমোর, স্ট্যাচু অব লিবার্টি) ব্যবহার নিয়ে, সিনেমায় সুররিয়ালিজম নিয়ে, এই সামান্য পরিসরের পানপাত্রে তার কীর্তিকে পরিবেশন করা যায় না। আবার কখনো, নিশ্চয়।