[জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞ নিয়ে সাদাত হাসান মান্টোর লেখা গল্প। মূল উর্দু থেকে রাখসান্দা জলিলের করা ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব]

শোনো ভাই, এটা ছিল ১৯১৯ সালের সেই দিনগুলো— রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে তখন পাঞ্জাবজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আমি বলছি অমৃতসরের কথা। ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া রুলের দোহাই দিয়ে স্যার মাইকেল ও’ডয়ার মহাত্মা গান্ধীর পাঞ্জাবে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। গান্ধীজিকে পথিমধ্যে পালওয়ালের কাছে আটকে দেয়া হয়েছিল এবং তাকে গ্রেফতার করে বোম্বাইতে ফেরত পাঠানো হয়। আমি যতদূর বুঝি, ইংরেজরা এই মারাত্মক ভুলটা না করলে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞ কখনো ঘটত না; এটা ভারতে ইংরেজ শাসনের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়।

হিন্দু, মুসলিম কিংবা শিখ—সবাই গান্ধীজিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করত। সবাই তাকে ‘মহাত্মা’, একজন মহান পুরুষ, সত্যিকার পরিণত আত্মা বলে বিবেচনা করত। তার গ্রেফতার হওয়ার খবর যখন লাহোরে পৌঁছল, তখন সবকিছু যেন মন্ত্রবলে থেমে গিয়েছিল। অমৃতসরের মানুষ যখন তার গ্রেফতারের খবর পেল, তখন আঙুলের তুড়ি বাজার সময়ের মধ্যে তাদের সর্বাত্মক অবরোধ শহরকে পঙ্গু করে দিল।

শোনা যায়, ৯ এপ্রিল সন্ধ্যা নাগাদ ড. সত্য পাল ও ড. কিচলুকে জেলা থেকে বহিষ্কারের আদেশ ডেপুটি কমিশনারের দপ্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি এ আদেশ পালনে আগ্রহী ছিলেন না। কারণ তার মনে হয়েছিল, অমৃতসরে দাঙ্গা কিংবা কোনো গোলযোগ হওয়ার আশঙ্কা নেই।

মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, কোথাও কোনো সহিংসতার লক্ষণ ছিল না। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, সেটাই বলছি তোমাকে।

৯ এপ্রিল ছিল রামনবমীর উৎসব। সবসময়ের মতো একটা শোভাযাত্রা বের হয়েছিল। কিন্তু কোথাও কেউ প্রশাসনের ইচ্ছার বাইরে কিছু করেনি। কিন্তু কথা হলো, স্যার মাইকেল ছিলেন একজন উন্মাদ। তিনি ডেপুটি কমিশনারের কথা শুনতে অস্বীকৃতি জানান। তার বিশ্বাস ছিল, সেদিনের রাজনৈতিক নেতারা মহাত্মার নির্দেশে ব্রিটিশরাজের শাসনকে উত্খাত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। আর এই নেতারাই সব ধর্মঘট ও শোভাযাত্রার পেছনে বিরাট ষড়যন্ত্র করছিলেন। ড. সত্য পাল ও ড. কিচলুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন এ খবর শুনে মর্মপীড়ায় ভুগছিল। আতঙ্কিত মানুষের মনে আশঙ্কা ছিল— যেকোনো সময় ভয়ানক কিছু ঘটবে। কিন্তু কথা হলো, কোনো কিছুই তাদের প্রতিবাদকে টলাতে পারেনি। দোকানগুলো বন্ধ ছিল, শহরটাকে মনে হচ্ছিল গোরস্তান। কিন্তু গোরস্তানের এই নিস্তব্ধতায় হঠাৎ বিরাট শোরগোল উঠেছিল। ড. সত্য পাল ও ড. কিচলুর গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজারো মানুষ এক জায়গায় জমায়েত হতে শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একত্র হয়ে ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করা এবং তাদের প্রিয় নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা বাতিল করার দাবি জানানো। কিন্তু সেটা দাবি গ্রহণের জন্য উপযুক্ত সময় ছিল না। স্যার মাইকেলের মতো একজন একনায়ক তখন সেখানকার শাসক। দাবি মানা তো দূরের কথা, মাইকেল ঘোষণা করলেন, মানুষের সেই জমায়েত অসাংবিধানিক ও অবৈধ!

অমৃতসর—এই শহর একসময় ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কেন্দ্র। এ শহর একসময় গর্বের সঙ্গে জালিয়ানওয়ালাবাগের জন্ম দিয়েছিল, এই ক্ষতকে সে তার বুকে মেডালের মতো ধারণ করেছিল, আর সেই শহরের আজকের অবস্থা দেখ! যা-ই হোক, এসব কথা বাদ দিই। এসব আমাকে কষ্ট দেয়। মানুষ বলে, এই পবিত্র শহরে পাঁচ বছর আগে যা ঘটেছিল, তার জন্য দায়ী ইংরেজরা। হয়তো তাই, কিন্তু আমাকে যদি সত্যটা জিজ্ঞেস করা হয় তাহলে আমি বলব, এখানে যে রক্ত ঝরেছিল আমাদের নিজের হাতই তাতে রক্তস্নাত, কলঙ্কিত। যা হোক, সেসব কথা বাদ দিই।

ডেপুটি কমিশনারের বাংলো ছিল সিভিল লাইনে। শহরের এই বিশেষ অংশে সব বড় কর্মকর্তা ও তাদের চাটুকাররা বাস করত। কখনো অমৃতসর শহরে গেলে নিশ্চয়ই দেখেছ যে শহর ও সিভিল লাইনের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে একটা সেতু। শহরের অভিজাতদের তৈরি করা বিচ্ছিন্ন স্বর্গে পৌঁছতে এই সেতু অতিক্রম করতে হবে, এখানে তারা দুনিয়াতেই তাদের স্বর্গ তৈরি করে ফেলেছে।

জমায়েত যখন সিটি হলের ফটকের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তারা দেখল, ঘোড়ায় চড়ে সেতু পাহারা দিচ্ছে কয়েকজন গোরা সেনা। কিন্তু মানুষ থামল না। আমিও সেই মিছিলে ছিলাম। সবার বুকে যে কী আগুন জ্বলছিল, তা আমি বর্ণনা করতে পারব না। তার পরও সবাই ছিল নিরস্ত্র; তাদের হাতে এমনকি একটা লাঠিও ছিল না। তারা তাদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল একটা সরল ইচ্ছা নিয়ে, আর সেটা হলো কমিশনারকে গিয়ে অনুরোধ করা যেন ড. সত্য পাল ও ড. কিচলুকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়া হয়। ভিড় না থেমে সেতুর দিকে এগিয়ে গেল। শ্বেতাঙ্গ সেনারা গুলি ছুড়ল। এতে অনেকে পদদলিত হন। সেনাদের সংখ্যা ২০-এর বেশি ছিল না। আর ভিড় ছুটেছিল হাজারো মানুষের। একটা গুলি কী আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, সেটা কল্পনাও করা যায় না। গুলির পর যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেটা বিশ্বাস করতে নিজের চোখে দেখতে হবে! কারো গায়ে বিঁধল গুলি, আবার কেউ পদদলিত হয়ে আহত হলো।

বাঁ দিক দিয়ে বয়ে গিয়েছিল নোংরা পানির একটা ড্রেন। ভিড়ের ধাক্কা খেয়ে আমি সেই ড্রেনে পড়ে গিয়েছিলাম। গুলির বৃষ্টি থেমে গেলে আমি ড্রেন থেকে মাথা তুললাম এবং দেখলাম ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। আহতরা রাস্তায় পড়ে আছে, আর গোরা সেনারা দাঁড়িয়ে হাসছে কিংবা কৌতুক করছে। সে সময় আমার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল তা কোনোভাবেই বোঝাতে পারব না। মনে হয় তখন আমার পুরোপুরি হুঁশ ছিল না। আমি যখন ড্রেনে পড়ে গিয়েছিলাম, তখন চারপাশের সবকিছু সম্পর্কে আমার পুরোপুরি সচেতনতা ছিল না। বের হয়ে আসার পর ধীরে, খুব ধীরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, সেগুলো আমার সামনে পরিষ্কার হতে শুরু করল।

একটু দূরে আমি চিত্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। যদিও অনেক মানুষ একসঙ্গে খুব উচ্চৈঃস্বরে, রাগত স্বরে কথা বলছিল। আমি ড্রেনটা পার হলাম, পবিত্র জাহিরার কবরকে পাশ কাটিয়ে টাউন হলের ফটকে পৌঁছলাম। সেখানে দেখি ৩০-৪০ জন উত্তেজিত তরুণ ফটকের দিকে পাথর ছুড়ছে। ফটকের শার্সির কাচ ভেঙে যখন রাস্তায় পড়ল, তখন এক তরুণ আরেকজনকে বলল, ‘চল গিয়ে রানীর মূর্তিটা ভেঙে দিই।’

আরেকজন বলল, ‘না, না, চল গিয়ে কোতোয়ালি জ্বালিয়ে দিই।’ তৃতীয় একজন বলল, ‘সবগুলো ব্যাংকও পুড়িয়ে দিতে হবে!’ চতুর্থজন বলল, ‘একটু থামো! এসব করে কী লাভ হবে? তার চেয়ে চলো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গোরা সেনাগুলোকে খতম করি।’

চতুর্থজনকে আমি চিনতে পেরেছিলাম, সে ছিল থাইলা কাঞ্জার। তার আসল নাম হলো মোহাম্মদ তোফায়েল, কিন্তু সবাই তাকে থাইলা কাঞ্জার নামে চেনে। সে জন্মেছিল এক বারবনিতার গর্ভে। সে নিজে ছিল এক অপদার্থ!&dquote;&dquote;

অল্প বয়সেই সে মদ খাওয়া আর জুয়া খেলা শুরু করেছিল। তার ছিল দুই বোন—শামশাদ ও আলমাস—এরা ছিল তাদের সময়ের সবচেয়ে সুন্দরী বারবনিতা। শামশাদ খুব ভালো গাইতেও পারত। ধনীরা দল বেঁধে বহু মাইল দূর থেকে তার গান শুনতে আসত। বোনরা তাদের ভাইয়ের অকর্মণ্যতা নিয়ে হতাশ ছিল। শহরের সবাই জানে, বোনেরা তাদের ভাইকে পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু কীভাবে যেন সে বোনদের কাছ থেকে চলার জন্য অনেক টাকাপয়সা আদায় করে নিয়েছে। সে শুধু সাধারণ খরচাপাতি করত তাই নয়, তার খানাপিনা দুটোই খুব ভালো ছিল। সে শহরে ড্যান্ডি বলে পরিচিত ছিল। সে ছিল গুলবাজ, গপ্পোবাজ। সে জানত কীভাবে বানিয়ে বানিয়ে, রঙ চড়িয়ে গল্প বলতে হয়; সে ভালো কৌতুকও করতে পারত।

উত্তেজিত তরুণরা তার কথায় কান না দিয়ে সোজা রানীর মূর্তির দিকে এগিয়ে গেল। থাইলা কাঞ্জার আবার বলল, ‘তোমাদের লক্ষ্য থেকে সরে যেয়ো না। আমার সঙ্গে চলো। চলো গিয়ে ওই গোরাদের খতম করি। ওরা আমাদের নির্দোষ মানুষের জীবন নিয়েছে, তাদের আহত করেছে। আল্লাহর কসম, চাইলে আমরা ওদের ঘাড় মটকে দিতে পারি। চলো! আমার সঙ্গে চলো!’

অনেক তরুণ এর মধ্যেই সরে গিয়েছিল, অন্যরা দাঁড়িয়ে পড়ল। থাইলা সেতুর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে তারা তার পিছু নিল। আমি এ দৃশ্য দেখে নিজেকে বললাম, এই দুর্ভাগা তরুণরা কেন নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে হাঁটছে? আমি একটা ফোয়ারার পাশে লুকিয়ে ছিলাম। থাইলাকে ডেকে বললাম, ‘যেয়ো না। তুমি কেন নিজেকে আর এই নিরীহ ছেলেগুলোকে মারার ব্যবস্থা করছ?’

আমার কথা শুনে থাইলা এক অদ্ভুত হাসি হাসল। সে বলল, ‘থাইলা শুধু এটা দেখাতে চায় যে সে গুলিকে ভয় পায় না।’ তারপর সে ভিড়ের দিকে ফিরে বলল, ‘কেউ ভয় পেলে ফিরে যেতে পারো।’

এ রকম সময় কেউ কি পেছনে ফিরতে পারে? তার ওপর যখন তাদের নেতৃত্ব দেয়া মানুষটি চরম বিপদের দিকে নিঃশঙ্কচিত্তে হেঁটে যাচ্ছে!

থাইলা তার চলার গতি বাড়িয়ে দিলে অনুসরণকারীদের তা করতে হলো।

টাউন হলের ফটক থেকে সেতুর দূরত্ব বেশি না। ৬০-৭০ গজের বেশি হবে না। থাইলা দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সেতুর উভয় পাশের রেলিং থেকে ১৫-২০ কদম দূরে দুজন অশ্বারোহী শ্বেতাঙ্গ সেনা দাঁড়িয়ে ছিল। থাইলা স্লোগান দিয়ে সেতুর মুখের কাছে পৌঁছে যেতে যেতে সেনারা গুলি ছুড়ল। আমি ভেবেছিলাম, সে তখনই পড়ে গেছে, কিন্তু তাকিয়ে দেখলাম, থাইলা বেঁচে আছে এবং তখনো হাঁটছে। তার সঙ্গীরা অবশ্য ততক্ষণে পালিয়ে গেছে। সে পেছনে ফিরে চিত্কার করে উঠল, ‘পালিয়ে যেয়ো না! আমার সঙ্গে চলো!’ সে ফিরে আমার দিকে তাকাল। ঠিক তখন আরেকটা গুলির শব্দ হলো। সে গোরা সেনাদের দিকে ফিরে তাকাল, তার হাতগুলো তার পিঠের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরল। আমার এ রকম কিছু দেখা উচিত হয়নি, কিন্তু আমি বলতে পারি, আমি তার সাদা শার্টটি রক্তে ভিজে যেতে দেখলাম। সে আহত সিংহের মতো ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গেল। আরেকটা গুলির শব্দ ধ্বনিত হলো। তার শরীর টলমল করে উঠল, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ়পায়ে এক অশ্বারোহীর দিকে এগিয়ে গেল। চোখের পলকে ঘোড়ার পিঠ খালি হয়ে গেল। শ্বেতাঙ্গ সেনা মাটিতে পড়ে গেছে এবং থাইলা তার ওপর চড়ে বসেছে। কাছেই অরেকটি ঘোড়ায় আরেক শ্বেতাঙ্গ সেনা ছিল, তার ঘোড়াটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, সওয়ারি তার প্রাথমিক ঘোর কাটিয়ে উঠেই এক ঝাঁক গুলি ছুড়ল। তারপর কী হয়েছিল আমার আর মনে নেই। আমি অজ্ঞান হয়ে ফোয়ারার পাশে পড়ে গিয়েছিলাম।

জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি আমার বাসায়। কয়েকজন পথচারী আমাকে চিনতে পেরে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। তারা পরবর্তী সময়ে আমাকে বলেছিল, সেতুর ওপর গোলাগুলি জনতাকে উত্তেজিত করে দিয়েছিল। ফলে তারা রানীর মূর্তিটা ধ্বংস করে দিয়েছিল। টাউন হল ও তিনটি ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। পাঁচ-ছয় জন ইউরোপীয়কে হত্যা করা হয়। আরো চলে লুটপাট, চরম বিশৃঙ্খলা।

ইংরেজ কর্মকর্তারা এ লুটপাট কিংবা অগ্নিসংযোগ নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন ছিল না। এই পাঁচ-ছয় জন ইউরোপীয়কে হত্যার প্রতিশোধ নিতেই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। ডেপুটি কমিশনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব জেনারেল ডায়ারের হাতে তুলে দেন। ১২ এপ্রিল জেনারেল ডায়ার শহরের বাজার ও সড়ক দিয়ে মার্চ করেন। তার নির্দেশে অনেক নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ এপ্রিল প্রায় ২৫ হাজার মানুষ জালিয়ানওয়ালাবাগে জড়ো হয়েছিল। সশস্ত্র গোর্খা ও শিখ সেনাদের নিয়ে জেনারেল ডায়ার সেখানে পৌঁছেন। তারপর নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। সেদিন কত মানুষ জালিয়ানওয়ালাবাগে মারা গিয়েছিল, তা তত্ক্ষণাৎ কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংঘটিত তদন্তে পাওয়া যায় যে সেদিন এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল এবং তিন-চার হাজার মানুষ আহত হয়েছিল। যা হোক, আমি থাইলার ব্যাপারে বলছিলাম। নিজের চোখে যা দেখেছি সেটাই বলছিলাম। একমাত্র ঈশ্বরই দোষহীন ও পবিত্র। নিহতরা সবাই শরিয়াতে নিষিদ্ধ চারটি পাপ করেছিল। হতে পারে থাইলার জন্ম এক বেশ্যার গর্ভে, কিন্তু সে একজন সাহসী মানুষ ছিল।

আমি নিশ্চিতভাবে তোমাকে বলতে পারি যে গোরা সেনাদের ছোড়া প্রথম গুলিটা থাইলার শরীরে বিঁধেছিল। সে যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গীদের তাকে অনুসরণের জন্য আর্জি জানাচ্ছিল, তখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতির উত্তেজনায় সে টেরই পায়নি যে উত্তপ্ত সিসা এরই মধ্যে তার বক্ষ ভেদ করে গেছে।

দ্বিতীয় গুলিটা লেগেছিল তার পিঠে আর তৃতীয়টা বুকে। বিষয়টা আমি চোখে দেখিনি, তবে শুনেছি যে থাইলার মরদেহ যখন গোরা সেনার ওপর থেকে সরানো হচ্ছিল, তখন দেখা গিয়েছিল তার হাত সেই মৃত সেনার ঘাড় চেপে ধরে আছে এবং তাদের মরদেহগুলো আলাদা করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

পরদিন থাইলার মরদেহ দাফন করার জন্য তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলো, দেখা গেল তার মরদেহ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে। অন্য যে গোরা সেনা সেদিন উপস্থিত ছিল, সে তার পুরো কার্তুজ থাইলার ওপর খরচ করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে থাইলার আত্মা তার দেহ ছেড়ে চলে গেছে; গোরা সেনা কেবল একটা মরদেহের ওপর লক্ষ্যভেদের অনুশীলন করছিল।

আমি শুনেছি থাইলার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর প্রতিবেশীদের ঘর থেকে বিলাপের সুর ভেসে আসছিল। থাইলা যে তার প্রতিবেশীদের কাছে প্রিয় ছিল এমনটা নয়; কিন্তু তার কিমা হয়ে যাওয়া মরদেহ দেখে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরাও শিশুর মতো কাঁদছিল। থাইলাকে কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার পর তার বোন শামশাদ ও আলমাস অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল; দুই বোনের কান্না ও হাহাকার উপস্থিত শোকার্তদের চোখ থেকে রক্তের অশ্রু ঝরাচ্ছিল।

ভাই, একবার আমি কোথাও পড়েছিলাম যে ফরাসি বিপ্লবের সময় ছোড়া প্রথম গুলিটি এক বেশ্যার জীবন হরণ করেছিল। মরহুম মোহাম্মদ তোফায়েল ছিল এক বেশ্যার পুত্র। বিপ্লব করার এ প্রচেষ্টায় কেউ খুঁজতে যায়নি প্রথম, দশম কিংবা পঞ্চাশতম—কোন গুলিতে থাইলা নিহত হয়েছিল। খুব সম্ভবত এর কারণ হলো, থাইলার কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না। আমার মনে হয়, সেদিনের রক্তস্নানে যারা খুন হয়েছিল, তাদের নামের তালিকায়ও থাইলা কাঞ্জারের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য এ রকম কোনো তালিকা আদৌ করা হয়েছে কিনা, সেটা কেউ জানে না।

সেগুলো ছিল বিক্ষোভের দিন। সেনাবাহিনীই সবকিছু শাসন করছিল। মার্শাল ল নামের মানুষখেকো এক দানব শহরের রাস্তা ও অলিগলিগুলোয় গর্জন করে বেড়াচ্ছিল। সেই অরাজক পরিস্থিতিতে বেচারা থাইলাকে অভব্য তাড়াহুড়ায় কবর দেয়া হয়েছিল। কারণ তার মৃত্যু স্বজনদের জন্য চরম লজ্জা বয়ে এনেছিল এবং তাই তারা তত্ক্ষণাৎ থাইলার সব চিহ্ন মুছে দিতে চাইছিল।

‘এবং ভাই, থাইলা মারা গিয়েছিল। তাকে কবর দেয়া হয়েছিল...এবং...এবং...’ থাইলার গল্প শুরু করার পর আমার সঙ্গী প্রথমবারের মতো নীরব হয়ে গেল। ট্রেন চলতে লাগল। রেললাইন গাইতে শুরু করল, ‘থাইলা মারা গেছে...থাইলাকে কবর দেয়া হয়েছে।’ তার মৃত্যু এবং কবরস্থ হওয়ার মধ্যে কোনো বিরতি, কোনো ফাঁক, কোনো দূরত্ব নেই। ব্যাপারটা ছিল এমন যে, সে প্রথম মিনিটে মারা গেল এবং দ্বিতীয় মিনিটে তাকে কবরস্থ করা হলো। ঘড়ঘড় শব্দ করা রেললাইন আর সেই শব্দগুলোর ছন্দময় ধ্বনি এমন বেপরোয়া এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল যে আমি মনকে সেই ছকে বাঁধা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার সফরসঙ্গীর দিকে ফিরে বললাম, ‘থেমে যাওয়ার আগে তুমি যেন কী বলতে চাইছিলে?’

চমকে সে আমার দিকে ঘুরে মুখোমুখি হলো। সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, সত্যি বলতে এ গল্পের একটা করুণ অংশ এখনো বলা বাকি আছে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী?’

সে বলতে শুরু করল, ‘যেমনটা তোমাকে বলেছি, থাইলার ছিল দুই বোন—শামশাদ ও আলমাস—তারা দুজনই পরীর মতো সুন্দরী ছিল। শামশাদ ছিল লম্বা, তন্বী গড়নের এবং তার চোখগুলো ছিল বড় বড়। সে ঠুমরি খুব ভালো গাইত। শোনা যায়, সে খান সাহেব ফতেহ আলী খানের কাছে শিক্ষা নিয়েছিল। আর আলমাস গাইতে না পারলেও নাচে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সে সময় ছিল না। সে যখন নাচত তখন মনে হতো তার শরীরের প্রতিটা অণুু-পরমাণু জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার অঙ্গের প্রতিটি ভঙ্গি যেন কথা বলত। তার চোখে ছিল জাদু, তাকালে তুমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতে, তোমার চেতনা লোপ পেত।’

আমার সেই সঙ্গী দুই বোনের প্রশংসায় মশগুল হয়ে রইল, তার পরও আমার মনে হলো তাকে থামিয়ে দেয়া উচিত হবে না। শেষমেশ তার প্রশংসাবাণ শেষ হলো, সে গল্পের করুণ অংশটিতে এসে পড়ল। ‘তারপর হলো কি ভাই, কিছু চাটুকার গিয়ে ইংরেজ কর্মকর্তাদের এই সুন্দরী দুই বোনের কথা জানাল। সেই দাঙ্গার সময় এক ইংরেজ নারীও নিহত হয়েছিলেন...কী যেন সেই ডাইনির নাম?...মিস...মিস শেরউড! তাই সিদ্ধান্ত হলো, দুই বোনকে ডেকে পাঠানো হবে এবং পর্যাপ্ত প্রতিশোধ নেয়া হবে। তুমি কি ভাই বুঝতে পারছ কীভাবে, বুঝতে পারছ?’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, পারছি।’

আমার সঙ্গী এক দীর্ঘ, গভীর শ্বাস টানল। ‘বেশ্যারাও তো শেষমেশ মা এবং বোন। কিন্তু ভাই আমার মনে হয়, আমাদের দেশের মানুষ সব লজ্জার মাথা খেয়েছে। উপরওয়ালারা নির্দেশ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানেদার নিজেই রাজি হয়ে গেল দুই বোনকে ডেকে আনতে। সে দুই বোনের বাড়িতে গিয়ে বলল যে ইংরেজ সাহেবরা তাদের নাচ-গান উপভোগ করতে চান। তাদের ভাইয়ের কবরের মাটি তখনো তাজা। এ নির্দেশ যখন এসেছিল তখন তাদের ভাইয়ের মৃত্যুর মাত্র দুদিন হয়েছে: চল! চল, আমাদের সামনে নাচ! কাউকে আঘাত করার জন্য এর চেয়ে ভয়ানক আর কিছু হতে পারে কি? আমার ধারণা নিষ্ঠুরতার এমন ঘটনা আর হতে পারে না। এ নির্দেশনা যারা জারি করেছিল, তাদের এ বিবেচনাবোধ ছিল না যে বেশ্যাদের কিছু আত্মমর্যাদা থাকতে পারে। হ্যাঁ, তাদেরও আত্মমর্যাদা আছে, নেই কি?’ তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেও প্রশ্নটা নিজেকেই করছিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বোনেরা কি গিয়েছিল?’

আমার সঙ্গী কিছুক্ষণ পর দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে জবাব দিল। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারা সেজেগুজে খুন হতে গিয়েছিল।’ হঠাৎ করে তার বেদনা কিছুটা কৌতুকের রূপ নিল। ‘তারা বেশ সেজেগুজে গিয়েছিল। মানুষ বলে, এটা মনে হচ্ছিল একটা উৎসব। বোনেরা বেশ উত্ফুল্ল ছিল। তারা তাদের সেরা পোশাকটা পরেছিল এবং তাদের রূপকথার রাজকন্যাদের মতো দেখাচ্ছিল। পানির মতো মদের ফোয়ারা ছুটেছিল। মানুষ বলে, রাত ২টার দিকে এক সিনিয়র কমকর্তা ইশারা করে এবং তারপর উৎসব-উল্লাসের সমাপ্তি ঘটল।’ মানুষটা উঠে দাঁড়ালেন এবং জানালার ওপাশে ছুটে যাওয়া গাছগুলোকে দেখতে শুরু করলেন।

তার বলা শেষ দুটো শব্দ রেলগাড়ির চাকার দুলুনির সঙ্গে নৃত্য করতে লাগল: ‘সমাপ্তি ঘটল, সমাপ্তি ঘটল, সমাপ্তি ঘটল।’ আমার মাথার মধ্যে গর্জন করতে থাকা শব্দগুলোকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দিতে চেষ্টা করছিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী ঘটল?’

ধাবমান গাছ আর খুঁটিগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে পরিষ্কার এবং দৃঢ়ভাবে বলল, ‘বোনদ্বয় নিজেরাই তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলল। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ইংরেজ কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে তারা বলে উঠল, ‘আমরা থাইলার বোন—আমরা সেই শহীদের বোন, যাকে তোমরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছ শুধু এ কারণে যে, তার আত্মা তার দেশকে ভালোবাসত। আমরা তার সুন্দরী বোন। এস তোমাদের কামনার তপ্ত সিসা দিয়ে আমাদের ঝাঁঝরা করে দাও। কিন্তু তার আগে তোমাদের মুখে একবার থুথু ছুড়তে চাই—শুধু একবার!’

এটুকু বলে মানুষটা চুপ করে গেল, এমনভাবে যেন জীবনে আর কখনো কথা বলবে না। আমি তত্ক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হলো?’

তার চোখে পানি চলে এসেছিল। সে বলল, ‘দুই বোনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

আমি কিছু বললাম না। এক স্টেশনে ট্রেনটা থামল। সে তার মালপত্র বহনের জন্য এক কুলিকে ডাকল। সে যখন চলে যাচ্ছে তখন আমি বললাম, ‘আমার সন্দেহ হয় তুমি গল্পের শেষটা নিজের মতো করে নির্মাণ করছে।’

চমকে উঠে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘তুমি কীভাবে বুঝলে?’

আমি বললাম, ‘তোমার কণ্ঠে তীব্র সন্তাপ টের পেয়েছি।’

থুথুর সঙ্গে মুখের মধ্যে জমে থাকা তিক্ততাকে গিলে নিয়ে সে বলল, ‘হ্যাঁ সেই দুশ্চরিত্রাগুলো...’ এটুকু বলে সে নিজের ঠোঁটে চলে আসা বাজে কথাগুলোকে সামলে নিল। ‘তারা তাদের শহীদ ভাইয়ের নাম অপবিত্র করেছে,’ এটুকু বলে সে ট্রেন থেকে নেমে গেল।