ফিলিস্তিনের প্রাচীন নগরী গাজা। জনবহুল অঞ্চলটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীতে এখানে বসতি স্থাপিত হয়েছিল। বিভিন্ন শাসক ও সাম্রাজ্যের আধিপত্যে গাজা ছিল বহুদিন।

মিসরের পথে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল হিসেবেই ইতিহাসে পরিচিত। প্রাচীন মিসরীয়রা প্রায় ৩৫০ বছর ধরে গাজা শাসন করে। পরে ফিলিস্তিনিরা এটিকে পেন্টাপোলিসের একটি অংশে পরিণত করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই গাজা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অসংখ্য বাণিজ্যিক রুট ছিল অঞ্চলটিকে ঘিরে। ফলে মিসরের শাসক, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার শাসকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিবাদ তৈরি হয়েছে প্রায়ই। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিসরীয়, আসিরীয় এবং পরে টলেমীয় ও সেলুসিডদের মধ্যে তীব্র ছিল। মধ্যযুগে ও আধুনিক সময়ে মিসরীয় রাজা ও দামেস্কের রাজাদের মধ্যেও এ অঞ্চল নিয়ে লড়াই চলেছে। তবে এটি সত্য ছিল যখনই মিসরীয়রা গাজা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল, তারা প্রচণ্ড উন্নতি করেছে নিজেদের। কারণ গাজা দখল করার উদ্দেশ্যই ছিল বন্দর দখল ও বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার করা। এশিয়া ও আফ্রিকায় বাণিজ্য এবং সামরিক রুটের নিয়ন্ত্রণ করাও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে যতই আটলান্টিক উপকূলে বাণিজ্যিক পথ উন্মুক্ত হয়েছে, গাজায় বাণিজ্যপথ ধীরে ধীরে তার চাহিদা হারিয়েছে। মূলত শহরের অবস্থানই একে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ফিলিস্তিনের সবচেয়ে পুরনো শহরগুলোর একটি, যা সমুদ্র উপকূল থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। জেরুজালেম থেকে ৫০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে এর অবস্থান। তাই স্বাভাবিকভাবেই গাজাকে ফিলিস্তিনের প্রধান শহরগুলোর একটি বলা যায়।

ধ্রুপদি লেখকদের বেশকিছু বর্ণনায় পাওয়া যায় শহরের প্রাচীন অবস্থান মধ্য ও আধুনিক যুগের অবস্থানের চেয়ে অনেক আলদা ছিল। আধুনিক শহরের প্রাধান অংশটি একটি উঁচু টিবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গ্রিকদের মতে গাজা শহরের মাটি সবসময়ই নরম ও উর্বরতার জন্য বিখ্যাত। উর্বরতার জন্যই ফলন ভালো হয় এবং ভ্রমণকারীরা এ অঞ্চল থেকে নানা শস্য ও ফল সরবরাহ করত। কিন্তু গাজা থেকে দক্ষিণে অবস্থিত এলাকাগুলো শুষ্ক, অনুর্বর, বালুকাময় ও মরু অঞ্চল ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে শহরটিকে সিরিয়ার সঙ্গে ধরা হতো। গাজার বন্দর মাইউমাস সম্পর্কে জানা যায় এটি প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান ছিল। ধারণা করা হয় অন্তত গ্রিকদের সঙ্গে বাণিজ্য যাত্রার সময় থেকেই বন্দরটি আছে। মাইউমাস একটি মিসরীয় শব্দ, যার অর্থ ‘‌সামুদ্রিক স্থান’। বর্তমান বন্দরটির স্থানেই এ বন্দর ছিল। নিচু বালুকাময় উপকূলে প্রাচীন কিছু শিলা দ্বারা বেষ্টিত ছিল এ বন্দর। সম্রাট কনস্ট্যানটাইনের সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে স্থানটিকে অধীনে আনা হয়। সম্রাট মাইয়ুমাসকে একটি স্বাধীন শহর বানিয়েছিলেন। খ্রিস্টানদের সমর্থনে এবং বাসিন্দাদের ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য তিনি তার বোনের সম্মানে ৩৩১ খ্রিস্টাব্দে বন্দরের নাম পরিবর্তন করে ‘‌কনস্ট্যান্টিয়া’ রাখেন। পরে বেশ কয়েকবার এ বন্দর দখল ও পুনরুদ্ধার হয়। তবে রাজা জুলিয়ানের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পর বন্দরটি তার পুরনো মাইয়ুমাস নাম ফিরে পায়।

মধ্যযুগে বন্দরটি টিডা বা টাইডা নামে পরিচিত ছিল, যে নামটি অ্যান্থেডনের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রাচীন অ্যান্থেডন স্থানটি ইতিবাচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গাজার আশপাশে বেশকিছু ধ্বংসাবশেষ ছিল। সে ধ্বংসাবশেষ বোঝাতেই টিডা নাম ব্যবহার হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আর অ্যান্থেডনও সে অর্থ বহন করে। এ শহরের ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সমস্যা হলো পুরনো গাজা ও নতুন গাজার অবস্থান নিয়ে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও খননকারীরা বহু শতাব্দী ধরে এর পর্যালোচনা করেছেন। পরিশেষে তারা এ সিদ্ধান্তে এসেছেন, আধুনিক গাজা কার্যত পুরনো শহরের ওপরেই দাঁড়িয়ে। বর্তমানে শহরের এ উচ্চতা শতাব্দী ধরে ধ্বংসাবশেষ জমে থাকার কারণে। স্ট্রাবো লিখেছে, ‘‌ওল্ড গাজা আলেকজান্ডারের সময়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং এ অঞ্চল বর্জ্যে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।’ প্রাচীন শহরের স্থানটি খুব কমই দৃশ্যমান এবং বিদ্যমান শহরটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থানটিকে ছেড়ে অন্য স্থানে নির্মিত হয়েছে। গ্যবিনিয়াস ৫৭ সালে স্ট্রাবোকে ভুল প্রমাণ করেন। তার দাবি ছিল, শহরটি কখনই পুরোপুরি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট দ্বারা ধ্বংস করা হয়নি। এটি পরে আলেকজান্ডার জ্যানাউসের রাজত্বকালে চূড়ান্তরূপে ধ্বংস করা হয়েছিল। তাই পুনর্নির্মিত শহরটিকে নতুন গাজা হিসেবেই শনাক্ত করা হয়। তবে ঐতিহাসিক হেরোডোটাস নগরীটিকে মহান হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, আলেকজান্ডার দ্বারা আক্রমণের সময় এটি একটি মহান শহর ছিল। ৩২৩ সালে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা এ শহরকে দখলে এনেছিলেন। কারণ গাজা শহরকে নিয়ে আগ্রহ ছিল সবার। আদিকাল থেকেই আরব উপদ্বীপের আরবদের সঙ্গে গাজার কমবেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিজেদের যাতায়াতেও গাজার ‘‌মরুভূমি বন্দর’ ব্যবহার হতো। গাজার মৃৎশিল্প ছিল প্রাচীনকাল থেকেই জনপ্রিয়। পশ্চিমে রফতানি হওয়া এসব মাটির তৈরি পাত্র পরিচিত ছিল গাজিটি নামে। আরো নানা ধরনের পণ্য গাজা বন্দর থেকে পশ্চিমে রওয়ানা হত। মিনিনিয়াস নামের আরব উপজাতিরা গাজাকে সর্বদা তাদের সদর দপ্তর হিসেবে দেখেছে।

প্রকৃতপক্ষে গাজা আদিকাল থেকেই একটি আরব শহর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আরব প্রতিবেশীদের শত্রুতা গাজার জনগণের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলেছে। সামরিক প্রতিরক্ষার মাধ্যমে আরবরা গাজা ও সব ফিলিস্তিনিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টায় আছে যুগ যুগ ধরেই। ফিলিস্তিনের ওপর ক্রুসেডের সময়ও প্রচণ্ড বাজে প্রভাব পড়েছিল, বিশেষ করে দক্ষিণ ফিলিস্তিনের ওপর। ১১০০ সালে খ্রিস্টানরা নিজেদের স্থায়ী করতে গাজায় অবস্থান নেয়ার পাশাপাশি দুর্গও নির্মাণ করেছিল। তারা গাজাকে সামরিক স্টেশন হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। বাণিজ্যিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করতে গাজায় বন্দর পুনর্গঠন করেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখনই যে শাসক সাম্রাজ্য পেয়েছেন, চেষ্টা করেছেন গাজাকে নিজেদের জন্য উপযোগী করে তুলতে। তবে পুরনো গাজা শহর বা নতুন গাজা বিদেশী শাসকদের আধিপত্য বিস্তারের পেছনে এখানে বাণিজ্যিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ছিল মূল লক্ষ্য। ব্যাবিলনীয় রাজাদের আধিপত্যে এ অঞ্চল ছিল বেশ লম্বা সময়কাল ধরে। সে সময়ে ফিলিস্তিনের উত্তরাঞ্চল ছিল সিরিয়ার দখলে। পরে ২৫০০-২২৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আমিরীয় নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী ছড়িয়ে পড়ে এ শহরে, যাদের আধিপত্য ফিলিস্তিনজুড়ে ছিল। তারা মিসর ও সিরিয়া অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এ সময় হিকসস ও সেমেটিক নামে দুটি জাতির আক্রমণ হয়েছিল ফিলিস্তিনে। যারা ফিলিস্তিনের দক্ষিণে ঘাঁটি গড়েছিল এবং দক্ষিণের বন্দরগুলো দখল করেছিল। তবে এ সময়ে মিসরের আক্রমণ থেকে ফিলিস্তিন একেবারেই মুক্ত ছিল।

মিনিয়ান রাজ্যের অধীনে পরবর্তী সময়ে আসে গাজা শহরটি। মূলত সিরিয়া দখলের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল এ শহরকে। খ্রিস্টপূর্ব পনেরো শতকে মিসর ফিলিস্তিনের ওপর নিজেদের একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালায়। মিসরের সম্রাট তাহুতিমেস ফিলিস্তিন আক্রমণ করেন। তবে তাহুতিমেসকে হারাতে উত্তর ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার লোকেরা একযোগে বিদ্রোহ করেছিল। দক্ষিণ ফিলিস্তিন দখলের জন্য তাহুতিমেস এগিয়ে যেতে থাকেন, কারণ এ সময়ে গাজা ছিল বেশ সমৃদ্ধ একটি শহর। ফলে সিরিয়ার বিদ্রোহকেও গুরুত্ব দেননি তিনি। তবে তিনি তার পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। এরপর বেশকিছু বছর মিসর, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের মাঝে গাজাকে নিয়ে ছিল নানা দোটানা। এবং বাণিজ্য স্থাপনের চেষ্টায় মূলত ছোট-বড় বেশকিছু বিদ্রোহ চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

গাজায় জনবসতি স্থাপনের ইতিহাস এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর মধ্যে স্থান দিয়েছে। উত্তর আফ্রিকা ও লেভান্টের মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় পথে অবস্থিত। গাজা শহরটির মূল আকর্ষণ হলো লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে মসলা বাণিজ্যের জন্য এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগে যেখানে কেবল বাণিজ্য স্থাপনের লক্ষ্যে বন্দর দখল করা হতো, সেখানে পুরো ফিলিস্তিনকেই আমরা দেখছি দখল হয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলের হাতে। ইসরায়েলিরা যখন তাদের ট্রান্স-জর্ডানীয় অঞ্চল এবং ফিলিস্তিনের তৎকালীন পশ্চিম অংশগুলো দখল করেছিল, তখন ফিলিস্তিনবাসী ক্রমেই তাদের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। তবে এ বিবাদ ও ভূখণ্ডে দখলদারিত্বের ইতিহাস বহু পুরনো। ইসরায়েল ফিলিস্তিন বিবাদ ও দখলদারিত্বের ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ইসরায়েলিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের প্রথম লড়াই এনে দিয়েছিল ফিলিস্তিনের জন্য বিজয়। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড বিস্তৃতি বাড়তে থাকে এ সূত্র ধরেই। ফিলিস্তিনিরা গাজা শহরকে মুক্ত রাখতে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়। ইসরায়েলিদের বিভিন্ন স্থাপনাকে ধ্বংস করেই এগিয়ে যাচ্ছিল ফিলিস্তিনিরা। তবে এ পরিস্থিতি বিক্ষিপ্ত ইসরায়েলি উপজাতিদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে দুই পক্ষের মাঝে কিছু সময় যুদ্ধ বিরতি ছিল। এ সময়েই ৯২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিসরের রাজা শেশংক ফিলিস্তিন আক্রমণ করেন। কার্নাকের মন্দির পাওয়া শিলালিপিতে বেশকিছু শহরের বর্ণনায় গাজার উল্লেখও পাওয়া যায়। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে অ্যাসিরীয়রা গাজা দখল করে তাদের দেবতার নানা মূর্তি স্থাপন করে শহরে। গাজা তাদের স্বর্ণ, রুপা, সিসা, লোহা, রঙ্গিন কাপড় নানা মৃৎপাত্র (যার জন্য গাজা একসময় বিখ্যাত ছিল), রাজকীয় ধন ইত্যাদি দিয়ে আকর্ষিত করেছিল। ৭১১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাসেরীয় শক্তির বিরদ্ধে ফিলিস্তিনে একটি বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়, যা মিসরের রাজা দ্বারা সংঘঠিত হয়েছিল। গাজা সরাসরি এতে যোগ দেয়নি। মিসরের রাজা সারগন এ যুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং ফিলিস্তিন শাসনে অগ্রসর হন। মসলা বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত করতে মিনিয়ানদের সঙ্গে বিদ্রোহ করেন এবং এ অঞ্চল শত্রুমুক্ত করেছিলেন। তবে ছোট-বড় বিদ্রোহের কারণে এ সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। আজকের গাজার সীমানা মাত্র ৩৬০ বর্গকিমি। এ বন্দর বেষ্টিত ও বাণিজ্যিক শহরটি এখন ইসরায়েল ফিলিস্তিন বিরোধে এমন পরিস্থিতিতে আছে আগামীর সকাল দেখাই যেন স্বপ্ন।

ফারিহা আজমিন: লেখক