আমি ধরে
নিলাম কাদম্বরীদেবীর সেই সুইসাইড-নোটটি হঠাৎ
পাওয়া গেল
তাঁর আত্মহনননের একশো সাতাশ
বছর পরে।
সেটিকে আগুনে
পুড়ে ছাই
হতে দেননি
রবীন্দ্রনাথ। ধরে
নিলাম সেই
ঝলসানো সুইসাইড-নোটের পাঠোদ্ধার সম্ভব হলো
শেষ পর্যন্ত।
—রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাক-কথন,
কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড
নোট
বিগত কয়েক
বছরে কাদম্বরী
সম্পর্কে আলোচনা
হলে সেখানে
অনিবার্যভাবে উঠে
আসে রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট
বইটির কথা।
এক দশক
আগে প্রকাশ
হওয়া বইটির
কয়েকটি মুদ্রণ
প্রকাশিত হওয়ার
পাশাপাশি পাঠক
ও সমালোচক
মহলে তুমুল
আলোচিত ও
সমালোচিত হয়েছে।
মূল ঘটনাকে
বিকৃত করে
উপস্থাপন করার
অভিযোগ রয়েছে
লেখকের বিরুদ্ধে।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য,
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
এ ধারার
একাধিক বইয়ের
রচয়িতা। কাদম্বরী
দেবীর সুইসাইড
নোটের আগে
তিনি প্রায়
একই বিষয়
অবলম্বনে লিখেছেন
আদরের
উপবাস: রবীন্দ্রনাথ। এছাড়া
শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে
নিয়ে লিখেছেন
নষ্ট
পুরুষ শরত্চন্দ্র। তার
আরো লেখার
মধ্যে রয়েছে
পাঁচ
মহানায়কের গোপন
জীবন।
রামমোহন রায়,
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,
মদনমোহন তর্কালঙ্কার,
কালীপ্রসন্ন সিংহ
ও বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে
এ বই
রচিত। ঠাকুরবাড়ির
প্রতি রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহ
খুব বেশি।
দ্বরকানাথকে নিয়ে
তিনি লিখেছেন
ডারলিং
ডোয়ার্কি
এবং রবীন্দ্রনাথকে
নিয়ে লেখা
আরেকটি বইয়ের
নাম রবি ও
রানুর আদরের
দাগ।
কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট
বইটি রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু
করেছেন কাদম্বরী
কর্তৃক ‘প্রাণের
রবি’ সম্বোধনে।
এরপর কাদম্বরীর
নিজের দৃষ্টিকোণ
থেকে ঠাকুরবাড়িতে
তার জীবন,
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
সম্পর্ক, তার
প্রতি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
‘অবহেলা’র
বিষয়গুলো উঠে
এসেছে। কিন্তু
মনে রাখা
প্রয়োজন যে
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
মূলত পুরোটাই
তার নিজের
মতো করে
লিখেছেন। আশ্রয়
নিয়েছেন কল্পনার।
সেখানে বাস্তবের
কিছু ছায়া
থাকলেও সিংহভাগই
কল্পনা। যেমন
কাদম্বরীর বকলমে
রঞ্জন লিখেছেন,
‘আমার
ঘরের পাশে
ছাদের উপর
যে-বাগানটি
একসঙ্গে করেছিলাম
আমরা, তুমি
তার নাম
দিলে নন্দনকানন
তারপর একদিন
সেই বাগানে
ভোরের প্রথম
আলোয় আমাকে
চুমু খেয়ে
জিগ্যেস করলে—“নতুন
বউঠান, নামটা
তোমার পছন্দ
হয়েছে?”
আমার সমস্ত
শরীর তখন
কাঁটা দিচ্ছে।
আবার ভয়ে
বুক করছে
দুরদুর।’
ঠাকুরবাড়িতে কাদম্বরীর
আগমন, অবস্থা
ও অবস্থান,
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে
তার সম্পর্ক,
এমনকি রবীন্দ্রনাথের
সঙ্গে তার
সম্পর্কের বিষয়
নিয়েও সমসাময়িক
সূত্র থেকে
তথ্য পাওয়া
যায়, কিন্তু
ছাদের বাগানের
দৃশ্য যে
লেখকের কল্পনাপ্রসূত
তাতে সন্দেহের
অবকাশ নেই।
ঔপন্যাসিক কিছুটা
স্বাধীনতা নিতেই
পারেন, কিন্তু
আলোচ্য বইয়ের
লেখক সে
স্বধীনতা একটু
বেশিই নিয়ে
ফেলেছেন। পুরো
বইয়ে এমন
নানা দৃশ্য,
বর্ণনা ও
‘তথ্য’
উল্লেখ করা
হয়েছে, যার
সঙ্গে বাস্তবের
কোনো সংযোগ
নেই। মূলত
প্রচলিত নানা
গালগল্প এবং
পূর্বসূরিদের নানা
ফিকশন থেকে
অনুপ্রাণিত হয়েছেন
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
কাদম্বরী দেবীকে
‘রহস্যময়’
করে রেখেছে
খোদ ঠাকুরবাড়ি।
তার মৃত্যুর
উপযুক্ত কোনো
তদন্ত হয়নি।
এ সম্পর্কে
দেয়া হয়নি
কোনো আনুষ্ঠানিক
বক্তব্য। স্বাভাবিকভাবেই
পরবর্তী সময়ে
কাদম্বরী, তার
মৃত্যু ও
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
সঙ্গে তার
সম্পর্ক অন্যদের
চর্চার বিষয়
হয়ে উঠেছে।
বিখ্যাতদের জীবন
নিয়ে চর্চার
বিষয়টি নতুন
নয়। আর
তাদের জীবনে
যদি কোনো
‘অমিমাংসিত
রহস্য’ থাকে
তাহলে তো
কথাই নেই।
ঠাকুরবাড়ির এ
বৌটির ক্ষেত্রে
এমনটাই হয়েছিল।
তাই পরবর্তীকালে
জ্যোতি-কাদম্বরী-রবি
সম্পর্ক নিয়ে
রচিত হয়েছে
নানা মিথ।
সাধারণ কৌতূহলী
আলোচনার গণ্ডি
পেরিয়ে কাদম্বরীকে
নিয়ে রচিত
হয়েছে একাধিক
ফিকশন। ফলে
বাস্তবের সঙ্গে
মিশেছে অনেক
কানকথা এবং
লেখকের কল্পনা।
কিন্তু জনপ্রিয়
ধারার সাহিত্য
ও সিনেমা
কাদম্বরীকে এমনভাবে
উপস্থাপন করেছে
যে পপুলার
কালচারে উপস্থাপিত
কাদম্বরীকেই বাস্তব
বলে মনে
হয়।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের
আগে কাদম্বরী
দেবীকে নিয়ে
লিখেছিলেন মল্লিকা
সেনগুপ্ত। ‘কবির
বউঠান’ নামে
তার উপন্যাসটি
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের
বইটির তুলনায়
বিস্তারিত চিত্র
উপস্থপন করে।
জ্ঞানদানন্দিনীর হাত
ধরে ঠাকুরবাড়িতে
আসা আধুনিকতা
থেকে মল্লিকা
তার উপন্যাস
শুরু করেছেন।
মল্লিকার এ
উপন্যাসে কাদম্বরী
দেবীর সঙ্গে
ঠাকুরবাড়ির নারী
মহল এবং
ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের
চিত্রও উঠে
এসেছে। কাদম্বরীকে
উপস্থাপনের জন্য
বিষয়টি প্রয়োজন
ছিল। অন্যথা
ঠাকুরবাড়ির বাজার
সরকার শ্যাম
গাঙ্গুলীর কন্যাটি
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী
হয়ে আসা
এবং ঠাকুরবাড়িতে
তার অবস্থা
বোঝানো ঔপন্যাসিকের
জন্য দুষ্কর
হতো। অর্থাৎ
মল্লিকার উপন্যাস
দেখায় যে
কাদম্বরী তার
পারিবারিক কারণে
শুরুতেই ঠাকুরবাড়িতে
নিজের অবস্থান
নিয়ে হীনম্মন্যতায়
ভুগতেন। জায়গাটি
অবশ্য রঞ্জন
আরো সরাসরি
লিখেছেন কাদম্বরীর
বয়ানে, ‘বিশেষ
করে তোমার
আইসিএস সেজদাদা
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
আর তাঁর
বিলাতফেরত স্ত্রী
জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে
আমার পরিচয়
ছিল, আমি
তোমাদের বাজার
সরকার শ্যাম
গাঙ্গুলির তিন
নম্বর মেয়ে।’
কাদম্বরীর পারিবারিক
পরিচয় ও
শিক্ষা যে
ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য
নারী, বিশেষত
জ্ঞানদানন্দিনীর সমপর্যায়ের
ছিল না,
তা বাস্তব।
সে বিষয়টি
মল্লিকা সেনগুপ্তের
উপন্যাসেও স্পষ্ট।
কিন্তু রঞ্জনের
উপন্যাসে কাদম্বরী
সরাসরি বলেন
যে তার
প্রতি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
কোনো ভালোবাসা
ছিল না।
কিন্তু মল্লিকার
উপন্যাস ভিন্ন
বার্তা বহন
করে। বিশেষত
জ্যেতিরিন্দ্র কন্যাটিকে
পছন্দ করেছিলেন
বলে লিখেছেন
মল্লিকা। তিনি
লিখেছেন, ‘জ্ঞানদার
আশঙ্কা ছিল
অশিক্ষিত বালিকাকে
পছন্দ হবে
না জ্যোতির।
সে ভয়
মিথ্যে করে
নববধূকে দেখে
জ্যোতিরিন্দ্রের মন
দুলে উঠল।
এই শ্যামল
বালিকাকে তিনি
নিজের মতো
গড়েপিটে নেবেন।’
এ বইয়ের
পরবর্তী অংশেও
কাদম্বরীর সঙ্গে
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের দাম্পত্য
ও প্রেমের
চিত্র অঙ্কিত
হয়েছে। বিপরীতে
কাদম্বরীর মুখে
রঞ্জন বসিয়েছেন,
‘কিন্তু
তোমার নতুনদাদার
প্রেম—না,
পেলাম না
কোনওদিন। কোনওদিন
তাঁর কাছের
মানুষ হয়ে
ওঠার সম্মানটুকুও
পাইনি।’
ফিকশনে লেখক
তার উদ্দেশ্য
অনুসারে লেখেন
বা গল্প
সাজান। এখানে
দুটো বিপরীত
চিত্র তুলে
আনার কারণ
মূলত সে
বিষয়টিকেই স্পষ্ট
করা। বাস্তবে
বালিকা বয়সে
ঠাকুরবাড়িতে আসার
পর কাদম্বরী
বয়ঃপ্রাপ্ত হলে
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে
তার স্বাভাবিক
প্রণয় ও
দাম্পত্য গড়ে
উঠেছিল। মল্লিকা
সেনগুপ্তের উপন্যাসের
ডিটেইলিংয়ে সে
চিত্র পাওয়া
যায়। এমনকি
কাদম্বরী ধীরে
ধীরে হয়ে
উঠেছিলেন জ্যেতিরিন্দ্রের
সাহিত্যসভার অন্যতম
সভ্য ও
আকর্ষণ। মূলত
কাদম্বরীকে নিয়ে
রচিত নানা
মিথ তৈরি
হওয়ার পেছনে
সহায়ক হয়েছে
ঠাকুরবাড়ির তত্কালীন
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।
মল্লিকা সেনগুপ্ত
রচিত ‘কবির
বউঠান’ উপন্যাসে
ঠাবুরবাড়ির এ
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের
একটি বিস্তৃত
চিত্র রয়েছে।
‘ভারতী’
পত্রিকা প্রকাশের
আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
আয়োজনে যে
সাহিত্যসভা বসত
সেখানে বিহারীলাল
চক্রবর্তী, তারক
পালিত প্রমুখের
আগমন হতো।
এ আসরের
শিরোমণি প্রথমে
ছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী।
পরে তা
কাদম্বরীর হাতে
চলে যায়।
মল্লিকা লিখেছেন,
‘জ্ঞানদা
কিছুদিন ছিলেন
না, তার
মধ্যে জোড়াসাঁকোর
বাড়িতে অনেক
পরিবর্তন হয়েছে।
অন্তঃপুরের পরদা
উঠে গেছে।
কাদম্বরী ঘোমটা
খুলে ফেলে
হয়ে উঠেছে
সাহিত্যবাসরের মক্ষীরানি।
এতে জ্ঞানদার
খুশিই হওয়ার
কথা কিন্তু
তাঁর মন
খচখচ করছে।’
অর্থাৎ কাদম্বরী
স্বকীয়তা অর্জন
করছে।
কাদম্বরী এমন
এক চরিত্র
হয়ে উঠেছেন
যে সাহিত্য
থেকে এসেছেন
সিনেমায়ও। কথিত
আছে, সত্যজিৎ
রায়ের চারুলতা
নির্মিত হয়েছে
কাদম্বরী দেবীর
জীবনকে উপজীব্য
করে। সত্যজিৎ
রায়ের সিনেমাটি
মূলত রবীন্দ্রনাথেরই
নষ্টনীড়
গল্পের
সিনেমারূপ বলে
উল্লেখ করেছেন
পরিচালক। তবে
রবীন্দ্রনাথের এ
গল্পও অনেকে
কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথ
সম্পর্ক অনুসরণে
রচিত বলে
মনে করেন।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একসময়
ঘরের বাইরে
বেশি সময়
কাটাতেন, এ
কথা সত্য
এবং সে
সময় রবীন্দ্রনাথের
সঙ্গে কাদম্বরীর
ঘনিষ্ঠতা তৈরি
হয় সেটাও
প্রচলিত। নষ্টনীড়
ঠিক এমনই
একটি গল্প
এবং সে
হিসেবে বলা
চলে, জনপ্রিয়
ধারায় কাদম্বরীকে
প্রথমে এনেছিলেন
খোদ রবীন্দ্রনাথ।
তবে সিনেমায়
কাদম্বরীকে নিজ
নাম ও
পরিচয়ে সহজে
খুঁজে পাওয়া
যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে দু-একটি
সিনেমা নির্মিত
হয়েছিল। তবে
তা নির্মাণ
ও অভিনয়ের
ক্ষেত্রে অত্যন্ত
দুর্বল। ২০০২
সালে সুকান্ত
রায় একটি
সিনেমা নির্মাণ
করেছিলেন, যেখানে
দেবশ্রী রায়
কাদম্বরীর চরিত্রে
অভিনয় করেছিলেন।
২০১১ সালে
রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি
থেকে একটি
ডকুফিকশন করেছিলেন
ঋতুপর্ণ ঘোষ।
এ চলচ্চিত্রে
কাদম্বরীর চরিত্রে
অভিনয় করেছিলেন
রাইমা সেন।
তবে এখানে
কাদম্বরীকে পুরোপুরি
পাওয়া যায়
না। ২০১৫
সালে মুক্তিপ্রাপ্ত
সুমন ঘোষের
কাদম্বরীকে বলা
চলে কাদম্বরী
দেবীকে নিয়ে
প্রথম পূর্ণাঙ্গ
সিনেমা।
সিনেমাটির শুরুতে
উল্লেখ করা
হয়েছে, সিনেমাটি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের
প্রথম
আলো
এবং মল্লিকা
সেনগুপ্তের কবির বউঠান উপন্যাস
থেকে সিনেমার
গল্প সাজানো
হয়েছে। তবে
আনন্দবাজারে (আর্কাইভ
থেকে পাওয়া)
এক সাক্ষাত্কারে,
তিনি বলেছেন,
“মেন
যে দু’টো
বই থেকে
গল্পটা ডেভেলপ
করা হয়েছে
সে দু’টো
হল সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম
আলো’ আর
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের
‘কাদম্বরী
দেবীর সুইসাইড
নোট’।”
তবে গল্প
যেখান থেকেই
নেয়া হোক
না কেন,
এ সিনেমার
মূল চরিত্র
কাদম্বরী চরিত্রে
কঙ্কনা সেনশর্মার
মধ্য দিয়ে
রবীন্দ্রনাথের নতুন
বউঠানকে পরিচয়
করিয়ে দেয়ার
চেষ্টাটা অনেকাংশেই
সার্থক। কাদম্বরীর
সঙ্গে সম্পর্কিত
ঠাকুরবাড়ির প্রায়
সব সদস্যসহ
কাদম্বরীকে উপস্থাপন
করেছেন সুমন
ঘোষ। বিভিন্ন
সিকোয়েন্স ও
সংলাপ প্রায়
সরাসরিই নেয়া
হয়েছে মল্লিকা
সেনগুপ্তের বই
থেকে।
ঠাকুরবাড়িতে বই
বিক্রি করতে
আসা বই
মালিনীর নানা
বই নিয়ে
আসার পর
বিষবৃক্ষ থেকে
পাঠ, রসুইঘরে
কাদম্বরীকে সন্তানহীনতার
জন্য গঞ্জনা
দেয়া থেকে
শুরু করে
উর্মিলা মারা
যাওয়ার পরবর্তী
সময়ে মেয়েমহলের
নানা মন্তব্য
সিনেমায় এসেছে।
এর প্রায়
সবাই মল্লিকা
সেনগুপ্তের ‘কবির
বউঠান’ উপন্যাস
অনুসরণে রচিত।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে
কাদম্বরীর সম্পর্কের
রসায়ন এসেছে
সিনেমায়, সেই
সঙ্গে এসেছে
কাদম্বরীর ব্যক্তিত্বের
বিষয়টি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ
যে সাহিত্যসভা
বসিয়েছিলেন তার
চিত্রায়ণ করেছেন
পরিচালক। সেখানে
মেয়েমহলের অসূয়া,
কাদম্বরীর জীবনের
পরিবর্তনের ধারাটিও
ফুটে উঠেছে।
একটি দৃশ্যে
কাদম্বরীর প্রতি
জ্ঞানদানন্দিনীর অসূয়ার
বিষয়টি স্পষ্ট
চিত্রিত। সিকোয়েন্সটি
মল্লিকা সেনগুপ্তর
বই থেকে
পুরোপুরি অনুপ্রাণিত।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের থিয়েটারে
বেশি সময়
দেয়া, বিনোদিনীর
সঙ্গে তার
সম্পর্ক এবং
অন্যান্য বিষয়ও
একই বই
থেকে অনুপ্রাণিত।
সুমন ঘোষ
দাবি করেছেন,
তার সিনেমার
গল্প সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো থেকে
অনুপ্রাণিত। সুনীলের
উপন্যাসে কাদম্বরী
প্রসঙ্গ ছিল,
তবে এসেছিল
উপন্যাসের অনুষঙ্গ
হিসেবে। তবে
বলা চলে,
আধুনিক ও
জনপ্রিয় ধারায়
সুনীলই বিষয়টি
প্রথম অবতারণা
করেছেন। এ
নিয়ে বেশকিছু
সমালোচনা আছে।
যদিও সুনীলের
লেখায় রবীন্দ্রনাথ
কাদম্বরী সম্পর্ক
যথাযত সংযতভাবে
উপস্থাপিত, অনেকেই
সেখানে আপত্তি
করেন। তবে
সর্বাধিক আপত্তি
অবশ্যই রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটি
নিয়ে। এ
সম্পর্কে গোলাম
মুরশিদ তার
‘কৃমি
ঘাঁটা’ নিবন্ধে
লিখেছেন, ‘প্রথম
আলো নামে
রবীন্দ্রনাথের সত্য
ঘটনা, কল্পিত
কাহিনি এবং
শোনা-কথা
নিয়ে ঢাউস
উপন্যাস লিখে
ফেললেন। কাদম্বরী
দেবী থেকে
আরম্ভ করে
কেউই বাদ
গেলেন না
রবীন্দ্রচরিত্রে কালিমা
লেপন করতে।’
গোলাম মুরশিদ
মূলত কাদম্বরী
সম্পর্কে আগ্রহী
নন, তিনি
রবীন্দ্রচরিত্র নিয়ে
আগ্রহী। তবে
কাদম্বরী দেবীকে
নিয়ে রচিত
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের
উপন্যাসটি নিয়ে
তার মন্তব্য
প্রণিধানযোগ্য। তিনি
লিখেছেন, ‘কাদম্বরী
দেবীর সুইসাইড
নোটে রঞ্জন
বন্দ্যোপাধ্যায় গবেষণার
সাজপোশাক পরিয়ে
পরিবেশন করলেন
নির্জলা কাহিনি।
যে পরিবেশে
কাদম্বরী দেবী
আত্মহত্যা করেন,
তাতে আত্মহত্যা
করার আগে
তিনি কী
লিখতে পারতেন,
তারই কল্পনা।
কল্পনাটাকে বিশ্বাসযোগ্য
করার জন্য
গবেষণার দোহাই।’
এর বাইরে
কাদম্বরী বিষয়ে
লেখা হয়নি
এমন নয়।
তবে সে
লেখাগুলো তুলনামূলক
কম জনপ্রিয়।
সিনেমার ক্ষেত্রেও
বিষয়টি তেমনই।
২০২১ সালের
শেষের দিকে
শোনা গিয়েছিল,
রবীন্দ্রনাথের ‘তিন
কন্যা’ অবলম্বনে
হলিউডে একটি
সিনেমা তৈরি
করা হবে,
যেখানে রবীন্দ্রনাথের
গল্পগুলো বলা
হবে কাদম্বরীর
দৃষ্টিকোণ থেকে।
অর্থাৎ অনেকটাই
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের
উপন্যাসের মতো।
জনপ্রিয় ধারায়
না হলেও
নীরদ সি
চৌধুরী ব্যক্তি
হিসেবে যথেষ্ট
বিখ্যাত এবং
বিখ্যাত তার
লেখা। কাদম্বরী
সম্পর্কে তিনি
মন্তব্য করেছেন
এবং তার
কথাও আলোচিত
ও সমালোচিত।
তিনি লিখেছেন,
‘কাদম্বরী
আত্মহত্যা করিলেন
কেন? প্রথম
উত্তর সহজ—প্রেমে
নিরাশ হইয়া।
দ্বিতীয় উত্তর,
স্বামীর মনের
অবস্থা দেখিয়া।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মনোভাব
যদি ভূপতির
মত হইয়া
থাকে তাহা
হইলে উহা
দেখিবার পর
অনুতপ্ত হইয়া
এবং পূর্ব-সম্বন্ধ
কোন ভাবে
ফিরাইয়া আনিবার
পথ না
দেখিয়া কাদম্বরীর
পক্ষে জীবনের
অবসান করা
সম্ভব ছিল।
তৃতীয় অনুমানও
করা যাইতে
পারে। উহা
একটা দুরপনেয়
ও অসহনীয়
কলঙ্কের অনুভূতি।
এটা রবীন্দ্রনাথের
বিয়ের সহিত
যুক্ত হওয়া
অসম্ভব নয়।
কিন্তু আরেকটি
সম্ভাবনার কথাও
বিবেচনা করিতে
হইবে। কেহ
কি দেবেন্দ্রনাথের
কানে রবীন্দ্রনাথ
ও কাদম্বরীর
মধ্যে অবৈধ
প্রণয়ের কথা
তুলিয়াছিলেন? সুতরাং
দেবেন্দ্রনাথ বিরক্ত
হইয়া তখনই
রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহ
পাঠাইয়া এইরূপ
বিবাহ দিলেন।
শ্বশুর তাহাকে
কলঙ্কিনী ভাবিলেন,
এই ধারণার
বশে আত্মহত্যা
করা তাহার
পক্ষে সম্ভব।
তাই অভাগিনী
কাদম্বরীর নামের
পাশে কলঙ্ক
(অবৈধ প্রণয়)
ছায়ার মত
ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।’
কাদম্বরীর প্রসঙ্গ
এলে কোনোভাবেই
রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে
যাওয়া যায়
না। নন-ফিকশন
হোক বা
ফিকশন, তিনি
এসেই যান।
নীরদ চৌধুরির
বক্তব্যের বিরোধিতা
করেছেন শঙ্খ
ঘোষসহ আরো
অনেকে। তবে
তারা রবীন্দ্রনাথ
নিয়ে কোনো
নেতিবাচক কথা
শুনতে আগ্রহী
নন। ওদিকে
প্রণয় ছিল
কি ছিল
না সে
প্রসঙ্গে না
গিয়েও বলা
যায়, কাদম্বরীর
প্রতি রবীন্দ্রনাথের
সহজাত একটি
সম্পর্ক ছিল
এবং তার
মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ
ব্যথিত ছিলেন
আজীবন। এর
প্রমাণ পাওয়া
যায় মৈত্রেয়ী
দেবীর লেখায়।
‘রবীন্দ্রনাথ
গৃহে ও
বিশ্বে’ বইয়ে
পাই, “ভালই
হয়েছে নতুন
বৌঠান চলে
গেছেন তার
অবিনশ্বর মধুর
ছায়া রেখে,
তাই আজও
তাকে নিয়ে,
কবিতা লিখছি।
নতুন বৌঠান
যেমনটি ছিলেন,
তেমনটিই আছেন,
‘বেঁচে
থাকলে হয়ত
মামলা মকদ্দমা
হত’।”
মাহমুদুর রহমান: লেখক





