কাদম্বরী দেবী
অন্য এক
নতুনদার স্ত্রী
আগে
নতুনদার কথা
বলি। শরত্চন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের এপিক
উপন্যাস শ্রীকান্তের
নতুনদার অভ্যুদয়ের
পর তার
প্রবল উপস্থিতি
আগেকার বাস্তবের
এবং কাহিনীর
সব নতুনদা
কিংবা দাদা
মার খেয়ে
গেলেন। যেন
নতুনদা একজনই,
কুকুরের তাড়া
খেয়ে নদীতে
পড়লেন, ইন্দ্রনাথ
আর শ্রীকান্ত
তখন টেনেটুনে
তাকে পাড়ে
তুললে তিনি
বলে উঠলেন,
আমার এক
পাটি পাম্প
সু।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ও সারদা
সুন্দরী দেবীর
ছয় নম্বর
সন্তান (পুত্র
নম্বর পাঁচ)
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
ঘরে ডাকা
আদুরে নামটি
ছিল নতুন।
তিনি পরিবারের
সবচেয়ে খ্যাতিমান
পুত্র রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ছিলেন
‘নতুন
দাদা’।
দ্বিতীয় পুত্র
ডাকসাইটে আইসিএস
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
কাছে ‘নতুন’।
যথেষ্ট মেধাবী,
সৃজনশীল, সংস্কৃতমনা,
বাউণ্ডুলে, নাট্যামোদী,
নটীনী আসক্ত
জ্যোতি নয়
বছর বয়সী
যে মেয়েটিকে
বিয়ে করলেন
কিংবা করতে
বাধ্য হলেন
জাত্যভিমানী ঠাকুরবাড়ির
অনেকেই যে
পরিবারের জন্য
তাকে কবুল
করবেন না
এটা অপ্রত্যাশিত
ছিল না।
মেয়েটি যে
নতুনের উপযুক্ত
নয় আইসিএস
বাবু তা
কাগজে-কলমে
লিখলেন আর
তার বিলেতি
বাতাস-লাগা
স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী
চরম উপেক্ষা
দিয়ে মেয়েটিকে
কিংবা ছোট
বউটিকে একেবারে
প্রান্তে ঠেলে
দিলেন।
নতুন কিংবা
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
বিয়ের আগের
কয়েকটি বিয়ের
প্রসঙ্গ আনতেই
হয়। ২৬
নভেম্বর ১৮৬৩
দেবেন ঠাকুরের
তৃতীয় পুত্র
হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
বিয়ে সাঁতরাগাছির
হরদেব চট্টোপাধ্যায়ের
মেয়ে নৃপময়ীর
সঙ্গে। সে
কাহিনী এবং
দেবেন ঠাকুরের
চতুর্থ পুত্র
বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে
স্বামী হিসেবে
পাওয়ার কাহিনী
শুনিয়েছেন নৃপময়ীর
ছোট বোন
প্রফুল্লময়ী দেবী:
‘নৃপময়ীর
বিবাহের সময়
আমাদের দিকে
মহাগণ্ডগোল উপস্থিত
হয়। আমাদের
জ্ঞাতিকুটুম্বেরা সকলেই
মনে করিলেন
এই বিবাহ
হইলে তাঁহাদের
জাত নষ্ট
হইবে (কারণ
দেবেন ঠাকুরদের
স্ট্যাটাস নিচু,
তারা পিরালি
ব্রাহ্মণ) সেই
আক্রোশে একজন
লাঠিয়াল ঠিক
করিয়া রাখিলেন
যে যখন
বর সভায়
আসিবে তাহাকে
লাঠির ঘায়ে
শেষ করিয়া
কনেকে তুলিয়া
লইয়া যাইবেন।
এই তার
পাইবামাত্র আমার
ভাই দুর্গাপ্রসন্ন
পুলিশের সাহায্য
লইয়া যাহাতে
বিবাহে কোনোরূপ
বাধাবিঘ্ন না
ঘটে তাহার
জন্য সার্জেন
কনস্টেবল পুলিশের
পাহারা বসাইয়া
রাাখিলেন। ভাগ্যক্রমে
কোনো বিপদ
ঘটে নাই।...অগ্রহায়ণ
মাসে গোধূলি
লগ্নে বিবাহ
হইয়াছিল। দিদির
বিবাহের পর
আমি প্রায়ই
মায়ের সাথে
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে
আসা যাওয়া
করিতাম। সেই
সময় আমাকে
দেখিয়া আমার
ননদ স্বর্ণকুমারী
ও শরত্কুমারীর
পছন্দ হওয়াতে
আমার স্বামীকে
বিবাহ করিবার
জন্য বারবার
অনুরোধ করিতে
থাকেন।...সেই
বছর ফাল্গুন
মাসের ৮ই
তারিখে আমার
বিবাহ হয়।
দিদির বিবাহের
দুই বৎসর
পরেই ওই
বাড়িতে মহর্ষির
চতুর্থ পুত্র
ধীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
সাথে আমার
বিবাহ হইয়াছিল,
তখন আমার
বয়স বারো
বৎসর ছয়
মাস মাত্র।’
নৃপময়ী আর
প্রফুল্লময়ী কিছুটা
উঁচু বংশের
তাই ঝামেলা
তেমন হয়নি।
বিয়ের পরদিন
তার দেবর
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
গয়নার বাক্সসহ
কনের বাড়িতে
এলেন, পাল্কিতে
উঠিয়ে প্রথমে
জাহাজে এবং
তারপর চার
ঘোড়ার গাড়িতে
চাপিয়ে বৌদিকে
নিয়ে গেলেন
জোড়াসাঁকের ঠাকুরবাড়িতে।
***
সেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ
ক’বছরের
মধ্যেই ৪
জুলাই ১৮৬৮
(২৩ আষাঢ়
১২৭৫) বিয়ে
করলেন। বৌটি
আহামরী সুন্দরী
কেউ নন।
ঠাকুরদেরই বেতনভোগী
সরকারের এক
কন্যা। সেই
সরকারের নাম
শ্যামলাল গাঙ্গুলি।
আর কন্যাটি
কাদম্বরী গাঙ্গুলি
কিংবা গঙ্গোপাধ্যায়।
তার জন্ম
৫ জুলাই
১৮৫৯। শ্যামলাল
দূর সম্পর্কের
আত্মীয়ও; শ্যামলালের
বাবা জগন্মোহন
দেবেন ঠাকুরের
বাবা দ্বারকানাথ
ঠাকুরের মামাতো
বোনকে বিয়ে
করেছিলেন।
জ্যোতির জন্য
পাত্রী যে
শনাক্ত হয়েছে
তা আইসিএস
দাদা সত্যেন
জেনে ক্ষুব্ধ
হয়েছেন। স্ত্রী
জ্ঞানদাকে চিঠিতে
লিখেছেন, ‘শ্যাম
গাঙ্গুলির ৮
বৎসরের মেয়ে—আমি
যদি নতুন
হতাম তবে
কখনোই এ
বিবাহে সম্মত
হইতাম না।
কোন হিসাবে
যে এ
কন্যা নতুনের
উপযুক্ত হইয়াছে
জানি না।’
বাড়ির কর্মচারীর
কন্যার সাথে
তাদের এমন
চৌকস ভাইটির
বিয়ে হতে
পারে না।
সত্যেন আরো
লিখেছেন, ‘শ্যামবাবুর
মেয়ে মনে
করিয়া আমার
কখনোই মনে
হয় না
যে ভালো
মেয়ে হইবে—কোনো
অংশেই জ্যোতির
উপযুক্ত তাহাকে
মনে হয়
না।’
জ্যোতির শ্বশুর
ঠাকুরবাড়ির সরকার
হিসেবে কত
বেতন পেতেন
তা নিশ্চিত
হওয়া যায়নি।
অবশ্য বাড়ির
সামনের বাগানের
আর আস্তাবলের
সামনের দেয়াল
নির্মাণের দায়িত্ব
পালন করে
শ্যামলাল ১০০
টাকা আগাম
নিয়েছিলেন, এই
রেকর্ড আছে।
রবীন্দ্রনাথের শ্বশুর
ঠাকুরবাড়ির সেরেস্তার
কর্মচারী বেনীমাধব
রায় চৌধুরীর
মাসান্তে বেতন
ছিল ১২
টাকা, তার
প্রমাণ পাওয়া
গেছে। অথচ
তখন জামাতার
থাকা-খাওয়া
আয়েশি কেনা-কাটা
বাদে কেবল
হাতখরচই ধার্য
ছিল দু’শত
টাকা। সমীর
সেনগুপ্ত লিখেছেন,
‘একে
পিরালী তায়
ব্রাহ্ম—এই
দুই কারণের
সমাহারের ফলে
সমমর্যাদার পরিবার
থেকে বধূ
সংগ্রহ করতে
পারা দেবেন্দ্রনাথের
মতো প্রভাবশালী
মানুষের পক্ষেও
অসম্ভব হয়ে
দাঁড়িয়েছিল।’ ঠাকুরবাড়ির
নিচতলাটা প্রকাণ্ড
হলেও বহু
সংখ্যক কর্মচারীর
বসবাসের কারণে
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়
‘একেবারে
পায়রার খোপ
হয়ে উঠেছিল...তারা
কখনো আত্মমর্যাদা
অনুভব করতে
পারেনি। তখনকার
দিনে দেশের
অন্য মেয়েদের
মতো অভ্যস্ত
অজ্ঞানতা ও
অন্ধকারের মধ্যে
তারা জন্মগ্রহণ
করেছিল। তারা
পরস্পরে ঈর্ষা
করেছে, নিজেদের
মধ্যে বিরোধ
সৃষ্টির দ্বারা
যতরকম কুচিন্তার
প্রশ্রয় দিয়েছে।
মানুষের জগতে
তাদের স্থান
কত তলায়,
তা বোধ
করিবার শক্তি
তাদের ছিল
না।’
রবীন্দ্রনাথের বিবরণ
একপেশে ও
উন্নাসিক মনে
হতে পারে—জানা
আবশ্যক এখানেই
শ্যামলাল গাঙ্গুলির
পরিবার বাস
করত, কাদম্বরী
বেড়ে উঠেছেন
এখানেই। এই
কাদম্বরীকে যে
ঠাকুরবাড়ির বৌমা
হিসেবে পাওয়া
গেছে দেবেন
ঠাকুর মনে
করেছেন সেটা
তাদের ভাগ্য:
‘জ্যোতির
বিবাহের জন্য
একটি কন্যা
পাওয়া গিয়াছে
এই-ই
ভাগ্য। একে
তো পিরালি
বলিয়া ভিন্ন
শ্রেণীর লোকেরা
আমাদিগের সঙ্গে
বিবাহেতে যোগ
দেয় না,
তাহাতে আবার
ব্রাহ্মধর্ম অনুষ্ঠান
জন্য পিরালিরা
আমাদিগকে ভয়
করে।’
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও
কাদম্বরীর বিয়ের
সংবাদটি প্রকাশিত
হয়: ‘ব্রাহ্ম
বিবাহ। গত
২৩ আষাঢ়
(৫ জুলাই
১৮৬৮) ব্রাহ্মসমাজের
প্রধান আচার্য্য
শ্রদ্ধাষ্পদ শ্রীযুক্ত
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
মহাশয়ের পঞ্চম
পুত্র শ্রীমান
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
সহিত কলিকাতা
ণিবাসী শ্রীযুক্ত
বাবু শ্যামলাল
গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয়
কন্যার যথাবিধি
ব্রাহ্মধর্ম্মের পদ্ধতি
অনুসারে শুভ
বিবাহ সমারোহ
পূর্বক সম্পন্ন
হইয়া গিয়াছে।
বিবাহ সভায়
বহুসংখ্যক ব্রাহ্ম
এবং এতদ্দেশীয়
প্রধান প্রধান
অধ্যাপক ব্রাহ্ম
সকল উপস্থিত
ছিলেন। দরিদ্রদিগকে
প্রচুর ভক্ষ্য
ভোজ্যে পরিতৃপ্ত
করিয়া বিস্তর
অর্থ প্রদান
করাও হইয়াছিল।’
রবীন্দ্রনাথের বিয়ে
জ্যোতির
বেলায় যেমন
রবির বেলায়ও
একই রকম
পাত্রী সংকট।
তার পরও
অনেক খোঁজখবর
করে যে
মেয়েটিকে পাওয়া
গেল সে
ঠাকুর জমিদারির
কর্মচারীর কন্যা।
ইন্দিরা দেবীর
বর্ণনা: ‘পূর্ব
প্রথানুসারে রবি
কাকার কনে
খুঁজতেও তার
বউ ঠাকুরানীরা
তার মানে
মা আর
নতুন কাকিমা,
জ্যোতি কাকা
মশায় আর
রবিকাকাকে সঙ্গে
বেঁধে নিয়ে
যশোর যাত্রা
করলেন। যশোরে
নরেন্দ্রপুরে ছিল
আমার মামার
বাড়ি। সেখানেই
আমরা সদলবলে
আশ্রয় নিলুম।...’
নতুন কাকিমা
মানে কাদম্বরী
দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথও
ছিলেন। রবি
ঠাকুর তো
আছেনই।
এ সময়
যে নির্মম
যন্ত্রণা কাদম্বরীকে
সইতে হয়েছে
তা আঁচ
করা যায়।
সার্চ পার্টি
জবরদস্ত হলেও
পাত্রী মিলছিল
না। ইন্দিরা
দেবীর ‘রবীন্দ্র
স্মৃতি’ থেকে
আরো খানিকটা
উদ্ধৃত হচ্ছে:
‘কিন্তু
দুঃখের বিষয়
তখন বোধহয়
যশোরের সুন্দরীকুল
উজাড় হয়ে
গিয়েছিলেন। কারণ
তাঁরা দক্ষিণডিহি
চেঙ্গট প্রভৃতি
সব পাড়া
খুঁজেও মনের
মতো মেয়ে
পেলেন না।
অবশেষে যার
সঙ্গে কথা
ঠিক করলেন,
তিনি ফুলতলার
বেনী রায়ের
মেয়ে, যিনি
জোড়াসাঁকো বাড়ির
দপ্তরে কাজ
করতেন। নাম
ছিল ভবতারিণী।
বিয়ের পর
সেটি বদলে
মৃণালিনী করে
দেওয়া হল,
বোধহয় রবির
সাথে মিলিয়ে।
কাকিমা দেখতে
ভালো ছিলেন
না, কিন্তু
খুব মিশুক
ও পরকে
আপন করবার
ক্ষমতা ছিল,
যেটা আমি
বলি যশুরে
মেয়েদের সাধারণ
গুণের মধ্যে।’
এই পাত্রী
দেখার মর্মান্তিক
চাপ (অন্তত:
কাদম্বরীর জন্য)
সইতে না
পেরে রবীন্দ্রনাথের
নতুন বৌঠান
অসুস্থ হয়ে
পড়েন।
নতুন বৌঠানের
সাথে সম্পর্কটি
যে বিয়ের
কারণে ক্ষতিগ্রস্ত
হতে পারে
কিংবা তার
বিয়ে কাদম্বরীকে
বিপন্ন করে
তুলতে পারে
এমন কিছু
রবীন্দ্রনাথ আগাম
লেখেননি, কিংবা
তিনি যে
বিয়েতে অনাগ্রহী
তার এমন
কোনো অভিব্যক্তিও
প্রকাশিত হয়নি।
পারিবারিক আয়োজনে
নিমন্ত্রণপত্র বিতরণ
করা না
হলেও রবীন্দ্রনাথ
হাতে লিখে
প্রিয় ক’জন
বন্ধুকে বিয়েতে
হাজির থাকার
আমন্ত্রণ জানান:
প্রিয় বাবু...,
আগামী রবিবার
২৪ আগ্রহায়ণ
শুভদিনে শুভলগ্নে
আমার পরমাত্মীয়
শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের বিবাহ
হইবেক। আপনি
তদুপলক্ষে বৈকালে
উক্ত দিবসে
৬ নং
জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ভবনে
উপস্থিত থাকিয়া
বিবাহাদি সন্দর্শন
করিয়া আমাকে
এবং আত্মীয়বর্গকে
বাধিত করিবেন।
ইতি/অনুগত
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিয়েটা রবীন্দ্রনাথ
বেশ উপভোগই
করেছেন, কাদম্বরীর
যাতনা কতটা
পায়ে মেখেছেন
বলা কষ্টসাধ্য।
অন্তত বিয়ের
অনুষ্ঠানগুলোয় তিনি
বিষণ্ন হয়ে
আছেন এমন
বিবরণ কেউ
দেননি। অবনীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের বর্ণনায়
গায়ে হলুদ
পরবর্তী আইবুড়োভাত
অনুষ্ঠানের বর্ণনা:
‘গায়ে
হলুদ হয়ে
গেল। আইবুড়োভাত
হবে। তখনকার
দিনে ও
বাড়ির কোনো
ছেলের গায়ে
হলুদ হয়ে
গেলেই এ
বাড়িতে তাকে
নেমন্তন্ন করে
প্রথম আইবুড়োভাত
খাওয়ানো হত।...মা
গায়ে হলুদের
পর রবিকাকাকে
আইবুড়োভাতের নেমন্তন্ন
করলেন। মা
খুব খুশী,
একে যশোরের
মেয়ে তার
রথীর মার
সম্পর্কের বোন।
খুব ধুমধামে
খাওয়ার ব্যবস্থা
হল। রবিকাকা
খেতে বসেছেন
উপরে, আমার
বড়োপিসিমা কাদম্বিনী
দেবীর ঘরে
সামনে আইবুড়োভাত
সাজানো হয়েছে—বিরাট
আয়োজন। পিসিমারা
রবিকাকাকে ঘিরে
বসেছেন এ
আমাদের নিজের
চোখের দেখা।
রবিকাকা গৌড়দার
শাল গায়ে,
লাল কী
সবুজ রঙের
মনে নেই
তবে খুব
জমকালো রঙচঙের।
বুঝে দেখো
একে রবিকাকা
তার ওই
সাজ, দেখাচ্ছে
যেন দিল্লির
বাদশা। তখনই
ওর কবি
বলে খ্যাতি,
পিসিমারা জিজ্ঞেস
করছেন কী
রে বউ
দেখেছিস পছন্দ
হয়েছে?’
বিয়ের দিনের
বর্ণনা দিয়েছেন
হেমলতা দেবী:
কনে এনে
সাত পাক
ঘুরানো হলো—শেষে
বরকনে দালানে
চললেন সম্প্রদান-স্থলে।
বাড়ির অবিবাহিত
বড় মেয়েগুলি
সঙ্গে সঙ্গে
চলল। আমিও
ছুটে গেলুম
তাদের সঙ্গে।...সম্প্রদানের
পর বরকনে
এসে বাসরে
বসলেন। রবীন্দ্রনাথের
বউ এলে
তার থাকবার
জন্য একটি
ঘর নির্দিষ্ট
করা ছিল
আগে থেকেই।
বাসর বসল
সেই ঘরেই।
বাসরে বসে
রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি
আরম্ভ করলেন।’
দুষ্টুমি করে
তিনি নববিবাহিত
স্ত্রীর দিকে
তাকিয়ে গাইতে
লাগলেন, আ
মরি লাবণ্যময়ী।
‘বেচারী
কাকিমা রবীন্দ্রনাথের
কাণ্ড দেখে
জড়োসড়ো। ওড়নায়
মুখ ঢেকে
মাথা হেট
করে বসে
আছেন।’
সাধারণী পত্রিকা
এ বিয়ের
সংবাদ ছেপেছে।
গত রবিবার
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের
কনিষ্ঠপুত্র শ্রীযুক্ত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
শুভ বিবাহ
অতি সমারোহের
সহিত সুসম্পন্ন
হইয়া গিয়াছে।
বিবাহটি যে
ব্রাহ্মমতে সাধন
হইয়াছে বলা
বাহুল্য পাত্রটিকে
নাকি যশোর
হইতে আনা
হইয়াছে।
বিয়ের পর
জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর
হাত ধরে
সূচনা হয়
ভবতারিনী ওরফে
মৃণালিনীর সংসার
জীবন এবং
শিক্ষাজীবনের। জ্ঞানদা
মোটেও পছন্দ
করেননি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
স্ত্রী কাদম্বরীকে।
কাদম্বরীর আত্মহনন
নতুন
দাদার বউ
ঠাকুরবাড়িতে এলেন।
এ বাড়ির
সঙ্গে মানিয়ে
নেয়ার চেষ্টাও
করেননি। প্রশান্ত
কুমার পাল
রবিজীবনীর দ্বিতীয়
খণ্ডে তুলে
এনেছেন কাদম্বরী
কাহিনী:
রবীন্দ্রনাথ যাকে
জীবনের ধ্রুবতারা
বলে সম্বোধন
করেছিলেন সেই
নতুন বৌঠান
কাদম্বরী দেবী
পঁচিশ বছর
পূর্ণ হবার
আগেই আত্মহত্যা
করলেন। ঠাকুর
পরিবারে আধুনিকতার
মুক্ত হাওয়া
প্রবাহিত করে
দেবার ক্ষেত্রে
মহর্ষির পুত্রবধূদের
মধ্যে জ্ঞানদানন্দিনী
দেবীর পরে
কাদম্বরী দেবীর
স্থান। এক
সময়ে তিনি
লোকলজ্জাকে তুচ্ছ
করে স্বামীর
পাশাপাশি চিত্পুরের
রাস্তায় ও
গড়ের মাঠে
ঘোড়া ছুটিয়ে
যেতেন; জোড়াসাঁকোর
বহির্বাটীর ত্রিতলে
তার বানানো
‘নন্দনকানন’
সঙ্গীত ও
সাহিত্যচর্চায় নিত্য
মুখরিত হয়ে
উঠত; ভারতী
গোষ্ঠীর তিনি
ছিলেন মক্ষীরানী...রবীন্দ্রনাথ
জীবন স্মৃতির
ছেলেবেলা এবং
বিভিন্ন রচনায়
ও কথোপকথনে
এই নারীর
প্রতি তার
অকৃত্রিম অনুরাগ
ও শ্রদ্ধার
কথা জানিয়েছেন।
সুতরাং তার
আত্মহনন স্বভাবতই
সকলের কৌতূহল
উদ্রেক করে।’
তার মৃত্যুর
কারণ নিয়ে
পাশাপাশি দুটো
স্কুলের ভাবনা
বিদ্যমান। একটিতে
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়,
প্রশান্ত কুমার
পাল, ঠাকুরবাড়ির
স্বজন লেখকবৃন্দ
এটাকে একটি
দুঃখজনক ঘটনা
মনে করলেও
এর দায়
রবীন্দ্রনাথের ওপর
চাপাতে আদৌ
সম্মত নন।
আবার যারা
নতুন বৌঠানের
সাথে রবীন্দ্রনাথের
সম্পর্কটি গভীর
প্রেমের বিবেচনা
করেছেন তারা
রবীন্দ্রনাথের বিয়ে,
উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিলেত
সফর এসবকে
দেখছেন অনেকটাই
প্রতারণা হিসেবে।
একদিকে কাদম্বরীর
স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
নিস্পৃহতা, অন্য
নারীতে আসক্তি,
নিজের সন্তানহীনতা
এবং শেষ
পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের
নিঃশব্দ প্রতারণায়
নিজের জীবনটা
তার কাছে
অর্থহীন হয়ে
পড়ে—তিনি
আত্মহননের পথ
বেছে নেন।
এ নিয়ে
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ
আরো কেউ
কেউ ফিকশন
ও নন-ফিকশন
রচনা করেছেন।
প্রশান্ত কুমার
পালের রবিজীবনী
থেকে প্রাসঙ্গিক
কয়েকটি উদ্ধৃতি
তুলে ধরছি।
১. কাদম্বরী
দেবীর আকস্মিক
মৃত্যুর কারণ
সম্বন্ধে লোকে
বহুরূপ কল্পনা
করিয়া থাকেন—আমাদের
যতদূর জানা
আছে তাহা
মহিলাদের দ্বন্দ্বের
পরিণাম।
২. কাজী
আব্দুল ওদুদের
লেখা, রবীন্দ্রনাথের
ছোটদি বর্ণকুমারীর
সূত্রে: জ্যোতিরিন্দ্রনাথের
ধোপার বাড়িতে
দেওয়া জোব্বার
পকেটে সেই
দিনের একজন
বিখ্যাত অভিনেত্রীর
সঙ্গে তাঁর
অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক
কতকগুলো চিঠি
পাওয়া যায়।
সেই চিঠিগুলো
পেয়ে কাদম্বরী
দেবী ক’দিন
বিমনা দিন
কাটান। সেই
চিঠিগুলোই নাকি
তার আত্মহত্যার
কারণ। এই
কথা নাকি
কাদম্বরী দেবী
লিখে গিয়েছিলেন!
তার সেই
লেখাটি ও
চিঠিগুলো সবই
মহর্ষির আদেশে
নষ্ট করে
ফেলা হয়।
এই রচনার
পাদটীকায় ওদুদ
লিখেছেন: ঠাকুরবাড়ির
একজন খ্যাতনামা
ব্যক্তির মুখে
শুনেছি যে
মহিলার সঙ্গে
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গতা
জন্মেছিল তিনি
অভিনেত্রী ছিলেন
না এবং
তার সঙ্গে
এই অন্তরঙ্গতার
জন্য কাদম্বরী
দেবী আরও
একবার (রবীন্দ্রনাথের
বিবাহের পূর্বে)
আত্মহত্যার চেষ্টা
করেছিলেন।
৩. রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের বোন
সুনয়না দেবীর
বক্তৃতার অংশ
উদ্ধৃত করেছেন
জগদীশ ভট্টাচার্য:
আর-একদিনের
কথা মনে
আছে। যেদিন
জ্যোতিকাকার স্ত্রী
কাদম্বিনী (কাদম্বরী)
দেবী মারা
যান। আপনারা
জানেন তিনি
আত্মহত্যা করেছিলেন।
কারণটা আমরা
ঠিক জানিনে।
তবে শুনেছি
জ্যোতিকাকার সঙ্গে
তার কি
নিয়ে মনোমালিন্য
হয়েছিল। সেই
সময় আমাদের
বাড়িতে এক
কাপড়উলী প্রায়ই
কাপড় বেচতে
আসত। তাকে
টাকা দিয়ে
তিনি লুকিয়ে
আফিম আনেন—তাই
খেয়ে আত্মহত্যা
করেন। আমরা
এ বাড়ির
জানালা থেকে
দেখেছি। তার
মৃতদেহ পড়ে
আছে। সারা
বাড়িতে শোকের
ছায়া।
৪. প্রভাতকুমার
মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রজীবনী
প্রথম খণ্ডের
নবতম সংস্করণে
কাদম্বরী দেবীর
আত্মহত্যার জন্য
প্রায় সরাসরি
জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে দায়ী
করেছেন।
৫. সুনয়না
দেবীর বর্ণনামতো
আফিম সেবনের
ফলে মৃত
অবস্থায় তার
দেহ আবিষ্কৃত
হয়নি, তার
জীবন রক্ষার
জন্য বহু
ডাক্তার প্রাণপণ
চেষ্টা করার
সুযোগ পেয়েছেন—অবশ্য
বলা বাহুল্য
তাদের প্রয়াস
শেষ পর্যন্ত
সার্থক হয়নি।—এ
বিশ্লেষণ প্রশান্ত
কুমার পাল
করেছেন, ঠাকুরবাড়ির
ক্যাশবই ঘেঁটে
তিনি খরচসহ
দুজন ডাক্তারের
প্রাণপণ চেষ্টার
বিষয় উল্লেখ
করেছেন।
৬. অস্বাভাবিক
মৃত্যু বলেই
পুলিশকে জানাবার
দায়িত্ব পালন
করতে হয়েছিল।
কিন্তু মহর্ষির
পরিবারের উচ্চমর্যাদার
জন্যে কাদম্বরী
দেবীর মৃতদেহ
মর্গে প্রেরিত
হয়নি। পরিবর্তে
করোনার কোট
বসেছিল জোড়াসাঁকোর
বাড়িতে।...পণ্ডিত
হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নের
তত্ত্বাবধানে নিমতলা
ঘাটের শ্মশানে
কাদম্বরী দেবীর
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যথোচিত
মর্যাদাসহকারে সম্পন্ন
করা হয়।
(সমুদয়
খরচ ক্যাশবই
থেকে উদ্ধৃত
করা হয়েছে,
এমনকি কাদম্বরীর
আত্মহত্যার সংবাদ
প্রকাশ প্রতিহত
করতে যে
অর্থ ব্যয়
করা হয়েছে
তাও অংকসহ
উদ্ধৃত হয়েছে।
সংবাদ না
ছাপার উেকাচ:
৫২ টাকা।
কাদম্বরী একবার
স্বামীর সাথে
বেড়াতে গিয়েছিলেন।
বিরহতাপিত দেবর
তখন লিখেছিলেন:
চলে গেল,
আর কিছু
নাহি কহিবার
চলে গেল,
আর কিছু
নাহি গাহিবার।
শুধু গাহিতেছে
আর শুধু
বলিতেছে
চলে গেল
সকলেই, চলে
গেল সকলেই
গো,
বুক শুধু
ভেঙ্গে গেল
চলে গেল
গো।
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের
চার মাস
পর ১৯
এপ্রিল ১৮৮৪
কাদম্বরী মৃত্যুকে
বরণ করার
জন্য জেনেশুনে
আফিম খেয়েছেন,
২১ এপ্রিল
১৮৮৪ তিনি
সত্যিই মৃত্যুবরণ
করলেন।
কাদম্বরী আর
নয়নসম্মুখে নেই,
ঠাঁই নিয়েছেন
নয়নের মাঝখানে।
‘হে
জগতের বিস্মৃত
আমার চিরস্মৃত
আগে তোমাকে
যেমন গান
শুনাইতাম এখন
তোমাকে তেমন
শুনাইতে পারি
না কেন?
এসব লেখা
যে তোমার
জন্য লিখিতেছি।
পাছে তুমি
আমার কণ্ঠস্বর
ভুলিয়া যাও
অনন্তপথে চলিতে
চলিতে যখন
দৈবাৎ তোমাতে
আমাতে দেখা
হইবে তখন
পাছে তুমি
আমাকে চিনিতে
না পার,
তাই প্রতিদিন
তোমাকে স্মরণ
করিয়া আমার
এই কথাগুলি
তোমাকে বলিতেছি,
তুমি শুনিতেছ
না।
(পুষ্পাঞ্জলি:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
বৌঠান কাদম্বরীকে
নিয়ে ঠাকুরপো
রবির আরেকটি
উক্তি ‘মনে
পড়ে আমার
নতুন বৌঠানকে।...যারা
মরে যায়
তাদের বয়স
আর বাড়ে
না। আমার
নতুন বৌঠান,
তার আর
বয়স হলো
না কোনদিন।’
কাদম্বরী এখনো
পঁচিশ, অনন্তকাল
পঁচিশই থাকবেন।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





