স্পেনের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে কেপ ভার্দে। ইংল্যান্ডকে হতাশ করেছে ঘানা। জার্মানিকে হারিয়ে দিয়েছে একুয়েডর। আবার কুরাসাও পয়েন্ট কেড়ে নিয়েছে একুয়েডরের কাছ থেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়েছে কীভাবে কম বল দখলে রেখেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়া যায়। র্যাংকিংয়ের হিসাবে যেসব দল প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, তারাই মাঠে তৈরি করছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ বলছে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অঘটন নয়। এর পেছনে আছে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং প্রতিপক্ষের শক্তিকে তাদের বিপক্ষেই ব্যবহার করার কৌশল।
বিশ্বকাপের শুরুতে সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি ছিল স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের গোলশূন্য ড্র। ইতিহাসের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলটি কাগজে-কলমে অনেক দুর্বল হলেও মাঠে তারা ছিল অসাধারণ সংগঠিত। পুরো ম্যাচজুড়ে তারা ৪-৫-১ ফরমেশনে এমন একটি লো ব্লক গড়ে তোলে, যেখানে মিডফিল্ড ও রক্ষণভাগের মাঝখানে কার্যত কোনো জায়গাই ছিল না। স্পেন বল ঘুরিয়েছে, পজিশন বদলেছে, পেছনে খেলেছে তবু কেপ ভার্দে নিজেদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসেনি। প্রতিপক্ষকে ফাঁকা জায়গা দেয়ার বদলে তারা অপেক্ষা করেছে সঠিক মুহূর্তের জন্য। ফলে স্পেন মাঝমাঠ দিয়ে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি, বাধ্য হয়েছে দুই প্রান্ত কিংবা লম্বা বলের ওপর নির্ভর করতে।
একই কৌশল দেখা গেছে ঘানার খেলাতেও। থমাস টুখেলের অধীনে ইংল্যান্ড বিল্ডআপের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বল পেছনে খেলতে ভালোবাসে। উদ্দেশ্য একটাই প্রতিপক্ষকে ওপরে টেনে এনে মাঝখানে জায়গা তৈরি করা। কিন্তু ঘানা সেই ফাঁদে পা দেয়নি। জর্ডান আইয়ু একাই সামনে থেকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছেন, আর বাকি দল নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে পেনাল্টি বক্সের সামনে দুটি সুশৃঙ্খল লাইনে। ইংল্যান্ড যতই বল ঘুরিয়েছে, ঘানার রক্ষণভাগ ততই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে। ফল প্রতিপক্ষ বলের দখল রাখলেও বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
আধুনিক ফুটবলে কোনো দল কতটা আগ্রাসীভাবে প্রেস করছে, তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো পাসেস পার ডিফেন্সিভ অ্যাকশন বা পিপিডিএ। এ সূচক যত বেশি, দলটি তত কম প্রেস করেছে। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের পিপিডিএ ছিল ৫১-এর বেশি, আর ঘানার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটে সেটি ছিল ৬০-এরও ওপরে। অর্থাৎ তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রতিপক্ষকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বল চালানোর সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো কখনোই ছেড়ে দেয়নি।
তবে শুধু রক্ষণে নেমে থাকাই যথেষ্ট নয়। কোন দল সফল হবে আর কে ভেঙে পড়বে, তা নির্ভর করছে লো ব্লকের গুণগত মানের ওপর। স্পেনের বিপক্ষে সৌদি আরবের ম্যাচটি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে মাঠে নামলেও সৌদি আরব বলের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েছিল। মিডফিল্ডও একপাশে সরে যাওয়ায় মাঠের অন্য প্রান্তে বিশাল ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। স্পেন সেটিই কাজে লাগায়। দ্রুত এক পাশ থেকে অন্য পাশে বল ঘুরিয়ে তারা দুই-এক পরিস্থিতি তৈরি করে এবং সেখান থেকেই আসে গোল।
নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ৫-৩-২ ফরমেশনে খেলা সুইডেনের মাঝমাঠ ছিল সংখ্যায় কম এবং প্রস্থজুড়ে ছড়িয়ে থাকতে ব্যর্থ। ডান দিক দিয়ে আক্রমণ গড়ে নেদারল্যান্ডস বারবার উইং-ব্যাককে বিচ্ছিন্ন করেছে। মিডফিল্ড বলের দিকে সরে আসায় বিপরীত পাশে তৈরি হয়েছে বিশাল জায়গা, যেটি কাজে লাগিয়ে সহজেই আক্রমণ করেছে ডাচরা। পরে সুইডেন ৪-৫-১ ফরমেশনে ফিরলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারলেও ততক্ষণে ম্যাচ অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে যায়। কেপ ভার্দে ও ঘানার সঙ্গে এখানেই পার্থক্য। তারা শুধু রক্ষণে লোক বাড়ায়নি, পুরো মাঠে ভারসাম্যও বজায় রেখেছে।
আন্ডারডগদের আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে বল পায়ে খেলার ধরনে। আগে দুর্বল দলগুলো চাপের মুখে পড়লেই গোলরক্ষকের কাছ থেকে লম্বা ক্লিয়ারেন্সে ভরসা করত। এখন তারা উল্টো ছোট পাসে খেলা শুরু করে প্রতিপক্ষকে ওপরে টেনে আনছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এ কৌশলের সবচেয়ে সফল উদাহরণ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ বলের দখল থাকলেও তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে দ্বিগুণ শট নিয়েছে। কারণ গোলকিক থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে বিল্ডআপ করেছে। প্রতিপক্ষ যখন সামনে উঠে প্রেস করেছে, তখন নির্ভুল লম্বা পাসে বল পৌঁছে গেছে মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগে। ফলে এক মুহূর্তেই রক্ষণ থেকে আক্রমণে রূপান্তর সম্ভব হয়েছে।
অবশ্য এ কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিল্ডআপে ভুল হলে নিজেদের অর্ধেই বল হারিয়ে গোল হজমের আশঙ্কা থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইরাক এমন পরিস্থিতিতে গোল খেয়েছে। কিন্তু তার পরও তারা একই দর্শনে অটল থেকেছে। কারণ পরিকল্পিত ঝুঁকি নেয়ার মধ্যেই তারা প্রতিপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পেরেছে এবং নিজেদের আক্রমণের সুযোগও তৈরি করেছে। আধুনিক ফুটবলে এটি এক ধরনের হিসাব কষে নেয়া ঝুঁকি, যেখানে সম্ভাব্য লাভের পরিমাণ ক্ষতির চেয়েও বেশি বলে মনে করছেন কোচরা।
তবে ট্যাকটিকসই সব নয়। ম্যাচের নির্দিষ্ট মুহূর্তে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছেন। কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম এক ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন।














