চ্যাম্পিয়ন—১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪। রানার্সআপ—১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬ ও ২০০২। তৃতীয় স্থান—১৯৩৪, ১৯৭০, ২০০৬ ও ২০১০। এর বাইরে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে ১৯৭২, ১৯৮০ ও ১৯৯৬ সালে। সেখানেও রানার্সআপ তিনবার। তবে জার্মানি তার সেই গৌরব হয়তো হারিয়ে ফেলেছে। প্যারাগুয়ের কাছে শেষ বত্রিশে হেরে গেছে জার্মানরা। বিশ্বকাপে ১২ বছরের মধ্যে প্রথমবার নকআউটের ম্যাচ খেলতে নেমেই হেরে বসেছে ‘ডাই ম্যানশাফট’রা। বোস্টন স্টেডিয়ামে ১-১ গোলের ড্র ম্যাচে টাইব্রেকারে জয় পায় প্যারাগুয়ে।

বিশ্বকাপে এর আগে কখনই টাইব্রেকারে হারেনি জার্মানি। তবে এ জার্মানি ছিল তাদের সোনালি যুগের দলটির ছায়া মাত্র। স্বর্ণযুগের জার্মানি দল হয়তো প্যারাগুয়েকে হারানোর কৌশল বের করে নিত। তবে ম্যানুয়েল নুয়্যার, কাই হাভার্টজরা পারেননি। জার্মানি এমন এক প্যারাগুয়ের কাছে হেরেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-৪ গোলে হেরেছে, আর অষ্টম হওয়ার আট দলের মধ্যে সপ্তম হয়ে জায়গা করে নেয় নকআউটে।

অতীতের অর্জনের কারণেই নাগেলসম্যানের দল বোস্টনে খেলতে নেমেছিল ফেভারিট হিসেবে। তাদের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। যদিও ‘ডাই ম্যানশাফট’দের মধ্যে সেই পুরনো জার্মানিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। সত্য হলো, এ ম্যাচে জিতলেও তাদের পরের রাউন্ডে হয়তো বিদায়ের মুখে পড়তে হতো, কারণ রোববার ভোরে ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোয় তাদের খেলতে হতো দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে।

এবার প্যারাগুয়ের কাছে পরাজয়টা জার্মান ফুটবলকে ওলট-পালট করে দিতে পারে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২২ সালে টানা দুইবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর এবার তারা বিদায় নিল ‘রাউন্ড অব ৩২’ থেকে, যেটি এক অর্থে গ্রুপ পর্বের মতোই। কেননা, আগে সব মিলিয়ে খেলত ৩২টি দেশ, আর এখন গ্রুপ পর্ব শেষে নকআউটেই উঠেছে ৩২টি দেশ।

গতকাল হারের পর জার্মানির কোচ নাগেলসম্যান বলেন, ‘আপনি যদি প্রথম রাউন্ডের পরই বিদায় নেন, তবে তা জার্মান ফুটবলের জন্য যথেষ্ট না। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার বিদায়। কাজেই আমরা আর কোনোভাবেই প্রথম সারির দল নই। আমি হতাশ।’

জার্মানিতে যখন বিষাদের ছায়া, শোকের মাতম তখন লাতিন আমেরিকার দেশটিতে উৎসবের আমেজ। প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট তো ম্যাচশেষেই একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। টুর্নামেন্টে পরের ম্যাচে যা-ই ঘটুক না কেন, বোস্টনের স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে তাদের।

জার্মানি ম্যাচের আগে কখনই বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে গোল করতে পারেনি প্যারাগুয়ে। হুলিও এনসিসকো গোল করে সেই ব্যর্থতা ঘুচিয়েছেন। এদিন দুর্ভেদ্য ডিফেন্স তৈরি করে তারা জার্মানিকে আটকে দিয়ে পরে টাইব্রেকারে জিতে পৌঁছে যায় শেষ ষোলোয়। টাইব্রেকারে জয়সূচক গোলটি করেন হোসে ক্যানালে। তার শটটিতে বল যখন জালে আশ্রয় নেয়, তখন গ্যালারিতে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ফুটবল ভক্তরা কেঁদে অভাবনীয়, ঐতিহাসিক এ জয় উদযাপন করেন।

এ হারের পর জার্মান ফুটবলে যা ঘটবে তা নিশ্চিতভাবেই নাগেলসম্যানের জন্য সুখকর হবে না। তা তিনি নিজেও অনুধাবন করতে পারছেন। এ কোচ বলেন, ‘সম্ভবত আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কিছু বিষয়ে সমাধান প্রয়োজন। আমি আজ বিস্তারিত বিষয়ে যাচ্ছি না, কিন্তু কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা জরুরি।’

প্যারাগুয়ের জন্য সময়টা শুধুই উদযাপনের, উপভোগের। সামনে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স হতে পারে, তা কোনোভাবেই তাদের আনন্দকে মাটি করতে পারছে না। বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে হারিয়ে আসা প্যারাগুইয়ানরা তাদের সিভিরা আরেকটু সমৃদ্ধ করল এবার জার্মানি বধের মধ্য দিয়ে। বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারানোর পর যে কল্পনার সুখরাজ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিলেন প্যারাগুয়ের সমর্থকরা, সেটি হয়তো সহসাই আসবে না, আর অতীতে তো আসেনিই।

বায়ার্ন মিউনিখ ছেড়ে ২০২৩ সালে জার্মানির দায়িত্ব নেন হেড কোচ নাগেলসম্যান। ২০২৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ পর্যন্ত তার চুক্তি রয়েছে। সোমবার হারের পর তাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে চান?’ হেঁটে যাওয়ার আগে তিনি উত্তর দেন, ‘আমি চাই। জার্মান এফএ যদি আমাকে চায়, আমি দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই। আমি জানি, অনেক মানুষ আমার বিদায় চাইবে, তবে এফএ চাইলে আমার দায়িত্ব পালন করে যেতে আপত্তি নেই। আমি আমার বসের কাছে অবশ্যই জবাবদিহি করব। এ মুহূর্তে জরিপ করলে অবশ্যই জার্মানির মানুষ আমাকে নিয়ে ইতিবাচক কথা বলবে না। এ টুর্নামেন্টে আমরা যথেষ্ট করিনি।’