সেবার স্পেনকে টাইব্রেকারে স্তব্ধ করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল লিখেছিল অ্যাটলাস সিংহরা। গতকাল সকালে তাদের শিকার নেদারল্যান্ডস, টোটাল ফুটবলের দেশ, কমলা ঐতিহ্যের বাহক। কিন্তু মরক্কোর সামনে সেই ঐতিহ্যও শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারল না। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ১-১ সমতা, তারপর টাইব্রেকারে ইয়াসিন বুনোর বীরত্বে ৩-২ জয়। ডাচদের জন্য এটি আরেক দুঃস্বপ্ন। টানা তিন বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে বিদায়। আর মরক্কোর জন্য কাতারের গল্প কোনো আকস্মিক বিস্ময় ছিল না; সেটি ছিল নতুন ফুটবল শক্তির জন্মকথা, যার গর্জন এখনো থামেনি।

মেক্সিকোর মনতেরে স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণের ধার, শরীরী ফুটবল সবখানেই মোহাম্মদ ওয়াহবির দল ছিল বেশি সংগঠিত, বেশি সাহসী। নেদারল্যান্ডস বরং অস্বাভাবিকভাবে রক্ষণাত্মক ছকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। রোনাল্ড কোম্যান তিন সেন্টারব্যাক,

দুই হোল্ডিং মিডফিল্ডার এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর আক্রমণভাগ নিয়ে এমন এক দল নামান, যেখানে আক্রমণাত্মক ফুটবলের চেয়ে সতর্কতাই ছিল মুখ্য।

প্রথমার্ধে মরক্কোর আক্রমণের বড় অংশ তৈরি হচ্ছিল বাম দিক দিয়ে। এল খানুস, আজ্জেদিন উনাহি ও আইয়ুব বুয়াদ্দি বারবার ডাচ রক্ষণে ফাঁক খুঁজছিলেন। হাকিমি ডান দিক থেকে উঠলেই নেদারল্যান্ডসের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল। একাধিকবার বার্ট ফেরব্রুগেনকে দুর্দান্ত সেভ করতে হয়েছে। গোলপোস্টের নিচে ডাচ গোলরক্ষক না থাকলে ম্যাচের ভাগ্য হয়তো নির্ধারিত সময়েই বদলে যেত। মরক্কোর প্রথম বড় সুযোগগুলোর একটি আসে কর্নার থেকে। নিল এল আয়নাউইয়ের হেড ঠেকিয়ে দেন ফেরব্রুগেন। এরপর দূর থেকে হাকিমির জোরালো শটও তিনি দারুণভাবে রুখে দেন। ডাচদের আক্রমণ ছিল বিরল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মিকি ফন ডে ফেনের দূরপাল্লার শটে ইয়াসিন বুনোকে প্রথমবার পরীক্ষায় পড়তে হয়। বুনো সেটিও সামলে মরক্কোর আত্মবিশ্বাস ধরে রাখেন।

দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কোর আধিপত্য আরো স্পষ্ট হয়। বিরতির পর তারা আরো সামনে উঠে আসে। ব্রাহিম দিয়াজ বল পায়ে জায়গা খুঁজতে থাকেন, উনাহি মাঝমাঠে জাদু আর শক্তির মিশ্রণ দেখান, আর হাকিমি যেন পুরো ডাচ রক্ষণকে নিজের গতিতে নাচিয়ে যাচ্ছিলেন। ৫৩ মিনিটে উনাহির পাস থেকে হাকিমির শট ক্রসবারে লাগে। দ্বিতীয়ার্ধের পানীয় বিরতির পর ডাচরা সামান্য ছন্দ ফিরে পায়। ক্রিসেনসিও সামারভিলের চাপে শুরু হওয়া পাল্টা আক্রমণে বল যায় কোডি গাকপোর পায়ে। মরক্কো তখন আক্রমণে উঠেছিল, ডাচরা সেই ফাঁক কাজে লাগায়। গাকপো শক্তিশালী শটে বুনোকে পরাস্ত করে নেদারল্যান্ডসকে ১-০-তে এগিয়ে দেন।

গোলটি ছিল ম্যাচের গতির বিপরীতে। কারণ পুরো ম্যাচে ডাচদের আক্রমণ ছিল অল্প, সুযোগ ছিল সীমিত। গাকপোর গোলের পর নেদারল্যান্ডস আরো নিচে নেমে যায়। কোম্যানের দল তখন আর খেলতে চায়নি, শুধু সময় কাটাতে চেয়েছে। ভার্জিল ফন ডাইক ৮০ মিনিটে সাইবারিকে ঠেকিয়ে বড় বিপদ সরান।

কিন্তু মরক্কো হাল ছাড়ার দল নয়। কাতারে স্পেনের বিপক্ষে যেমন তারা স্নায়ু ধরে রেখেছিল, এখানেও একই দৃঢ়তা দেখায়। ওয়াহবি একের পর এক পরিবর্তন আনেন। আক্রমণে গতি বাড়ে। শেষ মুহূর্তে মরক্কোর চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। যোগ করা সময়ে চেমসদিন তালবির মাপা ক্রসে বক্সে উঠে যান ইসা দিওপ। তার শক্তিশালী হেড ফেরব্রুগেনকে এবার আর কোনো সুযোগ দেয়নি। ১-১-এ সমতা। মনতেরের রাত তখন মরক্কোর গর্জনে কেঁপে ওঠে।