ম্যাচের আগে অধিনায়ক হ্যারি কেন সতীর্থদের বলেছিলেন, ‘মনে স্বাধীনতা রাখো, বিশ্বকাপের চাপকে উপভোগ করো।’ ইংলিশ ফুটবলাররা সেই বার্তাকেই যেন মাঠে বাস্তব রূপ দেন। ফলাফল ছিল রোমাঞ্চকর আক্রমণাত্মক ফুটবল, যদিও এর সঙ্গে ছিল রক্ষণভাগের কিছু উদ্বেগও।

গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ইউরো ২০২৪-এর ফাইনাল কিংবা ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেললেও ইংলিশদের ফুটবলে খুব বেশি রোমাঞ্চ ছিল না। তবে বুধবার দিবাগত রাত ২টায় ডালাসে দৃশ্যটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যাচের এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল না। প্রথমার্ধে টুখেলের ক্ষোভ, পরে ইংল্যান্ডের একের পর এক আক্রমণ—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর।

তবে আনন্দের মধ্যেও শঙ্কার জায়গা আছে। দুবার এগিয়ে গিয়েও ইংল্যান্ডকে সমতায় ফিরতে হয়েছে নিজেদের রক্ষণভাগের ভুলে। বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডদের বিপক্ষে এমন দুর্বলতা যে ভয়ংকর হতে পারে, সেটি নিশ্চয়ই টুখেলের নজর এড়ায়নি।

বিশেষ করে এজরি কনসাকে শুরু থেকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ছিল। ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার মার্ক গেহিকে বেঞ্চে রেখে সুযোগ পাওয়া অ্যাস্টন ভিলার এ ডিফেন্ডার খুব একটা আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারেননি। ক্রোয়েশিয়া দুবারই ইংল্যান্ডের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে পেয়েছে।

বিরতির আগে কেনের দুই গোল ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দিলেও ক্রোয়েশিয়া দুবারই ম্যাচে ফিরেছে। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জুড বেলিংহ্যামের গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মিডফিল্ড থেকে দুর্দান্ত দৌড়ে উঠে এসে তিনি মারিও পাসালিচকে পেছনে ফেলে গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচকে পরাস্ত করেন। এরপর ক্রোয়েশিয়া দীর্ঘ সময় নিজেদের অর্ধে আটকে ছিল। শেষ দিকে মার্কাস রাশফোর্ড গোল করে জয় নিশ্চিত করেন।

বেলিংহ্যাম ছিলেন দলের প্রাণশক্তি। অন্যদিকে ননি মাদুয়েকেকে শুরু থেকে খেলানোর সিদ্ধান্তও কাজে লেগেছে। তার গতির কাছে পিছিয়ে পড়ে লুকা মদ্রিচের দল শুরুতেই পেনাল্টি উপহার দেয়। কেনের প্রথম শট গোলরক্ষক ঠেকালেও লাইনের বাইরে এগিয়ে আসার কারণে পুনরায় পেনাল্টি নিতে হয়, আর দ্বিতীয় সুযোগ নষ্ট করেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি ছিল তার ১১৫ ম্যাচে ৮১তম গোল। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ডেও ভাগ বসান।

টুখেলের সাহসী মানসিকতারও প্রতিফলন দেখা গেছে বদলিতে। ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময়ও তিনি রক্ষণাত্মক হওয়ার পথ বেছে নেননি। ডেকলান রাইসের বদলে মর্গান রজার্স, অ্যান্থনি গর্ডনের জায়গায় রাশফোর্ড ও মাদুয়েকের বদলে বুকায়ো সাকাকে নামান। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবধান বাড়ানো, স্কোরলাইন ধরে রাখা নয়।

সাবেক ইংল্যান্ড তারকা ওয়েইন রুনি ম্যাচ শেষে বিবিসিকে বলেন, ‘এ বদলিগুলো দারুণ পছন্দ করেছি। টুখেল সাহস দেখিয়েছেন। তিনি জয়ের জন্য খেলেছেন।’ সাবেক গোলরক্ষক পল রবিনসনও মনে করেন, বেঞ্চ থেকে নামা খেলোয়াড়দের প্রভাব টুখেলের জন্য সুখকর ‘মাথাব্যথা’ তৈরি করবে।

বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথচলায় ইংল্যান্ডের সামনে আরো কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। রক্ষণভাগের দুর্বলতা দ্রুত ঠিক করতে না পারলে সমস্যা বাড়বে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—দলটি আর আগের মতো অতি-সতর্ক, নিস্তেজ ও রক্ষণাত্মক নয়। টুখেল শুরু থেকেই বলে আসছেন, তার লক্ষ্য জার্সিতে দ্বিতীয় তারকা যোগ করা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে কিনা তা সময় বলবে। কিন্তু ডালাসের রাত অন্তত জানিয়ে দিয়েছে, বহু বছর পর এমন এক ইংল্যান্ডের দেখা মিলেছে, যাদের খেলা দেখতে দেখতে সমর্থকরা গলা ফাটিয়ে গাইতে পারেন—‘ইটস কামিং হোম’।