তিন ম্যাচে ১০ গোল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ওসমান দেম্বেলের দুর্দান্ত ফর্ম, সঙ্গে মাইকেল অলিসে, ডিজিরে দুয়ে ও ব্র্যাডলি বারকোলার মতো একঝাঁক গতিময় আক্রমণশক্তি—সব মিলিয়ে দিদিয়ের দেশমের দলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে তাদের সামনে এবার সুইডেন। গ্রাহাম পটারের দল নকআউটে উঠেছে সেরা তৃতীয় দলগুলোর একটি হিসেবে। শক্তির বিচারে দুই দলের ব্যবধান স্পষ্ট। তাই আজ দিবাগত রাত ৩টায় নিউ জার্সির মঞ্চে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ফ্রান্সের আক্রমণের ঝড় সামলাতে পারবে সুইডেন?
ফ্রান্সের শক্তি নিয়ে নতুন করে বলার খুব বেশি কিছু নেই। সেনেগাল, নরওয়ে ও ইরাককে হারিয়ে গ্রুপ পর্বে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়েছে তারা। জয়গুলোও এসেছে দাপট দেখিয়ে। ব্লুজরা ১০ গোলের বিপরীতে হজম করেছে মাত্র দুটি। বিশ্বকাপে টানা সাফল্যের অভিজ্ঞতা, বড় ম্যাচে নিজেদের মানসিকতা ধরে রাখার ক্ষমতা এবং মুহূর্তেই ম্যাচের গতি বদলে দেয়ার সামর্থ্য ফ্রান্সকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
দিদিয়ের দেশমের দলকে ভয়ংকর করে তুলেছে তাদের আক্রমণের বহুমাত্রিকতা। এমবাপ্পে প্রতিপক্ষ রক্ষণের জন্য সবসময়ই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। তার গতি, জায়গা খুঁজে নেয়ার ক্ষমতা এবং ফিনিশিং ফ্রান্সকে যেকোনো মুহূর্তে গোলের কাছে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এবারের ফ্রান্স কেবল এমবাপ্পেনির্ভর নয়। ওসমান দেম্বেলে গ্রুপ পর্বে চার গোল করেছেন। নরওয়ের বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিকই বুঝিয়ে দিয়েছে, এমবাপ্পেকে আটকাতে গিয়ে প্রতিপক্ষ দেম্বেলেকে জায়গা দিলে তার মূল্য কতটা বড় হতে পারে।
এখানেই ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা। এমবাপ্পে না পারলে দেম্বেলে, দেম্বেলে না পারলে অলিসে, অলিসে না পারলে দুয়ে কিংবা বারকোলা—দেশমের হাতে বিকল্পের অভাব নেই। এ গভীরতাই ফ্রান্সকে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে ফেভারিট করে তোলে। মাইকেল অলিসে হাফ স্পেসে ঢুকে পাসের কোণ তৈরি করেন, ডিজিরে দুয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণরেখার মাঝের জায়গায় আক্রমণ করেন, আর বারকোলা গতি ও ড্রিবলিং দিয়ে ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বিপদে ফেলেন।
মাঝমাঠেও ফ্রান্সের ভারসাম্য চোখে পড়ার মতো। অরেলিয়েন চুয়ামেনি ও আদ্রিয়েন রাবিওর ডাবল পিভট শুধু প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙে না, দ্রুত বল সামনে পাঠিয়ে ফ্রান্সের দ্রুতগতির ট্রানজিশনও শুরু করে। এ কাঠামোর কারণেই ফ্রান্স একদিকে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অন্যদিকে সুযোগ পেলেই হঠাৎ আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। সেনেগালের বিপক্ষে প্রথমার্ধে খুব বেশি কার্যকর না হলেও দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের বদলে যাওয়া রূপ সেটিই দেখিয়েছে।
রক্ষণেও ফ্রান্স শক্তিশালী। মাইক মেনিয়ানের সামনে জুল কুন্দে, দায়ো উপামেকানো, উইলিয়াম সালিবা ও থিও হার্নান্দেজের সম্ভাব্য ব্যাকলাইন অভিজ্ঞতা, শারীরিক শক্তি ও গতির মিশ্রণে ভরপুর। সালিবা পিঠের সমস্যার কারণে নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্রামে থাকলেও সুইডেনের বিপক্ষে তার ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে সুইডেন গ্রুপ পর্বের শুরুতে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে দারুণ বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু পরের ম্যাচেই নেদারল্যান্ডসের কাছে ৫-১ ব্যবধানে হেরেছে তারা। শেষ ম্যাচে জাপানের সঙ্গে ১-১ ড্র করে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে ওঠে গ্রাহাম পটারের দল।
তিন ম্যাচে সাত গোল করার পাশাপাশি ৭টি গোলও খেয়েছে সুইডেন। ফলে সুইডেনের রক্ষণে দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। গুরুত্বপূর্ণ সেন্টারব্যাক ইসাক হিয়েন হ্যামস্ট্রিং চোটে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন। তার অনুপস্থিতিতে পটারকে রক্ষণ সাজাতে হচ্ছে নতুন করে। গুস্তাফ লাগেরবিয়েলকে, হালমার একদাল কিংবা গ্যাব্রিয়েল গুডমুন্ডসনের মতো ডিফেন্ডারদের সামনে এবার কঠিনতম পরীক্ষা। এমবাপ্পে-দেম্বেলের গতি সামলাতে হলে শুধু ব্যক্তিগত মার্কিং যথেষ্ট হবে না; পুরো রক্ষণকে একসঙ্গে সরে গিয়ে জায়গা বন্ধ করতে হবে।
তবে আক্রমণভাগে সুইডেনের আলেকজান্ডার ইসাক, ভিক্টর গিওকেরেস ও অ্যান্থনি এলাঙ্গা ফ্রান্সকে ভাবনায় ফেলতে পারেন। ইসাক এরই মধ্যে তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন। আর এলাঙ্গার গতি পাল্টা আক্রমণে সুইডেনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র।
সুইডেনের পরিকল্পনা তাই পরিষ্কার হওয়ার কথা। বলের দখলে তারা পিছিয়ে থাকবে, এ নিয়ে সন্দেহ কম। পটার সম্ভবত নিচু ব্লকে দল সাজাবেন। মাঝমাঠ ও রক্ষণকে কাছাকাছি রেখে ফ্রান্সের হাফ স্পেস বন্ধ করার চেষ্টা করবে সুইডেন। এমবাপ্পে ও দেম্বেলেকে একা একা ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হতে দিলে বিপদ অনিবার্য। শুধু রক্ষণ করে ফ্রান্সকে থামানো কঠিন। কারণ ফ্রান্স যত বেশি বল পাবে, তত বেশি তারা আক্রমণের পথ খুঁজে নেবে।
দুই দলের ইতিহাসও ম্যাচটিকে আলাদা মাত্রা দিচ্ছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে আগে কখনো মুখোমুখি হয়নি ফ্রান্স ও সুইডেন। তবে ইউরো ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কয়েকবার দেখা হয়েছে দুই দলের। ২০১২ ইউরোতে ইব্রাহিমোভিচের অসাধারণ ভলিতে সুইডেন ২-০ গোলে জিতেছিল। সাম্প্রতিক দেখায় অবশ্য ফ্রান্স এগিয়ে। সব হিসাবই ফ্রান্সের পক্ষে। তাই নিউ জার্সির লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের ফরাসি ঝড় সামলে শেষ বাঁশি পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে তো সুইডেন?
হালান্ডকে ঠেকানোই লক্ষ্য আইভরি কোস্টের: বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ডালাসে আলোটা স্বাভাবিকভাবেই থাকবে একজনকে ঘিরে—আরলিং হালান্ড। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচে চার গোল করে ফেলেছেন তিনি। আজ রাত ১১টায় হালান্ডের নরওয়ের সামনে এবার আইভরি কোস্ট। আইভরিয়ানরা চাইছে ম্যাচের আলো যেন না কাড়তে পারেন ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা। হালান্ডকে বল থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজেদের তরুণ ও বৈচিত্র্যময় আক্রমণভাগ দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ওঠার স্বপ্ন দেখছে আফ্রিকার দলটি।
ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন হালান্ড। এরপর সেনেগালের বিপক্ষেও দুটি গোল করে দলকে নিশ্চিত করেন নকআউট পর্বে। ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে বিশ্রাম দেয়ায় নরওয়ের আক্রমণ কতটা ভোঁতা হয়ে যায়, সেটিও পরিষ্কার দেখা গেছে। ফলে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে হালান্ডকে ঘিরেই সব পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে আইভরি কোস্টকে।
নরওয়ের আক্রমণের মূল ছন্দ আসে মার্টিন ওদেগার্দের পা থেকে। মাঝমাঠে তিনি সময় পেলেই হালান্ডের দৌড়ের সঙ্গে মিলিয়ে থ্রু বল কিংবা ক্রসের সুযোগ তৈরি করেন। দুই উইংয়ে আন্তোনিও নুসা ও আলেকজান্ডার সোরলথ রক্ষণকে চওড়া করে দেন, ফলে হালান্ড বক্সের ভেতরে জায়গা পান। ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে তার চার গোলই এসেছে এমন পরিস্থিতি থেকে, যেখানে সতীর্থরা তাকে সঠিক জায়গায় বল পৌঁছে দিতে পেরেছেন।
এ কারণেই আইভরি কোস্টের পরিকল্পনা শুধু হালান্ডকে মার্কিং করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কোচ এমের্স ফায়ে চাইবেন কেসিয়ে ও সাঙ্গারে মাঝমাঠে ওদেগার্দকে চাপের মধ্যে রাখুন, যাতে তিনি মাথা তুলে পাস দেয়ার সুযোগ না পান। একই সঙ্গে রক্ষণভাগকে কমপ্যাক্ট রেখে হালান্ডের দৌড়ের জায়গা সংকুচিত করাই হবে তাদের প্রথম লক্ষ্য।
এ ম্যাচে আইভরি কোস্টের ওসমান দিয়োমান্দের ওপরও থাকবে বাড়তি নজর। ইউরোপের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল এ সেন্টারব্যাককে শুধু শারীরিক লড়াই নয়, পজিশনিংয়েও নিখুঁত হতে হবে। হালান্ডকে একা অনুসরণ করতে গিয়ে যদি রক্ষণভাগে ফাঁক তৈরি হয়, তাহলে নরওয়ে সেটিই কাজে লাগাবে।
তবে ফায়ে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে চান না। তিনি বিশ্বাস করেন, নরওয়েকে রক্ষণে ব্যস্ত রাখতে পারলেই হালান্ডের প্রভাব কমবে। এ কারণেই ইয়ান দিয়োমান্দে, আমাদ দিয়ালো, নিকোলাস পেপে ও আঁজ-ইওয়ান বনির মতো দ্রুতগতির আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা রাখছেন তিনি। তাদের ধারাবাহিক অবস্থান পরিবর্তন নরওয়ের রক্ষণকে অস্থির করে তুলতে পারে।
আইভরি কোস্টের আরেকটি বড় শক্তি হলো গোলের উৎস বৈচিত্র্যময়। হালান্ডের মতো একজনের ওপর নির্ভর করতে হয় না তাদের। ফায়ের ভাষায়, বিভিন্ন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে গোল পাওয়ার সক্ষমতাই প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করে দিতে পারে। বেঞ্চ থেকেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো বিকল্প রয়েছে তার হাতে।
নরওয়েরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। সাম্প্রতিক ১০ ম্যাচে মাত্র একবার ক্লিন শিট রাখতে পেরেছে তারা। দুই ফুলব্যাক অনেক সময়ই অনেক ওপরে উঠে যান, ফলে বল হারালে পেছনে জায়গা তৈরি হয়। সেই ফাঁকা জায়গায় ইয়ান দিয়োমান্দে কিংবা পেপে দ্রুত আক্রমণে উঠতে পারলে আইভরি কোস্ট বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে ১০ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়েছিলেন কোচ স্তোলে সোলবাকেন। ফলে হালান্ড, ওদেগার্দ, নুসা ও সোরলথ নকআউটের এ ম্যাচে পুরোপুরি সতেজ অবস্থায় ফিরছেন। অন্যদিকে আইভরি কোস্ট চাইবে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে। মাঝমাঠে ছোট ছোট পাসে বলের দখল ধরে রেখে নরওয়ের আক্রমণভাগকে বিচ্ছিন্ন করা, সুযোগ পেলেই দ্রুত ট্রানজিশনে ওঠা—এই দুই কৌশলের সমন্বয়ই হতে পারে তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি।














