বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে নামার অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্যও নতুন এক অনুভূতি। আনন্দ আছে, গর্ব আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে অদ্ভুত অস্বস্তিও। চার বছর আগে ট্রফি জিতলেও প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে সে বিস্ময়কর হার এখনো স্মৃতিতে তাজা। তাই লিওনেল মেসি, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের নিয়ে গড়া দলটিকে দেখার সময়ও প্রশ্নটা থেকে যায়—লা স্কালোনেতা কি সত্যিই আরেকটি দীর্ঘ অভিযানের জন্য প্রস্তুত?
সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর খোঁজার মঞ্চ কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। আগামীকাল সকল ৭টায় অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচে প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া হয়তো আর্জেন্টিনার মতো তারকাখচিত নয়, কিন্তু তাদের হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। ভ্লাদিমির পেতকোভিচের অধীনে আফ্রিকার দলটি গত এক বছরে নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে তারা হারিয়েছে নেদারল্যান্ডসকে, ড্র করেছে উরুগুয়ের সঙ্গে, আর শেষ ম্যাচে বলিভিয়াকে উড়িয়ে দিয়েছে ৪-০ গোলে। টানা চার ম্যাচ অপরাজিত ‘ডেজার্ট ফক্সেস’রা নিশ্চয়ই আলবিসেলেস্তেদের চার বছর আগের লুসাইলের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ আবারো ফিরিয়ে দিতে চাইবে।
ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক স্কালোনির কৌশলগত চিন্তা। বিশ্বকাপের ঠিক আগে আর্জেন্টিনা এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে, যেখানে তাদের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য বাম প্রান্তের ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পুরোপুরি ফিট নন। ফলে কোচ লিওনেল স্কালোনিকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে পুরো কাঠামো নিয়ে। সাধারণত ৪-৩-৩ বা ৪-৪-২ রূপে খেলা আর্জেন্টিনা এবার হয়তো ভিন্ন কিছু দেখাতে পারে।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্কালোনির সামনে দুটি পরিকল্পনা। প্রথমটি তুলনামূলক পরিচিত। চার ডিফেন্ডারের লাইনে থাকবেন ফাকুন্দো মেদিনা, নিকোলাস ওতামেন্দি, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও গঞ্জালো মন্তিয়েল। মাঝমাঠে এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার ও ডি পলের ত্রয়ী। এ কৌশলে আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রেখে ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরবে।
দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি আরো আকর্ষণীয়। সেখানে স্কালোনি তিন সেন্টার ব্যাকের রক্ষণ সাজাতে পারেন। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ওতামেন্দি ও রোমেরোকে নিয়ে গড়া সেই ব্যাক থ্রির দুই পাশে উইং ব্যাকের ভূমিকায় থাকতে পারেন নিকোলাস গঞ্জালেস ও গিউলিয়ানো সিমেওনে। মাঝমাঠে ডি পল, এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার। সামনে মেসি ও লাউতারো মার্তিনেজ।
এ পরিবর্তনের তাৎপর্য অনেক বড়। কারণ ব্যাক থ্রি ব্যবহার করলে আর্জেন্টিনা আরো বেশি খেলোয়াড়কে আক্রমণে পাঠাতে পারবে। একই সঙ্গে আলজেরিয়ার দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পেছনে তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারও থাকবে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্কালোনি এমন কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। এবারো হয়তো একই পথ বেছে নিতে পারেন।
আর্জেন্টিনার বড় শক্তি মাঝমাঠ—ডি পল, এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টারের ত্রয়ী। ডি পল প্রতিপক্ষের প্রেস ভাঙার জন্য জায়গা তৈরি করেন, ম্যাক অ্যালিস্টার লাইনের মাঝখানে বল নিয়ে খেলার দিক বদলান, আর এনজো ফার্নান্দেজ নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলেন। তিনজনের ভূমিকাই আলাদা, কিন্তু একসঙ্গে তারা এমন একটি ত্রিভুজ তৈরি করেন, যা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হচ্ছে চার মিডফিল্ডারের ব্যবহার। আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গাস্তোন এদুলের তথ্য অনুযায়ী ডি পল, এনজো, ম্যাক অ্যালিস্টার ও থিয়াগো আলমাদাকে একসঙ্গে নামানোর কথাও ভাবছেন স্কালোনি। যদি সেটি হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা কার্যত মাঝমাঠে সংখ্যাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। ফলে মেসিকে আরো স্বাধীনভাবে খেলতে দেয়া সম্ভব হবে। তাকে আর নিচে নেমে বল সংগ্রহ করতে হবে না, বরং প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন।
মেসির বয়স এখন ৩৮। স্কালোনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি এমন একটি দল তৈরি করেছেন যেখানে মেসিকে আর প্রতিটি আক্রমণের শুরু ও শেষ দুটোই করতে হয় না। মানে এ আর্জেন্টিনা কেবল মেসিনির্ভর দল নয়। চার বছর আগেও কাতারে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল মেসিকে ঘিরে, কিন্তু মেসির ওপর নির্ভর করে নয়। পার্থক্যটা সূক্ষ্ম, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। সেই দলের মূল কাঠামো এখনো অক্ষত। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ—এরা সবাই আরো অভিজ্ঞ, আরো পরিণত। ফলে তিনি ম্যাচের নির্ধারক মুহূর্তগুলোর জন্য নিজের শক্তি জমিয়ে রাখতে পারেন।
অন্যদিকে আলজেরিয়াকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভ্লাদিমির পেতকোভিচের অধীনে দলটি নতুন প্রাণ পেয়েছে। তাদের আক্রমণে রয়েছে মোহাম্মদ আমোরা, আমিন গুইরি, আনিস হাজ মুসা এবং অভিজ্ঞ রিয়াদ মাহরেজ। মাঝমাঠে আছেন নাবিল বেনতালেব ও হোসেম আওয়ার। আর নতুন প্রজন্মের মুখ ইব্রাহিম মাজা—যাকে জার্মানিতে অনেকেই ডাকেন ম্যারাডোনার আদলে ‘মাজাডোনা’ নামে। আলজেরিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা তাদের ট্রানজিশন ফুটবল। পেতকোভিচের দল দীর্ঘ সময় বল ছাড়া খেলতে স্বচ্ছন্দ। তারা প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে এনে হঠাৎ গতির বিস্ফোরণে আক্রমণে উঠতে পছন্দ করে। আমিন গুইরি, মোহাম্মদ আমোরা এবং আনিস হাজ মুসার মতো খেলোয়াড়দের গতি আর্জেন্টিনার জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। বিশেষ করে যদি আর্জেন্টিনা তিন ডিফেন্ডারের সিস্টেমে খেলতে গিয়ে উইং ব্যাকদের অনেক ওপরে পাঠায়।
তবে এখানেই আবার স্কালোনির কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোমেরো, ওতামেন্দি ও লিসান্দ্রোকে একসঙ্গে নামালে আলজেরিয়ার দ্রুত আক্রমণ সামাল দেয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে ডি পল ও এনজোর প্রেসিং প্রতিপক্ষকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখতেও সাহায্য করবে। পেতকোভিচ সম্ভবত নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজাবেন। দুই লাইন মিলিয়ে ৪-৫-১ বা ৪-১-৪-১ ধরনের কাঠামো দেখা যেতে পারে। উদ্দেশ্য হবে মাঝখানের জায়গা বন্ধ রাখা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠা। কারণ খোলা মাঠে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ছন্দের লড়াইয়ে নামা আত্মঘাতী।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ ও ফরওয়ার্ড লাইন। মেসিকে আটকালেও লাউতারো আছে। লাউতারোকে সামলালেও আলভারেজ আছে। আলভারেজকে থামালেও দ্বিতীয় সারি থেকে ম্যাক অ্যালিস্টার উঠে আসতে পারেন। সেট-পিসে রোমেরো ও লিসান্দ্রোও বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারেন।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগে অনুশীলনে একাধিক ফর্মেশন পরীক্ষা করেছেন স্কালোনি। ম্যাচের কৌশল নিয়ে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ মোটামুটি নিশ্চিত হলেও রক্ষণভাগের বিন্যাস নিয়ে এখনো রয়েছে কিছু প্রশ্ন। তাই আগামীকালের ম্যাচটি একই সঙ্গে স্কালোনির কৌশলগত পরীক্ষার মঞ্চ এবং ডেজার্ট ফক্সেসদের স্বপ্ন দেখার সুযোগও। আর্জেন্টিনাই হয়তো ফেভারিট, কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো—এখানে ফেভারিট হওয়া আর জিতে যাওয়া এক কথা নয়।
আফ্রিকার অদম্য সিংহের সামনে এমবাপ্পের ফ্রান্স: ঐতিহাসিক এক অঘটনের প্রায় ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারো মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও সেনেগাল। ২০০২ সালে সিউলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বকাপে অভিষিক্ত সেনেগাল। তবে এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ফ্রান্স শুধু বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিই নয়, তাদের আক্রমণের নেতৃত্বে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকা। যদিও তার ক্লাব মৌসুম শেষ হয়েছে শূন্য হাতে। ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলার হয়েও জিততে পারেননি কোনো শিরোপা। তবে ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখলেই যেন বদলে যান কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বাংলাদেশ সময় আজ দিবাগত রাত ১টায় সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ফ্রান্স। ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এমবাপ্পে। ১৪টি বিশ্বকাপ ম্যাচে ১২ গোল করা এ ফরোয়ার্ড আর ৪ গোল করলে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করবেন।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং প্রস্তুতির দিক থেকে ফ্রান্স বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। টুর্নামেন্টের ঠিক আগে প্রস্তুতিমূলক ম্যাচে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের দাপুটে জয় পেয়েছে তারা। সেই ম্যাচে ফরাসিদের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন তরুণ উইঙ্গার মাইকেল অলিসে। অনবদ্য হ্যাটট্রিক করে তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে জ্বলে উঠতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে সব আলো যার ওপর নিবদ্ধ তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে। এ মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা এ স্ট্রাইকারের সামনে রয়েছে অনন্য এক ইতিহাস গড়ার হাতছানি। গত দুটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি এরই মধ্যে ১২টি গোল করে সর্বকালের সেরা গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছেন। জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসার গড়া চারটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ড থেকে তিনি মাত্র ৪ গোল দূরে রয়েছেন। এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এমবাপ্পে চাইবেন যত দ্রুত সম্ভব এ মাইলফলক স্পর্শ করতে। সেনেগালের রক্ষণভাগের জন্য এমবাপ্পেকে আটকে রাখাটাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেনেগালও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। কোচ পাপে থিয়াওয়ের অধীনে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে সাজানো এ দলে যেমন একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অভিজ্ঞ তারকারা। সেনেগালের রক্ষণভাগ সামলানোর দায়িত্বে থাকবেন কালিদু কুলিবালির মতো ডিফেন্ডার। তার সঙ্গে মুসা নিয়াখাতে, ইসমাইল জ্যাকবস ও অ্যান্টোনি মেন্ডির উপস্থিতি সেনেগালের রক্ষণভাগকে যথেষ্ট শক্তিমত্তা প্রদান করেছে। গোলপোস্টের নিচে এদুয়ার্দ মঁদির মতো অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থাকায় সেনেগাল রক্ষণাত্মক দিক থেকে বেশ আত্মবিশ্বাসী।















