সেলেসাওদের একের পর এক আক্রমণ সেই প্রাচীরে আছড়ে পড়ছিল। বিরতির পর কাসেমিরোর জাদুকরী ছোঁয়ায় ম্যাচে সমতা ফিরলেও, জাপানিদের নিশ্ছিদ্র শৃঙ্খলার শিকল ভাঙাটা অসম্ভবই মনে হচ্ছিল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের কাছে। কিন্তু ফুটবলের চিত্রনাট্য যে কতটা নির্মম আর হৃদয়বিদারক হতে পারে, তা বোঝা গেল ইনজুরি সময়ের ঠিক ষষ্ঠ মিনিটে। নিজেদের বক্সের ঠিক বাইরে তানাকার এক মুহূর্তের ভুলে বল পেয়ে যান ব্রুনো গিমারায়েস। যেন দুর্গের বিশ্বস্ত প্রহরীর হাত ফসকে চাবি পড়ে যাওয়া। সেই বল লুফে নিয়ে ব্রুনো গিমারায়েস যখন নিখুঁত এক পাস বাড়ালেন ফাঁকায় থাকা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির দিকে। মুহূর্তের মধ্যে বাঁ পা থেকে ডান পায়ে বল এনে তার নেয়া তীব্র শট জালে জড়াল। গ্যালারির হলুদের সমুদ্রে তখন বাঁধভাঙা উল্লাসের জলোচ্ছ্বাস। ২-১ ব্যবধানের জয়ে ব্রাজিল মাতল মহানাটকীয় প্রত্যাবর্তনের বন্য উল্লাসে, নিশ্চিত করল শেষ ষোলোর টিকিট।

গভীর খাদ থেকে উঠে আসার এ অবিশ্বাস্য আখ্যান যেন ডাগআউটে দাঁড়ানো কার্লো আনচেলত্তির কখনো হাল না ছাড়ার দীক্ষারই ফসল। ইতালিয়ান এ বসের শান্ত চোখের সামনেই যেন বিস্ফোরিত হলো সেলেসাওদের হার না মানা স্পিরিট। প্রতিপক্ষের সামান্য এক ভুলের সুযোগ নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার এ অদম্য জেদই আরেকবার প্রমাণ করল কেবল শৈল্পিক ফুটবল নয়, শেষ বাঁশি পর্যন্ত স্নায়ু ধরে রাখার শিল্পও বেশ রপ্ত করেছে সেলেসাওরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ব্রাজিলের। তৃতীয় মিনিটেই ব্রুনো গিমারায়েসের শট প্রতিহত হয়, এরপর ১৩ মিনিটে কাসেমিরোর পাস থেকে ম্যাথিউস কুনহার নিচু শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন জাপানের গোলরক্ষক সুজুকি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিবিড় মার্কিং করে এবং পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ সাজিয়ে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে বেশির ভাগ সময়ই আটকে রাখে জাপান।

২৯ মিনিটে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। মাঝমাঠে দানিলোর ভুল পাস কেড়ে নিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বেরিয়ে পড়েন কাইশু সানো। প্রায় ৩০ গজ দৌড়ে বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে অ্যালিসনকে পরাস্ত করে জাপানকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। শুরুতে হলুদ কার্ড দেখলেও পরে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন এ মিডফিল্ডার।

গোল হজমের পর ব্রাজিল আক্রমণের চেষ্টা চালালেও তা ছিল এলোমেলো। ভিনিসিয়ুস, কুনহা ও রায়ান—এ তিন ফরওয়ার্ডই প্রথমার্ধে ব্রাজিলের আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে কম বল স্পর্শ করেন। বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে জাপান।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্তন আনেন কার্লো আনচেলত্তি। চোটের অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন লুকাস পাকেতা, তার জায়গায় নামেন এন্দ্রিক। এর পর থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় ব্রাজিল। ৫২ মিনিটে দানিলোর ক্রসে ব্রুনো গিমারায়েসের হেড আবারো রুখে দেন সুজুকি। এক মিনিট পর বক্সে কাসেমিরোর প্রচেষ্টা গোললাইন থেকেই প্রতিহত করে জাপানের রক্ষণভাগ। সেই চাপ বেশিক্ষণ সামলাতে পারেনি সামুরাই ব্লুরা।

৫৫ মিনিটে গ্যাব্রিয়েলের দারুণ ক্রসে দূরের পোস্টে থাকা কাসেমিরো এবার আর ভুল করেননি। সহজ ফিনিশে জালে বল পাঠিয়ে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান অভিজ্ঞ এ মিডফিল্ডার। বিরতির পর ব্রাজিলের অবিরাম চাপের যথার্থ পুরস্কার ছিল এ গোল।

সমতায় ফেরার পরও আক্রমণ থামায়নি ব্রাজিল। ৫৮ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে কয়েকজনকে কাটিয়ে দুর্দান্ত শট নেন। গোলরক্ষক সুজুকির আঙুলের স্পর্শে বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে। অল্পের জন্য এগিয়ে যাওয়া হয়নি পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। ১ ঘণ্টা পার হওয়ার পর পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের হাতেই। জাপান নিজেদের অর্ধে রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। ৬৫ মিনিটে দুই দলই বদলি খেলোয়াড় নামায়। ব্রাজিলের হয়ে ম্যাথিউস কুনহার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি নামেন। অন্যদিকে জাপান রক্ষণ আরো শক্ত করতে ইয়ুকিনারি সুগাওয়ারা ও জুননোসুকে সুজুকিকে মাঠে পাঠান।

৭৩ মিনিটে আবারো গ্যাব্রিয়েলের বাঁ দিক থেকে ভাসানো ক্রস জাপানের রক্ষণে অস্বস্তি তৈরি করে। বদলি নেমে আসা জুননোসুকে সুজুকির গায়ে লেগে বল কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা পায় জাপান। কিছুক্ষণ পর আবারো আক্রমণে ওঠে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের কাছ থেকে বল পেয়ে এন্ড্রিক মার্তিনেল্লির উদ্দেশে লব পাস দিতে চাইলেও সেটি অনেক বেশি জোরে হয়ে যায়। ফলে আরেকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ নষ্ট হয় ব্রাজিলের। ৭৮ মিনিটে ডগলাস সান্তোসের ক্রস জাপানের রক্ষণভাগ ফিরিয়ে দিলেও বল পেয়ে যান গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তবে তড়িঘড়ি করে নেয়া তার শট ডান পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।

যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে নাটকীয়ভাবে জয়সূচক গোল পায় ব্রাজিল। বক্সের ঠিক বাইরে ভয়ংকর জায়গায় তানাকা বল হারালে সেটি পান ব্রুনো গিমারায়েস। তার বাড়ানো পাসে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি মুহূর্তের মধ্যে বাঁ পা থেকে বল ডান পায়ে এনে শট নেন। বল সুজুকিকে পরাস্ত করে পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। তার গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠে ব্রাজিল।

সব মিলিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ফুটবল-ভক্তদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে অনেক দিন। বুক চিতিয়ে লড়াই করেও শেষ মুহূর্তের গোলে জাপানের বিদায় আক্ষরিক অর্থেই হৃদয়বিদারক। অন্যদিকে শুরুতে পিছিয়ে পড়েও হাল না ছেড়ে জয় ছিনিয়ে নেয়াটা ব্রাজিলের জন্য কেবল শেষ ষোলোর টিকিট কাটাই নয়, বরং নকআউট পর্বের কঠিন লড়াইয়ের আগে নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার এক বড় পরীক্ষাও বটে। সামুরাই ব্লুদের বীরত্বকে ছাপিয়ে পাওয়া এই ঘাম-ঝরানো জয়, হেক্সা মিশনে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ।