টানা তিন বছর ফিফা রÅvংকিংয়ের সিংহাসন নিজেদের একচ্ছত্র দখলে রেখেছিল তারা। ২০১৮ সালে যে বেলজিয়ামের নান্দনিক ফুটবলে বুঁদ হয়ে ছিল পুরো বিশ্ব, সে প্রজন্মের অনেকেই এখন কেবল স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি। গত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে অপ্রত্যাশিত বিদায়ের তেতো স্বাদ এখনো তাদের তাড়া করে ফেরে।
সেই সোনালি যুগের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়েও এখনো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন কেভিন ডি ব্রুইনা ও থিবো কোর্তোয়ার মতো মহারথীরা। লুকাকু এখনো টিমটিম করে জ্বলছেন। ক্লাব ফুটবলে পুরো মৌসুমে মাত্র ১ ঘণ্টা খেলেও বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন, যা নিয়ে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় উঠেছে। মূলত বেলজিয়াম চলতি বিশ্বকাপে মাঠে নামছে পালাবদলের মশাল হাতে। আজ বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে ‘গ্রুপ জি’র মহারণে নতুন চেহারার বেলজিয়ামের মুখোমুখি হচ্ছে আফ্রিকান পরাশক্তি মিসর। ডি ব্রুইনা ও মোহাম্মদ সালাহর মতো দুই মহাতারকার ট্যাকটিক্যাল ও স্নায়বিক দ্বৈরথ এ ম্যাচটিকে পরিণত করেছে ফুটবলপ্রেমীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে।
অন্যদিকে, আজ রাত ১০টায় আটলান্টার সবুজ গালিচায় ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ছান্দসিক ‘পাসিং আর্মাডা’র প্রবল স্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ম্যাচটি খেলতে নামছে নবাগত কেপ ভার্দে। কাগজে-কলমে এ লড়াইটিকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’-এর এক অসম যুদ্ধ মনে হলেও স্প্যানিশদের জন্য এটি মোটেও সহজ কোনো পরীক্ষা নয়। বাছাইপর্বে ক্যামেরুনের মতো আফ্রিকান পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের টিকিট ছিনিয়ে আনা এ দলটিকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। রূপকথার ডানায় ভর করে আসা ছোট্ট এ দ্বীপরাষ্ট্রটি বিশ্বমঞ্চে বিস্ময় উপহার দিতে মুখিয়ে থাকবে নিশ্চিত।
স্পেনের জন্যও এটি সূচনা। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ জয়ের পর স্প্যানিশ ফুটবল দীর্ঘ সময় নিজেদের সেরা সময় খুঁজে ফিরেছে। একসময় তিকি-তাকার মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করা দলটি পরবর্তী তিন বিশ্বকাপেই হতাশ করেছে সমর্থকদের। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০১৮ ও ২০২২ সালে শেষ ষোলোতেই বিদায় নিয়েছে ‘লা রোজা’রা। কিন্তু ইউরো ২০২৪ সে গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন শুধু শিরোপাই জেতেনি, খেলেছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল।
তিকি-তাকার ধীরগতির পাসিংয়ের খোলস ছেড়ে স্পেন এখন অনেক বেশি হাই প্রেসিং ও ক্ষুরধার আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিচ্ছে। মাঠের লড়াইয়ে স্পেনের মূল শক্তি থাকবে তাদের ঐতিহ্যবাহী বল পজেশন, যা নিয়ন্ত্রিত হবে রদ্রি, পেদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের বিশ্বমানের মিডফিল্ড ট্রায়ো দিয়ে। স্প্যানিশদের ৪-৩-৩ ছকে রদ্রি খেলবেন ‘ডিপ-লায়িং মেত্রোনোম’ হিসেবে, মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে পুরো ম্যাচের গতি বা টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করবেন। পেদ্রি খেলবেন কিছুটা ওপরে, যার মূল কাজ হবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ও মিডফিল্ড লাইনের মাঝখানের ‘পকেট স্পেস’গুলো খুঁজে বের করে আক্রমণভাগের জন্য সুযোগ তৈরি করা।
আটলান্টায় মাঠে নামার আগে স্প্যানিশ শিবিরের বড় দুশ্চিন্তা হলো তাদের দুই গতিময় ডানা—লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের ফিটনেস। ইউরো জয়ে এ দুই তরুণ উইঙ্গারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। চোট কাটিয়ে বেস ক্যাম্পে তারা পূর্ণ অনুশীলনে ফিরলেও বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই শুরুর একাদশে তাদের খেলানোর ঝুঁকি কোচ ডি লা ফুয়েন্তে নেবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর ফলে ফেরান তোরেস, মিকেল ওয়ারজাবাল বা অ্যালেক্স বায়েনার মতো খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে স্পেনকে। এ পরিবর্তন স্পেনের খেলায় উইং-ভিত্তিক গতি কিছুটা কমিয়ে বক্সে বল হোল্ড করার এবং ‘হাফ-স্পেস’ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াবে। রাইট-ব্যাকে মার্কোস ইয়োরেন্তের ওভারল্যাপিং রান এবং লেফটে মার্ক কুকুরেরার হাই-প্রেসিং স্প্যানিশ আক্রমণকে আরো শাণিত করে তুলবে, যা কেপ ভার্দের অনভিজ্ঞ রক্ষণকে প্রতিনিয়ত প্রবল চাপে রাখবে।
কেপ ভার্দের জন্য ম্যাচটি তাদের জাতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগময় দিন। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার নেতৃত্বাধীন দলটির মূল লক্ষ্য থাকবে স্পেনের হাই-প্রেসিং এবং পজেশন-হেভি ফুটবলের বিপক্ষে নিজেদের অর্ধে একটি জমাট ‘লো-ব্লক’ রক্ষণ তৈরি করা। স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা যাতে ফ্ল্যাঙ্ক বা সেন্টার দিয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢোকার কোনো জায়গা না পায়, সেজন্য তেলমো আরকানজো ও কেভিন পিনা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে ডাবল-পিভট প্রাচীর তুলবেন। তাদের মূল দায়িত্ব পেদ্রির ডিফেন্স-চেরা পাস দেয়ার রাস্তাগুলো বন্ধ করা এবং সেন্টারে পাউ কুবারসি ও আইমেরিক লাপোর্তের লং-বল সাপ্লাই লাইন আটকে দেয়া। বিশালাকার স্টেডিয়ামের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সামলে, স্পেনের বিশ্বতারকাদের প্রবল আক্রমণ রুখে দিয়ে কেপ ভার্দের ডিফেন্স লাইন কতটা সময় নিজেদের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এ ঐতিহাসিক ম্যাচের ফলাফল।
অন্যদিকে দিনের দ্বিতীয় বড় আকর্ষণ বেলজিয়াম ও মিসরের লড়াই। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে যে বেলজিয়াম প্রতিপক্ষকে পজেশন আর প্রেসিংয়ে কোণঠাসা করে রাখত, সে তুলনায় বর্তমান দলটি ট্যাকটিক্যালি অনেক বেশি বাস্তববাদী। মিসর বরাবরই সুসংহত এবং জমাট রক্ষণের জন্য পরিচিত। সিয়াটল স্টেডিয়ামে তাই শুধু কেভিন ডি ব্রুইনা বনাম মোহাম্মদ সালাহর তারকাদ্যুতিই নয়, লড়াইটা হবে দুই দলের ডাগআউটের ট্যাকটিক্যাল মগজাস্ত্রেরও। শক্তির বিচারে বেলজিয়াম কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও দল হিসেবে অত্যন্ত সুসংহত মিসরকে ভাঙা ডি ব্রুইনাদের জন্য মোটেও সহজ হবে না।
উভয় দলই ৪-২-৩-১ ফরমেশনে মাঠে নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন চেহারার বেলজিয়াম এখন অনেকটাই ট্রানজিশন ও উইং-নির্ভর। মাঝমাঠে আমাদু ওনানা ও ইউরি তিলেমানস ডাবল পিভট হিসেবে খেলবেন। ওনানা মূলত ডেস্ট্রয়ার হিসেবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করবেন, আর তিলেমানস ডিপ-লায়িং প্লেমেকার হিসেবে নিচ থেকে আক্রমণ তৈরি করবেন। এ দুজনের শক্ত অবস্থানের কারণে কেভিন ডি ব্রুইনা অনেকটা ফ্রি রোল পেয়ে যান। ডি ব্রুইনা মূলত সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেললেও হাফ-স্পেসগুলোতে জায়গা করে নেন। তার মূল লক্ষ্য থাকবে লেফট উইংয়ে থাকা জেরেমি ডোকুকে আইসোলেট করে বল জোগান দেয়া। ডোকুর গতি এবং ড্রিবলিং ক্ষমতা বেলজিয়ামের অন্যতম বড় ট্যাকটিক্যাল অস্ত্র। তবে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের অনভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাক জুটি মেচেলে এবং এনগয়। মিসর যদি দ্রুত প্রতি-আক্রমণ করে, তবে এ হাই-লাইন ডিফেন্স বিপদে পড়তে পারে। আর ঠিক এ জায়গাতেই থিবো কোর্তোয়ার সুইপার কিপার ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মিসরের কৌশল হলো রক্ষণ জমাট রেখে প্রতি-আক্রমণে ওঠা। মারওয়ান আতিয়া ও মোহানাদ লাশিন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে দেয়াল তৈরি করবেন, যার মূল উদ্দেশ্য থাকবে ডি ব্রুইনাকে আটকে রাখা এবং তাকে পাসিং লেন তৈরি করতে না দেয়া। তারা মূলত লো থেকে মিড-ব্লক তৈরি করে খেলবে, যাতে বেলজিয়ামের ফরওয়ার্ডরা জায়গা না পায়। মোহাম্মদ সালাহ রাইট উইংয়ে থাকলেও তিনি মূলত ইনভার্টেড উইঙ্গার হিসেবে খেলবেন। বল পেলেই ডান দিক থেকে ভেতরে বক্সের দিকে ঢুকে আসার চেষ্টা করবেন। তখন রাইট-ব্যাক মোহাম্মদ হানি ওভারল্যাপ করে ডান প্রান্তে আক্রমণের জায়গা বড় করবেন। স্ট্রাইকার হিসেবে থাকা ওমর মারমুশ ফলস-নাইন হিসেবে খেলে বেলজিয়ামের সেন্টার-ব্যাকদের ব্যস্ত রাখবেন, যাতে সালাহ এবং লেফট উইংয়ে থাকা ত্রেজেগে ফাঁকা জায়গা পান।
মাঠের বেশকিছু নির্দিষ্ট জায়গার লড়াই এ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ডোকু বাঁ-প্রান্ত দিয়ে কতটা ভয়ংকর হতে পারেন তা ম্যানচেস্টার সিটিতেই দেখা গেছে। মিসরের রাইট-ব্যাক মোহাম্মদ হানি যদি ডোকুর গতির সঙ্গে পেরে না ওঠেন, তবে মিসরকে ডাবল-মার্কিং করতে হবে, যা ডি ব্রুইনার জন্য মাঝমাঠে জায়গা ফাঁকা করে দেবে। অন্যদিকে, ডি ব্রুইনাকে তার স্বভাবসুলভ কিলার পাস দেয়া থেকে বিরত রাখতে মিসরের আতিয়া ও লাশিনকে পুরো ম্যাচজুড়ে হাই-ইন্টেনসিটি প্রেসিং করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা হবে বেলজিয়ামের রক্ষণের। বেলজিয়ামের লেফট-ব্যাক ডি কুইপার যখন আক্রমণে উঠবেন, তখন সালাহ ফেলে যাওয়া ফাঁকা জায়গাটা ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন। বেলজিয়ামের অনভিজ্ঞ সেন্টার-ব্যাকদের জন্য সালাহর এ রানগুলো সামলানোই হবে ম্যাচের আসল টার্নিং পয়েন্ট।
এছাড়া বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় মায়ামি গার্ডেনসের হার্ড রক স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘এইচ’-এর ম্যাচে মুখোমুখি হবে সৌদি আরব ও উরুগুয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামলেও সৌদি আরব বড় আসরে অঘটন ঘটানোর সামর্থ্য আগেই দেখিয়েছে। অন্যদিকে সকাল ৭টায় লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জি’-এর লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে এশিয়ার অন্যতম ফুটবল শক্তি ইরান ও ওশেনিয়ার প্রতিনিধি নিউজিল্যান্ড। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে টুর্নামেন্টের আগে ইরানের যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা, ভিসা প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সে কারণেও ম্যাচটির দিকে থাকবে বাড়তি নজর। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও ম্যাচটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।















