কিন্তু এ মুহূর্তে শুধু প্রতিপক্ষকে হারানোর পরিকল্পনাই নয়, কোচদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হলুদ কার্ডের হিসাব। একটি অতিরিক্ত হলুদ কার্ডই নকআউটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ থেকে ছিটকে দিতে পারে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়কে। তাই শেষ গ্রুপ ম্যাচে সেরা একাদশ নামাবেন, নাকি তারকাদের বিশ্রাম দেবেন—এ কঠিন সিদ্ধান্ত এখন প্রায় সব কোচের সামনে।
ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে কোনো খেলোয়াড় একটি হলুদ কার্ড পেলে এবং শেষ গ্রুপ ম্যাচে আবারো হলুদ কার্ড দেখেন, তাহলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে নিষিদ্ধ হবেন। ফলে গ্রুপ পর্বে নিশ্চিত হওয়া দলগুলোর জন্য শেষ ম্যাচটি অনেক সময় হয়ে ওঠে কৌশলগত পরীক্ষার মঞ্চ।
এ পরিস্থিতির অন্যতম উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র। তুরস্কের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগেই তারা নকআউট নিশ্চিত করে ফেলেছিল। কিন্তু দলের চারজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের নামের পাশে ছিল একটি করে হলুদ কার্ড। ফলে কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর সামনে প্রশ্ন ছিল—ঝুঁকি নিয়ে তাদের খেলাবেন, নাকি বিশ্রামে রেখে নকআউটের জন্য প্রস্তুত করবেন।
পচেত্তিনো ম্যাচের আগে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আরেকটি হলুদ কার্ড নিয়ে পরের ম্যাচে খেলতে না পারার ঝুঁকি নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’ তার এ মন্তব্যই ফুটিয়ে তোলে বিশ্বকাপের এ পর্যায়ে কোচদের মানসিক চাপ কতটা বেড়ে যায়।
টাইলার অ্যাডামস, ক্রিস রিচার্ডস, অ্যান্টনি রবিনসন ও ফোলারিন বালোগুনকে এ কারণেই তুরস্কের বিপক্ষে শুরুর একাদশে রাখেননি পচেত্তিনো। একই পরিস্থিতিতে রয়েছে পর্তুগালের বের্নার্দো সিলভা, নেলসন সেমেদো, রেনাতো ভেইগা ও তোমাস আরাউজো, নেদারল্যান্ডসের মেমফিস ডিপাই, মিকি ফান ডে ফেন ও ক্রিসেনসিও সামারভিল এবং স্পেনের পেদ্রি। শেষ গ্রুপ ম্যাচে এদের কেউ আরেকটি হলুদ কার্ড দেখলে শেষ ৩২-এর ম্যাচে খেলতে পারবেন না।
অন্যদিকে যেসব দল এখনো নকআউট নিশ্চিত করতে পারেনি, তাদের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের সামনে প্রথম লক্ষ্য শেষ ৩২-এ ওঠা। তাই হলুদ কার্ডের ঝুঁকি থাকলেও সেরা খেলোয়াড়দের মাঠে নামাতেই বাধ্য হচ্ছেন কোচরা। কারণ এ ম্যাচ জিততে না পারলে পরের ম্যাচের হিসাবই থাকবে না।
হলুদ কার্ড দেখানোর কারণও অনেক। বিপজ্জনক ট্যাকল, সময় নষ্ট করা, অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে উদ্যাপন, রেফারির সঙ্গে তর্ক, বারবার ফাউল করা কিংবা প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামাতে ইচ্ছাকৃত ফাউল—এসবের যেকোনো একটির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেক সিদ্ধান্তই রেফারির বিবেচনার ওপর নির্ভর করে।
লাল কার্ডের নিয়ম আরো কঠোর। বিপজ্জনক বা সহিংস ট্যাকল, প্রতিপক্ষকে আঘাত করা, থুতু নিক্ষেপ, কামড় দেয়া, আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার কিংবা নিশ্চিত গোলের সুযোগ বেআইনিভাবে নষ্ট করলে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হয়। লাল কার্ড পাওয়া খেলোয়াড়কে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছাড়তে হয় এবং পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হয়। গুরুতর অপরাধ হলে অতিরিক্ত শাস্তিও দেয়া হতে পারে।
এবারের বিশ্বকাপে নতুন একটি নিয়মও যোগ হয়েছে। কোনো খেলোয়াড় যদি মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন, যাতে তার বক্তব্য গোপন থাকে, তাহলে সেটিও লাল কার্ডের কারণ হতে পারে। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগেল আলমিরন এ নিয়মে শাস্তি পেয়েছেন।
একটি ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলেও সেটি লাল কার্ড হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ খেলোয়াড়কে সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছাড়তে হবে এবং পরবর্তী ম্যাচেও নিষিদ্ধ থাকতে হবে।
৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফিফাও শৃঙ্খলা বিধিতে পরিবর্তন এনেছে। খেলোয়াড়দের জন্য দুটি ‘অ্যামনেস্টি’ বা কার্ড মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমটি গ্রুপ পর্ব শেষে। অর্থাৎ কোনো খেলোয়াড় শেষ গ্রুপ ম্যাচে নতুন হলুদ কার্ড না পেলে আগের হলুদ কার্ডের হিসাব মুছে যাবে এবং নকআউটে তিনি নতুনভাবে শুরু করবেন। দ্বিতীয় অ্যামনেস্টি কার্যকর হবে কোয়ার্টার ফাইনালের পর, যাতে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে অযথা খেলোয়াড় হারানোর ঝুঁকি কমে।
তবে হলুদ ও লাল কার্ডের প্রভাব শুধু নিষেধাজ্ঞায়ই সীমাবদ্ধ নয়। এবার যেহেতু কয়েকটি গ্রুপের তৃতীয় হওয়া দলও শেষ ৩২-এ উঠবে, তাই সমান পয়েন্ট, গোল ব্যবধান ও গোলসংখ্যার পর ফিফার টাইব্রেকারে বিবেচনায় আসে ‘ফেয়ার প্লে’ বা আচরণগত স্কোর। বেশি হলুদ ও লাল কার্ড পাওয়া দল সেখানে পিছিয়ে পড়ে। অর্থাৎ অতিরিক্ত কার্ড শুধু একজন খেলোয়াড়কে নয়, প্রয়োজনে পুরো দলকেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিতে পারে।














