বদলে যাওয়া দিনের হাওয়া লেগেছে আমাদের বিনোদনজগতে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ওটিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। টেলিভিশনভিত্তিক বিনোদন পার করে দেশের দর্শক, বিশেষত তরুণরা ওটিটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একাধিক ওটিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে এগিয়ে নিয়েছে। নতুন নতুন নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তারা নাটক বা সিনেমার প্রথাগত ধারা থেকে সরে ভিন্ন কিছু করছে। এ ভিন্নতার কারণেই মূলত ওটিটি জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
বৈশ্বিক নানা ওটিটি প্লাটফর্মের মতো অনেক দেশের নিজস্ব প্লাটফর্ম রয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশেও এ ধরনের বেশকিছু ওটিটি প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটি হিসেবে সর্বপ্রথম ‘বঙ্গ’র আগমন ঘটে। প্লাটফর্মটি এ সময় বিদেশী নানা কন্টেন্টের পাশাপাশি দেশীয় নাটক, সিনেমা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়। পরে ২০১৬ সালে গ্রামীণফোনের তত্ত্বাবধানে ‘বায়োস্কোপ’
নামে আরেকটি প্লাটফর্ম আসে। একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো মোবাইল কোম্পানি দ্বারাই পরিচালিত হতো। এ ধারায় বাংলালিংকের ‘বাংলা ফ্লিক্স’
এবং আজিয়াটার ব্যানারে ‘আইফ্লিক্স’-এর আগমন ঘটে।
বাংলাদেশে অনেকদিন ধরে ইউটিউব জনপ্রিয়। ওটিটির দর্শকও ছিল, কিন্তু ওটিটি বলতে নেটফ্লিক্সের বাইরে তেমন কিছু মাথায় আসত না। কেবল বাংলাদেশ না, দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারটাই এমন। কিন্তু কভিড-১৯ এসে অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। ২০২০ সালে কোয়ারেন্টিনে থাকাকালীন মানুষের অন্যতম বিনোদন হয়ে ওঠে সিনেমা ও সিরিজ। এক্ষেত্রে টেলিভিশনের তুলনায় ওটিটি বেশি সহায়ক হয়েছিল। মানুষ আবিষ্কার করে, অনলাইনে বহু ভালো ভালো কাজ পড়ে আছে অদেখা। বিশ্বের মতো বাংলাদেশও বিষয়টি অনুধাবন করে এবং এখানকার পুরনো ওটিটিগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়।
গত ১০-২০ বছর প্রতি ঈদে প্রতিটি চ্যানেল নাটক নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু করোনা মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালে কিছুটা ভিন্ন দৃশ্য লক্ষিত হয়। দেখার মতো ভালো কাজের যথেষ্ট অভাব ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে এবার কাণ্ডারি হয়ে দাঁড়িয়েছিল দেশের একাধিক ওটিটি প্লাটফর্ম। প্রথাগত হাসির নাটক থেকে বেরিয়ে এসে ‘বঙ্গ’র তরফ থেকে ‘বেজড অন বুক’
নামে সাত পর্বের একটি অ্যান্থোলজি করা হয়েছিল। সাতজন লেখকের সাতটি গল্প নিয়ে তৈরি হয় সাতটি শর্ট ফিল্ম। প্রায় প্রতিটিই দর্শকের প্রশংসা লাভ করেছে।
পিছিয়ে থাকেনি বায়োস্কোপও। ঈদুল আজহায় তারা নিয়ে আসে ‘সাত দু গুণে চৌদ্দ’। প্রায় একই সময়ে নবাগত ওটিটি ‘চরকি’
তার ‘উনলৌকিক’
নামক অ্যান্থোলজি দিয়ে প্রশংসা পায়। চরকি একটি অরিজিনাল সিরিজ এনেছিল ‘মরীচিকা’
নামে। এছাড়া নানা ধরনের ডকুমেন্টারি, ডাবিং করা বিদেশী সিনেমা, সিরিজ, দেশীয় নাটক, ওয়েব সিরিজের সমাবেশ ঘটিয়েছে চরকি, বঙ্গ, টফি, বাংলাফ্লিক্স, জাগো বিডি, টেলিফ্লিক্সের মতো এককেটি ওটিটি প্লাটফর্ম।
প্রশ্ন জাগে, দেশের বিনোদনজগতে আসলে কতটা প্রভাব ফেলছে ওটিটি? সত্যি বলতে প্রভাব যথেষ্ট। টিভি নাটক ও টেলিফিল্মের গুণী নির্মাতা মিজানুর রহমান আরিয়ান, শাফায়েত মনসুর রানা, আদনান আল রাজীবরা কাজ করছেন ওটিটিতে। অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম থেকে মনোজ প্রামাণিক, প্রীতম হাসানের মতো এ সময়ের অভিনেতারা। এমনকি দেশীয় অভিনেতা, নির্মাতারা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় কাজ করেছেন। হইচইয়ের সঙ্গে কাজ করলেন নির্মাতা আশফাক নিপুণ। ‘মহানগর’
পছন্দ করেছেন দর্শকরা। তালিকায় আরো থাকবে জি ফাইভে আসা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান।
কেবল দর্শককে বিনোদিত করাই নয়, বিনোদনজগতে নতুন শিল্পী, নির্মাতা সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে। বায়োস্কোপের ‘সাত দু গুণে চৌদ্দ’
সিরিজটিতে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ শিক্ষার্থীকে শর্ট ফিল্ম নির্মাণের সুযোগ করে দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, প্রতিটি শর্ট ফিল্ম ভালো হয়েছে। বিষয় বৈচিত্র্য ও নির্মাণে কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন বর্তমান গুণী অভিনেতা মনোজ প্রামাণিকের এ ১৪ ছাত্র। ‘বঙ্গ’র বেজড অন বুকও যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। বইয়ের কথা থেকে মনে করিয়ে দেয়া যায়, মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের বই থেকে সিরিজ করেছেন সৃজিত মুখার্জী।
ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর মাধ্যমে দেশের সিনেমাকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ রয়েছে। হলের বেহালের পাশাপাশি নানা কারণে হলবিমুখ মানুষের কাছে ওটিটির মাধ্যমে সহজে সিনেমা পৌঁছানো যায়। হলিউড, বলিউডের বহু সিনেমা এখন ওটিটিতে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও সে সুযোগ রয়েছে। চরকি এরই মধ্যে দুটো অ্যান্থোলজির পাশাপাশি দুটো অরিজিনাল ওয়েব ফিল্মও তৈরি করেছে। ওয়েব ফিল্ম হিসেবে বঙ্গ থেকে আসা ‘মরণোত্তম’ও একটা ভালো চেষ্টা ছিল। এভাবে চলতে থাকলে আরো নতুন অভিনয়শিল্পী, নির্মাতার পাশাপাশি দর্শক তৈরি করা সম্ভব।
একটি হিসাবমতে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গর সাবস্ক্রাইবার ছিল প্রায় ৪৩ লাখ। পরবর্তী সময়ে তা আরো বেড়েছে। বায়োস্কোপ থেকে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল স্ট্রিম করার সুবিধা থাকার কারণে এটির ভিন্ন ভোক্তাশ্রেণী রয়েছে। তবে এদিক থেকে এগিয়ে আছে বিঞ্জ। এ প্লাটফর্মে দেড় শতাধিক চ্যানেল দেখার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের ওটিটিগুলোর একটি বিশেষ দিক হলো তাদের কিছু কন্টেন্ট ফ্রি এবং বিশেষ কন্টেন্ট প্রিমিয়াম, যা অর্থের বিনিময়ে দেখতে হয়। কিন্তু সব মিলিয়ে দিন যত যাচ্ছে, সাবস্ক্রাইবার বাড়ছে বৈ কমছে না। অর্থাৎ শিল্প ও ব্যবসা উভয় ক্ষেত্রেই ওটিটি বড় একটি সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে।
তবে ওটিটি নিয়ে অনেক শঙ্কার কথাও উঠে আসে। অনেকের দৃষ্টিতে ওটিটি মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মাধ্যমগুলোর ক্ষতির কারণ হতে পারে। আরেকটি ব্যাপার হলো বিষয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি যৌনতা, অপরাধ, সহিংসতার সরাসরি চিত্রায়ণ অনেকে পছন্দ করছেন না। গত বছর বিঞ্জে আসা ওয়েব সিরিজ ‘১৪ আগস্ট’ এসব কারণে সমালোচিত হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিষয়টি স্বাভাবিক এবং এভাবেই কাজ হয়। দেশের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে ওটিটির জন্য নীতিমালা তৈরির চিন্তা রয়েছে। সরকারের এ চিন্তা থেকেও বোঝা যায়, ওটিটিকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবা যাচ্ছে না। বরং সামনের দিনগুলোয় ওটিটির প্রভাব ও অবদান বাড়বে বলেই মনে হয়।










