কাকাবাবু নিয়ে সৃজিত ফিরেছেন বেশ কিছুদিন হলো। কিন্তু রাজার বেশে ফেরা হলো না রাজা রায়চৌধুরির। সৃজিত মুখার্জি তার নিজের ধারা থেকে বেরোলেন না। ফলে সিনেমাটা ‘কাকাবাবু’
না হয়ে সৃজিতের যেকোনো একটা সিনেমার মতোই হয়ে রইল। মাসাইমারার যে চিত্র ফুটে ওঠার কথা ছিল সেখান থেকে কেবল প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের চিরাচরিত অভিনয় এবং কিছু অকারণ সংলাপ ও অনুষঙ্গই আনা হলো।
সিনেমা শুরু হয় কাকাবাবু এবং সন্তুর নাইরোবিতে পৌঁছার মধ্য দিয়ে। সেখানে বাঙালি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী অমলের সঙ্গে তাদের দেখা। এখান থেকেই সেই পুরনো সৃজিত মুখার্জি সিনড্রোমের শুরু। অমল চরিত্রে অভিনয় করা অনির্বাণ চক্রবর্তীকে জোর করে জটায়ু বানানো হলো। সৃজিত মুখার্জি ফেলুদার গল্প থেকে সিরিজ করছেন। সেখানে জটায়ুর চরিত্রটিতে অনির্বাণ অভিনয় করছেন, কিন্তু তাকে জটায়ু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরেকটি সিনেমার আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন ছিল না। কাকবাবুর গল্প থেকে সিনেমায় ফেলুদাকে ট্রিবিউট দেয়ার কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু সেটা সত্যিকার অর্থে প্রয়োজন ছিল না। যেভাবে বারবার অমল বলেন যে সবাই তাকে জটায়ু বলেই মনে করে, সেটা আরোপিত বলে মনে হয়।
গল্প থেকে সিনেমায় কিছু পরিবর্তন থাকবে তা স্বাভাবিক। কিন্তু সৃজিত এ সিনেমায় অনেক পরিবর্তন এনেছেন, যা মূল গল্পটির স্বাদ বদলে দেয়। আফ্রিকান সাভানার বিষয়টি এসেছে, সেখানে চিত্রায়ণ এবং আফ্রিকার উপস্থাপন সুন্দর। জায়গাটিকে আরো স্পষ্টভাবে এবং সময় নিয়ে বড় ফ্রেমে উপস্থাপন করা হলে সিনেমার মান এবং দর্শকের ভালো লাগা বাড়ত বৈ কমত না। কিন্তু সে কাজটি করা হয়নি। উপরন্তু দুটি গান এখানে আফ্রিকার ব্যাকগ্রাউন্ডে আনা হয়েছে, যা অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’
গল্পটির মূল আকর্ষণ ছিল মাসাইমারার জঙ্গল এবং এর বর্ণনা। সে বিষয়টি যদি সিনেমায় ঠিকভাবে উপস্থাপিত হতো তাহলে গল্পটির প্রতি সুবিচার করা হতো। যদিও সাভানা দেখানো হয়েছে, কিন্তু মাসাইদের গ্রামে কাকাবাবু ও সন্তুর পৌঁছানো এবং সেখানকার মানুষের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হওয়ার গল্পটি পুরোপুরি আসেনি। কেবল তাদের সর্দার শহর নিয়ে কয়েকটি কথাই বলে। অথচ সুনীলের গল্পে তথাকথিত ‘সভ্যতা’র প্রতি মাসাইদের বিরাগ স্পষ্টরূপে ফুটেছিল। সিনেমায় তা অনুপস্থিত।
পোচার, চোরাকারবারি ইত্যাদি বিষয় সিনেমায় এসেছে, কিন্তু সৃজিত যেহেতু গল্পের আধুনিকায়ন করেছেন, তিনি এখানে আরো বিস্তারে যেতে পারতেন। সুযোগ ছিল হোটেল ব্যবসার পেছনে থাকা নানা স্বর্থের দ্বন্দ্ব এনে সিনেমাটিকে আরেকটু প্রাপ্তমনস্ক করা। কিন্তু সেখানেও যাওয়া হয়নি। কারিগরি দিকে নজর দিলে সিজিআইয়ের কাজ বেশ ভালো বলা চলে। তবে ক্যামেরায় বরাবরের মতোই সৃজিত এলোমেলো কাজ করেছেন।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় দক্ষ অভিনেতা। কিন্তু কাকাবাবুর ভারিক্কি চালটা তিনি কখনই আনেননি। মিসর রহস্য থেকে শুরু করে সবসময়ই তিনি লঘু। মূলত কাকাবাবুর এ ‘অ্যাটিটিউড’
সৃজিতের কাকাবাবুসুলভ। কেননা তিনি নানা সময় নানা মুখরোচক সংলাপ বলে থাকেন। তার পাশে আরিয়ান ভৌমিক বরাবরের মতোই। সন্তুর বুদ্ধিমত্তা ও সরলতা তার মধ্যে ফোটে না। তবে এবারের সিনেমায় অমল চরিত্রটির উপস্থাপনা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু। অনির্বাণ চক্রবর্তীও দক্ষ অভিনেতা, কিন্তু এখানে দ্বৈত চরিত্রের কোনোটিতেই যেন সাবলীল হতে পারলেন না। এর মাঝে লোহিয়ার চরিত্রে সৃজিত নিজে এলেন, যেখানে চরিত্রটি তার নিজের মতো করে তৈরি। মূল গল্প থেকে ভিন্ন। সৃজিতের সিগনেচার এ বিষয়টি রাখায় কোনো ক্ষতি হয়নি, কিন্তু বিশেষ কিছুও হয়ে ওঠে না।
সবশেষে বলা যায়, সাভানার চিত্রায়ণ যেভাবে সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল, গল্প ও অভিনয় মিলে সিনেমাটি সে রকম হয়ে উঠতে পারল না। ইয়েতি অভিযানের পর সময় নিয়ে তৈরি করা কাকবাবুর প্রত্যাবর্তন তাই গড়পড়তা একটি সিনেমা হয়ে রইল। সিনেমায় রাজা রায়চৌধুরির সে দাপট আর দেখা গেল না।










