সিনেমা কতটা ‘হিট’ না ‘সুপারহিট’ হলো—বহুদিন ধরে বক্স অফিসের মাপকাঠি ধরে তা ঠিক করা হয়। আমরা বক্স অফিসের আয়ের হিসাব শুনে থাকি। কিন্তু এ ‘বক্স অফিস’ বিষয়টা কী? এর উত্পত্তি কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তর বিশদ না জানলেও আমরা জানি, টিকিট বিক্রির রোজগার থেকে সিনেমার ব্যবসা হিসাব করা হয়। মজার ব্যাপার হলো টিকিট বিক্রির এ কাউন্টারই ‘বক্স’ বা ‘বক্স অফিস’ বলে পরিচিত। এ কাউন্টার বা বক্স থেকে বিক্রীত টিকিট এবং তার আয় থেকে বক্স অফিস আয়ের হিসাব করা হয়।

বাংলাদেশে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভারতে সিনেমা হল কথাটা প্রচলিত। থিয়েটার বলতে এখানে মঞ্চ নাটক বা মঞ্চ বোঝানো হয়। একটা সময়ে ইউরোপে এ থিয়েটার বা মঞ্চ খুব জনপ্রিয় ছিল। আজ যেমন সিনেমার জন্য দর্শক লাইন ধরে দাঁড়ায়, তখন থিয়েটারের জন্য ধরতে হতো। এ থিয়েটার বা মঞ্চের বাইরে একটি বিশেষ বক্স আকৃতির এক বা একাধিক কাউন্টারে টিকিট বিক্রি হতো। পাশাপাশি থিয়েটারে সবচেয়ে দামি আসন ছিল বক্স, যেখানে অভিজাত মানুষ বসত। স্বাভাবিকভাবেই বক্সের টিকিটের দাম ছিল সবচেয়ে বেশি। দর্শক আসনের বক্স এবং টিকিট বিক্রির বক্স মিলিয়ে বক্স শব্দটা থিয়েটারের লাভ-লোকসানের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। সিনেমার অগ্রযাত্রা শুরু হলে সে জগতেও বক্স ও বক্স অফিস রয়েই যায়। এমনকি আমরা সিনেমা হল বললেও প্রেক্ষাগৃহকে বহু দেশে থিয়েটার বা সিনেমা থিয়েটার বলা হয়।

বক্স অফিস নিয়ে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প আছে। ষোড়শ শতাব্দীতে এলিজাবেথ থিয়েটারে টাকা গ্রহণের জন্য একটি বাক্স ব্যবহার করা হতো। লম্বা একটি লাঠির মাথায় বাক্সটিকে যুক্ত করে দর্শকের কাছে পাঠিয়ে টাকা নেয়া হতো। অনেকটা আজকের দিনে আমাদের দেশে দান বাক্স যেমন দেখা যায়, তেমনই। কিন্তু বক্স অফিস বিষয়টি আরো প্রায় ২০০ বছর পর প্রচলিত হয়। আর এখন অবস্থা এমন হয়েছে সিনেমার জনপ্রিয়তা মাপতে গেলেও এখন বক্স অফিসের হিসাবের উল্লেখ করা হয়।

থিয়েটার কিংবা সিনেমার সূচনাকালে সরাসরি দর্শকের কাছে টিকিট বিক্রিই আয়ের একমাত্র উপায় ছিল। ফলে সিনেমা যখন ব্যবসায়িক হয়ে উঠল, তখন রোজগারের ক্ষেত্রে বক্স অফিস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সিনেমা আজ বহুল জনপ্রিয় হলেও একটা সময় অবধি সিনেমার (এমকি মঞ্চ নাটকের) দর্শক ছিল হাতেগোনা। কখনো কখনো একই দর্শক ঘুরেফিরে এসে সিনেমা বা নাটক দেখতেন। কে আসছেন তা তো জানা যেত না, কিন্তু কত মানুষ আসছে তা থিয়েটারের কাউন্টার বা বক্স অফিসের আয় থেকে বোঝা যেত। অর্থাৎ, টিকিট বিক্রি হয়ে উঠল সিনেমার জনপ্রিয়তার মাপকাঠি এবং সে খবর যেখানে থাকত, সে বক্স অফিস হয়ে উঠল সিনেমার ব্যবসায়িক হিসাবের কেন্দ্রস্থল। এমকি আজ পর্যন্ত বক্স অফিসই এ হিসাবের হর্তাকর্তা। আমরা আজও শুনি অমুক সিনেমা এত টাকা আয় করেছে, তমুক সিনেমা তত। কিন্তু কথা হলো হিসাবটা কেমন করে হয়?

সিনেমার খরচ শুরু হয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে। আয় শুরু হয় বক্স অফিস থেকে। সেটা কয়েক ধাপ পার হয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছে। বিভিন্ন থিয়েটারে মুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একটি বিপণন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়। থিয়েটার, হল বা মাল্টিপ্লেক্সের বক্স অফিস থেকে আসা অর্থের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আবার বিপণন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে বলিউডে বক্স অফিসের নীতি অনুসারে থিয়েটারের বক্স অফিসে জমা অর্থের ৩০ শতাংশ ‘বিনোদন কর’ (ভারতে মূলত ১৪টি আলাদা আলাদা অংশে, আলাদা পরিমাণে বিনোদন কর নির্ধারিত) হিসাবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়। বাকি অর্থ মূলত থিয়েটারের আয়। এ আয় থেকে থিয়েটার মালিকরা নির্দিষ্ট হারে ফেরত দেন। এক্ষেত্রে প্রথম সপ্তাহে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় সপ্তাহে ৪২, তৃতীয় সপ্তাহে ৩৭ এবং এরপর থেকে ৩০ শতাংশ হারে বিপণন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। তবে কোনো সিনেমা যদি একটি স্ক্রিনে মুক্তি পায়, তবে থিয়েটার মালিকরা তাদের আয় থেকে বিপণন প্রতিষ্ঠানকে ৭০-৯০ শতাংশ দিয়ে থাকেন।

হলিউড বা যেকোনো বক্স অফিস প্রায় এ একই নীতিতে কাজ করে। এখন কথা হলো বক্স অফিস কালেকশন বলে আমরা যা শুনে থাকি তা আসলে কী? বিপণন প্রতিষ্ঠান থিয়েটার থেকে যে অর্থ লাভ করে, চুক্তি অনুসারে তার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। এ অর্থ মূলত সিনেমাটির মুনাফা। অনেক সময় একেই বক্স অফিস কালেকশন বলে ভুল হয়। বক্স অফিস কালেকশন মূলত বক্স অফিসে জমা হওয়া টিকিট-বিক্রির অর্থমূল্য। এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন আসে বক্স অফিস কালেকশনের যে সম্ভাব্য পরিমাণ দেয়া হয়, তা কেমন করে হিসাব করা হয়? মূলত অগ্রিম টিকিট বিক্রি লক্ষ্য করে হিসাবটি করা হয়। কোনো সিনেমার প্রথম সপ্তাহের তুলনায় দ্বিতীয় সপ্তাহে টিকিট বিক্রি কমে গেলে আন্দাজ করা যায়, পরের সপ্তাহে হার আরো কমবে। পাশাপাশি প্রযোজনা বা বিপণন প্রতিষ্ঠানটি দেশজুড়ে থাকা থিয়েটার থেকে তথ্য নিয়ে পূর্বাভাস তৈরি করে।

বর্তমানে কেবল বক্স অফিস হিসাব দিয়ে সিনেমা হিট বা সুপার হিট ধরা হয় না। এ সময়ে এসে সংগীত, বিজ্ঞাপন ও অনলাইনে প্রচার স্বত্ব সিনেমার মোট আয়ে ব্যাপক প্রভাব রাখে। কিন্তু সেটা ব্যবসার হিসাব। দর্শক-পছন্দ বোঝার ক্ষেত্রে এখনো বক্স অফিসই প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য উপায়। তবে অনলাইনে সিনেমা মুক্তি যেভাবে জনপ্রিয় এবং ব্যবসা সফল হয়ে উঠছে, অদূর ভবিষ্যতে বক্স অফিস কেবল নস্টালজিয়া হয়ে থাকবে বলেই মনে হয়।