আশির দশক বলিউডের জন্য ভালো ছিল না। একটা সিনেমা যেন আরেকটার চেয়েও খারাপ হচ্ছিল। ইন্ডাস্ট্রিটাই নিজের প্যারোডি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের দিনের মতো তখনো বলিউডে দক্ষিণের সিনেমার রিমেক শুরু হয়। প্রযোজকরা দোষ দিচ্ছিলেন ভিডিও ক্যাসেট ও পাইরেসিকে। অবস্থা এমন হয়েছিল যে অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্নার মতো তারকারা সিনেমা থেকে অবসরের কথা ভেবেছিলেন। কমল হাসানের অভিষেক হয়েছিল হিন্দি সিনেমায়। ‘এক দুজে কে লিয়ে’ হিটও করেছিল, কিন্তু সিনেমাটা ভালো ছিল না। এ দুরবস্থার মধ্যেই বলিউডে নিজের জায়গা করার পাশাপাশি কয়েকটি হিট সিনেমা দিয়েছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী।

আশির দশকের মিঠুন চক্রবর্তীকে ইন্ডাস্ট্রি ও দর্শক প্রায় ভুলেই গেছে। ২০০০ সালের পর কেউ তাকে চিনেছে ডান্স ইন্ডিয়া ডান্স, কেউ চিনেছে ‘ফাটাকেস্ট’ দিয়ে। কিন্তু আশির দশকে তিনি ছিলেন রীতিমতো একটা সেনসেশন। তার নাচের মুদ্রা, পোশাক ও স্টাইল অনুসরণ করত বলিউডের অনেক অভিনেতা। দর্শকের কাছে প্রিয় তো ছিলই। বিশেষত আশির দশকের ডিস্কো মানেই ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী।

16

তার অভিষেক হয়েছিল ভারতীয় বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি পরিচালক মৃণাল সেনের হাত ধরে। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায় মৃণাল সেন পরিচালিত ‘মৃগয়া’। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন মিঠুন। কিন্তু সিনেমা পাননি এরপর। ২০০৬ সালে স্টারডাস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতীয় পুরস্কার আমাকে সিনেমা এনে দেয়নি। একটা সময় আমি খল চরিত্র করার ব্যাপারেও ভেবেছিলাম। কারণ আত্মবিশ্বাস ছিল না যে ভালো কোনো চরিত্র পাব।’

নাচের প্রতি মিঠুন চক্রবর্তীর আগ্রহ ছিল। ওই সময়ের নায়করা নাচের প্রতি মনোযোগী ছিলেন না। মিঠুন নিজের এ আগ্রহকে কাজে লাগান। নিজের নাম বদলে রাখেন রানা রেজ। এরপর ব্যাকআপ ডান্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন। হেলেনের দলে যোগ দিয়েছিলেন মিঠুন আর সেখানে তার পারফরম্যান্স দেখে হেলেন মুগ্ধ হন।

17

১৯৮২ সালে ভাগ্যলক্ষ্মী মিঠুনের দিকে চেয়ে হেসেছিলেন। সে বছর মুক্তি পায় ‘ডিস্কো ডান্সার’। বব্বর সুভাষ পরিচালিত সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করেছিল ১০০ কোটি রুপি। সিনেমায় তেমন কিছু ছিল না, কিন্তু বাপ্পী লাহিড়ীর সংগীত ও মিঠুনের নাচই সিনেমার প্রতি দর্শককে টেনেছিল। ডান্স নাম্বারের জন্যই দর্শক বারবার এ সিনেমা দেখেছেন। আশির দশক বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। কেননা সিনেমার একটা দৃশ্যে দেখা যায় নায়কের মা গিটার থেকে তড়িতাহত হয়ে মারা যান। আজকের দর্শক এসব মেনে নিতেন না।

ডিস্কো ডান্সার হিট হলে মিঠুনের জন্য কাজ পাওয়া সহজ হয়েছিল। এরপর তিনি আরো কিছু সিনেমায় অভিনয় করেন যা বস্তুত ডিস্কো ড্যান্সারের অনুকৃতি। কিন্তু তাতে মিঠুনের লাভ বই ক্ষতি হয়নি। তার রোজগারও বাড়ছিল। ১৯৮৬ সালে তিনি সর্বোচ্চ করদাতা ছিলেন।

কিন্তু আশির দশকের বলিউড নতুন কিছু করার মানসিক অবস্থায় ছিল না। মিঠুন চক্রবর্তীও তাই একটা গণ্ডির বাইরে বেরোতে পারেননি। তিনি বছরে ১২টি সিনেমায় কাজ করেছেন, কিন্তু সিনেমাগুলো হিট হয়নি। দর্শকের মনেও জায়গা করে নিতে পারেনি।

আশির দশকে মিঠুন ১০০-এর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এরপর গোবিন্দ, জ্যাকি শ্রফ, অনীল কাপুরদের যুগ শুরু হয়। মিঠুনের আর সুযোগ ছিল না। তিনি ১৯৯০ সালে উটিতে জমি কেনেন। ৩ কোটি রুপি লোন নিয়ে নিজের আরো ৪ কোটি রুপি যোগ করে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। বলিউডের নায়কদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ী শাহরুখ খানের আগে মিঠুন চক্রবর্তীই সফল ব্যবসা করেছিলেন।

নব্বইয়ের দশক ও তার পরও মিঠুন বলিউডে অভিনয় করেছেন। কিন্তু বলিউড তাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিনেতার কাতারেই রেখেছে। ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে টালিগঞ্জ তাকে আবার সুপারস্টার তকমা ফিরিয়ে দেয়। পাশাপাশি ডান্স ইন্ডিয়া ডান্স তাকে আরেকটি পরিচয় দিয়েছিল। অমিতাভ যেমন ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ দিয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন, মিঠুনের জন্য সে কাজ করেছিল ডান্স ইন্ডিয়া ডান্স। পরবর্তী সময়ে এর বাংলা সংস্করণও হয়। এছাড়া আরো অনেক সিনেমা ও রিয়ালিটি শো দিয়ে মিঠুন নিজের জায়গা নতুন করে তৈরি করেন। বলিউডও তাকে নতুন করে সিনেমায় নিয়েছে। এখন তিনি জ্যেষ্ঠ অভিনেতা ও কিংবদন্তি হিসেবেই পরিচিত।