সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি মুক্তি পেয়েছিল ২০২২ সালে। সিনেমাটি দিয়ে বানসালি ফিরেছিলেন নতুন করে। প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি এবং তার চেয়ে বেশি পেয়েছেন আলিয়া ভাট। দুই বছরের মাথায় বানসালি প্রায় একই ধাঁচের গল্প নিয়ে এসেছেন। তবে বড় পর্দায় নয়, তিনি নিজেকে নতুন করে এনেছেন ছোট পর্দায়। ১ মে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে তার প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘হীরামাণ্ডি’। নারীপ্রধান এ সিরিজে তিনি তুলে এনেছেন লাহোরের বিখ্যাত হীরামাণ্ডিকে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আসল হীরামাণ্ডিকে ধারণ করার চেয়ে তিনি বেশি মন দিয়েছেন তার স্বভাবসুলভ বিশাল সেটে। পাশাপাশি বানসালি এবার হেঁটেছেন বলিউডের চলতি পথে, যেখানে সব গল্পেই মেশানো হয় জাতীয়তাবাদ।

হীরামাণ্ডি একটি বাস্তব স্থান। লাহোরে এর অবস্থান। মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের সময় তার এক পারিষদ হীরা সিং ডোগরা, লাহোরে একটি বাজার স্থাপন করেন। তার নামেই ‘হীরা কি মাণ্ডি’ ও পরবর্তী সময়ে আরো সংক্ষেপে হীরামাণ্ডি। শহরের কেন্দ্রে বাণিজ্য ভালো হবে মনে করে বাজার বসিয়েছিলেন হীরা সিং। পরবর্তী সময়ে সেখানে পসার জমায় ‘তাওয়ায়েফ’রা। সাধারণ রূপোপজীবিনী ছিলেন না এরা। মূলত রাজা-মহারাজা, নবাবদের মনোরঞ্জন করতেন। নাচ ও গানে তাদের প্রতিভা ছিল অসাধারণ। এমনকি আদবকেতায়ও। অনেক সময় নবাবজাদাদের কেতাদুরস্ত করতে পাঠানো হতো তাওয়ায়েফদের কাছে। বানসালি তার গল্পেও এ হীরামাণ্ডিকেই দেখিয়েছেন। কিন্তু একে সাজিয়েছেন নিজের মতো করে।

বানসালির হীরামাণ্ডির শুরুটা আগ্রহজাগানিয়া। দেখা যায় শাহী মহলের এক তাওয়ায়েফের পুত্রকে বিক্রি করে দিচ্ছেন মহলের মালকিন। কেননা পুত্র কোনো কাজে লাগে না ‘কোঠি’তে । সে রাগ থেকে কোঠির প্রধানকে হত্যা করে সে জায়গা দখল করে মালিকা জান। এটা ফ্ল্যাশব্যাক। গল্পের বর্তমান চল্লিশের দশক। বানসালি আমাদের দেখান ‘ওস্তাদ’ একজন ইংলিশম্যানকে নিয়ে এসেছেন হীরামাণ্ডির ‘হুজুর’ (প্রধান) মালিকাজানের (মনীষা কৈরালা) কাছে। ইংলিশম্যান তাকে গ্রামোফোন দেখায় ও বলে বিব্বো জানের (অদিতি রাও) গান রেকর্ড করতে চায়। এতে সারা ভারত সে গান শুনতে পারবে। মালিকা বলেন, ‘আমাদের কলা দেখতে আমাদের দরজায় আসেন নবাব, রাজা এমনকি ইংরেজ। আমরা কারো দরজায় যাই না।’ সত্যিকার অর্থে এমনই ছিল তাওয়ায়েফদের অহংকার। সেকালের ‘সুপারস্টার’ ছিলেন তারা।

এ গল্প কম-বেশি সবার জানা। মানদা দেবীর ‘শিক্ষিতা পতিতার আত্মকথা’, মীর্জা হাদি রুসওয়ার ‘উমরাও জান’, বিক্রম সম্পতের ‘আমার নাম গওহর জান’ ও নবাবি আমল নিয়ে লেখা বইয়ে তাওয়ায়েফ/বাইজিদের এসব গল্প জানা যায়। সিনেমায়ও তা এসেছে বহুবার। কমর আমরোহীর ‘পাকিজা’, মুজাফফর আলীর ‘উমরাও জান’ সে সাক্ষ্য দেয়। বানসালি নিজেও নির্মাণ করেছেন গাঙ্গুবাই। তবে মানদা দেবীর বই, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ ও সৃজিত মুখার্জির ‘রাজকাহিনী’ বা ‘বেগম জান’ একটু আলাদা ধরনের। কেননা এ তিন আখ্যান পতিতাদের নিয়ে। তাওয়ায়েফ এদের তুলনায় উচ্চ ঘরানার। কিন্তু হীরামাণ্ডির সঙ্গে এ বিষয়ও যুক্ত, কেননা চল্লিশের দশকের শেষের দিকে হীরামাণ্ডির নারীদেরও অবনমন হয়। এছাড়া সৃজিতের গল্পের সময়কাল অনেকটা বানসালির সময়কালের সঙ্গে মেলে।

বানসালির নির্মাণ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে তার সেট। প্রতিবারের মতো এবারো সেট নির্মাণেই অর্ধেকের বেশি পরিশ্রম করেছেন। মানতেই হবে খুব অল্প জায়গা নিয়ে হলেও জমকালো সেট বানিয়েছেন তিনি। ফোয়ারা, আলোকসজ্জা, ঝাড়বাতি মিলিয়ে এলাহী কাণ্ড। সেদিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে মন দিতে হয় অভিনেত্রীদের দিকে। মনীষা, সোনাক্ষী, অদিতি, শারমিন, রিচা সবারই পোশাক থেকে শুরু করে সাজ ও গহনা জমকালো। এরা প্রত্যেকেই নিজের জায়গা থেকে চমৎকার অভিনয় করেছেন। বিশেষত মনীষা ও সোনাক্ষীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ্য ছিল। ঘরোয়া রাজনীতির এ চেহারা হীরামাণ্ডি এমনকি বাদশাহী জেনানায়ও ছিল। বানসালি সেটা ভালো তুলেছেন। সমস্যা তিনি করেছেন অন্য জায়গায়। হীরামাণ্ডির গল্পটা সেখানে হারিয়ে যায়।

সৃজিত মুখার্জির রাজকাহিনী নির্মাণ হয়েছিল পার্টিশন নিয়ে। কিন্তু তার বড় অনুষঙ্গ ছিল ‘বেগম জানের কোঠা’। সে কোঠার পতিতাদের প্রত্যেকের জীবনকে মুখ্য রেখেছিলেন তিনি। মুজাফফরের উমরাও ও আমরোহীর পাকিজায় ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ দেয়া হয়েছিল। বানসালিও গাঙ্গুবাইয়ে একই কাজ করেছেন। হীরামাণ্ডি শুরু হয়েছিল হীরামাণ্ডি, হুজুর মালিকাজানের ক্ষমতা, বিব্বো জানের প্রতিভা, আলমজেবের শায়েরা হওয়ার স্বপ্ন দিয়ে। এরপর এল ফারিদানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব। অন্তঃকোন্দলের জায়গা থেকেই হীরামাণ্ডি ও সেখানকার নারীদের ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল। কিন্তু বানসালি চলে গিয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে।

তাওয়ায়েফরা রাজনীতির হিস্যা ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু যেভাবে বিব্বোকে সশস্ত্র বিদ্রোহে যুক্ত করা হয়েছে তা বেমানান। নবাবরা হীরামাণ্ডি থেকে সমর্থন তুলে নেয়া ও বিব্বোকে বাঁচাতে হীরামাণ্ডির সবার পথে নেমে আসা এবং গান গাওয়া মেলোড্রামাটিক। ষষ্ঠ পর্ব থেকে সিরিজ যেন মূল গল্প থেকেই সরে গেল। সেখান থেকেই বলিউডের চলতি পথ, সব গল্পেই জাতীয়তাবাদের ছোঁয়া ধরেছিলেন বানসালি। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, স্বাধীনতাকামী যুবক ভারতের পতাকা নাড়াচ্ছেন। অথচ শহরটা ছিল লাহোর।

২০১৩-১৪ সালে স্টার প্লাসে ‘সরস্বতীচন্দ্র’র পর আবার ছোট পর্দায় বানসালি । তার স্বভাবসিদ্ধ সবই ছিল। কিন্তু মূল গল্পটাই যেন তিনি আনতে পারলেন না।