—টিকিটটা মুখে পুরে দাও... এবার গিলে ফেলো!

এক্সিলেন্ট। আরে দারুণ, দারুণ! টেরিফিক। খুব ভালো। টিকিটটা ফেলে দাও।

—ওটা তো গিলে ফেলেছি।

মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ সিনেমার ট্রামের সিকোয়েন্সের রিকনস্ট্রাকশন। সিনেমার নাম ‘চালচিত্র এখন’। সেখানে কুনাল সেন তার অভিনেতা রঞ্জনকে বলেছিল ট্রামের টিকিট গিলে ফেলতে। মেথড অ্যাক্টিংয়ের ভক্ত রঞ্জন সত্যিই গিলে ফেলেছিল টিকিট। বাস্তবে চালচিত্র করতে গিয়েও হয়তো এমনটাই হয়েছিল। কেননা অঞ্জন দত্ত তার সিনেমায় নিয়ে এসেছেন মৃণাল সেনের সে সিনেমাটিরই হয়ে ওঠার গল্প। চালচিত্রের তিনি একজন কুশীলব। মৃণালকে দেখেছেন কাছ থেকে। ফলে এ সিনেমার গল্প যতটা মৃণালের, ততটাই অঞ্জনের।

সিনেমা শুরু হয় কলকাতার কথা বলে। আদতে সিনেমাটা কলকাতাকে নিয়েই। চালচিত্র যারা দেখেছেন তারা জানেন, আশির কলকাতা এ সিনেমায় মূর্ত। সে সময়ের গল্পটা মৃণাল কেমন করে তুললেন, অঞ্জন দত্ত নিজের সিনেমায় তা বলেছেন। শুরুতেই আমরা দেখি, কুনাল সেনের ইন্টারভিউ নিতে এসেছে রঞ্জন। কুনালের কোনো সিনেমা সে দেখেনি। কুনাল সে কথা বুঝতে পেরেও ইন্টারভিউ ক্যান্সেল করেন না। বরং রঞ্জনকে জানান কলকাতা সম্পর্কে তার ধারণা।

এদিকে রঞ্জন জার্মানির ভক্ত। জার্মান নাটক নামাচ্ছে। সেজন্য তার আছে একটা দল। সে দলের অভিনেতাদের সঙ্গে রঞ্জনের খুব একটা জমে না। কারণ রঞ্জন যেভাবে নাটককে দেখে, তারা দেখে না। নাটকে বাগড়াও আসে রাজনৈতিক কারণে। সে সময় একটা সিনেমায় ‘পার্ট’ করার জন্য রঞ্জনকে নিজে থেকে ডেকে নেন কুনাল। কথা হয় ৫ হাজার টাকা দেয়ার। কিন্তু শুরুতেই, প্রথম দিনে রঞ্জনের কোঁকড়া-লম্বা চুল কেটে দেন কুনাল।

মৃণাল সেনকে যারা দেখেছেন, তার সম্পর্কে পড়েছেন তারা জানেন, মৃণাল ছিলেন অনেকটাই খামখেয়ালি। সিনেমা পুরোটা তার মাথায় থাকলেও থাকত না কোনো লিখিত চিত্রনাট্য। চালচিত্র এখন আমাদের দেখায় রঞ্জন একটা চিত্রনাট্য চাইছে কুনালের কাছে, কিন্তু কুনাল বলছে চিত্রনাট্যের প্রয়োজন নেই। তিনি যেমন বলবেন রঞ্জন করবে, তাহলেই হবে। মৃণাল সেন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার ছেলে কুনাল সেনও একই কথা বলেছেন। তার বাবা অনেক সময়ই লিখিত চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করতেন না। সেই সঙ্গে শুটিংয়ে আগে থেকে অনেক বিষয়ের থাকত না কোনো পরিকল্পনা। মৃণাল সেন বলতেন, আর সেই অনুসারে কাজ করত তার অভিনেতারা।

চালচিত্র এখন আমাদের দেখাল কয়েকটা জিনিস। প্রথম মৃণাল সেনকে। অঞ্জন দত্ত অনেকটাই হয়ে উঠেছেন মৃণাল সেন। কয়েকটা দৃশ্যে অঞ্জনের পরচুলার লাইন বোঝা যাওয়া এবং গায়ক, অভিনেতা ও নির্মাতা অঞ্জনের পরিচিত ছাপ বাদে তিনি মৃণাল হয়ে উঠেছেন। কাঁধ কুঁজো করে হাঁটা, সিগারেট খাওয়ার ধরন, জুলপির স্টাইল নিয়ে তিনি যেন মৃণালের রেপ্লিকা। সেটা অবশ্য অঞ্জনের পক্ষেই সবচেয়ে সহজ ছিল, কেননা বেশ কয়েকটি সিনেমায় তিনি কাজ করেছেন মৃণাল সেনের সঙ্গে। চালচিত্র তার জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল, তা সবারই জানা।

সিনেমায় অঞ্জন দত্তের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাওন চক্রবর্তী। তাকে অঞ্জন দত্তের মতো মনে না হলেও চালচিত্রের দীপু ঠিকই মনে হয়েছে। অঞ্জন দত্ত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সিনেমার জন্য ‘অঞ্জন দত্ত’কে খুঁজে পেতে তার সমস্যা হয়েছিল বা এ ছিল তার বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা তার প্রয়োজন ছিল তার্কিক, জেদি, গিটার বাজাতে পারা একটা ছেলে। সেই জায়গা থেকে শাওন ভালো কাজ করেছেন। বিশেষত অঞ্জন দত্ত তাকে দিয়ে নিজের মিমিক করাননি, এটা তার পরিচালনার একটা গুণ।

অঞ্জন দত্ত নিজে কেন মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করলেন? এ লেখায় শুরুতে যেমন বলা হলো অঞ্জন দত্ত খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাকে। অঞ্জনের নিজের কথায়, তিনি যেভাবে মৃণালকে আত্মস্থ করেছেন তা আর কেউ করেনি। সিনেমায় অবশ্য তার প্রমাণ আছে। তিনি মৃণাল সেনের মতোই গপগপ করে খাচ্ছেন, সবসময় একটা অস্থিরতা, কিছু না কিছু করতে থাকার বিষয়টা অঞ্জন দত্ত ভালো তুলে এনেছেন।

সেই সঙ্গে তিনি এনেছেন গীতা সেন, কেকে মহাজন, শ্রীলা মজুমদার, অনুপ কুমারকে। গীতা সেনের চরিত্রটির স্ত্রিন টাইম বেশি ছিল না। সেই তুলনায় কেকে মহাজনের (সিনেমার মাধবন) চরিত্রে সুপ্রভাত মহাজনকে নতুন করে পরিচয় করান। তবে অনুপ কুমারের চরিত্রে এক মিনিটের স্ক্রিনটাইমে রূপংকর খুব একটা ভালো করেননি। এর বাইরে সিনেমায় চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও সিনেমাটোগ্রাফিতেও আছে কিছু ত্রুটি। তার চেয়ে বেশি একটু তাড়াহুড়োর ছাপ। পুরনো কলকাতার মধ্যে নতুন কলকাতার চেহারা দেখা যায়। এ নিয়ে অঞ্জন দত্তের মত, ‘ওরা অ্যাস্বাসেডর গাড়ি আর টুসি ক‌্যামেরা নিয়ে ঘুরুক না। পেছন দিয়ে অন‌্য গাড়ি এলে অসুবিধা কী! এটা গোদারিয়ান টেকনিক। মৃণালবাবু এটাকে সাপোর্ট করতেন। যেজন‌্য আমরা ‘‘সামটাইম’’ লিখছি। ১৯৮০ বলছি না।’ (মৃণাল সেনের বাড়ির দেয়ালে লেখা ছিল আমার ফোন নাম্বার, রোববার, ৯ মে ২০২৪)

এর মধ্যেই শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি একটা সময়ের কথা বলে। কিছু মানুষের কথা বলে। তবে সিনেমাটি হয়ে ওঠে আত্মানুসন্ধানীও। রঞ্জনের জার্মানি না যাওয়া, কলকাতাকে ভালোবাসার গল্প ও রঞ্জনের মধ্য দিয়ে যেন নিজেকেই খুঁজতে চেয়েছেন অঞ্জন দত্ত।