দিনকাল বদলে গেছে। ১৯৯৯ সালে কোলাহলপূর্ণ একটা সিনেমা হলে বসে আমি ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ দেখেছিলাম। ২২ বছর পর এ সিরিজের তৃতীয় সিনেমা ‘দ্য ম্যাট্রিক্স: রেজারেকশনস’ নানা অনলাইন প্লাটফর্মে মুক্তি দেয়া হচ্ছে। আমি ভাবছিলাম ল্যাপটপেই দেখব। এ কথা বলতেই ওপাশ থেকে কিয়ানু রিভস বলে উঠলেন, ‘তুমি সিনেমাটা স্ট্রিম করো না...খবরদার এটা স্ট্রিম করবে না।’

ভিন্ন দুই টাইম জোনে জুম মিটিংয়ে আমাদের কথা হচ্ছিল—লন্ডনে আমি যখন সন্ধ্যা দেখছি, লস অ্যঞ্জেলেসে তখন সকাল। রিভস নিজেই বলেন, তিনি সকালে ঘুম থেকে ওঠেন না। তরুণ অবস্থায় কোনো এজেন্সি যখন তাকে অডিশনের জন্য ডাকত, তিনি বলে দিতেন, বেলা ১১টার আগে নয়। সেই কিয়ানু যখন জেট ল্যাগ ভেঙে, এক কাপ কফির পর আমেরিকান স্পিরিট ব্লু সিগারেট টেনে জুম ইন্টারভিউতে আসেন, সেটা একটা বড় বিষয়। চোখ ডলে দুই হাতের মধ্যে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি কি পাগল? ম্যাট্রিক্সের নতুন সিনেমাটা তুমি ল্যাপটপে দেখবে?’

অনেক কথার পর কিয়ানু বললেন, ‘দেখো, সমস্যা নেই।’ এত কথা বলে নেয়ার কারণ কিয়ানু নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করেন সেটা পাঠককে জানানো। কিয়ানুর বন্ধুরা বলেন, কিয়ানু প্রথমত শ্রোতা, অতপর বক্তা। একটা বক্তব্য দেয়ার পর তিনি কখনো কখনো নিম্নস্বরে সেটার পুনরাবৃত্তি করেন। আর কোনো নতুন প্রশ্ন শুনলে কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে থেকে তিনি ভাবেন। আমি যখন একজন ভালো শ্রোতার গুণ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, আগ্রহ আর যত্ন। আমি কারো সঙ্গে কথা বলছি মানে আমি তার প্রতি যত্নশীল।’

কিয়ানুর সহজ ব্যবহার, জীবনযাপন, ব্যক্তিত্ব প্রশংসিত। কিয়ানুর মতে, এর অনেকটা তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। কিয়ানুর জীবন বেশ বিচিত্র। তার মা-বাবার দেখা হয়েছিল বৈরুতে। তারপর প্রেম, পরিণয়। কিন্তু বিয়ে টেকেনি। বিচ্ছেদের পর মা প্যাট্রিসিয়া তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে যান এবং পরে ঠাঁই হয় টরন্টো। সৎ পিতা পল অ্যারনের মাধ্যমে সিনেমা জগতের সঙ্গে কিয়ানুর যোগাযোগ হয়। ‘আমার ধারণা, আমার বয়স তখন ১৫। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছিল। সে সময় আমার মা-বাবা আমাকে সিনেমার প্রডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট করার চিন্তা করলেন।’ অ্যারন তখন চাক নরিসকে নিয়ে একটা সিনেমা তৈরির কথা ভাবছিলেন। কিয়ানুকে একজন কর্মী হিসেবে নেয়া হয়। স্মৃতি থেকে কিয়ানু বলেন, ‘আমি অভিনেতাদের দেখছিলাম। দেখছিলাম সিনেমার সেটে কীভাবে কাজ হয়। কলশিট, জেনারেটর, লাঞ্চ টাইম সবই দেখতাম।’

বেশ কিছুদিন এসব কাজের পর টরন্টোর একটি পারফর্মিং স্কুলে ভর্তি হন রিভস। এক বছর সেখানে ছিলেন। ‘ওরা আমাকে আর ফিরতে দেয়নি’—কিয়ানু বলেন। কিন্তু কেন? খারাপ ব্যবহারের জন্য? এমন বদনাম তো তার নেই। কিয়ানু সম্পর্কে স্যান্ড্রা বুলক বলেন, ‘আমার মনে হয় না ওর সম্পর্কে বদনাম করার মতো কোনো ঘটনা কারো কাছে আছে।’ স্কুল থেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে তাই স্বভাবগতভাবে রিভস বলেন, ‘আমার সঙ্গে শিক্ষকদের মত মিলত না। আমি নানা ধরনের প্রশ্ন করতাম। কেন? কীভাবে? এসব তাদের ভালো লাগেনি।’ ততদিনে কিয়ানু বেশ অভিনয় করছেন। টাকাও কামাচ্ছেন। কর্নফ্লেক্সের বিজ্ঞাপনে পারিশ্রমিকসহ কাজ করার পাশাপাশি কমিউনিটি থিয়েটারে বিনা পয়সায় অভিনয় করেছেন। কিয়ানুর ভাষায়, ‘আমি এক বন্ধুর বাড়িতে থাকতাম। যথেষ্ট টাকা ছিল। ২০ বছর বয়সে টরন্টো ছেড়ে হলিউডে পাড়ি দিলাম।’

কিয়ানু তুলনামূলক বেশিসংখ্যক সিনেমায় কাজ করেন। এ কারণে অনেক সময় একটার সঙ্গে আরেকটার সময় নিয়ে সমস্যা হয়। কিন্তু শুরু থেকেই নিজেকে কাজের মধ্যে রাখতে চাইতেন তিনি। তবে সবকিছুর মধ্যে ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ এখনো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। দুই যুগ পর এসে মনে হয় আমার ১৭ বছর বয়সে দেখা ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ ভিন্ন আবেশ রেখে দিয়েছে। শুধু বক্স অফিসে আয়ের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে বহু পরিমাণে ডিভিডি বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকশন সিনেমার ধারাই বদলে দিয়েছিল ম্যাট্রিক্স। রিভসের জনপ্রিয়তার অন্যতম জায়গাও এ সিনেমা। কিন্তু রিভস বলেন, ‘সিনেমাকে আমি সিনেমার মতো করেই নিই। বুঝতে চেষ্টা করি পরিচালক কী চান। তারা কোন দিকটা ফুটিয়ে তুলতে চান বা কী দেখাতে চান। আমি সেটাই করে দিই।’

কাজের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনে কিয়ানু অনেক খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। মধ্য ত্রিশে তার তত্কালীন প্রেমিকার গর্ভকালীন সমস্যার কারণে তারা একটি সন্তান হারান। পরে তার প্রেমিকা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯৩ সালে বন্ধু রিভার ফিনিক্সকে (জোকারখ্যাত হোয়াকিম ফিনিক্সের ভাই) হারান। এত সবের মধ্য দিয়ে কিয়ানু নিজেকে বের করে এনেছেন। কখনো কখনো কিয়ানুর মনের গভীর আবেগ কবিতায় উঠে আসে। বর্তমান জীবনসঙ্গী আলেকজান্দ্রা গ্র্যান্টের অলংকরণের সঙ্গে রিভসের কবিতা মিলেমিশে যায়। একজন হলিউড সুপারস্টারের কবি হয়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে রিভস ভালোই করেছিলেন। বেদনা ও ব্যস্ততা নিয়ে কবিতার মতো জীবন তার। পুরনো কষ্ট সম্পর্কে রিভসকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত কবিতার বই ‘শ্যাডোস’ মূলত জীবনের এসব অব্যক্ত ব্যথার প্রকাশ ছিল। বেদনার জন্য কতটা মূল্য দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় মূল্য চোকানোর জন্য ব্যাংকে এখন যথেষ্ট অর্থ আছে।’

কিয়ানু এখন এতটাই আত্মবিশ্বাসী। ম্যাট্রিক্স নিয়ে এ বছর অনেক রকম কথা হচ্ছে। তবে ২০১৪ থেকে ‘জন উইক’ দিয়ে তার যে জনপ্রিয়তা, তাতে ভাটা পড়েনি। ২০২২-২৫ এর মধ্যে আরো কয়েকটি সিক্যুয়াল আসছে। জন উইকের প্রথম সিনেমাটি নিয়ে একটা গল্প আছে। সিনেমা বাজেট সংকটে ভুগছিল। একটা দীর্ঘ সিকোয়েন্সে ছিল, যেখানে অনেকের সঙ্গে কিয়ানুর অ্যাকশন হবে। স্বল্প বাজেটে অল্প কয়েজন স্ট্যান্ট ম্যানই আনা সম্ভব হয়েছিল। তারা নায়কের (কিয়ানু) সঙ্গে লড়াই করে মরছিলেন। তারপর ক্যামেরার পেছন থেকে আবার ফিরে এসে অ্যাকশন করছিলেন। আমার কাছে কিয়ানুর ক্যারিয়ারটাও এমন মনে হয়। শুট... বিরতি... শুট...। কিয়ানুর দর্শন হলো প্রতিটি মিনিটের সদ্ব্যবহার। সময়ের কাছ থেকে যতটা আদায় করে নেয় সম্ভব তিনি নিতে চান। সাক্ষাত্কারের শেষে বিদায় জানানোর আগে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘এত কাজ করে আপনি কি সময়টা আপনার জন্য ধীর করতে চান?’ কিয়ানু জবাব দিলেন, ‘এতে কখনো সময় ধীর হয়ে যায় না। সময় কখনো ধীরে চলে না। বরং সবকিছু আরো গতিশীল হয়।’

 

‘দ্য গার্ডিয়ান’ প্রকাশিত টম ল্যামন্টের সাক্ষাত্কারভিত্তিক ফিচার অবলম্বনে