ফুলেরায় এলেন নতুন সচিব। কিন্তু পঞ্চায়েত অফিসে তালা। বিকাশকে প্রধান জানাচ্ছেন তালা খোলা হবে না। নতুন সচিব চেষ্টা করলেন তালা ভাঙার। কেননা তিনি এলাকার বিধায়কের নিজের লোক। তার ওপর তালা ভাঙার জন্য হাতুড়ি এনে দিল ভূষণ। সব মিলিয়ে পুরনো সিজনের ভাব এনে দিল টিভিএফ প্রযোজিত সিরিজ পঞ্চায়েতের তৃতীয় সিজন। সিরিজের শুরুতেই দর্শক মনে করতে পারবেন আগের সিজনের ঘটনা। কোনো প্রিলিউড দেখানো হয়নি, কিন্তু দর্শক বুঝতে পারবেন কী হয়েছিল। অভিষেকের বদলি, প্রধান ও ফুলেরার সঙ্গে বিধায়কের দ্বন্দ্ব, ভূষণের রাজনীতি, অভিষেক-রিংকির রসায়নের সঙ্গে প্রহ্লাদের সন্তান হারানোর বেদনা নিয়েই শুরু হয় পঞ্চায়েতের তৃতীয় সিজন।
গত সিজনে অভিষেকের বদলি হয়েছিল। এবার প্রথম পর্বে আমরা দেখি অভিষেক চাকরি ছাড়ার চিন্তা করছে। কিন্তু নতুন সচিবকে যখন বিকাশ, প্রহ্লাদ, প্রধানরা ঢুকতে দিচ্ছে না, সেসব ঘটনার মধ্যেই খবর আসে বিধায়ক মামলায় হেরেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রতিবেশীর কুকুর হত্যা করেছেন। ফলে মামলায় হারা বিধায়কের আশীর্বাদপুষ্ট সচিব পঞ্চায়েত অফিসে জয়েন করার আগেই অভিষেকের বদলি রদ হলে সে ফিরে আসে ফুলেরায়।
পঞ্চায়েতের গল্প আগের দুই সিজনে আবর্তিত হয়েছে অভিষেকের পড়াশোনা, উচ্চাশার সঙ্গে ফুলেরার সরল-সাধারণ জীবন ও গ্রাম্য রাজনীতি নিয়ে। এবারো তা আছে তবে আগের দুই সিজনের গল্প যতটা সরলরৈখিক, এবার তা ছিল না। বেশ কয়েকটি ছোট গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে সিজনের পুরোটা। সে গল্পেরই একটা জগমোহনের পরিবারকে নিয়ে। জগমোহনের মা চায়, প্রধানমন্ত্রীর স্কিম থেকে একটি ঘর পেতে। সেজন্য কিছুটা নাটক করতে হয় তার। রাস্তা তৈরি না হওয়ার ভয় দেখিয়ে অভিষেককেও টানা হয় এর মধ্যে। আর যদিও জগমোহনদের একটা ঘর আছে, তবু বৃদ্ধা একটি ঝুপড়িতে থাকা শুরু করে এটা বোঝাতে যে ছেলে তাকে ঘরে রাখে না।
গ্রামে এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটে। পঞ্চায়েত তার দর্শককে এমনই একটা ঘটনা দেখায়। শেষ পর্যন্ত ঘর পেলেও তা আর নেয়া হয় না ‘আম্মা জি’র। কেননা প্রহ্লাদ একদিন তাকে বলে, ‘যে ঘর আপনি সন্তানের জন্য চাচ্ছেন, তার জন্য এখন সন্তানের কাছ থেকেই দূরে থাকতে হচ্ছে।’
পঞ্চায়েতকে কমেডি সিরিজ হিসেবেই দেখে থাকেন অনেকে। কিন্তু দ্বিতীয় সিজন থেকেই পঞ্চায়েত হয়ে উঠেছে জীবনের গল্প। প্রথম সিজনে অভিষেককে ফুলেরায় আপন করে নেয়া থেকেই এর সূচনা, কিন্তু প্রহ্লাদের ছেলের মৃত্যু সেখানে অন্য রকম আবহ এনে দেয়। এবারের সিজনের পুরোটায় প্রহ্লাদের শোকের ছাপটা রেখেছেন নির্মাতারা। একটা দীর্ঘ সময় হাসি-মজার মধ্যেই দর্শক কাতর হন প্রহ্লাদের শোকে। বিশেষত ডিএম অফিসে প্রহ্লাদ যখন বলে, ‘সময়ের আগে কেউ চলে যাবে না ভাবী। কেউ না, মানে কেউ না’, ফয়সাল মালিকের ডায়ালগ ডেলিভারি আর অভিব্যক্তি এ সময় দর্শকেরও চোখের কোল ভেজায়। কথাটা কেবল বর্তমান লেখক বলছেন না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পঞ্চায়েতের দর্শকরাই বলছেন। তারা এ-ও জানাচ্ছেন, এর পর প্রহ্লাদের খুশিতে তারাও খুশি হয়েছেন।
সিরিজ সাধারণত যত এগোয়, এর গল্প ঝুলে যেতে থাকে। পঞ্চায়েত নিয়ে এমন আশঙ্কা এর ভক্তদের ছিল। কিন্তু সে রকম কিছু করেননি নির্মাতারা। পুরনো সরলতা তারা রেখেছেন। সেই সঙ্গে কমেডির পাশাপাশি আছে গ্রাম্য রাজনীতি। ভূষণ (দুর্গেশ কুমার) এ সিজনে আরো বেপরোয়া। নানাভাবে সে মঞ্জু দেবী ও প্রধানকে হেনস্থা করতে চায়। নিজে হয়ে উঠতে চায় নেতা। এ কারণেই বিধায়কের কাছে দরবার করে সে।
বিধায়ক চন্দ্রকিশোর সিং (পঙ্কজ ঝা) এ সিরিজের অন্যতম পয়েন্ট। তাকে শুরু থেকেই খল মনে হবে দর্শকের এবং শেষ পর্যন্ত সে খলই থাকে। তার বিরুদ্ধে কুকুর হত্যার অভিযোগের পাশাপাশি ফুলেরায় এসে শান্তি স্থাপন করার সময় কবুতরের মৃত্যু হয়। আবার সে-ই যখন ঘোড়া বিক্রি করে, ঘোড়ার প্রতি তার ভালোবাসার দৃশ্য দেখে দর্শক। মূলত প্রাণী হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা ও সচেতনতার জন্য চমৎকার একটা পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন পঞ্চায়েতের নির্মাতারা।
আছে প্রতিবাদের কথাও। এ সিরিজে বম বাহাদুর সেই প্রতিবাদ ও সাহসের প্রতিনিধি। তার কবুতর মারা গেলে বিধায়কের বিরুদ্ধে কথা বলে সে। তাকে ভয় দেখানো হয়, লোভ দেখানো হয়। কিন্তু সে নিজের জায়গা থেকে সরে আসে না। বম বাহাদুর এবারের সিজনের একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, কেননা তার মাধ্যমেও একটা বার্তা দেয় পঞ্চায়েত।
ভারী ভারী সব বিষয়ের মধ্যে কমেডি থেকে সরেনি সিরিজ। নতুন সচিবকে ঠেকানোর জন্য সূচালো অগ্রভাগের বাঁশ আনা থেকে শুরু করে বিধায়কের কুকুর ভক্ষণ, রিংকির সঙ্গে অভিষেকের সংলাপ, বিকাশের আধ-বোকা কথাবার্তা দর্শককে হাসাবে। সেই সঙ্গে ফিরে এসেছে প্রধান, বিকাশ, প্রহ্লাদ ও অভিষেকের পানের আসর।
সিরিজের অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। নীনা গুপ্তা, রঘুবীর যাদব, জীতেন্দ্র কুমার, চন্দন রায়, সানবিকা, অশোক পাঠক (বিনোদ চরিত্রে) সবাই দুর্দান্ত। এবার আম্মাজি চরিত্রে আভা শর্মা দর্শকের মন জয় করেছেন। ফিরে এসেছে গণেশ (ফুলেরার সে জামাতা, সচিবের সঙ্গে যার দ্বন্দ হয়েছিল চেয়ার নিয়ে)। এ চরিত্রে ফিরেছেন আসিফ খান। তবে এবার গণেশ মিটিয়ে নিয়েছে পুরনো দ্বন্দ্ব। ফিরেছে থানা ইনচার্জ ও পরমেশ্বর।
অনেকের ধারণা ছিল এ সিজনেই হয়তো সিরিজ শেষ হবে। কিন্তু শেষটা বরং রইল ক্লিফ হ্যাঙ্গারে। থানায় হাতে দড়ি বাঁধা অবস্থায় অভিষেক, প্রহ্লাদ, বিকাশ, বম বাহাদুর এক পাশে; অন্য পাশে বিধায়ক, ভূষণ, বিনোদরা। সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। প্রশ্ন থাকে অনেকগুলো। আর এ সময় দর্শকের মধ্যে ‘কী হয়, কী হয়!’ ভাবটা বাড়ে। কেননা তারা ততক্ষণে ফুলেরারই একজন।










