মুজাফফর আলী পরিচালিত সিনেমা ‘উমরাও জান’। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা মূলত মির্জা হাদি রুসওয়া রচিত ‘উমরাও জান আদা’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি করেছেন নির্মাতা। বলিউডে চলমান ‘রি-রিলিজ’ সংস্কৃতিতে এই সিনেমা আবারো মুক্তি দেয়া হচ্ছে বড় পর্দায়। সিনেমাটি কোনো স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে নেই। সহজে দেখার কোনো উপায়ও নেই। ইউটিউবে দুই ভাগে পাওয়া যায়। এ সূত্রে স্ক্রল কথা বলেছে মুজাফফর আলীর সঙ্গে। তার মতে সিনেমাটি সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে।

উমরাও জানের প্রযোজক সিনেমাটি কোনো স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে না দেয়া প্রসঙ্গে মুজাফফর বলেন, ‘সিনেমাটি সহজলভ্য হলে এর প্রতি দর্শকের আকর্ষণ কমে যেত। আমি দেখলাম, এখনো বড় পর্দায় উমরাও জান দেখার প্রতি দর্শকের আগ্রহ আছে।’

বলিউডের পুরনো বহু সিনেমাই নষ্ট হয়ে গেছে। ফিল্মে শুট করা এসব সিনেমার রিল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণজনিত আরো নানা সমস্যায় এ অবস্থা হয়। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ, ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এসব সিনেমার প্রিন্ট সংস্কার করে থাকে। সেভাবেই সংস্কার করে উমরাও জান মুক্তি দেয়া হচ্ছে ২৭ জুন। সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রেখা। ছিলেন ফারুক শেখ, নাসিরুদ্দিন শাহ, রাজ বব্বর প্রমুখ। গল্প, সিনেমাটোগ্রাফি, সেট, পোশাকের নকশা থেকে শুরু করে সিনেমার গান আজও জনপ্রিয়।

উমরাও জান মূলত এক বাঈজীর গল্প। আমিরন তার নাম। উনিশ শতকের লক্ষ্ণৌয়ের বাঈজী সংস্কৃতি, গণিকালয় এবং তাদের সঙ্গে অভিজাতদের সম্পর্ক, প্রেম, বিরহ নিয়েই এ সিনেমা। তবে সেই সঙ্গে উঠে এসেছে লক্ষ্ণৌয়ের জৌলুসের পতন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ। আওয়াধ, বাঈজী, কোম্পানি আমলে ভারতের অভিজাতদের শেষ সময়ের একটা উপস্থাপনা দেখার জন্য সিনেমাটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

সিনেমাটি নিয়ে মুজাফফর আলী বলেন, ‘সত্যের পটভূমিতে আওয়াধের সেই সময়টাকে দেখার একটা মাধ্যম হতে পারে উমরাও জান। এ ধরনের সিনেমায় ওই নির্দিষ্ট জায়গাটা দেখা যায় না। স্থানের সুবাস নেয়া যায় না। কিন্তু উমরাও জান সিনেমায় লক্ষ্ণৌয়ের সুরভি খুবই স্পষ্ট। আমি যে স্থানে বসবাস করেছি, দেখেছি, সেই স্থান সিনেমায় জীবন্ত।’

মুজাফফর আলী আওয়াধে বসবাস করেছেন। সেখান কোটওয়ারায় বাস ছিল এ নির্মাতার। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল তার পরিচালনায় ‘গমন’। সিনেমায় মুম্বাইয়ের এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের গল্প বলা হয়েছে যে তার উত্তর প্রদেশের গ্রামে ফিরতে চায়। কিন্তু রুসওয়ার ১৮৯৯ সালের উপন্যাসের প্রতি মুজাফফরের আগ্রহ জাগল কেন?

নিজের স্মৃতিকথায় মুজাফফর লিখেছেন, ‘আমি দেখলাম এটা এমন এক নারীর গল্প যে ভঙ্গুর সময়ে, ভঙ্গুর সমাজ ও সংস্কৃতিতে নিজের অধিকার আদায়ে বা নিজের স্বর তুলে ধরার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। ওই সময়টা নারীদের জন্য কোনোভাবেই অনুকূল ছিল না। সেখানেই এক বাঈজীকে খুঁজে পাওয়া যায় যে প্রথাগত গণিকাবৃত্তির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন।’

এছাড়া সিনেমায় আছে পুরনো লক্ষ্ণৌ। তবে উমরাও জান এমন এক পুরনো লক্ষ্ণৌয়ের কথা বলে যার প্রায় কোনো চিহ্নই এখন নেই। মুজাফফর যখন সিনেমাটা নির্মাণ করেছিলেন তখনো ছিল না। তিনি বলেন, ‘এটা মূলত লক্ষ্ণৌ এবং ওই সময়ের একটা টুকরো যা আমাকে আলোড়িত করেছিল। সিনেমা দেখে এখন কেউ সেই লক্ষ্ণৌ খুঁজতে গেলে পাবে না।’

সিনেমাটিকে কবিতার সঙ্গে তুলনা করেন অনেকেই। এ নিয়ে মুজাফফর বলেন, ‘আপনি ন্যারেটিভ ছাড়া কবিতা তৈরি করতে পারবেন না। কবিতা তখনই তৈরি হয় যখন এর পেছনে জীবন, জীবনীশক্তি থাকে।’

রেখাকেও এ সিনেমার জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন পরিচালক। তিনি বলেন, ‘রেখার ভেতরকার সত্যের তারকে ছুঁয়ে গেছে সিনেমাটি। সে কারণেই সিনেমায় সুর উঠেছে। আমিরন চরিত্রটিকে রক্ত-মাংসে তুলে এনেছেন রেখা। একটা সেট তৈরি করে সংলাপ ধরিয়ে দিয়ে অ্যাকশন বললেই এটা হয় না। জীবন্ত করে তোলার মতো অভিনেতা, জীবনীশক্তি ও সততা লাগে। রেখার সেটা ছিল।’

একদিকে মুজাফফরের নিজের দীর্ঘদিনের লালিত দৃষ্টিভঙ্গি, লক্ষ্ণৌ নিয়ে তার নস্টালজিয়ার পাশাপাশি রেখার অভিনয়, আশা ভোঁসলের কণ্ঠ, শাহরিয়ারের লিরিক মিলিয়ে সিনেমাটিই এক কিংবদন্তি কবিতা হয়ে আছে।

স্ক্রল ডটইন অবলম্বনে