প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে গানের ব্যবহার ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, তা একরকম অজানাই। গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গরা নিজেদের শোষণ আর যাতনার কথা ভুলে থাকতে শুরু করেছিল ব্লুজ মিউজিকের প্রচলন। আদিম আফ্রিকার গন্ধমাখা সেসব গানে আঁধারের বুক চিরে ধ্বনিত হতো নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। সময়ের সঙ্গে এ বহু পুরনো তবু ভীষণ আধুনিক ব্লুজ মিউজিকের হাত ধরে জন্ম হয়েছিল জ্যাজ মিউজিকের। শুরুতে আমেরিকার তথাকথিত ভদ্রসমাজ একে বাতিল করে দিতে চেয়েছিল ‘‘ডেভিল’স মিউজিক’’ আখ্যা দিয়ে।
ক্লান্ত দিনের শেষে শুঁড়িখানায় মদ্যপরা ভেসে যেত এ সুরের মূর্ছনায়। এ ধারার সর্বোচ্চ বিকাশ হয়েছিল মিসিসিপি নদীর বদ্বীপে। গ্রেট মাইগ্রেশনের ধাক্কায় তখন কৃষ্ণাঙ্গরা চলেছে আরো দক্ষিণে। পুঁজিবাদী শ্বেতাঙ্গরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছিল। এরই মধ্যে ককতো ইন্ডিয়ান গোত্রের মানুষের ওপর চড়ে বসার পর এ খেটে খাওয়া কৃষ্ণাঙ্গদেরই বাগে আনতে ব্যস্ত ছিল তারা। ব্যবসায়িক চতুরতার ঠাণ্ডা যুদ্ধে যখন কৃষ্ণাঙ্গদের কেউ কেউ শিকাগো থেকে লুট করা মদের বিপণন শুরু করে, তখন শ্বেতাঙ্গরা খুঁজে পাচ্ছিল না কণ্ঠরোধের পথ। তারা আইনের সহায়তায় নিষিদ্ধ করতে চায় ব্লুজ মিউজিককে। এভাবে নিজের শিকড়ের প্রায় ভুলতে বসা ইতিহাসের পাতা থেকে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’খ্যাত পরিচালক রায়ান কুগলার তুলে এনেছেন বহুল প্রশংসিত ও বাণিজ্যসফল সিনেমা ‘সিনারস’-এর গল্প।
মাইকেল বি. জর্ডানের দ্বৈত ভূমিকায় অভিনীত দুই ভাই স্টক আর স্মোককে ঘিরে আবর্তিত এ কাহিনী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তারা শিকাগো যায় একটা স্থায়ী বন্দোবস্ত করতে। কিন্তু সেখানকার তিক্ত পরিস্থিতি ঠেলে দেয় লুণ্ঠিত আইরিশ বিয়ারের ব্যবসার দিকে। তারা ফিরে আসে নিজেদের ফেলে যাওয়া ঠিকানায়। এ এলাকায় নিজেদের মদের আসর আয়োজন করতে বেছে নিতে হয় কঠিন পথ। নিজেদের স্বজনদের মাঝে একে একে খুঁজে শেষ পর্যন্ত জোটে বারটেন্ডার, রাঁধুনি, পরিবেশকদের এক ছোটখাটো বহর। সঙ্গী হয় গিটারবাদক চাচাতো ভাই স্যামি। চার্চের ধর্মীয় অনুশাসনে, প্রভুদের অনুগত না থাকার কারণে তাদের দাগিয়ে দেয়া হয় পাপীদের তালিকায়। কিন্তু পাপের দোহাই তো আদতে তাদের গলায় শেকল পরানোর ছল। নিয়তি এড়ানো যায় না। নতুন ব্যবসার স্বপ্নে মুক্তির আনন্দে মত্ত শুঁড়িখানার সামনে নেমে আসে শ্বেতাঙ্গ ভ্যাম্পায়ারদের দল। চোখে সাদা আলো, পেছনে অদৃশ্য ছায়া আর কানে ভেসে আসে গির্জার ঘণ্টা। এক সাংগীতিক অসম যুদ্ধের মুখোমুখি হয় তারা, যার গভীরে বইছে বর্ণবাদের চোরাস্রোত। শুধু অতীতের ঘেরাটোপে না আটকে বর্তমানকে পেরিয়ে এ গল্প ছুঁতে চেয়েছে ভবিষ্যৎকেও।
হরর সিনেমা মূলত একটা সমাজের সামষ্টিক ট্যাবুর প্রতিরূপ। গল্পের পৃষ্ঠতলের গভীরে পরিচালকরা আদতে সে ট্যাবুকেই ভাঙতে চান। সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ শক্তির সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়াতে গিয়ে, মানিয়ে নিতে গিয়ে মধ্যবর্তী এক জটিল অবস্থায় পড়তে হয়। হরর সিনেমায় তা নিয়ে এসে বাজিমাত করেছিলেন আরেক কৃষ্ণাঙ্গ পরিচালক জর্ডান পিল। প্রচলিত বয়ানভঙ্গির বাইরে গিয়ে ভয়ের ছবিকে নতুন সংজ্ঞা দেয়ার জন্য তার গেট আউট সিনেমাটি ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছিল। রায়ান কুগলারও সব কাজের মধ্য দিয়ে আদতে ব্যক্তিগত গল্পই তুলে এনেছেন। শোষকদের রক্তচোষা হিসেবে কল্পনা করার ধারাটি বহু পুরনো। চিলির সিনেমা ‘এল কোন্দ’-এর স্বৈরাচারী অগাস্টো পিনোচেটই হোক বা আদ্যিকালের ‘কাউন্ট ড্রাকুলা’, সবক্ষেত্রেই শোষকরা শোষিতের কাছে রক্তচোষার সমার্থক। লোককাহিনীর ধারণাটিকে রায়ান আরোপিত করেছেন নিজের ব্যক্তিগত সংযোগের সঙ্গে। মিসিসিপির সন্তান রায়ান চাচার কাছে শুনতেন ব্লুজ মিউজিকের জনপ্রিয়তার ইতিকথা।
সিনেমাটিতে নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে লাস্যময়ী সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন উনমি মুসাকো, জেইমি লসন, হেইলি স্টেইনফিল্ড। আইরিশ ভ্যাম্পায়ারের চরিত্রে জ্যাক ও’কনেল হয়ে উঠেছেন মূর্তিমান আতঙ্ক। এছাড়া একঝাঁক গায়কের মধ্যে সংগীতশিল্পী মাইলস ক্যাটন নিজের জাত চিনিয়েছেন স্যামি মুরের চরিত্রে। চীনা আর ককতো ইন্ডিয়ান অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। পুরো সিনেমায় জ্যাজ-ব্লুজ মিউজিকের আধিক্য বাদেও ১৯৩২ সালের মিসিসিপির পটভূমি তুলে ধরতে ব্যবহার করা হয়েছে সে সময়কার পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতিনীতি।
বাদ পড়েনি শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থী খ্রিস্টানদের সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যানদের দৌরাত্ম্যের কথাও। নিজস্ব ধাঁচের পরিচালনার মাঝেও রায়ান ট্রিবিউট দিয়েছেন জোনাথন কারপেন্টারের ‘দ্য থিং’ আর রবার্ট রদ্রিগেজ-টারান্টিনো জুটির সিনেমা ‘ফ্রম ডাস্ক টিল ডন’কে। আইম্যাক্স ফিল্মে ধারণের কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দৃশ্যগুলো হয়ে উঠেছে প্রবল সিনেমাটিক। দুনিয়ায় তো আসলে পাপীরাই বসে অন্য পাপীদের বিচার করতে। সেখানে কি নিঃসীম আঁধার কেটে গিয়ে নতুন ভোর আসে? দর্শকের সামনে এ প্রশ্নই রেখে গেছে কুগলারের ‘সিনারস’।










