কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে সিনেমা যে নানা হুমকির মুখে তা অজানা নয়। কিন্তু এর মধ্যেই হলিউড বক্স অফিসকে সুসংবাদ দিয়েছে যে দুটো সিনেমা তার মধ্যে ম্যাট রিভস পরিচালিত দ্য ব্যাটম্যান একটি। রবার্ট প্যাটিনসন অভিনীত সিনেমাটির আরেকটি দিক হলো কেবল বক্স অফিস নয়, সারা পৃথিবীর সিনেমাপ্রিয় দর্শকদের আলোড়িত করেছে এ সিনেমা। প্যাটিনসনকে নাম চরিত্রে অর্থাৎ ব্যাটম্যান হিসেবে কাস্ট করার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সিনেমাটি তুমুল চর্চিত। ক্রিস্টোফার নোলানের জনপ্রিয় ব্যাটম্যান-ট্রিলজির পর ব্যাটম্যান নিয়ে আদৌ নতুন চেষ্টা করার প্রয়োজন আছে কিনা সে প্রশ্ন উঠেছিল। ম্যাট রিভসে ভরসা করলেও প্রায় কেউই প্যাটিনসনে ভরসা করেননি। কিন্তু সে সিনেমার ফার্স্ট লুক প্রকাশ হতে না হতেই হাওয়া বদলে গেল। মুক্তির পর আয় হলো রেকর্ড পরিমাণ। স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রশ্ন ওঠে এ সিনেমার বিশেষত্ব কী?

ম্যাট রিভস পরিচালিত দ্য ব্যাটম্যানের বিশেষত্ব দুটি। প্রথমত, যে ব্যাটম্যানকে ২০ বছর ধরে দর্শকরা দেখে অভ্যস্ত, সে কমিকের ব্যাটম্যান থেকে কিছুটা আলাদা। নিউইয়র্ক টাইমসে এও স্কট লিখেছেন, ‘ষাটের দশকের টেলিভিশনে আসা ব্যাটম্যান কৌতুকপূর্ণ ছিল। আশির দশকে কিটন-ক্লুনি-কিলমার এবং নব্বইয়ের দশকের ব্যাটম্যান প্লেবয় হয়ে ওঠে। নোলানের ট্রিলজিতে আনন্দ, বেদনা মিলিয়ে সে উপস্থাপিত।’ কিন্তু ব্যাটম্যানের যে প্রতিশোধপরায়ণ অবতার, সেটা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। গথাম সিটির সেই বিষাদ, অবিশ্বাস, অপরাধজগতের কালো ছায়ায় রহস্যময় ব্যাটম্যানকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ম্যাট রিভস এবার হারিয়ে যাওয়া ব্যাটম্যানকে ফের নিয়ে এসেছেন সবার সামনে।

পিটার ক্রেইগের সহযোগিতায় দ্য ব্যাটম্যানের চিত্রনাট্য ম্যাট রিভসের লেখা। প্রায় তিন ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের সিনেমাটিতে পুরো সময় ধরে গথাম সিটির অপরাধ, দুর্নীতি এবং অনৈতিকতার পরিস্থিতি দর্শকের চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন রিভস। ব্যাটম্যানের গল্পের মূল থিমটি অনুসরণ করে রিভস যে গল্পটি সাজিয়েছেন সেখানে নতুন কিছু অনুষঙ্গ ছিল। যেমন, ব্যাটম্যানের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ঠিক এ জায়গাটি রবার্ট প্যাটিনসন ও ম্যাট রিভস উভয়ের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, প্যাটিনসনকে নিয়ে দর্শকের পুরনো সেই প্রশ্ন, ‘টোয়াইলাইটের চকোলেট-বয় কী করে ব্যাটম্যান হবে?’ দ্বিতীয়ত, ম্যাট রিভস কেমন করে ব্যাটম্যানের সত্তা প্যাটিনসনে আরোপ করবেন? কিন্তু সিনেমা দেখে দর্শকদের কেউ কেউ বলছেন, আগের ব্যাটম্যানের সিনেমাগুলোর ব্রুস ওয়েইনের চেয়ে তরুণ এ ব্রুস ওয়েইন অনেক ক্ষেত্রে অভিব্যক্তিতে তার পূর্বসূরিদের ছাড়িয়ে গেছেন।

সেলিনা কাইল বা ক্যাটওম্যান হিসেবে জোয়ি ক্রেভিটজ ও গর্ডনের চরিত্রে জেফরি রাইটকে দেখার আগে দর্শকের কিছুটা হলেও দোনোমনা লাগে। কেননা গ্যারি ওল্ডম্যানের পর কাওকে গর্ডন বলে ভাবা কষ্টকর। কিন্তু ম্যাট রিভসের নিও নয়্যারে গথাম ও ব্রুসের এ রূপের পাশে রাইটকে মানিয়ে গেছে। ক্রেভিটজের সঙ্গে বেশকিছু সিকোয়েন্সে প্যাটিনসনের কেমিস্ট্রি দুর্দান্ত। বেশকিছু দৃশ্য কয়েক মাস ধরে ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্দায় সেই লালচে আকাশের নিচে ব্রুস-সেলিনাকে দেখতে ভালোই লাগে। ক্রেভিটজ ও রাইটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে কিছুটা আড়ালে পড়ে যান অ্যান্ডি সার্কিস। বহু দর্শকের চোখে স্যার মাইকেল কেইন ও আলফ্রেড পেনিওয়ার্থ অভিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু এ সিনেমায় ‘নির্দয়’ ব্রুস ওয়েইনের বাটলার হিসেবে সার্কিসের মতোই একজনকে প্রয়োজন ছিল।

ডিটেকটিভ স্কিলের কারণে কমিকপ্রেমীদের কাছে ব্যাটম্যান জনপ্রিয়। সিনেমায় স্বাভাবিকভাবে ব্যাটম্যানের দ্বৈত জীবন বেশি প্রাধান্য পায়। ম্যাট রিভস ডিটেকটিভ স্কিলের দিকে দৃষ্টি দিতে চেষ্টা করেছেন। তবে নোলানের সিনেমার মতো এখানেও গ্যাজেটের আধুনিকায়ন হয়েছে। তবে ম্যাট রিভসের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যাটম্যানকে আবেগহীন দেখানো। সিনেমায় ব্যাটম্যান বলে ওঠে, ‘দুই বছর না ঘুমিয়ে আমি নিশাচর জানোয়ারের মতো হয়ে গিয়েছি।’ অপরাধী ধরার যাত্রা এবং ব্যক্তিগত দ্বিধা থেকে ব্যাটম্যানের এ ‘ফ্রাস্ট্রেশন’ এবং সেখান থেকে তৈরি হওয়া প্রতিহিংসার রূপ সিনেমার কালার গ্রেডিং দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। ব্রুস ওয়েনের অভিব্যক্তিতে প্রতিহিংসার প্রবণতা যেন এ সময়ের জমা ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এখানে বলে রাখা ভালো, সিনেমার কারিগরি দিকে রিভসের এ কাজটি ব্যাটম্যান সিনেমার জন্য উপযুক্ত। পরিবেশ, পরিস্থিতির দুরবস্থা এবং শহরের অন্ধকার সিনেমায় স্পষ্ট। এর আগে নোলানের সিনেমায় ডিস্টোপিয়া এলেও স্পষ্ট হয়নি। জ্যাক স্নাইডারের সিনেমায় বিষয়টি থাকলেও তা সুপারম্যানের সঙ্গে দ্বন্দ্বের গল্প হয়ে উঠেছিল; ব্যাটম্যানের একার গল্প ছিল না।

টিম বার্টনের ১৯৮৯ সালের সিনেমায় ব্যাটম্যানকে পাওয়া যায়। নোলানের ট্রিলজিতে আমরা গথাম সিটিকে পাই। ম্যাট রিভসের সিনেমায় ব্রুস ওয়েইন ও ব্যাটম্যান উভয়কে পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গে থাকছে কলুষিত হয়ে ওঠা গথাম সিটি। সেখানে যেন এ সময়ের মানুষের মধ্যকার নানা ক্ষোভই সিনেমায় উঠে আসে। সব মিলিয়ে ম্যাট রিভসের ব্যাটম্যান নায়ক থেকে প্রতিনায়ক হয়ে উঠেছে। যদি এক কথায় দ্য ব্যাটম্যানকে প্রকাশ করতে হয়, তাহলে ব্যাটম্যান নিজেই বলেছে,আই অ্যাম ভেনজেনস।