দক্ষিণ ভারতের সিনেমা নিয়ে এ সময়ে নানা কথা হচ্ছে। ব্যবসায়িক দিক থেকে অর্ধযুগ ধরে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা তালিকার শীর্ষে থাকছে। গল্প, চিত্রনাট্য ও সিনেমাটোগ্রাফির দিক থেকেও দক্ষিণ এগিয়ে থাকে বলে অনেকে দাবি করেন। এর বাইরে আরেকটি বিষয় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় বিশেষভাবে দেখা যায়—সমাজসচেতনতা ও প্রতিবাদ। সে ধারাবাহিকতায় কামাল কেএম নির্মাণ করেছেন পাডা। এ বছরের মার্চে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি প্রান্তিক মানুষের অধিকারের কথা বলে।

সিনেমায় আমরা দেখি, চারজন ব্যক্তি পরিকল্পনা করে একজন কালেক্টরকে জিম্মি করে নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। তবে তারা কোনো জঙ্গি সংগঠনের নয়। দাবিতে কোনো সন্ত্রাসীর মুক্তির কথা নেই। নগদ অর্থও দাবি করে না তারা। তারা কেবল বলতে চায়, ‘আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা কেবল আদিবাসীদের।’

১৯৯৬ সালে পালাক্কাড় কালেক্টরেটে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা থেকে সিনেমাটি নির্মিত। মূলত ভূমি-সংক্রান্ত একটি আইনের সংশোধন চাওয়ার উদ্দেশ্যে কালেক্টরকে জিম্মি করা হয়। নিজেদের আয়াঙ্কালি পাডা (ড-এর উচ্চারণ ড়-এর কাছাকাছি হলেও ড় নয়) বলে পরিচয় দেয়া চারজন মূলত কোনো বৃহৎ সংগঠনের সদস্য নয়। তারা আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রাখতে নিজেরাই এ পরিকল্পনা করে। সিনেমা শুরু হয় কালেক্টরেটকে আক্রমণে এ চারজনের চেষ্টা দেখানোর মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তী ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ধরে তাদের কার্যপ্রণালির বিস্তারিত চিত্রিত হয়।

সিনেমার মূল উদ্দেশ্য দর্শককে চিন্তা করতে বাধ্য করা। এ কারণে বালু কাল্লারের সঙ্গে রাজশেখরের কথোপকথন ও দরকষাকষি দেখানো হয়। রাজশেখর নানাভাবে বালুকে বোঝায়, আইন সংশোধনের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ এবং প্রটোকল অনুসারে তাদের এগোতে হবে। চিফ সেক্রেটারি রাজশেখর তার অধীনস্থ এবং বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়েও সরকারি নানা বিষয় ও তার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আলোচনা করে। পাশাপাশি উঠে আসে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশি অপারেশনের বিভিন্ন ধাপ। কিন্তু অ্যাকশন সিনেমার মতো এ সিনেমার অপারেশন মারদাঙ্গা নয়, বাস্তব।

মালয়ালম সিনেমার সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসারে পাডা বাস্তবকে চিত্রিত করে। সেট, প্রপস থেকে শুরু করে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মেকআপ (যেটা নেই বললেই চলে) বাস্তবসম্মত। এ সিনেমায় বালু কাল্লারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিনায়ক, নারায়ণকুট্টির চরিত্রে দিলিশ পোটান। নায়াট্টুর পর এ সিনেমায় জজু জর্জ ও কুচাকো বোবানকে আবার একসঙ্গে দেখা গেল। চিফ সেক্রেটারি রাজশেখরের চরিত্রে ছিলেন প্রকাশ রাজ। পরিচালক কামাল কেএম এ সিনেমায় প্রতিটি চরিত্রকে বাস্তবের খুব কাছে রাখার চেষ্টা করেছেন। ফলে থ্রিলারের সাসপেন্স এখানে না থাকলেও পুলিশি আক্রমণ ও দরকষাকষির মধ্যবর্তী সময়ে চারজনের ভেতরকার টেনশন দর্শকের মধ্যেও ঢুকে যায়। কেননা পরিচালক এটা বোঝাতে সফল হয়েছেন যে এদের পদ্ধতি ভুল হলেও উদ্দেশ্য সৎ।

সিনেমাটি বিশেষ হয়ে ওঠে এর মধ্যবর্তী বার্তাটির জন্য। কেননা ব্যবসা করতে গিয়ে প্রধান চরিত্রে অধিক নায়কত্ব আরোপ করে এখনকার সিনেমাগুলো। কিন্তু পাডা কোনো নায়ক তৈরি না করে ঘটনার সঙ্গে দর্শককে যুক্ত করে। পাশাপাশি সিনেমাটি শেষ ভাগে জানিয়ে দেয়, ঘটনার পরপর জেলা জজের জরুরি আদালত থেকে ‘অপরাধীদের’ মুক্তি দেয়া হলেও পুলিশ তাদের তাড়া করে গেছে। অন্যদিকে আদিবাসীরা এখনো নিপীড়িত।