সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন বদলায়। বদলে যায় মনস্তত্ত্ব। প্রযুক্তি, চাহিদা, বাজার ব্যবস্থা বদলের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব পড়ে মানুষের সম্পর্কে। উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মানুষে-মানুষে সম্পর্কের গল্পগুলো ভিন্ন। দেশ বাদ দিলেও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে অবস্থানের বদলের সঙ্গে যাপিত জীবন ও সম্পর্কের গল্প বদলায়। বদলে যাওয়া সম্পর্কের বা সম্পর্কের বদলে যাওয়ার রসায়নের গল্পগুলো কখনো লিখিত হয়, কখনো সেলুলয়েডে আসে। বলিউডে সেই আশির দশকে যশ চোপড়ার সিলসিলা থেকে শুরু করে এ শতাব্দীর প্রথম দশকে করণ জোহরের কাভি আলবিদা না কেহনা মূলত বদলে যাওয়া সম্পর্কেরই গল্প। সম্প্রতি শকুন বাত্রা আরেকটি গল্প যোগ করলেন—গেহরাইয়া।

১১ ফেব্রুয়ারি অ্যামাজন প্রাইমে মুক্তি পাওয়া গেহরাইয়া সিনেমায় অভিনয় করেছেন দীপিকা পাডুকোন, সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী, অনন্যা পান্ডে। সিনেমার গল্পটি মূলত আলিশা (দীপিকা) ও জাইনের (সিদ্ধান্ত) মধ্যে তৈরি হওয়া সম্পর্ক, তাদের রসায়ন এবং টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি আলিশার ছেলেবেলা, মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়গুলো ফ্ল্যাশব্যাকে আনার মাধ্যমে সম্পর্কের আরেকটি দিক দেখানো হয়েছে। এ সিনেমার ট্রেলার দেখে বা সিনেমা দেখেও মনে হয় গল্পটি মূলত প্রেমবিষয়ক সম্পর্কের। কিন্তু আদতে শকুন বাত্রা এখানে কয়েক ধরনের সম্পর্কের কথা এনেছেন। আলিশার সঙ্গে করণের সম্পর্কটা প্রেমের, কিন্তু সেখানে জাইনের উপস্থিতিতে আলিশার সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। আবার এখানে করণের সঙ্গে টিয়ার (অনন্যা) বন্ধুত্বের সম্পর্কও স্পষ্টভাবে দেখানো হয়।

এ সিনেমা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে সময় ও অর্থনীতির প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। আলিশা ও করণ অবিবাহিত হয়েও একত্রে বাস করে, যা কিনা বর্তমান ভারতের মেট্রোপলিটন শহরের স্বভাবিক আচার। কিন্তু শহরের হিসাবে তারা মধ্যবিত্ত। সরাসরি কিংবা স্পষ্ট করে না হলেও গেহরাইয়া আমাদের দেখায় মধ্যবিত্ত থেকে উত্তরণে আলিশা ও করণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাইন ও টিয়া ততদিনে অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক অগ্রসর। সে মুহূর্তে করণের সঙ্গে আলিশার দূরত্ব (যার একটি কারণ স্টাগলিং রাইটার করণের সঙ্গে বাস করতে গিয়ে খরচ আলিশাকে দিতে হয় এবং এ বিষয়টি তাদের মধ্যে সংকট তৈরি করে) জাইনকে আলিশার জীবনে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। আলিশার মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে জাইনের সহায়তা সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব চিহ্নিত করে। সিলসিলায় যশ চোপড়া কেবল প্রেম দেখিয়েছিলেন, করণ জোহর কাভি আলবিদা না কেহনায় মানসিক দূরত্ব দেখিয়েছিলেন। শকুন বাত্রার সিনেমা নানামুখী বিষয় নিয়ে এসেছে।

সিনেমায় আমরা কয়েক ধরনের টানাপড়েন দেখি। আলিশার সঙ্গে করণের টানাপড়েনের অর্থনৈতিক কারণ, জাইন ও আলিশার যৌন আকর্ষণের পাশাপাশি তাদের মানসিক নৈকট্যে এবং পরিবারে পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের টানাপড়েনও এসেছে। সিনেমার প্রতিক্রিয়ায় অনেকে দীপিকার পোশাক, সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিছানা-দৃশ্য নিয়ে রগরগে কথা বললেও সিনেমার গল্প এবং এর বার্তার গভীরতা এর চেয়ে বেশি। কেননা সিনেমায় দেখানো প্রতিটি বিষয়ই বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরিবার, বন্ধুত্ব, প্রেম, যৌন সম্পর্ক—প্রতিটি ক্ষেত্রে এ সময়ে যে টানাপড়েনগুলো দেখা যায়, সিনেমায় সবই তুলে আনা হয়েছে। সম্পর্কের রসায়ন এবং টানাপড়েনগুলোর গভীরতাই এ সিনেমার উপজীব্য।

দীপিকা পাড়ুকোন বেশ খোলামেলা অভিনয় করেছেন, কিন্তু তার অভিনয় নিয়ে খুঁতখুঁতে সমালোচকরাও অভিযোগ করেননি। পুরো সিনেমা বলা চলে দীপিকাময়। কেননা গল্পটি আলিশা চরিত্রটিকে ঘিরেই সাজানো এবং আলিশার জীবন, মানসিকতা, সংকট প্রতিটি বিষয় দীপিকা তার অভিনয় কুশলতা দিয়েই ফুটিয়ে তুলেছেন। গালি বয় সিনেমায় এ সি শের চরিত্রে অভিনয় করে মনোযোগ কাড়া সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী দীপিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো কাজ করেছেন। অনন্যা পান্ডেও নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে তৈরি করছেন, বোঝা যায়। তবে এ সিনেমায় একটা পর্যায়ে সব মনোযোগ কেড়ে নিয়েছেন নাসিরউদ্দীন শাহ। আলিশার বাবার চরিত্রে তার উপস্থিতি, চরিত্রের ধরন এবং সংলাপ দর্শককে কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্তব্ধ করে। ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হয়তো বলা যায় না, তবে নাসিরউদ্দীন শাহ এ সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অংশ।

গেহরাইয়া নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। সাধারণ দর্শকরাই করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, সিনেমায় উডি অ্যালেনকে অনুসরণ করা হয়েছে। সিনেমার ভাব এবং উপস্থাপনে উডি অ্যালেনকে কিছুটা অনুসরণ করা হয়েছে, কিন্তু শকুন বাত্রার নিজস্ব ছাপও রয়েছে। শকুন এর আগেও সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেছেন। কাপুর অ্যান্ড সান্স, এক ম্যায় অওর এক তু থেকে গেহরাইয়ায় এসে গল্প বলার ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। নির্মাণেও এসেছে নতুনত্ব। বিশেষত সিনেমার নাম এবং গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে সমুদ্রের ঢেউ দেখানোর ব্যাপারটি একটি ভালো প্রচেষ্টা ছিল। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আলিশার জীবনে বা গল্পে অস্থিরতার সঙ্গে মিল রেখে ঢেউয়ের গতিপ্রকৃতি বদলায়।

পরিচালনার পাশাপাশি আয়েশা দেবিত্রি, যশ সাহাই ও সুমিত রায়ের সঙ্গে শকুন বাত্রা যৌথভাবে চিত্রনাট্য লিখেছেন। সিনেমাটোগ্রাফিতে কুশল শাহ অন্য অনেক সিনেমার চেয়ে ভালো করেছেন। কবির কাঠপালিয়া ও সাভেরা মেহতার সংগীতায়োজনে গেহরাইয়ার কয়েকটি গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। সব মিলিয়ে সম্পর্কের রসায়ন ও সম্পর্কের সংকটের গভীরতা দেখানোর চেষ্টা অনেকাংশে সফল। সত্যি বলতে গেহরাইয়ার গভীরতা বোঝাও সহজ নয়। সময় ও সম্পর্কের যে টানাপড়েন নিয়ে শকুন কাজ করেছেন, তা এ সময়ের সমাজে চলমান। বাত্রা গভীরভাবে তা দেখিয়ে সমাধানেও খানিকটা ইঙ্গিত করেন। সময়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে গেহরাইয়া প্রশংসার যোগ্য।