এবার অস্কারে বিদেশী সিনেমা বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে ভুটানি সিনেমা লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম। পাও চয়নিং দর্জির সিনেমাটির অস্কার মনোনয়ন পাওয়া এ বছরের অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা। মজার ব্যাপার হলো সিনেমাটি ভুটান সরকার গত বছর জমা দিয়েছিল। গত বছর মনোনয়ন না পাওয়া সিনেমাটি এ বছর মনোনীত হলো। পরিচালক পাও চয়নিং দর্জি নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘এটা একটা অসম্ভব যাত্রা ছিল। কাজটা শেষ করতে পারব এ বিশ্বাস ছিল না। অস্কার মনোনয়ন পাওয়া এতটাই অবিশ্বাস্য যে আমার বন্ধুদের বলতাম, সকালে উঠে হয়তো দেখব আমি আসলে স্বপ্ন দেখছিলাম।’
দর্জির সিনেমাটি ভুটানের একটি দুর্গম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নির্মিত। জায়গাটির নামই লুনানা। ভুটানের গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত লুনানা এতই দুর্গম যে ভুটানের জাতীয় ভাষা জংঘায় একে ‘অন্ধকার উপত্যকা’
বলা হয়। হিমালয়ের উপত্যকায় অবস্থিত লুনানায় কভিড-১৯ ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের হেলিকপ্টারে করে যেতে হয়েছিল। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পৌঁছতে তাদের তুষার ও বরফ পেরিয়ে হাঁটতে হয়েছে মাইলের পর মাইল। দর্জি যখন তার সিনেমার জন্য লুনানায় গিয়েছিলেন, পুরো দলের প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ, ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল খচ্চরের পিঠে করে নিতে হয়েছিল। লুনানা এমন এক উপত্যকা, যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পৌঁছেনি। সিনেমার জন্য তাদের নিজেদের ঘর তৈরি করতে হয়েছিল এবং খাবার হিসেবে নিয়েছিলেন শুকনো কুমড়া, মাশরুম, যা সহজে পচে না।
সিনেমার গল্পটি উগিয়েন নামে এক তরুণ স্কুল শিক্ষকের। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে গহীন উপত্যকায় স্কুল শিক্ষকের চাকরি দেয়া হয়। কিন্তু উগিয়েনের ইচ্ছা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একজন গায়ক হবে। কিন্তু যখন লুনানায় নয় বছর বয়সী পেম জামের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, উগিয়েনের ভাবনা বদলে যায়। লুনানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা সরে গিয়ে লুনানা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে সে। পাও চয়নিং দর্জি সিনেমাটি নির্মাণের পেছনে একটি কারণ উল্লেখ করেছেন। ভুটানের তরুণ স্কুল শিক্ষকদের মধ্যে কাজ ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। গত কয়েক বছরে বহু শিক্ষক চাকরি ছেড়েছেন। তারা আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ায় সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের স্বপ্নে বিভোর।
সিনেমার গল্পটির পটভূমি হিসেবে লুনানাকে ভাববার কারণ হিসেবে দর্জি এর পরিচিতির কথা মাথায় রেখেছেন। উন্নত বিশ্বের আলোকিত শহরগুলোর বিপরীতে তিনি লুনানাকে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে মানুষ জানেই না, সিনেমা আসলে কী? লুনানা: আ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম সিনেমায় অভিনয় শিল্পীরা সবাই অপেশাদার। কিছু ক্ষেত্রে দর্জি এমনভাবে শুট করেছেন, সিনেমার ছোট শিশুরা জানতই না যে তারা অভিনয় করছে। উগিয়েন যে সময় শিশুদের দাঁত মাজা শেখায়, সিনেমার এ দৃশ্যে তারা সত্যিই দাঁত মাজছিল।
সিনেমার পরিচালকরা সাধারণত দৃশ্যধারণের পর পুনরায় তা দেখেন। কিন্তু লুনানায় শুট করার পর তা দেখার সুযোগ দর্জির ছিল না। কেননা তার ব্যাটারি ও বিদ্যুত্শক্তি ছিল সীমিত। সেখানকার মানুষের কাছে ক্যামেরার চেয়ে চামরি গাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বহু দূরের লুনানাকে ক্যামেরায় চমত্কার তুলে ধরেছেন নির্মাতা। ক্যামেরায় তিনি প্রকৃতি ও মানুষের সরলতা ধরেছেন। অস্কারজয়ী পরিচালক অ্যাং লি তাই চয়নিং দর্জিকে অভিনন্দন জানাতে ভিডিও কল করেছিলেন। তিনি সিনেমাটিকে তাজা বাতাসে শ্বাস নেয়ার মতো সুন্দর উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত মূল্যবান। খুব সাধারণ কিন্তু হূদয় স্পর্শ করে যায়। আপনার দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করানোর জন্য ধন্যবাদ।’
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে










