লতা মঙ্গেশকরের নাম জানেন না, উপমহাদেশে এমন মানুষ বিরল। ভারতের নাইটিঙ্গেলখ্যাত এ শিল্পীর গান মুগ্ধ করেছে এ অঞ্চলের অনেক ভাষার কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাদের। ৭০ বছরের অধিক সময় সুরের আবেশে সংগীতপ্রেমী থেকে সাধারণ মানুষকে বুঁদ করে রাখার পর ৯২ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন তিনি। গতকাল ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ১২ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। করোনা ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এ বছরের শুরুতে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। মাঝে একটু একটু করে সেরে উঠছিলেন। ২৮ জানুয়ারি অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাকে ভেন্টিলেটরের বাইরে আনা হয়েছিল। কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারি আবার শারীরিক অবস্থার অবনতির পর তাকে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেয়া হয়। এবার আর ফেরেননি তিনি।

লতা মঙ্গেশকর দক্ষিণ এশিয়ার বহু ভাষায় গান গেয়েছেন। প্রতিটি ভাষায় তিনি এতটা সাবলীল যে ওই ভাষাটিকেই তার মাতৃভাষা মনে হয়। লতা মঙ্গেশকরের বাংলা গান শুনে আমরা অনেকেই তাকে বাঙালি ভেবে ভুল করি। ভারতের মধ্যপ্রদেশে সেবন্তী ও পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের ঘরে ১৯২৯ সালে লতার জন্ম। দীননাথ একজন নাট্যকার এবং মারাঠি-কোঁকন সংগীতকার। তাদের পদবি মঙ্গেশকর মূলত গোয়া অঞ্চলের মঙ্গেশি শহর থেকে এসেছে। আশা, ঊষা, মীনা, লতা ও হূদয়নাথ পাঁচ ভাইবোনই প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী। এদের মধ্যে লতা মঙ্গেশকর সবার বড়।

পঞ্চাশ, ষাটের দশকে লতা মঙ্গেশকর গায়িকা হিসেবে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। কিন্তু সংগীতের জগতে তার পদচারণা চল্লিশের দশকে শুরু হয়। লতার ১৩ বছর বয়সে তার পিতার মৃত্যু হলে পরিবারের বন্ধু এবং নবযুগ চিত্রপট নামে সিনেমা কোম্পানির মালিক বিনায়ক দামোদর কর্ণাটকীর সহায়তায় লতা মুম্বাই আসেন। লতা সেখানে ভিন্ডিবাজার ঘরানার ওস্তাদ আমান আলী খানের কাছে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি সংগীত পরিচালক গোলাম হায়দার তাকে প্লেব্যাক সম্পর্কে শেখান এবং তিনিই লতা মঙ্গেশকরকে পরিচালক শশধর মুখার্জির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। শশধর সে সময়ে শহীদ নামে সিনেমা নির্মাণ করছিলেন। সেখানেই লতার প্রথম প্লেব্যাক করার কথা। কিন্তু লতার কণ্ঠ সম্পর্কে শশধরের বক্তব্য ছিল ‘তার কণ্ঠ তীক্ষ’। শহীদ-এ লতার প্লেব্যাক করা হয়নি।

গোলাম হায়দারের সহায়তায় ১৯৪৮ সালে মজবুর সিনেমায় ‘দিল মেরা তোড়া, মুঝহে কাহি কা না ছোড়া’ গানের মধ্য দিয়ে প্লেব্যাকে লতার অভিষেক হয়। তবে এ কেবল লতা মঙ্গেশকরের নয়, বরং ছিল এক যুগের সূচনা।

চল্লিশের দশকের ভারত বেশ টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দেশভাগ, স্বাধীনতা এসবের কারণে মালিকা-এ-তারান্নুম নূর জাহান ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেলে ভারতে তখন নতুন একটি কণ্ঠের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। লতাকে নিয়ে যারা লিখেছেন তারা বলেছেন, শুরুর দিকে তিনি নূর জাহানকে অনুসরণ করতেন, কিন্তু খুব দ্রুতই স্বকীয় গায়কী তৈরি করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে মহল সিনেমায় ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ গানটি প্রচারিত হলে তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান। মধুবালার ঠোঁটে পরিবেশিত গানটির সংগীত পরিচালক ছিলেন ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ।

লতা মঙ্গেশকর কখনো অনেক গেয়েছেন, কখনো কমিয়ে দিয়েছেন গান। কিন্তু সংগীত থেকে সরেননি। গানের ক্ষেত্রে তিনি কোনো জনরায় আটকে ছিলেন না। প্রেম, বিরহ, বিষাদ থেকে ভজন, ঈশ্বরপ্রেম—কোনো ধারাই বাদ পড়েনি। প্লেব্যাকে ষাটের দশকেই কিংবদন্তি বনে গিয়েছিলেন। রফি, মুকেশ, তালাত মাহমুদদের সঙ্গে প্লেব্যাক করেছেন। সেকালে নারী শিল্পীদের মধ্যে তিনি নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। ভারতের প্রায় সব বিখ্যাত সংগীত পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে এসে তাকে এবং তার কণ্ঠকে নতুন করে উপস্থাপন করেন এআর রহমান। দিল সে সিনেমার ‘জিয়া জালে’ গানে লতা মঙ্গেশকরের জন্য বিশেষভাবে সংগীত তৈরি করেছিলেন রহমান।

গ্রামোফোনের ৭৮ আরপিএম ডিস্ক থেকে শুরু করে ভিনিল, ক্যাসেট, সিডি থেকে মেমোরি কার্ড—লম্বা একটা সময় ধরে প্রতিটি মাধ্যমে লতা জনপ্রিয়। এই ২০২২ সালে এসে স্পটিফাইয়েও তাকে শোনা হয়। হয়তো কেউ গাইড সিনেমার ‘আজ ফির জি নে কী তামান্না’ শুনছেন; কেউ হয়তো ছোট বাচ্চাকে ‘ইচাক দানা বিচাক দানা’ শুনিয়ে খাওয়াচ্ছেন; ‘মঙ্গল-দীপ জ্বেলে’ কেউ হয়তো অন্ধকার দূর করছেন। ‘লুক্কা ছুপি’ শুনে চোখ টলটল করেনি এমন মানুষ কম। প্রায় দুই হাজার সিনেমায় ৩০ হাজার গান গাওয়া লতা মঙ্গেশকরের গান প্রতিদিন কোনো না কোনো ঘরে বাজে। ভবিষ্যতেও বাজবে এবং লতা মঙ্গেশকর এভাবেই বেঁচে থাকবেন।