ফেনী শহরে এখন চালু আছে একটি মাত্র সিনেমা হল। সেটিও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, দীর্ঘদিন ভালো ছবি তৈরি না হওয়া, দর্শক কমে যাওয়ায় টানা লোকসানে বিভিন্ন সময়ে এসব সিনেমা হল ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একসময় ফেনীতে সিনেমা হলের ব্যবসায় জৌলুস থাকলেও এখন তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, এমনটা বলাই যায়। ফেনীর ছয়টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন কেবল দুলাল সিনেমা হলটি চালু আছে। এটি আর কতদিন চালু থাকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে ফেনীতে সিনেমা হলে ছবি দেখার সংস্কৃতি লুপ্ত হওয়ার পথে। তবে ভালো ছবি নির্মাণ, বলিউডের ছবি আমদানি, হলের পরিবেশ আধুনিকায়ন ও পরিবারকে নিয়ে দেখার মতো ছবি থাকলে পুনরায় দর্শকদের হলমুখী করা যেতে পারে বলে মনে করেছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় ফেনী জেলা শহরে দুলাল, সুরত, বিলাসী ও কানন সিনেমা হল নামের চারটি হল ছিল। এছাড়া ফুলগাজীতে বিউটি ও দাগনভূঞায় ঝর্ণা সিনেমা হল চালু ছিল। ফেনীর সিনেমা হল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫২ সালের দিকে ক্রীড়া সংগঠক খায়রুল এছাক মিয়া ফেনীর রেল স্টেশন সড়কে দুলাল সিনেমা হল চালু করেন। এর বছর খানেক পর শহরের জিরো পয়েন্ট-সংলগ্ন সমবায় সুপার মার্কেটে সুরত সিনেমা হল চালু করেন আফজালুর রহমান। এরপর বিভিন্ন সময় চালু হয়েছিল কানন ও বিলাসী হল দুটো। নিরাপত্তা, পরিবেশ ও আসন ভালো থাকায় সুরত ও দুলাল সিনেমা হলই দর্শকদের বেশি পছন্দের ছিল। একসময় শহরের চারটি সিনেমা হলে প্রতিদিন ১০-১২ হাজার দর্শক ছবি দেখত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৩ সালের দিকে ফেনীর জনপ্রিয় হল সুরত ভেঙে দোকান নির্মাণ করা হয়। একাডেমি রোডের বিলাসী সিনেমা হলটি লোকসানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে শহরের কানন সিনেমা হলটি গত বছর করোনা পরিস্থিতির আগ পর্যন্ত চালু ছিল। তবে করোনা পরিস্থিতিতে কয়েক মাস বন্ধ থাকায় কর্মচারীরা অন্য পেশায় চলে গেলে কর্তৃপক্ষ সিনেমা হলটি ভেঙে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন। বিউটি ও ঝর্ণা হল দুটোও বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের একমাত্র চালু দুলাল সিনেমা হলে গিয়ে দেখা যায় সেখানে ‘কাউন্টার এ্যাটাক’
নামের একটি পুরনো ছবি চালানো হচ্ছে। হলজুড়ে ১০-১২ জন দর্শক রয়েছে। কেবিনের টিকিট কিনে ঘুমিয়ে আছে এক দর্শক। নিয়মিত দর্শক না থাকায় ফাঁকা আসনগুলো ধুলোবালিতে ঢাকা পড়ে আছে। কিছু কিছু আসন ভেঙে গেলেও সংস্কার করা হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। হলের ক্যাশিয়ার গোলাম নবী জানান, দুলাল সিনেমা হলে একসময় পাঁচটি শো চালানো হতো। দর্শক না থাকায় এখন দু-তিনটি চালানো হয়। দুলাল সিনেমা হলের বর্তমানে তত্ত্বাবধানে রয়েছেন প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার সফিউদ্দিন বেলাল। তিনি জানান, একসময় তাদের মালিকানায় ফেনী, রামগতি, মাটিরাঙ্গা, লাকসাম, হাতিয়ায় কয়েকটি সিনেমা হল ছিল। তখন ভালো লাভও হতো। শুধু ফেনীর দুলাল সিনেমা হলে ৩০-৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকতেন। মূলত ২০১৫ সালের পর থেকেই সিনেমা হলগুলোতে দর্শক কমতে থাকে। সফিউদ্দিন বেলাল মনে করেন, মানসম্মত ছবি পাওয়া না গেলে সিনেমা হলের যত উন্নয়নই করা হোক না কেন, কোনোভাবেই সিনেমা হলের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না।
জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সমরদেব নাথ বলেন, বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও ভালো চলচ্চিত্র না হওয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সিনেমা হলের সংস্কৃতি তো আরো আগেই শেষ হয়ে গেছে। দেশের সব জেলায় শিল্পকলা একাডেমি রয়েছে, সেসব স্থানে সরকারিভাবে নামমাত্র ফি দিয়ে সপ্তাহে অথবা মাসের যেকোনো দিন ভালো কিছু সিনেমা প্রদর্শন করা যেতে পারে। এতে ক্রমেই দর্শকদের মাঝে সিনেমাপ্রীতি সৃষ্টি হবে। শুধু বেসরকারি নয়; বরং সরকারিভাবে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কম মূল্যে সিনেমা প্রদর্শনের দাবি জানান এ সাংস্কৃতিক সংগঠক।
জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সরকার সিনেমা হলের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে ফেনীতে কোনো উদ্যোক্তা অথবা যেকোনো ব্যক্তি এগিয়ে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।










