বহু জল্পনা-কল্পনার পর মুক্তি পেল স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম। ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই নানা আলোচনার জন্ম দেয় সিনেমাটি। মুক্তির পর রীতিমতো হুলস্থূল বাঁধিয়ে দিয়েছে। কেবল কভিড-১৯ পরবর্তী মুক্তির কারণে নয়, ‘স্পাইডার-ম্যান’ এমন এক নাম, যে নিজেই ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। এ কারণেই মার্ভেলের সিনেমাটি মুক্তি পাওয়া মাত্রই সারা বিশ্বে টিকিট বিক্রির ধুম পড়েছে। প্রেক্ষাগৃহে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করছেন দর্শক। টিকিটপ্রত্যাশীদের চাপে রীতিমতো ওয়েবসাইট ডাউন হয়ে যায়। অন্যান্য দেশের মতো ভারত-বাংলাদেশেও স্পাইডার ভক্তের অভাব নেই। ভারতে একদিনে টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে অনেক ভারতীয় সিনেমার রেকর্ড ভেঙেছে ‘নো ওয়ে হোম’। ঢাকার অনেক প্রেক্ষাগৃহেও দর্শকের ভিড় দেখা যাচ্ছে। বক্স অফিস বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সিনেমাটি ১০ কোটি ডলারের বেশি ব্যবসা করবে। এসব থেকে প্রশ্ন আসে, ‘স্পাইডার-ম্যানের এত জনপ্রিয়তার রহস্য কী?’

‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ সিনেমাটি খোদ স্পাইডার-ম্যান সিরিজের সিনেমাগুলোর মধ্যে অনেকটা ভিন্নধর্মী। প্রায় এক দশক ধরে সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের মাধ্যমে মার্ভেলের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বেড়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে সুপারহিরোদের উপস্থাপনা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তু স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তা আসলে বহু আগ থেকে। ষাটের দশকে স্পাইডার-ম্যান প্রথম আত্মপ্রকাশ করলে তখন থেকেই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। মার্ভেলের অন্য অনেক চরিত্রের মতোই স্পাইডার-ম্যানও স্ট্যান লি-র হাতে তৈরি। ১৯৬২ সালে প্রথম কমিক হিসেবে প্রকাশিত হয় স্পাইডার-ম্যান। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ষাট বছর ধরে বহু সুপারহিরোর আগমন হলেও স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তা কমেনি। বলতে গেলে কমিক যারা পছন্দ করেন, স্পাইডার-ম্যান তাদের অনেক আপন।

অনাথ পিটারের একাকী জীবনের সঙ্গে কমিকপ্রেমী টিনএজরা নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন। হাই স্কুল জীবনে পছন্দের মেয়েটিকে নিজের মনের কথা বলতে না পারা পিটার আরো অনেক টিনএজারের প্রতিনিধি। তাই সুপারম্যানের মতো উড়তে না পারা বা ব্যাটম্যানের মতো তার অঢেল সম্পদ না থেকেও পিটার পার্কার হয়ে ওঠে কমিকপ্রেমীদের নায়ক। স্পাইডার-ম্যানের বিশেষত্ব মূলত এটিই। ডিসি-মার্ভেল বিতর্কে না গিয়েও তার তুলনা ডিসি ইউনিভার্সের দুই সুপারহিরোর সঙ্গে চলে আসে। কিন্তু ভিন গ্রহের সুপারম্যান আগে থেকেই ভিন্ন শক্তির অধিকারী। ব্যাটম্যান নিজের চেষ্টায় গ্যাজেট তৈরি করলেও তার পেছনে পারিবারিক সম্পদের সাহায্য ছিল। মাকড়সার কামড় বাদ দিলে পিটারের জীবনে দৈব কিছু নেই।

স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তার অন্যতম একটি কারণ গল্পগুলো সিনেমায় নিয়ে আসা। ১৯৭৩ সালে ব্রিটেনে স্পাইডার-ম্যানকে পরিচিত করানোর পর ৪০ বছর ধরে স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এর পেছনে অভিনেতা টোবি ম্যাগুইয়ারের প্রভাব রয়েছে। ২০০২ সালে টোবি অভিনীত স্পাইডার-ম্যান আজ অবধি জনপ্রিয়। কেবল কমিকপ্রেমী নয়, সাধারণ দর্শকের কাছেও এই স্পাইডার-ম্যানের আবেদন ভিন্ন। পৃথিবীতে সবাই স্বীকার করে, টোবির চেহারায় যে শান্ত ভাব আছে তা স্পাইডার-ম্যানকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে। টোবির পর অ্যান্ড্রু গারফিল্ডকে স্পাইডার-ম্যান হিসেবে আনা হলে তিনি ততটা জনপ্রিয় হননি। কিন্তু পৃথিবীর কাছ থেকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখা পিটারের সারল্য আবার টম হল্যান্ডের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেল।

‘নো ওয়ে হোম’ ভিন্নভাবে দর্শকদের নাড়া দিয়েছে। মূলত কমিক ও সুপারহিরো সিনেমাপ্রেমীদের কাছে স্পাইডার-ম্যান এক নস্টালজিয়ার নাম। সুপারহিরো দুনিয়ায় এমনও হয়, খল চরিত্ররা অবধি এক ধরনের প্রভাব তৈরি করে। সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘নো ওয়ে হোম’ মূলত স্পাইডার-ম্যানের পুরনো খলনায়কদের নতুন করে নিয়ে এসেছে। অন্তত ট্রেলার দেখে তেমনই মনে হয়। অনেকে ধারণা করছেন, টম হল্যান্ডের সঙ্গে পুরনো দুই পিটারকেও (টোবি ও গারফিল্ড) দেখা যেতে পারে। লিজার্ড, গ্রিন গবলিন ছাড়াও স্পাইডার-ম্যানের অন্যতম সেরা খলনায়ক ডক্টর অক্টোপাস। ২০০৪-এর পর আলফ্রেড মেলিনা ফের ডক্টর অক্টোপাস হয়ে ফিরছেন এ বছর।

মেলিনার পাশাপাশি সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ ডক্টর স্ট্রেঞ্জরূপী বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ। ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, মাল্টিভার্স, নস্টালজিয়ার পাশাপশি ভিএফএক্স নিয়েও দর্শক আগ্রহী। পুরনো খলনায়কদের নতুন করে উপস্থাপনে ব্যবহূত গ্রাফিকসের প্রশংসা দেখা যাচ্ছে অনলাইনে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো এ সিনেমার ভিজ্যুয়াল এফেক্টস এবং ডিজিটাল প্রডাকশনের দায়িত্বে আছেন আমাদের ঢাকার ছেলে ওয়াহিদ ইবনে রেজা। ছোটবেলা থেকে স্পাইডার-ম্যানের ভক্ত ওয়াহিদ নিজের ফেসবুকে এ বিষয়ে লিখে তার অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। ‘নো ওয়ে হোম’ নিয়ে বাংলাদেশীদের আগ্রহ বেশি হওয়ার এটিও একটি কারণ। এ সিনেমায় কাজ করা প্রসঙ্গে ওয়াহিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টুডিওর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। অনেকেই স্টুডিও বদল করে। ঠিক এ মুহূর্তে মার্ভেলের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু আমি স্পাইডার-ম্যানের বড় একজন ফ্যান। আমার স্টুডিওর হেড অব প্রডাকশন, নাওমি স্টপা সেটা জানত। সেই বলেছিল কাজটা আমার নেয়া উচিত। এভাবেই যুক্ত হওয়া।’

সিনেমায় কাজ করার সময়কার মজার কোনো অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এখানে কাজ করার সময় গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সবার একটা করে কোডনেম দেয়া হয়। এখানে নামগুলো দেয়া হয়েছিল সিনফিল্ড নামের একটা সিটকম থেকে। সিনেমার কাজ শেষ কিন্তু দেখা যায় আমি এখনো সেই কোডনেমেই একেকজনকে ডেকে বসি।’

কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দর্শকদের আবার চাঙ্গা করে তুলেছে ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’। এবারো হয়তো সে মেরি জেনকে নিজের কথা বলতে পারবে না। পুরনো স্পাইডার-ম্যানরা সিনেমায় আছেন কিনা তা সিনেমা দেখেই জেনে নিতে হবে। তবে আশা করা যায়, মাল্টিভার্স জটিলতা পেরিয়ে দর্শক নিজেকে আগের মতোই পিটারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। স্পাইডার-ম্যান তার ভক্তদের জালে আটকে রাখবে আরো অনেক দিন। বহু বছর পরও আন্ট মে পার্কারের বলা, ’বিশেষ ক্ষমতার সঙ্গে তোমার ওপর মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়’ কথাটি লোকে উচ্চারণ করবে।