নিদারুণ এক করোনাকাল। ব্যাধিগ্রস্ত পৃথিবী। বিপন্ন বিশ্ব। স্তব্ধ-বিষণ্ন সময়। সারা দুনিয়ার কোণায় কোণায় চলছে প্রাণের যবনিকাপাত। বিপন্ন মানুষ। অসহায় রাজনীতির নীতি নির্ধারক। বিজ্ঞান ও ধর্মের অসহায়ত্বও প্রবলভাবে ঘাম ঝরাচ্ছে। কোনো কূল-কিনারা নাই।

লকডাউন। কাজ নেই। কামাই-রোজগার নেই। মানুষের অসহায়ত্ব বাড়ছে। চিকিৎসা ও খাদ্য সুবিধা কমে আসছে। অনেকের জীবনে বোবা কান্নার গোমড়ানি। জঠরজ্বালার মোচড় বাংলার অনেক ঘরে। কান পাতলে এইসব নিরন্ন মানুষের হাহাকার শোনা যায়। তাই বলে কি থেমে যাবে মানুষ?

না, মানুষ শেষ পর্যন্ত থামেনা। মানুষ শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে রাজি হয় না। সকল সংকীর্ণতাকে পায়ে মাড়িয়ে সে দাঁড়ায় মানুষের পাশে। আহারের অভাবে যেন একটা মানুষেরও মৃত্যু না হয়। এই লড়াইটাই করে মানুষ। এই লড়াইটাই চিরন্তন। এই লড়াইটাই মানুষের।

এ করোনাকালে অসহায় ও বিপদগ্রস্ত এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা থেকে দাঁড়িয়েছেন এক তরুণ। যার হাতে যা আছে সম্বলের মতো সহায় নিয়ে দেশের এক উপজেলা শহরের এক তরুণ তার বানানো একটি ছবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন, আমার সম্বল এটুকুই, এই স্বল্পদৈর্ঘের ছবিটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফেস্টিভ্যালগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছে। হচ্ছে। ফলে এর শর্ত হিসেবে এখনও ইউটিউব বা অনলাইনের অন্য কোনো প্লাটফর্মে এটার গণমুক্তি দেওয়া হয়নি।

তরুণটি মানুষের কাছে হাত পাতলো। ‘সিনেমা ফর হিউম্যানিটি’ স্লোগানকে সামনে নিয়ে এলো। সামান্য টোকেন মানি দিয়ে সে তার অর্জন, তার বানানো ছবিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনলাইনে দেখার জন্য ফেসবুকে আহ্বান করলো। বললো, ছবিটি দেখার বিনিময়ে আপনাদেরকে কিছু অর্থ দিতে হবে। আপনাদের দেয়া অর্থ নিয়ে আমি দাঁড়াতে চাই আমার শহর, ভৈরবের কিছু করোনাকালীন অসহায়ত্বের শিকার মানুষ ও সংস্কৃতিকর্মীর পাশে।

সিনেমা ফর হিউম্যানিটির আওতায় তার ছবিটি দুই দফায় অনলাইন স্ক্রিনিং করে ভৈরবের তরুণ ও সম্ভাবনাময় চিত্রনির্মাতা নাঈম হক। সে তার বানানো টাইপিস্ট দেখিয়ে যে সামান্য টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছে তার পুরোটা নিয়ে, বন্ধুদের সহযোগিতায় ভৈরবের অসহায় কিছু পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে এ খবর নানা জনের কাছ থেকে পেয়েছি।

উল্লেখ করার ব্যাপার হলো, দান-ত্রাণের এই সেলফি কালচারের যুগে তাদের দেয়া সহযোগিতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির ছবি দিয়ে লোকেদের তারা অপমানিত করেননি। এই ধন্যবাদার্হ উদাহরণের জন্য অশেষ ভালোবাসা।

২.

নাঈম হকের ছবিটির নাম ‘দ্য টাইপিস্ট’। আমিও এবার তার ছবিটি আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখলাম। ১৩/১৪ মিনিটের মতো দৈর্ঘের চিত্রায়ন। সাধারণ এক গল্প। এ গল্প খুঁজতে আপনাকে যে ঘরের বাইরে, অনেক দূরে গিয়ে আতিপাতি করতে হবে, তা নয়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এ গল্প পেয়ে যাবেন তার পাশের ঘরেই। কপাল মন্দ হলে নিজের ঘরেও এমন ভারাক্রান্ত গল্পের দেখা মিলতে পারে। অসহ্য এক ঘটনার ধারাবর্ণনা। কয়েকটি চরিত্র। ছোট ছোট কয়েকটি সংলাপ। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে ছোট বড় কয়েকটি শট। সবমিলিয়ে এতটুকুই।

এই এতটুকুটুতেই সে কাজটা করেছে অসাধারণ। ছোট খাল নদীতে, কিংবা নদী সাগরে মিশে গিয়ে বড় ঢেউ তৈরি করে আছড়ে দিতে পারে, তুলতে পারে সৃজনশীল তরঙ্গ। এমন সম্ভাবনা দেখা গেল। হয়তো সে সম্ভাবনা একটি বড় ক্যানভাসের জন্য অপেক্ষা করছে। কতটুকু কি করতে পারবে, তা বলবে নাঈমের আগামী দিনের সময়।

আপাতত আমরা এখানে এক সৃজনশীল তরুণের প্রতি শুভাশিস জানিয়ে রাখতে পারি। আমরা একজন বড় নির্মাতার আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় থাকতে পারি। সেটা বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য যেমন। পাশাপাশি আমার জন্মগ্রাম ও আমার প্রিয় ভৈরবের এক তরুণের জন্য তার থেকেও একটু বেশি। কেননা সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা মাথা পেতে নিয়েও যদি বলি, এই নাঈমতো আমার গ্রামেরই ছেলে!

৩.

শিল্পের অঙ্গীকারে তারুণ্যের জয় হোক। শিল্পতো মানুষের জন্যই। মানুষ না থাকলে শিল্প দিয়ে কি আর হবে? শিল্পীরা মানুষের পাশে দাঁড়াক। মানুষের কাতারে ওঠে আসুক, এইতো আমাদের আরাধ্য!

যত বড় দুর্যোগ, তত বেশি মানবিকতার পরীক্ষা। মানুষের জন্য মানুষ- এই মন্ত্র, এবারের এই মহাদুর্যোগের করোনাকাল তা আরও ভালো করে আমাদের শিখিয়ে যাক। মানুষ ও শিল্পীরা নতুন পৃথিবীর জন্য নিজেক প্রস্তুত করুক।

নাঈম হকের মতো তরুণদের শিল্প, জীবনবোধ ও মানবিকতার জয় হোক।

জয়তু মানুষ!