পশ্চিম আমেরিকা তার নিজের মধ্যেই এক রহস্য। রহস্যের গভীরে ডুব দিলে মনে হবে বহুকাল ধরে পশ্চিমারা আফ্রিকা নিয়ে যে রহস্য বুনেছে, পশ্চিম আমেরিকা তার চেয়ে বেশি রহস্য ধরে। ‘ওয়েস্টার্ন’
ঘরানা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সিনেমাও হয়েছে অনেক। জনরা হিসেবে তৈরি হওয়ার পর বহুবার জনরার ভেতরেই নতুন নতুন নিরীক্ষা হয়েছে আর সেখানে নতুন সংযোজন জেন ক্যাম্পিয়নের এ বছরের সিনেমা ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’। ১২ বছর পর ফিরে ক্যাম্পিয়ন এমন এক বিষয় নিয়ে নীরিক্ষা করলেন, যেখানে ওয়েস্টার্ন ঘরানার উপস্থাপনের পাশাপাশি ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এক বিন্দুতে মেশে।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পটভূমির এ গল্প ‘মন্টানা’ অঞ্চলের। মন্টানার পারিবারিক র্যাঞ্চের মালিক দুই ভাই—ফিল (বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ) ও জর্জের (জেসি প্লেমন্স) ব্যক্তিক বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে গল্প শুরু হয়। সেখান থেকে খামারের জীবন ও পশ্চিম আমেরিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরের একাকিত্ব এসে জুড়ে বসে পর্দায়। একটা সময়ে বলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যে, প্রান্তরের শূন্যতা মানুষের মনে প্রভাব ফেলে নাকি ফিল বার্বাংকের মানসিক শূন্যতা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়! ক্যাম্পিয়নের সিনেমার গল্পটি মূলত ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত থমাস স্যাভেজের একই নামের বই থেকে নেয়া। স্যাভেজের বইয়ের চরিত্রগুলো মূর্ত করার পাশাপাশি জেন ক্যাম্পিয়ন এখানে প্রকৃতিকে ক্যামেরায় ধরেছেন। অন্যান্য ওয়েস্টার্ন সিনেমার সঙ্গে এর ব্যতিক্রম হলো, সেসব সিনেমায় বাহ্যিক দ্বন্দ্ব প্রধান হলেও এখানে সবকিছু ব্যক্তির মানসিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
ক্যাম্পিয়ন এখানে সূক্ষ্মভাবে বেশকিছু বার্তা দেন। সিনেমায় উল্লিখিত ‘ডগ’কে মানুষের ভেতরকার প্রবৃত্তি বলেই মনে করা স্বাভাবিক। সিনেমায় ফিল যে জীবনযাপন করে—অপরিচ্ছন্ন, বিশৃঙ্খল—সে জীবনের পাশাপাশি তার আচরণের রুক্ষতা দেখে তা-ই মনে হয়। কিন্তু সিনেমার একটা পর্যায়ে গিয়ে দর্শক ভাবতে বাধ্য হবে, এই ‘কুকুর’
মূলত পরিবেশ, প্রতিবেশ। ঘোড়াকে খোজা করার দৃশ্যে ফিলের নির্লিপ্ততা তার নিজস্ব নয়। প্রায় ২৫ বছর ধরে পারিবারিক খামার রক্ষণাবেক্ষণ করার পর র্যাঞ্চ তাকে নির্লিপ্ত করে তুলেছে। কিন্তু ফিল ও জর্জের শূন্য ঘরের বুকশেলফ তাদের অন্য কোনো পরিচয় লুকিয়ে রাখে। তখনই প্রশ্ন জাগে, মূলত পরিবেশই মানুষকে বদলায়। বার্বাংক পরিবারের দুই সদস্য মন্টানা র্যাঞ্চ এলাকায় খামারি পরিবেশ বজায় রাখেনি, বরং পরিবেশটা তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন করে রেখেছে।
জেন ক্যাম্পিয়ন ক্যামেরার কাজে বরাবরই দক্ষ। এ সিনেমায় পশ্চিম আমেরিকান পরিবেশের আবহ তুলে আনা জরুরি ছিল। নিউজিল্যান্ডে শুট করা সিনেমাটিতে নানা সময়ে উপর থেকে নেয়া একেকটি দৃশ্যে কিংবা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ভিউ থেকে পশ্চিম অমেরিকান পরিবেশের শূন্যতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে দৃশ্যের সঙ্গে শব্দ সংযোজন চমত্কার হওয়ার সে মুহূর্তগুলোর হাহাকার স্পষ্টভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে। মূলত এ সিনেমায় ক্যাম্পিয়ন একাকিত্বের মধ্য দিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার গল্পটাই বলতে চেয়েছেন। এ জায়গাটিতে এসে অন্যান্য ওয়েস্টার্ন সিনেমার তুলনায় দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ আলাদা হয়ে ওঠে। তবে ফিল ও জর্জের মধ্যে রোজ গর্ডনের (কার্স্বেন ডানস্ট) আগমন এবং গল্পের ধরনটা টেরেন্স মালিকের ১৯৭৮ সালের ‘ডেজ অব হেভেন’
মনে করিয়ে দিতে পারে।
বাস্তব জীবনের দম্পতি জেসি প্লেমন্স ও কার্স্বেন ডানস্ট এ সিনেমায় এক জটিল দাম্পত্যে আবদ্ধ। সমস্যাসংকুল দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপড়েন তারা স্ক্রিনে দেখালেন। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে গেলেন বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ। দিন দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া ব্রিটিশ অভিনেতা এ সিনেমায় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন বলে সমালোচকরা মনে করেন। ফিল বার্বাংকের চারিত্রিক দ্বৈততার যে রূপ তিনি নিজের অভিব্যক্তি, ভঙ্গি ও ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করেন, তা সিনেমার ‘ডগ’-এর প্রতিনিধিত্ব করে। অবশ্য সিনেমাটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবলে মনে হয় ফিল ও র্যাঞ্চের পরিবেশ আসলে পরস্পরের পরিপূরক। মন্টানার রুক্ষতা আর রোজের প্রতি আবেগ মিলে একটা সময়ে ফিল বার্বাংক খোদ আপাদমস্তক একটা খামার করে ওঠে। এটিই সম্ভবত সিনেমা ও বেনেডিক্টের চরম সার্থকতা।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও সিনেমাটোগ্রাফির জন্য প্রশংসিত দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ ৯৪তম অস্কারের জন্য কেনেথ ব্রানার ‘বেলফাস্ট’-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বলে অস্কার বিশেষজ্ঞরা রায় দিয়েছেন। মজার ব্যাপার, দুটো সিনেমাই ভৌগোলিক অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করে। অবশ্য ব্রানার বেলফাস্ট যেখানে পারিবারিক আবহে নস্টালজিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবতার উপস্থাপন, ক্যাম্পিয়নের দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ সেখানে পরিবেশ-প্রতিবেশের নিরিখে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম রূপায়ণ।










