বড় অসময়ে চলে যান কিছু মানুষ। রেখে যান অগণিত ভক্ত আর অসীম আক্ষেপ। ভারতীয় সংগীতশিল্পী কেকেও মাত্র ৫৪ বছর বয়সে চলে গেলেন। গানের মঞ্চে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মালয়ালি পরিবারে জন্ম নেয়া কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ বলিউডে কেকে নামেই পরিচিত।
কেকের জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৩ আগস্ট। মালয়ালি পরিবারের হলেও বেড়ে উঠেছেন নয়াদিল্লিতে। তার বাবা সিএস নায়ার ও মা কুন্নাথ কনকাবল্লী। কেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগীতের প্রশিক্ষণ নেননি, কিন্তু তার বেড়ে ওঠাই সংগীতের মধ্যে। মা-বাবা দুজনেই ভালো গাইতেন এবং মামাবাড়িতে গানের চল ছিল। ছোটবেলায় মায়ের গানের রেওয়াজ খুব মন দিয়ে শুনতেন, কখনো রেকর্ড করেও রাখতেন। শোনা যায় তার বাবা তাকে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রশিক্ষণ নিতে বললেও অল্পদিনেই প্রশিক্ষণ নেয়া বন্ধ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কিশোর কুমার কখনো গান শিখে গায়ক হননি।’
গান শেখা না শেখা কেকের জীবনে যে খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি তা কেকের ক্যারিয়ার দেখেই বোঝা যায়। গায়ক কেকের শুরুটা ছিল চমত্কার। এ আর রহমানের সুরে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন। ১৯৯৯ সালে আসে তার প্রথম অ্যালবাম ‘পল’। সংগীতে ক্যারিয়ার শুরুর সময় (১৯৯৪ সাল) তিনি লুইস ব্যাংকসকে তার গানের ডেমো রেকর্ডিং পাঠিয়েছিলেন। এরপর জিংগেল দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। চার বছরে তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার জিংগেল গেয়েছেন। লুইস ব্যাংকস ও লেসলি লুইসকে তার মেন্টর হিসেবে ধরা হয়। তার মাধ্যমেই তিনি বলিউডে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এ আর রহমানের সঙ্গে কাজ করেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
লুইস ব্যাংকসের সঙ্গে সম্পর্কের দুই বছর পর আসে কাথিরের সিনেমা কাডল দেশম। এ সিনেমায় ‘কাল্লুরি সালে’ ও ‘হ্যালো ডক্টর’ গান দুটি বিখ্যাত হয়। এরপর এভিএম প্রডাকশনের মিউজিক্যাল ফিল্ম মিনাসা কানাভুতে তিনি ‘স্ট্রবেরি কান্নে’ গানটি গেয়েছিলেন। প্রথম অ্যালবামের সঙ্গে সঙ্গে বলিউডেও তার যাত্রা হয়। আর আসতে না আসতেই শ্রোতারা কেকের গায়কি ও সুরের জাদুতে মোহিত হন। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায় সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা হাম দিল দে চুকে সানাম। এ সিনেমার সালমান খানের লিপে ‘তাড়াপ তাড়াপ’ গানটি শোনেনি উপমহাদেশে এমন সংগীতপ্রেমী দুর্লভ। ইসমাইল দরবারের সুরে গানটি বিরহী প্রেমিকের যাতনা ফুটিয়ে তোলে। কেকের গায়কিতে গানে সে বেদনা এসেছে গভীরভাবে।
গায়কির পাশাপাশি কেকের স্বর সবসময়ই শ্রোতাদের কানে সুধাবর্ষণ করে। প্রাথমিকভাবে তার গান তরুণদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল। তার প্রথম অ্যালবামের সুর করেছিলেন লেসলি লুইস। অ্যালবামের ‘পল’ ও ‘ইয়ারো’
গান দুটি মুখে মুখে ফিরত। সনি মিউজিকের লেবেলে মুক্তি পাওয়া এ অ্যালবামের জন্য সেরা গায়ক হিসেবে স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন কেকে। তার পরবর্তী অ্যালবাম মুক্তি পায় আট বছর পর। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া এ অ্যালবামের নাম হামসাফার। অ্যালবাম থেকে ‘আসমান কে’,
‘দেখো না’,
‘ইয়ে কাহা মিল গ্যায়ে হাম’
গানগুলো জনপ্রিয় হয়োিছল। কিন্তু এর আগে বলিউডে চলেছিল কেকের রাজত্ব।
বলিউডের অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গায়ক কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ ওরফে কেকে। মোটামুটি ২০০২-২০১০ পর্যন্ত বলিউডের সিনেমায় গায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশেষত ইমরান হাশমীর লিপে তার কয়েকটি গান জনপ্রিয়। অনুরাগ বসু পরিচালিত গ্যাংস্টার সিনেমার ‘তু হি মেরি শাব’,
কুনাল দেশমুখের জান্নাত সিনেমার ‘যারা সা’
গানটি বছরের পর বছর তরুণদের মুখে ঘুরেছে। বেজেছে অলিতে গলিতে। এ গানের জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা গায়কের মনোনয়ন পেয়েছিলেন কেকে।
কেকের গলায় জাদু ছিল। যে গানে যে ধরনের আবেগ প্রয়োজন তা তিনি ফোটাতে পারতেন। তাড়াপ তাড়াপে প্রেমিকের দুঃখের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মিষ্টি প্রেমের গানও গাইতেন সমান দক্ষতায়। ফারাহ খানের ২০০৭ সালের সিনেমা ওম শান্তি ওম-এ তিনি গেয়েছিলেন ‘আঁখো মে তেরি’। গানটির আবহ কেকের গায়কিতে এত চমত্কারভাবে এসেছিল যে একটি গানের জন্যই তাকে মনে রাখা চলে।
গান না শিখলেও গানের প্রতি তার নিবেদনে কোনো অভাব ছিল না। ‘তাড়াপ তাড়াপ’
গানের রেকর্ডিংয়ের সময় ইসমাইল দরবার তার গানটি ‘ওকে’ করে দিলেও কেকে নিজে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি মনে করতেন গানটিতে বেদনার মাত্রা তিনি দিতে পারেননি। তিনি চেষ্টা করতে থাকেন এবং একদিন ভোর ৩টায় ফোন করে জানান, তিনি প্রস্তুত। ভোর ৪টায় গানটি রেকর্ড করা হয়। গানটির জনপ্রিয়তা অজানা নয়। একই বছর মুক্তি পাওয়া তার পল অ্যালবামটিও সমান জনপ্রিয়তা পায়। অ্যালবামের ‘হাম, রয়ে ইয়া না রহে কাল...’ গানটি তার সিগনেচার হয়ে ওঠে। মূলত এ অ্যালবাম থেকেই কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ হয়ে ওঠেন কেকে। ২০০৯ সালে ‘খুদা জানে...’ গানের জন্য পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার।
তারপর বহুদিন পেরিয়ে বহু গানের মধ্য দিয়ে কেকে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বলিউডে নিজের জায়গা করেছেন শক্ত। উঁচু মাত্রায় গান গাওয়ায় তার সামর্থ্যও সংগীত মহলে প্রশংসিত। মালয়ালি পরিবারের কেকে হিন্দির পাশাপাশি তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালি, মারাঠি, বাংলা, অহমিয়া ও গুজরাটি ভাষাতেও গেয়েছেন। মোট গানের সংখ্যা ৭০০-এর অধিক। এর মধ্যে হিন্দি গান প্রায় ৫০০।
এত প্রতিভার পরও কোনো এক অজানা কারণে বলিউডে সুযোগ কমে গিয়েছিল কেকের। গান গাননি এমন নয়, তবে গানের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। প্রডিউসাররা সেভাবে ডাকতেন না। বিশেষত ২০১০ পরবর্তী সময়ে বলিউডে হিপহপ ও র্যাপ জনপ্রিয় হওয়ার পরই যেন কেকে কিছুটা আড়ালে চলে যান। কিন্তু এর মধ্যেও প্রিতমের মতো সংগীত পরিচালকরা তার পাশে ছিলেন। এই সেদিনও তিনি লাভ আজকাল ২০২০-তে গেয়েছেন ‘অওর তানহা’
গানটি। পুরনো আবেশ ফের নিয়ে আসলেন কেকে সেখানে।
তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে বলিউডে। সনু নিগম লিখেছেন, ‘কেকে মেরে ভাই, নট ডান’। তারা একসঙ্গে গেয়েছিলেন ‘মেহকি হাওয়াও মে’। শ্রেয়া ঘোষাল তার টুইটে লিখেছেন, ‘এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। আমার হূদয় ভেঙে গেছে।’
সংগীত পরিচালক বিশাল দাদলানি লিখেছেন, ‘অশ্রু থামছে না। কী অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। কী ছিল তার স্বর।’
হ্যাশট্যাগে তিনি লিখেছেন কেকে ফরেভার। মোহিত চৌহান একটি ছবি পোস্ট করেছেন যেখানে কেকের সঙ্গে তাকে দেখা যায়। শেষবার তাদের ওখানেই দেখা হয়েছিল।
কলকাতায় কনসার্টে মারা গেলেন কেকে। তার এ কনসার্টের আগে একটি নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন শিল্পী রুপঙ্কর বাগচী। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী বাবুল সুপ্রিয়, সংগীত পরিচালক জিৎ গাঙ্গুলী তার মৃত্যুতে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। কেকের নিকটজনরা জানিয়েছেন খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। ছিলেন পুরোদস্তুর সংসারী। দীর্ঘদিনের প্রেমের পর ১৯৯১ সালে তিনি প্রেমিকা জ্যোতির পাণিগ্রহণ করেন। তাদের দুই সন্তান—পুত্র নকুলকৃষ্ণ কুন্নাথ ও কন্যা আমারা কুন্নাথ।
প্রীতমের সুরে কেকে গেয়েছিলেন, ‘আলবিদা’। মেট্রোপলিটন শহরে তার গান তাকে কখনো বিদায় নিতে দেবে না। তিনি থাকুন আর না থাকুন, শ্রোতা ও ভক্তের মনে তিনি থাকবেন প্রতি পল।










