ভারতীয় সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি মণি রত্নম। তিনি ‍আলো, আবেগ, চরিত্র ও সংগীতের চমৎকার মেলবন্ধনে সিনেমাকে তুলে ধরেছিলেন নতুন উচ্চতায়। তার পরিচালনায় ‍১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নায়কান’-এ অভিনয় করেছিলেন কমল হাসান। সিনেমাটি এখনো কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। তাই ‍৩৭ বছর পর ‘থাগ লাইফ’ সিনেমায় মণি রত্নম ও কমল হাসান আবার একসঙ্গে কাজ করছেন। এ খবর ‍ভক্তদের কাছে ছিল এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত। কিন্তু সে প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে বাস্তবতায়।

থাগ লাইফ মুক্তির পর পরই দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে সমানভাবে সমালোচিত হচ্ছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, মণি রত্নম আবার সেই পুরনো ঢংয়ে নতুন কোনো গল্প বলবেন—যা ধীরে ধীরে এগোবে, দৃশ্য থেকে দৃশ্যে আবেগ তৈরি করবে। কিন্তু সমালোচনায় বলা হচ্ছে, সিনেমাটি দেখে মনে হচ্ছে যে বাস্তবে তিনি যেন নতুন প্রজন্মের ‘রিলস সংস্কৃতির’ পেছনে ছুটেছেন। লোকেশ কনগরাজ (বিক্রম, ২০২২), কার্তিক সুব্বারাজ (রেট্রো, ২০২৫), নেলসন দিলীপকুমার (জেলার, ২০২৩) ও আধিক রবিচন্দ্রনের (গুড ব্যাড আগলি, ২০২৫) মতো বর্তমানের তরুণ পরিচালকরা ‍গল্প বলার চেয়ে দর্শককে তাৎক্ষণিক অনুভূতি দেয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। তাদের সিনেমাগুলো যেন অনেকটা ‍ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো, যেখানে একের পর এক ‍উত্তেজনা, সহিংসতা, চমক আর ‍পুরনো গানের রিমিক্স থাকে। এ ধরনের সিনেমায় ‍গল্প, চরিত্র বা আবেগের চেয়ে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখাই যেন বড় বিষয়। তাই ক্লাইমেক্সের আধিক্য থাকে অনেক বেশি। গল্পের পরিণতির দিকে ধীরে এগোনোর বদলে, এখানে ‍আলাদা আলাদা চমকপ্রদ মুহূর্তই মূল আকর্ষণ। এতে দর্শকের ক্লান্তি কাজ করলেও পুরো সময়ে তাদের মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয়।

থাগ লাইফে মণি রত্নমও একই ফর্মুলা অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দর্শকের চোখে সেটিই দুর্বলতা হয়ে ধরা দিয়েছে। যিনি একসময় আলো, শব্দ ও আবেগ দিয়ে গল্প বলতেন, এখন তিনি সে আবেগের জায়গায় ভরসা করছেন রক্ত আর রিমিক্স গানের ওপর।

সমস্যা হলো মণি রত্নম নতুন এ ধারার সিনেমার মানুষ নন। তাই থাগ লাইফ যেন নতুন ধারার সিনেমা হতে চেয়েও হয়নি, আবার পুরানো ঘরানার আবেগও ঠিকভাবে পৌঁছায়নি। সহিংসতার দৃশ্যায়ন বা মিনিটে মিনিটে দর্শককে চমকে দেয়ার ফর্মুলায় সিনেমা নির্মাণে মণিকে দেখা যায়নি। তাই এবারের সিনেমাটিও যেন ভিত পেল না।

যদি থাগ লাইফের সঙ্গে গুড ব্যাড আগলি সিনেমার তুলনা করা হয়, তাহলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে রবিচন্দ্রনের সিনেমা ছিল অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও স্পষ্ট ভঙ্গিতে তৈরি। কী তৈরি করছেন ও দর্শককে কী দেখাতে চাচ্ছেন, তা তিনি বেশ ভালোভাবে জানতেন। একটানা চমক, ভক্তি আর বিদ্রূপের মিশ্রণে গল্প বা আবেগ উপেক্ষা করেছেন তিনি, কিন্তু দর্শককে বিনোদন ঠিকই দিয়েছেন। থাগ লাইফ সেখানে ‍এ ‍দিকগুলোর কোনোটিই ‍পুরোপুরি ‍দিতে ‍পারেনি। মনে হয়েছে, মণি রত্নম বারবার খেই হারিয়েছেন।

সিনেমার বর্তমান ধারা দেখে একটা বিষয় পরিষ্কার, আজকের দর্শকের মনোযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তারা গল্পের আবেগ নয়, খোঁজেন তাৎক্ষণিক উত্তেজনা। ৩০ সেকেন্ডের রিল এখন অনেক সময় পুরো দৃশ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়। অনেক পরিচালক এখন সিনেমা বানান এমনভাবে, যেন তা ইনস্টাগ্রামের রিলের মতো সহজেই ভাইরাল হয়।

তবে সিনেমার এ নতুন ধারায় অনেকেই মানিয়ে নিতে পারছেন না। মণি রত্নমের সিনেমা যেন পুরনো আর নতুনের মাঝামাঝি কোথাও আটকে গেছে। তিনি নতুনদের মতো হতে চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের পুরনো ঘরানা থেকেও পুরোপুরি বের হতে পারেননি। ফলে থাগ লাইফ অনেক কিছু বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত কিছুই স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত থাগ লাইফ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে। কারণ ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে শুধু অনুকরণ যথেষ্ট নয়, বরং নিজের স্টাইলকে নতুনভাবে তুলে ধরাও জরুরি। সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলার মানে পুরনোকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং নিজস্ব ঘরানা বজায় রেখে সেটিকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করাটাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের পথ।

দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে মারিফুল হাসান