কিছু গল্প থাকে, যা পড়ার সময় আপনা থেকে ঠোঁটে হাসি ফোটে। এ হাসি কৌতুকের না, নির্মল আনন্দের। টিভিএফ প্রযোজিত পঞ্চায়েত ওয়েব সিরিজের গল্পটি ঠিক এমন। ভারতের উত্তর প্রদেশের ফুলেরা গ্রাম ও গ্রামের মানুষের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে পঞ্চায়েত। পাশাপাশি মূল গল্পের সঙ্গে ছিল আরো কত অনুষঙ্গ বা গল্পের ভেতরের গল্প। শহুরে যুবক অভিষেক ত্রিপাঠির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গ্রাম পঞ্চায়েতের সচিবের দায়িত্ব পাওয়া এবং তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সিরিজের গল্প। প্রথম সিজনটি এমন জায়গায় শেষ যে মনে হয় ফুলেরার প্রতি অভিষেকের আবেগ তৈরি হয়েছে। সে থেকেই যাবে এখানে। বিশেষত ট্যাংকের ওপরে উঠে রিংকির সঙ্গে দেখা হওয়া সে ইঙ্গিতই দিয়েছিল।
পঞ্চায়েত এমন একটি সিরিজ, যা পরিবার নিয়ে দেখা যায় আবার একা দেখলেও এক ধরনের মানসিক শান্তি অনুভব হয়। পাশাপাশি ভারতীয় সিরিজের একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় সিজনে গল্পের মোড় বদলে দেয়া। দর্শকের তুষ্টি বা গল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় না। কিন্তু পঞ্চায়েত সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। পঞ্চায়েতের মূল আকর্ষণ ও শক্তিশালী দিক এর গল্প। ফুলেরা গ্রামের মধ্য দিয়ে গ্রাম চরিত্রের স্পষ্ট ও বাস্তবের উপস্থাপনা এ সিরিজ। গ্রামের মানুষ ও তাদের জীবনাচার ফুটে উঠেছে চমত্কারভাবে। অনেক সিনেমা বা সিরিজে এ বিষয় দেখা যায় কিন্তু সেখানে কিছু না কিছু আরোপিত বিষয় থেকেই যায়। পঞ্চায়েত গল্পটা বলেছে একদম সাদামাটাভাবে। গ্রামীণ সরলতা প্রকাশ করে এ সিরিজ। কিন্তু এর মানে এমন নয় যে সিরিজের সব চরিত্র বা ঘটনা ইতিবাচক। গ্রামীণ কিছু ষড়যন্ত্র, গ্রামীণ মানুষের সংকীর্ণতার কথাও পঞ্চায়েত বলে, তবে তা চাঞ্চল্যকর কোনো হত্যা, ধর্ষণ বা সংঘর্ষ নয়।
গ্রামের চিত্রের উপস্থাপনে সিরিজটি চমত্কার কাজ করেছে। দীপক কুমার মিশ্রের পরিচালনায় সিরিজে ফুলেরার যে চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে তা অনুরাগ কাশ্যপের সংঘাতে রক্তাক্ত গ্রাম নয়—ভারতের একটি সাধারণ গ্রাম। সেখানে এখনো শৌচকাজ থেকে শুরু করে টিকাগ্রহণসহ নানা বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হয়। মানুষগুলো সরল, ক্ষেত্রবিশেষে অবুঝ। এসবের মধ্যে শহুরে যুবক অভিষেকের কাজ করতে হয়। কাজ করতে গিয়ে সে যেভাবে এ গ্রাম ও মানুষকে আবিষ্কার করে, দীপক সে গল্পটা বলেছেন। আর গল্পটিকে ফুটিয়ে তুলতে সাবলীল কাজ করেছেন জিতেন্দ্র কুমার, রঘুবীর যাদব, চন্দন রায়, নীনা গুপ্তা, ফয়সাল মালিক প্রমুখ। চিত্রনাট্যের পাশাপাশি তাদের অভিনয়ই এ সিরিজের প্রাণ।
দ্বিতীয় সিজনেও অভিষেক ফুলেরার প্রেমে পড়ে না। পঞ্চায়েত এখানেই অন্যান্য সিরিজ থেকে ভিন্ন। অভিষেক এখনো গ্রাম থেকে চলে যেতে চায়। কিন্তু প্রধান হিসেবে কাজ করা ব্রজভূষণ দুবে, বিকাশ ও প্রহ্লাদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। অসম বয়স ও অবস্থানের তিনজন মানুষের বন্ধুত্বের গল্পটি পঞ্চায়েতের প্রাণ। অভিষেক চরিত্রে জিতেন্দ্র, প্রহ্লাদ চরিত্রে ফয়সাল, বিকাশের চরিত্রে চন্দন রায় ও প্রধানের চরিত্রে রঘুবীর যাদব এ বন্ধুত্বের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। এ চারজনের আড্ডার কয়েকটি দৃশ্য সিরিজের অন্যতম সুন্দর অংশ। পাশাপাশি প্রধানের স্ত্রীর চরিত্রে নীনা গুপ্তা তার বহুদিনের অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইটের দাম নিয়ে তার দরকষাকষির দৃশ্যটিও দর্শকের মনে থাকবে বহুদিন। এছাড়া প্রধান ও প্রধানের স্ত্রীর দাম্পত্যের রসায়নও দর্শকের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করে। রঘুবীর যাদব ও নীনা গুপ্তার জুটি এ সম্পর্ককে করে তুলেছে অনন্য।
পঞ্চায়েত নারীর ক্ষমতায়নের বাজারি গল্প বলে না। এ সিরিজে মঞ্জু দেবী (নীনা গুপ্তা) পঞ্চায়েত প্রধান হলেও তার হয়ে পদটি সামলান ব্রজভূষণ (রঘুবীর) দুবে। গ্রামের ক্ষেত্রে এটিই বাস্তব। কিন্তু এরই মধ্যে দেখানো হয় সংসারে মঞ্জুই প্রধান। এমনকি প্রধান পদের দায়িত্ব তার কাছে এলেও তিনি তা পালন করতে সক্ষম।
রিংকির চরিত্রে সান্বিকা ভালো কাজ করেছেন। তবে রিংকির সঙ্গে অভিষেকের প্রেমটা এ সিজনে হতে হতেও হতে দিলেন না সিরিজের গল্পকার চন্দন কুমার। তোলা থাকল পরের সিজনে। কিন্তু অভিষেকের সঙ্গে তার কয়েকবার দেখা এবং চায়ের কাপের দৃশ্যটি দর্শকের মনে থাকবে অনেক দিন। দৃশ্যের সঙ্গে অনুরাগ সাইকিয়ার সংগীত এ সিজনের দৃশ্যগুলোকে করেছে আরো মনোরম।
পাশাপাশি দ্বিতীয় সিজনে কয়েকটি দৃশ্য দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে। শুরুতেই বাইজির সঙ্গে অভিষেকের কথোপকথনে উঠে আসে জীবন বাস্তবতা। মেয়েটি বলে, ‘সচিব সাহেব, আমরা সবাই কোথাও না কোথাও নাচছি।’
এর মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিদিনের কাজ করার কথা বোঝানো হয়। এছাড়া মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইনে জিপ চালকের কথায়ও বেশকিছু ইঙ্গিত রয়েছে। এ সিরিজের শেষদিকে প্রহ্লাদের ছেলের মৃত্যু এবং এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের জীবন বাস্তবতার আরেকটি চিত্র উঠে আসে। সেনাবাহিনীর জওয়ান হিসেবে চাকরি করতে গিয়ে মারা যাওয়া ছেলেটি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে অন্য এক সরকারি কর্মচারী বলেন, ‘এত কম বেতনে দেশের জন্য জীবন দেয়ার মানুষ এ গ্রাম-দেহাত ছাড়া কোথায় পাওয়া যাবে?’
প্রহ্লাদের একাকিত্ব, অভিষেকের সঙ্গে পঞ্চায়েতের সবার বন্ধুত্বের পাশাপাশি এসেছে গ্রামেরই আরেকজনের করা শত্রুতার গল্প। কিন্তু সেটা সাধারণ ঈর্ষার চিত্র। এ সিজনে নতুন সংযোজন বিধায়কের খল চরিত্র। অভিষেকের বিরুদ্ধে তার বাজে ব্যবহার এবং সেখান থেকে একসঙ্গে রুখে দাঁড়ানোর গল্পও হয়ে ওঠে পঞ্চায়েতের দ্বিতীয় সিজন। সব মিলিয়ে এবারের সিজনটিতে কৌতুকের আবেশ কম থাকলেও ফুলেরার সঙ্গে আরো গভীরভাবে দর্শককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে টিভিএফ। শেষটায় একটা চমক আছে এবারো। কিন্তু সেখানেও টিভিএফের সফলতা হলো কাহিনী থেকে অনেক দূর সরে গিয়ে চমকে দেয়নি তারা। সরলতার বয়ানেই থেকে গেছে পঞ্চায়েত—আজকের দিনে যা দুর্লভ।










