সম্প্রতি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নতুন করে রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আর তা হলো শিল্পকর্মের আদান-প্রদান নিয়ে। তবে এ ঘটনার মাধ্যমে শিল্পকর্মের সঙ্গে কূটনীতির সম্পর্ক স্পষ্ট হবে।

ফ্রান্সের বায়েউ ট্যাপেস্ট্রিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যকে ধার দেয়া এবং এর বদলে যুক্তরাজ্যের সাটন হুর মূল্যবান জিনিসপত্র ফ্রান্সে পাঠানো আস্থার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের একটা নিদর্শনও বটে। বিশ্লেষকরা এ আয়োজনকে ঘিরে নানা মতামত দিচ্ছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে পারমাণবিক বিষয়ে নতুন চুক্তির কথা হতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন এর ফলে অভিবাসন চুক্তির রাজনৈতিক পালাবদলে প্রভাব ফেলেতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি থাকবে বায়েউ ট্যাপেস্ট্রির দিকে। শিল্পকর্মটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হবে। একই সময়ে ফ্রান্সের রুয়াঁ ও কাঁ শহরে সাটন হু থেকে আনা ঐতিহাসিক জিনিসপত্র দেখার জন্যও মানুষ ভিড় করবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। তারা আশা করছে, এ আয়েজনকে ঘিরে অনেক দর্শনার্থী আসবে। এটি দেখায়, আজও শিল্প ও ইতিহাস কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতিহাসে আমরা দেখি, শিল্পকর্ম, পুরাকীর্তি, রেশমি কাপড় ও নানা রকম আবিষ্কার দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উপহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এমন উপহার কখনো আলোচনার সূচনার মাধ্যম, আবার কখনো হয়ে দাঁড়ায় যোগাযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এসব উপহার কিংবা প্রদর্শিত শিল্পকর্ম এমনভাবে কথা বলে, যা কোনো কূটনীতিক সরাসরি বলার সাহস বা সুযোগ পান না। তবু শিল্পকর্ম শব্দ ছাড়াই সেই বার্তা পৌঁছে দেয়।

উপহার শুধু সম্মানের নিদর্শন নয়। অনেক সময় দেখা যায় এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। যেমন দাস ব্যবসায়ী বা ধর্ম প্রচারকরা অনুমতির জন্য শাসকদের নানা কিছু উপহার দিতেন। ১৫৫০-এর দশকে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারকারী ফ্রান্সিস জাভিয়ার জাপানে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি পৌঁছে দেন পশ্চিম জাপানের শাসক ওউচি ইয়োশিতাকাকে। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা পেতে তারা এমন কিছু উপহার দিয়েছিলেন, যা তখনকার সময়ের জন্য খুবই অদ্ভুত ও উন্নত ছিল—যেমন চশমা, হার্পসিকোর্ড, টেলিস্কোপ ও একটি যান্ত্রিক ঘড়ি।

অনেক সময় দেখা যায়, কোন রাজ্যের বা সাম্রাজ্যের শাসক শুধু শিল্পকর্ম পাঠাতেন না। খ্যাতনামা শিল্পীকেও পাঠাতেন। যেমন ১৬২৯ সালে স্পেনের ফিলিপ চতুর্থ শিল্পী পিটার পল রুবেন্সকে ইংল্যান্ডের চার্লস প্রথমের দরবারে কূটনৈতিক মিশনে পাঠিয়েছিলেন। রুবেন্স দুই দেশের মধ্যে শান্তি ও বন্ধুত্বের চুক্তির প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেন এবং রাজার জন্য তিনটি চিত্রকর্ম আঁকেন।

তবে স্প্যানিশদের চেয়ে ফরাসিরাই কূটনৈতিক উপহার পাঠানো জাতি হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৮৫ সালে ফ্রান্স আমেরিকাকে স্বাধীনতা ও দাসপ্রথা বিলোপের স্মারক হিসেবে ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ উপহার দিয়েছিল। এ স্ট্যাচু ৩৫০টি অংশে ২১৪টি বাক্সে করে নিউইয়র্কে পাঠানো হয়েছিল এবং তা লক্ষ লক্ষ অভিবাসীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রায় এক শতাব্দী পর ১৯৬৩ সালে দীর্ঘ আলোচনা শেষে প্রথমবারের মতো ফরাসিরা তাদের জাতীয় সম্পদ মোনালিসাকে বিদেশে প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় ১০ লাখ আমেরিকান এ বিখ্যাত চিত্রকর্মের রহস্যময় হাসিটি দেখার জন্য মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে ভিড় জমায়।