চিত্রশিল্পী ড. আব্দুস সাত্তার সম্প্রতি একুশে পদক ২০২৬-এ ভূষিত হয়েছেন। তিনি শিল্পচর্চার পাশাপাশি একজন নন্দিত শিক্ষকও। ২০টিরও বেশি প্রকাশনা রয়েছে তার। সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রবন্ধ থেকে শুরু করে রচনা করেছেন চিত্রশিল্পের ওপর একাধিক তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ। শিল্পকর্মের জন্য দুটি স্বর্ণপদকসহ সাতটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে পেয়েছেন নয়টি পুরস্কার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. বজলুর রশিদ শাওন

আপনার জন্মস্থান, ছোটবেলা এবং বেড়ে ওঠা—

আমার জন্ম ১৯৪৭ সালে, তৎকালীন বৃহত্তর রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমায় (বর্তমানে জেলা)। উপজেলা বড়াইগ্রাম, গ্রাম চক বড়াইগ্রাম। নাটোর যেহেতু রাজবাড়ি ছিল, রাজাদের শাসন চলত, তাই এলাকাটা জমিদার অধ্যুষিত ছিল। আমাদের আশপাশের গ্রামেও জমিদাররা ছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছি প্রজারা খাজনা দিত। একেবারেই অজপাড়াগাঁ বলা চলে। এরপর বড়াইগ্রাম হাইস্কুলে লেখাপড়া। তখন আমাদের এলাকাটা হিন্দুপ্রধান ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য সব তাদের দখলেই ছিল। মুসলমানরা তখন ব্যবসা করার চিন্তাই করত না। যেহেতু হিন্দুপ্রধান এলাকা, পূজা-পার্বণ সবসময় হতো। নাটক, যাত্রা, থিয়েটার—এসব হতো সবসময়। খুব জমজমাট সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল।

শিল্পের প্রতি আগ্রহটা কীভাবে তৈরি হলো?

ছোটবেলায় বইয়ের কভার বা ইলাস্ট্রেশন দেখে ভালো লাগত। আমি দেখে দেখে আঁকতাম। গোলাপ ফুল, গাছপালা আঁকতাম। আমাদের স্কুলের সামনেই নদী ছিল। নদী শুকিয়ে গেলে ভেজা মাটি তুলে নানা রকম পুতুল বা জিনিসপত্র তৈরি করতাম। আর স্কুলের পাশেই ছিল পূজামণ্ডপ। দুর্গা পূজা, কালী পূজা হতো। পালরা (প্রতিমাশিল্পী) আসতেন মূর্তি তৈরি করতে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম কীভাবে বাঁশ-খড় দিয়ে কাঠামো বানাচ্ছে, মাটি লাগাচ্ছে, রঙ করছে, চেহারা ঠিক করছে। হঠাৎ করেই একটা সুন্দর প্রতিমা তৈরি হয়ে যেত। এগুলো দেখেই শিল্পের প্রতি একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। মাটি দিয়ে কাজ করা বা ছবি আঁকা—এভাবেই শিখে ফেললাম।

31

চারুকলায় পড়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন? পরিবার বা শিক্ষকদের কোনো বাধা ছিল?

আমার কোনো শিক্ষক বা এলাকার কেউ জানতেন না যে শিল্পশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান আছে। আমিও জানতাম না। এসএসসি পাসের পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। দুই বছর পড়ার পর দেখা যায়, কেমিস্ট্রি-ফিজিকস পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। ভালো ফল না হওয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়া যাবে না। তখন ভাবলাম, পরীক্ষা না দিয়ে পরেরবার ভালো করে দেব। কিন্তু রেজাল্ট আসার পর দেখলাম ভালোই করেছি। ১৯৬৬ সালের কথা। ঢাকার চারুকলার শফিকুল আমিন স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তখন জয়নুল আবেদিন স্যার আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। শফিকুল স্যার বললেন, আমাদের তো তিন মাস আগে ভর্তি শেষ হয়ে গেছে। তবে ভালো ছাত্র হলে ‘স্পেশাল কেস’ হিসেবে নেয়া যেতে পারে।" এ কথাটা আমাকে সাহস জোগাল। এরপর ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। আমাকে একটা মাটির পট বা কলস আঁকতে দেয়া হলো, শুধু পেন্সিল আউটলাইন। আর ইংরেজিতে একটা রচনা লিখতে দিল। আমি লিখে দিলাম। স্যার দেখে ৬০ শতাংশ নম্বর দিলেন এবং অফিসকে বললেন আমাকে ভর্তি করে নিতে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ভর্তি হয়ে গেলাম।

১৯৭১ সালে আপনি কোথায় ছিলেন? ২৫ মার্চের সেই রাতের কথা যদি বলেন।

আন্দোলন-সংগ্রামে চারুকলার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ব্যানার ও পোস্টার আঁকত। আন্দোলন শেষে সেগুলো আবার হোস্টেলে নিয়ে রাখত। এ কারণে চারুকলার প্রতি পাকিস্তান আর্মির ক্ষোভ ছিল। আমি তখন চারুকলার হোস্টেলেই থাকতাম। একাত্তরের ২৩ মার্চ আমি বাড়ি যাই। পরীক্ষার আগ দিয়ে সাধারণত বাড়ি যেতাম। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি আর্মি ঢাকা শহরে গণহত্যা চালায়। শাহনেওয়াজ (আমার ব্যাচমেট), নজরুল ইসলাম (জুনিয়র) ও শাহনেওয়াজের এক বন্ধু ওইদিন চারুকলার হোস্টেলে ছিল। ২৬ মার্চ সকালে এক ট্রাক আর্মি হোস্টেলে আক্রমণ করে। পরে এ ঘটনা আমি জাব্বার নামে এক সহপাঠীর মাধ্যমে জানতে পারি।

আর্মি ২৬ মার্চ হোস্টেলে ঢুকে যত ব্যানার-পোস্টার পেয়েছে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর শাহনেওয়াজদের রুমের দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলে। ওদের তিনজনকে দেয়ালের পাশে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে। শাহনেওয়াজ সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। নজরুল গুলি খেয়েও বেঁচে ছিল। ওর বুকের পাশ দিয়ে গুলি লেগেছিল। এ গুলির প্রভাবে পরে নজরুলের মানসিক সমস্যা হয়।

আর জাব্বার হোস্টেলের পেছনের ড্রেনে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচায়। শাহনেওয়াজদের গুলি করার পর আর্মি কিবরিয়া স্যারের রুমে ঢোকে। স্যার তখন পরিচয় দেন যে তিনি শিক্ষক এবং পাকিস্তান সরকার তাকে পদক দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত সনদও দেখান। অফিসার তখন স্যারকে বললেন, আমরা চলে যাচ্ছি, আপনি এখানে থাকবেন না। নিরাপদ কোথাও চলে যান।

32

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে আমি একদিন হোস্টেলে এসেছিলাম। তখনো দেখেছি, শাহনেওয়াজের রুমের দেয়ালে গুলির গর্ত, ফ্লোরে রক্তের দাগ। এগুলো দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। হোস্টেলে আগুনে পোড়ানো অনেক কিছু দেখলাম। এ স্মৃতি ধরে রাখার জন্য পরে উডকাটে শিল্পকর্ম করেছি।

আপনার কর্মজীবন কীভাবে শুরু হলো?

স্বাধীনতার পর আমি ‘ইন্টারস্প্যান’ নামে মতিঝিলের এক নামকরা অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিতে চাকরি শুরু করি। বেতন ছিল ৪০০ টাকা। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর ঢাকা চারুকলায় চাকরির বিজ্ঞাপন হয়, ইন্টারভিউ দিয়ে ফুলটাইম যোগ দিই। আমি তখন সকালে চারুকলায় ক্লাস নিতাম আর বিকালে ওই এজেন্সিতে চাকরি করতাম। পরে ১৯৭৩ সালে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাই।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

আবেদিন স্যারের সরাসরি কোনো ক্লাস আমরা পাইনি। তবে সিনিয়র শিক্ষক যেমন আমিনুল ইসলাম, রশীদ চৌধুরী, হাশেম খান স্যারদের সঙ্গে ওনার বাসায় যেতাম। আমি যখন শান্তিনিকেতনের স্কলারশিপ পাই তখন অনেকেই না করেছিলেন যেতে। কিন্তু আবেদিন স্যারের পরামর্শেই আমি গিয়েছিলাম। এছাড়া উনি যখন কোনো প্রদর্শনী আয়োজন করতেন তখন আমাকে কাজ দিতে বলতেন। একবার বৈশাখ উপলক্ষে একটা প্রদর্শনীর জন্য উনি কাজ চেয়েছিলেন। আমি তখন খোলা চুলের একটা মেয়ের ছবি এঁকেছিলাম কালবৈশাখী ঝড়ের রূপক হিসেবে।

শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

শান্তিনিকেতনে গিয়ে দেখি সেখানে সোমনাথ হোর আছেন। জয়নুল আবেদিন স্যার আমাকে পাঠিয়েছিলেন ওনার কাছে কাজ শিখতে। আমি সেখানে প্রিন্ট মেকিং—লিথোগ্রাফ, এচিং, উডকাট শিখলাম। দেশে ফিরে আমি উডকাট মাধ্যমেই বেশি কাজ করেছি। কারণ এচিং বা লিথোর জন্য যে কেমিক্যাল বা পাথর দরকার, তা আমাদের দেশে সহজলভ্য ছিল না। উডকাট করাটা সহজ ছিল। প্রিন্টমেকার শিল্পী হিসেবে আমার যে পরিচিতি তা মূলত শান্তিনিকেতনের শিক্ষার ফলাফল।

বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কী?

দৃশ্যশিল্প নিয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে বিভিন্ন প্রদর্শনী হয়। আমাকে সেখানে ডাকে, আমি যাই। সেখানে ভাস্কর্য, সিরামিক ও পেইন্টিংয়ের প্রদর্শনী হয়। এগুলো দেখে আমার মূল্যায়ন হলো, যারা কাজ করে তারা খুবই সিরিয়াস। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা যে কাজ দেখি, বাংলাদেশীদের কাজ তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সমস্যা হচ্ছে এখানে প্রচার কম। আমরা নিজেরা ছবি আঁকি, প্রদর্শনী করি। প্রদর্শনী শেষ হলে ঘরে নিয়ে রেখে দিই। বিদেশে যারা অভিজ্ঞ, শিল্পচর্চা করেন, পরামর্শ দেন তাদের দেখাতে পারছি না। এটা বড় সীমাবদ্ধতা। ভাস্কর্য ও সিরামিকে আমাদের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। এখন বিদেশে প্রদর্শনী প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের অবস্থানটা কোথায়—বিদেশে প্রদর্শনী না করলে তো সেটা জানতে পারছি না। সে কারণে শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব হচ্ছে এ পেইন্টিংগুলো বিদেশে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। যেন আমাদের মান নিয়ে বিদেশীরা মতামত দিতে পারে। সমালোচনারও দরকার আছে। সমালোচনা না হলে উন্নতি হবে না।

একুশে পদকে ভূষিত হওয়ায় আপনার প্রতিক্রিয়া?

জীবনে কী পেলাম, কী পেলাম না এ নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই। চিন্তাও করি না। এর একটা কারণ হতে পারে, পুরস্কার তো আমি ছোটবেলা থেকেই পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশে ছবি পাঠিয়েছি, পুরস্কারও পেয়েছি। এই যে একুশে পদক, এটা জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করে গেছেন। শিল্পকলা অগ্রসর হতে হলে শিশুকাল থেকেই শুরু করতে হবে, সেই চিন্তা থেকে তিনি শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম এশিয়া চারুকলা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে প্রথম আয়োজনটি জিয়া নিজেই উদ্বোধন করেন। সেই প্রদর্শনীতে আমি স্বর্ণপদক অর্জন করি।

এখন আমি লেখালেখি করি। লেখালেখিতেই ব্যস্ত থাকি। ৫ মিনিট যদি আমার হাতে কাজ না থাকে, অস্বস্তি লাগে। সুতরাং আমি কাজকেই ভালোবাসি। এতদিন যে আমাকে একুশে পদক দেয়নি, সে নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। আমি বিশ্বাস করি কর্মফলে। কর্ম যদি ভালো হয় ফল আসবেই।