নতুনের প্রতি মানুষের টান সহজাত। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে আরো কত কবি তাদের গানে, কবিতায় করেছেন নতুনের স্তুতি। বছরকে বিদায় দেয়ার আগেই মানুষ বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। আর তাই বাংলা বর্ষপঞ্জিতে চৈত্রসংক্রান্তির তুলনায় ঘটা করে চলে বৈশাখকে স্বাগত জানানোর আয়োজন।
ক’দিন বাদেই ফুরাবে ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। ১৪৩২-কে স্বাগত জানাতে বরাবরের মতো এবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে গিয়ে দেখা গেল, প্রতিবারের মতো এবারো নববর্ষকে বরণ করতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছেন শিল্পীরা। পহেলা বৈশাখের উৎসবমুখর রূপ ফুটিয়ে তুলতে প্রতিকৃতি, মুখোশ, পটচিত্রসহ নানা অনুষঙ্গ সাজিয়ে তুলছেন তারা। কেউ কাগজ কেটেছেঁটে তৈরি করছেন বাংলার বাঘ। লক্ষ্মীপ্যাঁচার প্রতিকৃতিতে রঙের আঁচড় বসাচ্ছেন কেউ। কেউ ব্যস্ত রঙতুলি দিয়ে মাটির সরায় নকশা অঙ্কনে। গ্যালারির এক কোণে দেখা গেল রাজা-রানীর কয়েকটি বিশাল প্রতিকৃতি।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বৈশাখ আয়োজনের কর্মযজ্ঞে অংশ নিচ্ছেন চারুকলা অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। এমনকি আপন মনে তুলি হাতে প্রতিকৃতিতে রঙ করতে দেখা গেল শিশুদেরও। গ্যালারিতে নানা বয়সের শিল্পীদের কর্মব্যস্ততাই বলে দিচ্ছিল, এবারের বৈশাখকে আরো প্রাণবন্ত করতে চেষ্টার কমতি নেই তাদের।
মুহাম্মদ মেহেদী হাসান চারুকলার ১৯৯৭-৯৮ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। এত বছর পরও বৈশাখের প্রস্তুতিতে অংশ নিতে ছুটে এসেছেন প্রিয় শিক্ষাঙ্গনে। গ্যালারিতে তার সঙ্গে কথা হলো এবারের প্রস্তুতি নিয়ে। মেহেদী জানালেন, এবারের প্রস্তুতি পর্বের শুরুটা অন্যবারের তুলনায় কিছুটা ধীরগতির ছিল। রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ছিলেন বাড়িতে। তবে ঈদের দীর্ঘ ছুটির আমেজ কাটতে না কাটতেই মুখর হয়ে উঠেছে চারুকলা প্রাঙ্গণ। সব ব্যাচের শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

মেহেদী জানালেন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে এবারের শোভাযাত্রায় দেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তারা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা উপাদান নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন। নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি কবে নাগাদ শেষ হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি চৈত্রসংক্রান্তির আগেই সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
মূলত বৈশাখকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই পুরো চারুকলায় উৎসবের আমেজ বইছে। কেবল শিল্পীরাই নন, নানা বয়স-পেশার মানুষও আসছে প্রস্তুতি পর্বের আয়োজন দেখতে। চারুকলা ঘুরে তারা দেখছে কীভাবে শিল্পীরা কাগজ, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করছেন গ্রাম বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা মোটিফ।
জয়নুল গ্যালারিতে প্রতি বছর সিনিয়র শিল্পীদের নিয়ে বৈশাখের প্রস্তুতিতে থাকে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন। এবার সোমবার শুরু হওয়া ক্যাম্প শেষ হবে আজ।
জয়নুল গ্যালারির ২ নম্বর গ্যালারিতে ক্যাম্পের শিল্পীদের দেখা গেল নিবিষ্টচিত্তে ক্যানভাসে রঙ ছুঁয়ে যেতে। ক্যাম্প শেষে তাদের আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজন হবে প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী থেকে পছন্দের চিত্রকর্ম সংগ্রহ করতে পারবেন যে কেউ।

জয়নুল গ্যালারি থেকে সামান্য এগিয়ে গেলেই ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিংয়ের বারান্দা। সেখানে অনেকটা জায়গায় কাপড় বিছিয়ে আঁকা হচ্ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্য পটচিত্র। এছাড়া চারুকলার মাঠে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে বিশালাকৃতির প্রতীকী ভাস্কর্য নির্মাণে কর্মব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে চারুকলার শিল্পীদের। প্রকৌশলী, চারুকলার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও মোটিফ আর্টিস্টদের নির্দেশনায় সেখানে কাজ করছেন একদল কারিগর।
এবারের বৈশাখ ভিন্নমাত্রায় উদযাপন হবে বলে দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের ডিন ড. আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল। অনুষদের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বৈশাখকে রাঙাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সমকাল—এ তিনের সমন্বয়ে কীভাবে আরো সুন্দর করে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা যায় সেই প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে চারুকলা অনুষদ। তাদের প্রত্যাশা, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে পহেলা বৈশাখের আনন্দ আয়োজন আরো বর্ণাঢ্য ও সফল হয়ে উঠবে।
তিনি আরো বলেন, ‘নতুন বছরে উদযাপন সফল করতে যত ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায় তার সবই নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’





