দক্ষিণ আমেরিকায় শিল্প প্রদর্শনী ইভেন্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসর ব্রাজিলের ‘সাও পাওলো আর্ট বাইয়েনিয়ল।’ এবার বসেছে এ আয়োজনের ৩৬তম আসর। প্রথম আয়োজন হয়েছিল ১৯৫১ সালে। ভেনিসের পর এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম দ্বিবার্ষিক শিল্প উদ্যোগ। ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত। এর কিউরেটর বোনাভেনচার সোহ বেজেং এনডিকং বলেছেন, ‘এটি দক্ষিণ বিশ্বের একটি বিরল প্লাটফর্ম, যা উত্তর বিশ্বের আর্ট সেন্টারের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে।’
ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ব্রাজিল আফ্রিকার খুব কাছাকাছি, আর এ কারণেই এটি অভিবাসনের নানা গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। সোহ বেজেং এনডিকং আর্টসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ব্রাজিল এমন একটি জায়গা, যেখানে আদিবাসী, আফ্রিকান ও ইউরোপীয় পথচলা একে অপরের সঙ্গে মিশেছে। এটি কখনো বেদনার মাধ্যমে, আবার কখনো নতুন সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে।’
বাইয়েনিয়ল এ প্রদর্শনীতে স্থানীয় শিল্পকর্মের সংখ্যা অবশ্য কম। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আয়োজনটির কেন্দ্রে রাখা হয়েছে আফ্রিকান ও কৃষ্ণাঙ্গ ব্রাজিলিয়ান শিল্পীদের কাজ। এটি ব্রাজিলে চলমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী প্রমাণ। অতীতে অনেক গ্যালারি ও আর্ট প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী ও শিল্প পেশাজীবীদের কম প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের এ ঐতিহাসিক অবমূল্যায়ন দূর করার জন্য অনেক গ্যালারি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বর্তমান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাও পাওলো বাইয়েনিয়লের মতো আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চ কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের জন্য বড় জায়গা তৈরি করেছে।
এবারের প্রদর্শনীর মূল থিম হলো ‘মানবতার মেলবন্ধন’। এখানে অনেক কাজেই জোর দেয়া হয়েছে শিল্পের সেই শক্তির ওপর, যা আমাদের অন্যের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে। আটলান্টিক পারাপার পথে পানি থেকে শুরু করে মোহনার পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ স্রোত পর্যন্ত—এ ভিজুয়াল ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। ফলে অনেক শিল্পকর্মে দেখা যায় তরলতার টেক্সচার আর ঢেউ খেলানো বিভাজন।
বিয়েনালে প্রদর্শনীটি হচ্ছে সিসিলিও মাতারাজো প্যাভিলিয়নের তিনতলাজুড়ে। প্যাভিলিয়নে বাইরের অংশ ও সামনেও কিছু শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়েছে। উদ্বোধনী দিনে সাংবাদিকরা প্রদর্শনীর কিউরেটর, শিল্পী ও শিল্প সংগ্রাহকদের কাছে জানতে চান, কোন কোন কাজ তাদের মনে দাগ কেটেছে। তাদের মতে, ২০২৫ সালের সাও পাওলো বিয়েনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু শিল্পকর্ম হলো—
প্রেশাস ওকোইওমনের ‘নট অল ট্রাভেলার্স ওয়াক রোডস অব হিউম্যানিটি অ্যাজ প্র্যাকটিস’

প্রদর্শনীর প্রবেশপথেই রাখা হয়েছে প্রেশাস ওকোইওমনের বিশাল বাগানসদৃশ একটি ইনস্টলেশন। দর্শনার্থীরা এতে হাঁটতে পারেন, মাটি ও পাথরের উঁচু ঢিবি বেয়ে উঠতে পারেন এবং উপভোগ করতে পারেন এক অদ্ভুত সবুজ মরুভূমি। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেরাদো পরিবেশের বাস্তবতা, যেটি শিল্পী এখানে এনে সাজিয়েছেন। কৃত্রিম পুকুর আর কুয়াশা ছড়ানো যন্ত্রের সাহায্যে এটি স্থাপন করা হয়েছে। এটি প্রদর্শনীর সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা কাজগুলোর একটি। তবে এর যত্নও নিতে হয় প্রচুর—পাতা ঝরে পড়া বা মাটি সরে যাওয়া ঠেকাতে টেকনিক্যাল টিম সবসময় ব্যস্ত থাকে। কিউরেটররা বলেছেন, শিল্পকর্মটির এ অনিশ্চয়তা বুঝিয়ে দেয়, সব জীবের মধ্যে বিশৃঙ্খল আছে, আবার সহাবস্থানের সৌন্দর্যও আছে।
লেইকো ইকেমুরার ‘গার্লস’

সাও পাওলো শহরে প্রচুর জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করে। এখানে ইকেমুরার মতো জাপানি শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে নিজের কাজকে অন্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে। তার চিত্রকর্মে নারীর শরীরকে অস্পষ্ট, ভুতুড়ে রূপে দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কখনো চোখ, কখনো যৌনতার ইঙ্গিত, আবার যৌবনের অনিশ্চিত ধারাবাহিকতাকেও তুলে ধরেছেন শিল্পী। কিউরেটর পাওলো মিয়াদা বলেছেন, ‘ইকেমুরা দেখান কীভাবে একজন জাপানি শিল্পী নিজের দেশের বাইরে থেকেও বিশ্বব্যাপী কাজ করতে পারেন। তার স্বচ্ছতা, রঙের ব্যবহার আর বহুমাত্রিক রূপক আমাদের মুগ্ধ করে।’
নাদিয়া তাকুয়ারির ‘আইরুকু: দ্য কসমিক ট্রি’
ব্রাজিলের শিল্পী নাদিয়া তাকুয়ারির ভাস্কর্যে নারীর দেহকে পাখির মতো রূপ দেয়া হয়েছে। এখানে নারীর পালক, শক্তিশালী নখ একদিকে যেমন বিস্ময় তৈরি করে, আবার কিছুটা ভয়ও জাগায়। প্রদর্শনীর সংবাদ সম্মেলনে বাইয়েনিয়লের যোগাযোগ উপদেষ্টা হেনরিয়েট গ্যালুস বলেছিলেন, ‘শিল্পে সব ধরনের স্বাধীনতা আরামদায়ক নয়। তাকুয়ারির কাজ সেই কথাকেই মনে করিয়ে দেয়।’ নাদিয়ার শিল্পচর্চা মূলত পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য আর ঔপনিবেশিক আমলের কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত। এছাড়া তিনি একটি উজ্জ্বল কমলা রঙের ফাইবার গ্লাসের গাছও তৈরি করেছেন, যা ব্রাজিলীয় আফ্রো-ধর্মীয় ঐতিহ্যে পবিত্র গাছ ‘গামেলেইরা’র প্রতীক। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাসমতে, এ গাছ দিয়েই ওরিক্সা দেবতারা পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন।
মারলেনে আলমেইদার ‘লিভিং আর্থ’
৫০ বছরের অভিজ্ঞ শিল্পী আলমেইদা ছাদ থেকে ঝুলন্ত চামড়ার ফিতা দিয়ে তৈরি বিশাল ভাস্কর্য এনেছেন। পাশাপাশি একটি ‘ল্যাবরেটরি’ ইনস্টলেশনে তিনি নিজের অঞ্চলের মাটি ও পাথর কাচের বোতলে ভরে প্রদর্শন করেছেন। প্রতিটি বোতলে লেখা আছে কোন জায়গা থেকে মাটি আনা হয়েছে। এ নিয়ে শিল্প ইতিহাসবিদ তেরেজা দে আরুদা বলেন, ‘তার কাজ ভূগোল, প্রকৃতি ও ইতিহাস মুছে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মতো। তিনি কেবল ল্যান্ডস্কেপ আঁকেন না, তিনি প্রকৃতিকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন।’
এমেকা ওগবোহর ‘দ্য ওয়ে আর্থ থিংস আর গোয়িং ২’
প্রদর্শনীর অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছে ওগবোহর শব্দ ও ঘ্রাণভিত্তিক কাজ ‘দ্য ওয়ে আর্থ থিংস আর গোয়িং ২’। লাল আলোয় ভরা ঘরে গাছের কাটা গুঁড়িতে রাখা স্পিকারের মাধ্যমে বিষণ্ন সুর বাজছে। সঙ্গে পোড়া গন্ধ। অ্যামাজন বন ধ্বংস আর পরিবেশগত শোকের প্রতীক হিসেবে এ শিল্পকর্ম উপস্থাপন করা হয়েছে।
এছাড়া ব্রাজিলের আদিবাসী শিল্পী লিদিয়া লিসবোয়ার ‘টেটাস কুই দেরাম দে মামার ও মনডো’ শিরোনামে কাপড় বুনে বিশাল স্তনাকৃতি ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। এগুলো ছাদ থেকে ঝুলে আছে। এটি জীবনের ক্লান্তি ও প্রাচুর্য দুই-ই মনে করিয়ে দেয়। এ রূপগুলো সেসব দেহের প্রতীক, যেগুলো শুধু সন্তানকেই নয়, পুরো শক্তির ব্যবস্থাকেও যেন লালন করেছে।
সাও পাওলো বাইয়েনিয়ল ২০২৫-এর সহকিউরেটর আনা রোবার্তা গোয়েটজ বলেছেন, ‘বিশ্বের অনেক বড় প্রদর্শনী অনেক অর্থ খরচ করে টিকিটের মাধ্যমে উপভোগ করতে হয়। এ কারণে সেসব আয়োজন সবাই উপভোগ করতে পারেন না। কিন্তু সাও পাওলো বাইয়েনিয়ল সবার জন্য উন্মুক্ত। এত বড় শিল্পমঞ্চ এবং বহু শিল্পীর প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার ঘটনাও এ আয়োজনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।’
[আর্টসি ডটনেটে এলা বিটেনকুর ‘দি এইট মোস্ট টক্ড-অ্যাবাউট আর্টওয়ার্কস অ্যাট দ্য সাও পাওলো বাইয়েনিয়ল ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অবলম্বনে]










