শিল্প আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। মনে করিয়ে দেয় ভুলে যাওয়া গল্পগুলো। আর কখনো কখনো নীরবে সতর্ক করে দেয়, আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এবং কোন পথে এগোচ্ছি। বাংলাদেশের শিল্পভুবনে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর তৈরি করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ‘নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী’। ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু করা ‘নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী’ নিয়মিত জাতীয় আয়োজন হিসেবে বাংলাদেশের চারুকলার বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখে চলেছে। বহু প্রথিতযশা শিল্পীর শিল্পীসত্তা এ প্রদর্শনীর মাধ্যমেই প্রথম বৃহত্তর দর্শকের সামনে উন্মোচন হয়েছিল, যারা পরবর্তী সময়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জন করেন। সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই ‘২৪তম নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী, ২০২৫’ নতুন চিন্তা ও কাঠামোর সংযোজন ঘটিয়েছে দুটি বিশেষ কিউরেটেড শিল্প উপস্থাপনার মাধ্যমে।
এ বছরের প্রদর্শনীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন কিউরেটেড প্রদর্শনী ‘রূপান্তর’। আন্তর্জাতিক ভিজুয়াল আর্ট প্রদর্শনীতে কিউরেটেড শো দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রথা হলেও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এ উদ্যোগ দেশের শিল্প পরিসরে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, প্রাচ্যকলা, কারুশিল্প, সিরামিক, আলোকচিত্র, ইনস্টলেশন, পারফরম্যান্স আর্ট, নিউ মিডিয়াসহ চারুকলার প্রায় সব মাধ্যমের বহুমাত্রিক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
নিত্যদিনের জীবনের অনুচ্চারিত গল্প উঠে এসেছে মো. ইমতিয়াজ ইসলামের কাজে। দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রহ করা টিকিটের ওপর মানুষের দৈনন্দিন ভঙ্গিমা ও চলমান জীবনের মুহূর্তগুলো ধারণ করে তিনি এমন এক দৃশ্য নির্মাণ করেছেন, যেখানে দর্শক নিজের অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন।
মাতৃত্বের নিঃশব্দ ত্যাগ ও আবেগময় শক্তি তুলে ধরা সীমা মণ্ডলের প্রিন্ট মেকিং কাজ এ বছর দ্বিতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে। তার শিল্পকর্ম মায়ের ভূমিকা কোনো আবেগঘন প্রতীক নয়, বরং এক গভীর মানবিক দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ‘এমন প্রদর্শনী বেশি বেশি হওয়া দরকার। তাহলে আমাদের শিল্পীরা আরো বেশি অনুপ্রেরণা পাবে এবং বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে আমাদের শিল্পীরা খ্যাতি কামাবে।’
প্রদর্শনীতে লোক ঐতিহ্যের বিলুপ্তপ্রায় অধ্যায়ও উঠে এসেছে হাজং সম্প্রদায়ের চার-মাগা পরিবেশনার মাধ্যমে। গান, নৃত্য ও নাট্যের সংমিশ্রণে ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী বলার এ ভ্রাম্যমাণ শিল্পধারা একসময় সামাজিক বন্ধনের প্রধান মাধ্যম ছিল। চার-মাগা অংশে প্রদর্শিত ‘মহিষাসুর বধ’ পরিবেশনা সেই হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্মারক। কৃষিজ সরঞ্জামের প্রতীকে নির্মিত রূপশ্রী হাজংয়ের এ শিল্পকর্ম হাজং জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক টিকে থাকার লড়াইকে দৃশ্যমান করে তোলে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করা আনন্দের। আমি সেখানে হাজংদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরছি। এমন প্রদর্শনী হলে আমরা আরো সুযোগ পাই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের পরিচয়কে সবার সামনে তুলে ধরতে।’

রূপশ্রী হাজংয়ের শেকড় অনুসন্ধান
নারীর কর্মজীবনের নীরব মানসিক চাপ ও প্রতিবন্ধকতা গভীরভাবে উঠে এসেছে ফারিয়া খানম তুলির ইনস্টলেশন ‘কর্মক্ষেত্রে নারী’-তে। ২৪ জন কর্মজীবী নারীর মুখের ছাঁচ ও তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের গল্প নিয়ে নির্মিত এ কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও একজন কর্মজীবী নারী। আমি প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মানুষ দ্বারা সৃষ্ট নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। তা না হলে হয়তো আরো একটু সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে নিজে ও নিজের কর্মক্ষেত্রে ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারতাম। আমার নিকটাত্মীয় ও আমার আশপাশের নারীদের নিয়ে এ স্থাপনা শিল্প, যেখানে ২৪ জন নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার পেছনের যে মানসিক অস্বস্তি তার গল্প।’
এ ইনস্টলেশন আত্মনির্ভরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা ও সামাজিক বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে সামনে আনে।
প্রকৃতি ও নগরায়ণের সংঘাত নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে নূর এ আলা সিদ্দিকের তৃতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পকর্ম ‘শিকড়ের মৃত্যু’। উন্নয়নের নামে বন উজাড় ও কংক্রিটের বিস্তারে প্রকৃতির শেকড় উপড়ে ফেলার পরিণতি নিয়ে এ কাজ দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে, এ আরামদায়ক বর্তমান কি ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ। এর বিপরীতে মৌসুমি আক্তার মনির ইনস্টলেশন ‘শিকড়ের সন্ধানে’ অতীতের ভেতর দিয়ে নিজের পরিচয় অনুসন্ধান করে। পুরান ঢাকার পুরনো ভবন, পানাম নগর, ঝুলে পড়া লেপ-সুরকির দেয়াল, জলসাঘর, মন্দির ও আস্তাবলের চিত্র তার শিল্পে ইতিহাসের ক্ষীয়মাণ মুখ হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্বাধীনতার ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তানজিলা সুমাইয়া সিদ্দিকির ‘আম-জনতা’, যেখানে খাঁচাবন্দি মুরগির প্রতীকে সাধারণ মানুষের অসহায়তা ও নিয়ন্ত্রিত অস্তিত্ব ফুটে ওঠে। একইভাবে হৃদয়বিদারক স্মৃতির ভাষ্য হয়ে উঠেছে মায়া দেবী চাকমার শিল্পকর্ম, যেখানে কাপ্তাই বাঁধের পানিতে বিলীন হয়ে যাওয়া এক গ্রামের ইতিহাস নীরব আর্তনাদ হয়ে ধরা দেয়।
খাদ্যরসিক বাঙালির খাবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক উঠে এসেছে মুনা হোসেনের ‘ফুড হ্যাজ অ্যান এক্সপ্রেশন’-এ। এ শিল্পকর্ম নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাবারের সাথে প্রত্যেকটা মানুষের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। স্পেশালি মায়ের হাতের রান্না। এখানে একটা সিরিজ—কলাপাতার ওপর পাতুরি। পাতুরি কলাপাতায় মুড়িয়ে ভাপে রান্না করা বিলুপ্তপ্রায় খাবার। রেস্তোরাঁয় কিছুটা দেখা মিললেও আগের মতো যত্ন নিয়ে বাসাবাড়িতে কেউ আর এ খাবার প্রস্তুত করেন না। এ ইনস্টলেশনে আমি ইলিশ মাছের পাতুরি, ভেটকি মাছের পাতুরি আর চিংড়ির পাতুরি দেখিয়েছি।’
এমন আরো বহু শিল্পকর্মে উঠে এসেছে বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তরুণদের চোখে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরের জানা-অজানা গল্প। এ প্রদর্শনী একত্রে নির্মাণ করে সময়ের এক স্পন্দিত মানচিত্র, যেখানে তরুণ শিল্পীরা নিজেদের শেকড়, সংকট ও স্বপ্নকে ভাষা দিয়েছেন। প্রদর্শনীটি কেবল দেখার বিষয় নয়; এটি ভাবনার আহ্বান, স্মৃতির দায় আর ভবিষ্যৎ রক্ষার এক সচেতন প্রচেষ্টা।










