‘জলে লেখা সখ্য ধুয়ে গেছে জলে; তবু সখ্যের সেই কাহিনী মিশে আছে জলের অতল হৃদয়ে। কেউ তাকে খোঁজে না, আর খুঁজলেও পায় না। তবু কালের মন্দিরার মতো তা বেজে ওঠে।’ ভাষাচিত্রী ইমতিয়ার শামীমের উপর্যুক্ত লেখাটি প্রাসঙ্গিকভাবে এসে সজোরে ধাক্কা দিল সহিদ কাজীর ‘ইমপাস্তো’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে গিয়ে।

পঞ্জিকার পাতায় এখনো চলছে পাতা ওড়ার কাল—হেমন্ত। কিন্তু প্রকৃতিতে বেশ কয়দিন হলো বইছে হিম হিম দুরন্ত হাওয়া। জন-অরণ্যের এই নগরে শীতের প্রকোপ যদিও কিছুটা কম থাকে। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যারাতে রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ৬/৪ নম্বর বাড়ির ভূমি গ্যালারিতে প্রবেশের সময় অনুভূত হলো ঠাণ্ডা হাওয়ার বেশ তোড়জোড়। শান্ত নিবিড় প্রাঙ্গণ। ক্বচিৎ টুংটাং রিকশার ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে লালমাটিয়া মহিলা কলেজ রোড থেকে। এদিকে ঘন সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে নেমে পড়ছে কুয়াশার কুহক। সেই আলো-আঁধারির মায়াভ্রম ঠেলে ঢুকে পড়ি যেন জীবনানন্দের ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’র খণ্ডচিত্রে। কবি প্রায় আট দশক আগে সন্ত্রস্ত হয়ে লিখলেন, ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে—সবচেয়ে সুন্দর করুণ।’ আক্ষরিক অর্থেই বাংলার সুন্দর করুণ দৃশ্যটাই যেন চোখে পড়ল সহিদ কাজীর তেলরঙে আঁকা চাঁদমালা ফুলের হালকা বাদামি রঙের পাতার দৃশ্য দেখে। কালো জলের রেখায় বোনা পানা ফুলটির পাশে জুড়ে দিলেন চাঁদের মায়াবী ছায়া। কী অসাধারণ দৃশ্যকল্পের বুনন। আমি যেভাবে ঠিক দেখেছি চিত্রকর্মটি, শিল্পী হয়তো তা ভেবেও আঁকেননি। এখানেই চিত্রকরের ক্যারিশমা।

17

দূর থেকে সকাতর চাহনিতে ডাকছে সূর্যমুখী। চিত্রকর্মটি দেখার সময় পরিচয় ঘটে শিল্পী সহিদ কাজীর সঙ্গে। খানিকটা রসিকতা করে বলি, আপনার সূর্যমুখী এত নিষ্প্রাণ কেন?

শিল্পী খানিক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতেই বলেন, ‘হ্যাঁ। এখানে ৪৬টি চিত্রকর্ম আছে। প্রত্যেকটি চিত্রকর্মতেই শেষ মুহূর্তের গল্প বলতে চেয়েছি।’ চিত্রকর্মটির পাশের দেয়ালেই বিশাল ক্যানভাস। কাজটিকে আপাতত মনে হয় চাষ উপযুক্ত ভূমি। কিন্তু একটু নিরীক্ষা করলেই দেখা মেলে উঁচু-নিচু কর্দমাক্ত ভূমির বুক চিরে বয়ে গেছে মাটি বহনকারী গাড়ি। সে বাহনের চাকার দাগ রয়ে গেছে। এ চিহ্নে শিল্পী মাটির কান্না তুলে ধরেছেন ইমপাস্তো পদ্ধতির পেইন্টিং ব্যবহারে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ক্যানভাসের ওপর যেন জলের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে উঁচু-নিচু স্তরের। সব মিলিয়ে যেন উৎপন্ন করে একটা কাব্যিক দ্যোতনা।

18

শিল্পী তার ক্যানভাসে এনেছেন একটি সুন্দর পাতার শেষ অধ্যায়, পথের ধারে অনাদরে ঝরে পড়া বুনো ভাটফুল, নষ্ট হয়ে যাওয়া কলাবতী ফুল। দূরের কাশবন ঘন হয়। কিন্তু বনের ভেতরে গেলে বোঝা যায় কাশবনেরও যে রয়েছে বেদনা। হালফিল ট্রেন্ডিংয়ের কবলে আমরা ক্রমাগত বিনাশ করছি প্রকৃতিকে। শরতে দেখা যায় দলবেঁধে কাশফুল ছিঁড়ে নিয়ে আসার দৃশ্য। কোথাও কোথাও বন উজাড়ের সংবাদও পাওয়া যায়। সেই দৃশ্যকল্প কাশবনের ক্যানভাস এঁকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিল্পী।

সহিদ কাজীর সব কাজের মধ্যেই বেদনার রঙ মিশ্রিত। চিত্রকর্মের সাবজেক্ট (যেমন ফুল, পাতা) ম্রিয়মাণ—ক্ষয়ে যাচ্ছে। ধূসর হয়ে পড়ছে। তবু কাজ সতেজ হয়ে উঠেছে টেক্সচারের উপযোগিতায়।

কেন যেন মনে হয় সহিদ কাজীর অনেকগুলো কাজের টেক্সচার এই বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে মেলে না! তবে তার কাজের ফিনিশিং দারুণ। নয়ন জুড়িয়ে যায়। কাজীর ল্যান্ডস্কেপগুলো অসাধারণ। বিশেষ করে কলাগাছ, শুকনো পাতাসহ ভূমির চিত্রকর্মটির নাম বলতে হয়। পিষ্ট হয়ে যাওয়া ঘাস, সেই সঙ্গে এই পুরান ঢাকা নিয়ে কয়েকটি কাজের কথাও দর্শনার্থীদের আলাদা করে মনে থাকবে নিশ্চয়।

গুণী এ শিল্পীর প্রদর্শনী সম্পর্কে কথা হয় অগ্রজ শিল্পী রফি হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সহিদ কাজীর ছবিতে দেখেছি উদ্ভাসিত আলোর মায়াময় বিস্তার। আমার বিশ্বাস ওর ছবির মায়াময় আলোর বিস্তার শিল্পপ্রেমিক দর্শকদের মনেও ছড়িয়ে পড়বে।’

৫ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত গ্যালারির দুয়ার। শিল্পসমঝদারদের জন্য থাকছে চিত্রকর্ম সংগ্রহ করার সুযোগও।