২০২৫ সালের ঊষালগ্নে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেই শিল্পী, কিউরেটর, লেখক ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের, যারা ২০২৪ সালে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

কার্ল আন্দ্রে: মিনিমালিস্ট আন্দোলনকে সংজ্ঞায়িত করতে কাজ করেছেন মার্কিন ভাস্কর কার্ল আন্দ্রে। তার নির্ভার উপকরণকেন্দ্রিক কাজ হয়তো চিরতরে পরিবর্তন করেছে আধুনিক ভাস্কর্যের ভাষা। ১৯৮০-এর দশকে স্ত্রী শিল্পী আনা মেন্ডিয়েটার মৃত্যুতে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তখন থেকেই কিছুটা জটিল হয়ে উঠতে থাকে আন্দ্রের শিল্পকর্ম।

রবার্ট হুইটম্যান: হ্যাপেনিংসের মতো পারফরম্যান্স আর্টের প্রথম যুগের ইভেন্টের অন্যতম পথিকৃৎ রবার্ট হুইটম্যান। প্রযুক্তিগতভাবে সে সময় শিল্পকেন্দ্রিক যে প্রকল্পগুলোকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখা হতো সেসবে রাউসেনবার্গসহ অনেকে তার সঙ্গী ছিলেন। শিল্প ও প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক্সপেরিমেন্টস ইন আর্ট অ্যান্ড টেকনোলজি (ইএটি)।

জ্যাকব রথসচাইল্ড: রথসচাইল্ড ছিলেন ব্রিটিশ শিল্পজগতের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি পৃষ্ঠপোষক, সংগ্রাহক ও দাতা হিসেবে এবং হেরিটেজ লটারি ফান্ড, ন্যাশনাল গ্যালারি, লন্ডনের সমারসেট হাউজ এবং বাকিংহামশায়ারের ওয়াডেসডন ম্যানরের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি ও রূপান্তরে প্রভাব ফেলেছিলেন। রথসচাইল্ড ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ওয়াডেসডন বিকোয়েস্টের পুনরায় প্রদর্শনীতে অর্থায়ন করেছিল।

ফাতি ঘাবেন: ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক দৃশ্যপটে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠা স্বশিক্ষিত শিল্পী ফাতি ঘাবেন ইসরায়েল কর্তৃক একাধিকবার বন্দি হয়েছিলেন। আরব বিশ্ব এবং তার বাইরের শিল্পীদের সমর্থন দেয়া লন্ডনভিত্তিক আর্টস ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসের এল সাক্কা বলেন, ‘ঘাবেনই প্রথম ব্যক্তি যিনি চিত্রকলায় ফিলিস্তিনি পতাকা ব্যবহার করেছিলেন। শহরের সর্বত্র তার শিল্পকর্মের পোস্টারগুলোকে আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারি।’

রিচার্ড সেররা: সম্ভাবনার শেষ সীমানায় গিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন সেররা। স্টোনহেঞ্জ বা মিসরীয় সমাধির মাপের বিশাল ইস্পাতকর্ম তৈরি করেছেন তিনি। বিখ্যাত শিল্প ডিলার লিও ক্যাসটেলি ১৯৬৬ সালে তাকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে সেররা এমন কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান যা সহজেই বিক্রয়যোগ্য। বরং তিনি অগ্রসর হন আরো বড় শিল্পকর্মের দিকে।

লুকাস সামারাস: ১৯৫০-এর দশকে নিউইয়র্কের শিল্পাঙ্গনে আবির্ভূত হন সামারাস। নিজের স্বাক্ষর রাখা বিভিন্ন শিল্পকর্মের মধ্যে সামারাস বিস্তৃত ছিলেন চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, ইনস্টলেশন, অঙ্কন, ভাস্কর্য এবং আরো অনেক ধরনের মাধ্যমে। সামারাস একবার বলেছিলেন, তিনি কখনো নির্দিষ্ট কোনো ফরম্যাট বা দিক অনুসরণ করতে না চাইলেও তার বিভিন্ন কাজের মধ্যে সূক্ষ্ম সম্পর্ক রয়েছে যা দৃষ্টিভঙ্গি, আবেগ ও আত্মপরিচয়ে প্রোথিত।

ফেইথ রিংগোল্ড: রিংগোল্ডের বলিষ্ঠ এবং অবিচল রাজনৈতিক চিত্রকর্মগুলো জন্ম দিয়েছে কিছু পরিশীলিত ও চাক্ষুষ গল্পের। কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও মেয়েরা নিজেদের যেভাবে দেখত সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সামাজিক ভূমিকায় রিংগোল্ডের বিশ্বাস প্রদর্শিত হয়েছে এসব চিত্রকর্মে। শিল্পী কারা ওয়াকার একবার রিংগোল্ডকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঠিক কোন কার্যকলাপ বা সত্তা তাকে আশাবাদী, প্রাণবন্ত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ বোধ করায়। রিংগোল্ড উত্তর দিয়েছিলেন— ‘চিত্রকলা। আমি সাধারণত একটি সিরিজ করতে পছন্দ করি। কারণ তখনই কোনো গল্প বলা যায়।’

ফ্রাঙ্ক স্টেলা: স্পর্শকাতর এবং স্থাপত্যবিষয়ক নানা কাজের একজন ভাস্কর হিসেবে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। তিনি কাজের একটি অসাধারণ সংগ্রহ রেখে গেছেন যা সমালোচক পিটার শিয়েল্ডাহলের ভাষায়, এ ভাস্কর্যগুলো গত অর্ধশতাব্দীর শিল্পের প্রতি যত্নশীল যে কারো মনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে।

মার্ক ক্যামিল শাইমোউইচ: পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত ছিল শাইমোউইচের বহুমাত্রিক শৈল্পিক অনুশীলন। এর মাঝে ছিল ইনস্টলেশন, পারফরম্যান্স, চিত্রকর্ম, আর্টিস্ট বুক ও আসবাব। লুইসা বাক লিখেছেন, এখন মূলত শাইমোউইচের প্রভাবের কারণে শিল্পীদের জন্য শিল্প ও নকশা, সেই সঙ্গে সরকারি ও ব্যক্তিগতের মধ্যে সীমানা ভেঙে দেয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে এক সাধারণ ব্যাপার।

অড্রে ফ্ল্যাক: ১৯৬০-এর দশকে ফ্ল্যাক তার স্বতন্ত্র ফটোরিয়ালিস্ট ভাষার বিকাশ ঘটিয়ে ভিজুয়াল ক্ষেত্রে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন, যা শুধু এ ঘরানাতেই নয়, তার শিল্পচর্চার বিকাশেও এক বিশাল পরিবর্তন এনেছিল। এটি তার কাজকে বিমূর্ত এক্সপ্রেশনিজমের পুরুষতান্ত্রিক সাহসিকতা থেকে দূরে সরিয়ে সংবেদনশীল এবং স্পষ্টতই নারীবাদী এক জগতে প্রবেশ করায়।

ক্যাসপার কুনিগ: জার্মান কিউরেটর ক্যাসপার কুনিগ ছিলেন স্কাল্পচার প্রক্টে মুন্সটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তাকে তার যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী সমসাময়িক শিল্প প্রদর্শনীর নির্মাতাদের একজন হিসেবে অভিহিত করা হয়। কোলনের মিউজিয়াম লুডউইগের প্রাক্তন পরিচালক হিসেবে তিনি গত পাঁচ দশকের শিল্প সমালোচনাকে যেভাবে প্রভাবিত করেছেন তা অন্য কেউ পারেননি।